একালের শিক্ষা (তৃতীয় পর্ব)

Pratim De
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০’তে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক ইতিহাস পড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু বিজেপি সরকারের শিক্ষানীতিতে এই আঞ্চলিক ইতিহাসকে কেন্দ্র করে শিশুদের বোঝানো হচ্ছে যে পুরান আর ইতিহাসের মধ্যে কোনও ফারাক নেই। শিক্ষক আন্দোলনের বক্তব্য, ইতিহাস অনুসন্ধানে বিজ্ঞানমনস্কতাকে ধ্বংস করছে আরএসএস।
তৃতীয় পর্ব 

একশো বছরে আরএসএস : স্কুলপাঠ্যে হিন্দুত্বের প্রাবল্যে 


পুরান হচ্ছে ইতিহাস। ইতিহাস হচ্ছে বাতিল। ইংরেজিতে ‘এ ফর অ্যাপল’ নয়, হচ্ছে ‘এ ফর অর্জুন’। 
কোথায় হচ্ছে? স্কুলের পাঠ্য বইতে। 
কোন রাজ্যে? বিজেপি শাসিত সব রাজ্যেই। পড়ার বইয়ে হিন্দু ছাড়া অন্য কোনও ধর্মাবলম্বীর নামই নেই।
২০২৫ সালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আরএসএস’র একশো বছর পূর্তি। সংবিধান নির্দেশিত ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়, সংখ্যাগুরুবাদী সাম্প্রদায়িক ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ আরএসএস’র লক্ষ্য। আরএসএস’র রাজনৈতিক শাখা বিজেপি। কেন্দ্রে এবং বিভিন্ন রাজ্যের দলের সরকারগুলিকে কাজে লাগিয়ে চলছে সেই প্রস্তুতি। গোড়াতেই শিশুমনে চারিয়ে দেওয়া হচ্ছে সেই ধারণা। 

২০২০’তে সংসদে কোনওর আলোচনা ছাড়া নয়া শিক্ষা নীতি পাশ করিয়েছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। সংবিধান অনুযায়ী কেন্দ্র যৌথ তালিকার বিষয়। কিন্তু রাজ্যগুলির বিস্তারিত মতামত নেওয়ার দিকে যায়নি বিজেপি। শিক্ষা আন্দোলনের বিভিন্ন অংশই মনে করিয়ে দিচ্ছেন কেবল গৈরিকীকরণই যে স্পষ্ট তা নয়। স্পষ্ট বেসরকারিকরণের নীতিও। শিক্ষাকে পণ্য করে বেসরকারি মুনাফার জন্য তুলে দেওয়া হয়েছে। 

জাতীয় শিক্ষা নীতি

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০’তে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক ইতিহাস পড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু বিজেপি সরকারের শিক্ষানীতিতে এই আঞ্চলিক ইতিহাসকে কেন্দ্র করে শিশুদের বোঝানো হচ্ছে যে পুরান আর ইতিহাসের মধ্যে কোনও ফারাক নেই। শিক্ষক আন্দোলনের বক্তব্য, ইতিহাস অনুসন্ধানে বিজ্ঞানমনস্কতাকে ধ্বংস করছে আরএসএস। ২০২২ সালে গুজরাট, উত্তরপ্রদেশের মতো বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে এই প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। ‘ভারত গণতন্ত্রের জন্মদাত্রী’, এই বিষয়ে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনাসভা করার জন্য রাজ্যপালদের চিঠি পাঠিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসি। তাঁরা বলছেন, বিপজ্জনক দিক হলো জাত ভিত্তিক ‘বর্ণাশ্রম’ প্রথা বা জাত-গোষ্ঠী নির্ভর খাপ পঞ্চায়েতকে আধুনিক ভারতে গণতন্ত্রের জন্য শিক্ষণীয় বলে প্রচার হচ্ছে। 
বেদের যুগকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে প্রচারেও প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষকরা। তাঁরা বলছেন, ইতিহাসের পাতায় দেখা যাবে যে বৈদিক সমাজে পুরুষ এবং মহিলাদের আলাদা চোখে দেখা হচ্ছে। কোনও স্তরে মহিলাদের সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র মনে করা হচ্ছে। মহিলাদের কাজ বাড়িতে থাকা, শিশুদের পালন করা এবং পুরুষদের সেবা করা। তাঁরা বলছেন, বৈদিক সমাজেও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ছিল। সেই অনুসন্ধান থেকে সরে গিয়ে বিভেদের বৈদিক সমাজকে আদর্শ বলে দেখানো হচ্ছে। 
শিক্ষকরা মনে করিয়েছেন, বৈদিক সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বর্ণাশ্রম। বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে ভাগ। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্রের মধ্যে সব থেকে বেশি অত্যাচার লাঞ্ছনার মুখোমুখি হতে হয়েছে শূদ্রদের। তাঁরা বলছেন, দলিত এবং আদিবাসী নিপীড়ন বাড়ছে। এই সময়ে প্রজন্মান্তরে সামাজিক শোষণকে ভুলিয়ে দেওয়ার কৌশল সমাজের পক্ষে কাঙ্ক্ষিত নয়।
শুধু এখানেই শেষ নয় স্বাধীনতা আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকাকে খাটো করে দেখানোর প্রবণতা প্রথম থেকেই রয়েছে এই সরকারের। আর তাই বিভিন্ন রাজ্যের পাঠ্য বইতে জায়গা পায় না ব্রিটিশ বিরোধী ‘মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা’। 
শিক্ষাবিদদের বক্তব্য, শিক্ষা কাঠামোয় গণতন্ত্র এবং বিজ্ঞানমনস্কতা বাতিল করছে এ রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস সরকারও। আরএসএস’র মুখপত্র ‘পাঞ্চজন্য’-তে মমতা ব্যানার্জিকে ‘দুর্গা’ বলা হয়েছিল। তারপর তাঁকে কেন্দ্রের বিজেপি’র মন্ত্রীসভার সদস্যও হতে দেখেছে দেশের মানুষ। এখন নিজেকে ‘বিজেপি বিরোধী মুখ’ হিসাবে তুলে ধরতে চাইলেও স্ববিরোধ স্পষ্ট। নবান্নে বসে মমতা বলেছেন, ‘‘আমি ব্যাক্তিগত ভাবে মনে করি যে আরএসএস অতটা খারাপ নয়।’’


আগামীকাল চতুর্থ পর্ব

প্রথম পর্ব লিঙ্ক
দ্বিতীয় পর্ব লিঙ্ক

প্রকাশের তারিখ: ২১-অক্টোবর-২০২৫

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org