“বন্দেমাতরম” গান: সাম্প্রদায়িক আধিপত্যের আবর্ত

Arnab Bhattacharyya
এই প্রশ্ন উঠে এলো সব মুসলমানই কি শত্রু? অথচ এই বাংলাতেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মের আগে ঘটে গিয়েছে সন্ন্যাসী- ফকির বিদ্রোহ যেখানে সন্ন্যাসীদের নেতা ভবানী পাঠক এবং ফকিরদের নেতা মজনু শাহ একত্রে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।

সম্প্রতি “বন্দেমাতরম” গান নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে। “বন্দেমাতরম” গানের যে প্রথম দুটি স্তবককে এতকাল জাতীয় গান বলে বিবেচনা করা হয়ে এসেছে সেই দুইটি স্তবকের বদলে সম্পূর্ণ গানটি গাওয়ার নির্দেশ জারি করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। তবে এ রাজ্যে এই গানটি গাওয়ার সরকারি নির্দেশ আসার আগেই গোটা দেশে "বন্দে মাতরম" গান নিয়ে সংকীর্ণ রাজনীতি করেছে দেশের শাসক দল। আজ যখন "বন্দেমাতরম" নিয়ে দেশের শাসককে মেতে উঠতে দেখি তখন তার মধ্যে লক্ষ্য করি এক চরম দ্বিচারিতা। যে সরকারের নীতির মধ্যে রয়েছে দেশের জনসাধারণের প্রতি তাচ্ছিল্যের মনোভাব, যারা জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারকে অবলীলায় পদদলিত করে, যারা দেশের সম্পদ নির্দ্বিধায় মুষ্টিমেয় বৃহৎ কর্পোরেট শক্তিকে আত্মসাৎ করতে সহযোগিতা করে, তারাই আবার দেশকে মাতৃরূপে বন্দনা করে নিজেদের দেশপ্রেমিক প্রমাণের চেষ্টা করছে। দেশের সমস্ত মানুষকে এখন দেশপ্রেমের পরীক্ষায় বসতে হচ্ছে। আর সেই দেশপ্রেম প্রমাণ করতে হবে "বন্দেমাতরম" বলে এবং গেয়ে! যদিও এই গান নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত স্বাধীনতার আগেই। 

১৮৮২ সালে প্রকাশিত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের অন্তর্ভুক্ত এই বন্দেমাতরম গান। তবে আনন্দমঠ প্রকাশের বছর পাঁচেক আগে, সম্ভবত ১৮৭৫ বা ১৮৭৬ সালে এই গানটি লেখা হয়েছিল। এই উপন্যাসের দশম পরিচ্ছেদে ভবানন্দ এই গানটি গেয়েছেন, যিনি সন্তানদলের নেতা। ভবানন্দ বলছেন, তারা মায়ের সন্তান। তাদের কাছে ‘জন্মভূমিই জননী, আমাদের মা নাই, বাপ নাই, ভাই নাই, বন্ধু নাই, – স্ত্রী নাই, পুত্র নাই, ঘর নাই, বাড়ী নাই, আমাদের আছে কেবল সেই সুজলা, সুফলা, মলয়জসমীরণশীতলা শস্যশ্যামলা,__।’ এই মা শত্রু নিধন করবেন, তিনি “রিপুদল বারিণী”। এই শত্রু কে ? ভবানন্দ বলছেন এই শত্রু মুসলমান রাজা। ভবানন্দ উপন্যাসে জানিয়েছেন, ‘এই নেশাখোর দেড়েদের না তাড়াইলে কি হিন্দুর হিন্দুয়ানী থাকে?’ স্বভাবতই এই প্রশ্ন উঠে এলো সব মুসলমানই কি শত্রু? অথচ এই বাংলাতেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মের আগে ঘটে গিয়েছে সন্ন্যাসী- ফকির বিদ্রোহ যেখানে সন্ন্যাসীদের নেতা ভবানী পাঠক এবং ফকিরদের নেতা মজনু শাহ একত্রে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসে যবনদের বিতারণের যে প্রসঙ্গ এসেছে তাকে কোন কোন সমালোচক ইংরেজের কোপ দৃষ্টি থেকে বাঁচবার জন্য সাহিত্যিকের কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র নিজেই বলেছিলেন, "বাঙ্গালা হিন্দু মুসলমানের দেশ- একা হিন্দুর দেশ নহে। কিন্তু হিন্দু মুসলমান এক্ষণে পৃথক- পরস্পরের সহিত সহৃদয়তা শূন্য। বাঙ্গালার প্রকৃত উন্নতির জন্য হিন্দু মুসলমানে ঐক্য জন্মে। …”

কিন্তু তা সত্বেও এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই আনন্দমঠ উপন্যাস ১৯৩৭ সালের পর সাম্প্রদায়িক শক্তির পুনরুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত বিতর্কিত হয়ে উঠেছিল এবং মুসলিম লীগের নেতারা এই বই পোড়ানোর কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। মুসলিম লীগের কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করেন প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং সাহিত্যিক রেজাউল করীম। তিনি এই আন্দোলনের পেছনে ইংরেজের ষড়যন্ত্র লক্ষ্য করেন এবং সকলকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন-

‘আজ ‘আনন্দমঠ’র বিরুদ্ধে যে আন্দোলন আরম্ভ হইয়াছে, তাহা মুসলমানের অভাব-অভিযোগ দূর করিবার উদ্দেশ্যে নহে। তাহার মূল কারণ- মুসলমান যাহাতে মুক্তি আন্দোলনে যোগ দিতে না পারে তাহার জন্য কতকগুলি ছল বাহির করিবার দূরভিসন্ধি’।

তবে একেশ্বরবাদী মুসলিমদের পক্ষ থেকে "বন্দে মাতরম" গানটির কয়েকটি স্তবক নিয়ে যে আপত্তি উঠেছিল তা অমূলক বলা সম্ভব ছিল না। এই গানে যেভাবে পৌত্তলিকতা এসেছে তা মুসলিমদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত করছে বলে যে অভিযোগ উঠেছিল তার পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন কংগ্রেস সভাপতি জওহরলাল নেহরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে তাঁর মতামত জানতে চান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই গানের প্রথম দুটি স্তবকে সুর দিয়েছিলেন এবং ১৮৯৬ সালে কংগ্রেস অধিবেশনে গেয়েও ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে এই গানের প্রথম সাত লাইন ছাড়া পরবর্তী অংশ সার্বজনীনভাবে গ্রহণীয় নয় বলে তিনি মনে করেন। জহরলাল নেহেরুর চিঠির উত্তরে রবীন্দ্রনাথ জানান, I freely concede that the whole of Bankim's 'Bande Mataram' poem together with its context is liable to be interpreted in ways that might wound Muslim susceptibilities. অর্থাৎ তিনি মনে করতেন যে সম্পূর্ণ বন্দেমাতরম গানটি তার প্রেক্ষাপট সহ মুসলিমদের ভাবাবেগে আঘাত করতে পারে। কিন্তু যেহেতু এই গানটি তার বিশিষ্টতা এবং উদ্দীপনী শক্তির মাধ্যমে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে তাই তিনি ঐ গানের প্রথম দুটি স্তবক (সাত লাইন)-কে গ্রহণ করার পরামর্শ দেন এবং বলেন যে এর মধ্যে কোন নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে আহত করবার মতো কোনো উপাদান নেই।

(সূত্র: প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় রবীন্দ্রজীবনী, ৪র্থ খণ্ড)

ফলে জাতীয় গান হিসেবে গৃহীত অংশটি হল – 
বন্দে মাতরম্
সুজলাং সুফলাং
মলয়জশীতলাং
শস্যশ্যামলাং
মাতরম্।
শুভ্র-জ্যোৎস্না-পুলকিত-যামিনীম্
ফুল্লকুসুমিত-দ্রুমদলশোভিনীম্,
সুহাসিনীং সুমধুরভাষিণীম্
সুখদাং বরদাং মাতরম্।
আর যে অংশটি জাতীয় গান হিসেবে গৃহীত হয়নি সেটি হল,
সপ্তকোটি কণ্ঠ কলকল নিনাদ করালে,
দ্বিসপ্তকোটী ভুজৈর্ধৃত খর-করবালে,
অবলা কেন মা এত বলে৷৷
বহুবলধারিণীং
নমামি তারিণীং
রিপুদলবারিণীং
মাতরম্৷৷
তুমি বিদ্যা তুমি ধর্ম্ম
তুমি হৃদি তুমি মর্ম্ম
ত্বং হি প্রাণাঃ শরীরে৷৷
বাহুতে তুমি মা শক্তি
হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি
তোমারই প্রতিমা গড়ি
মন্দিরে মন্দিরে॥
ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী
কমলা কমল-দলবিহারিণী
বাণী বিদ্যাদায়িনী
নমামি ত্বাং
নমামি কমলাম্
অমলাং অতুলাম্
সুজলাং সুফলাম্
মাতরম্॥
বন্দে মাতরম্
শ্যামলাং সরলাম্
সুস্মিতাং ভূষিতাম্
ধরণীং ভরণীম্
মাতরম্॥

দেশকে মাতৃমুর্তি রূপে, দেবী প্রতিমা রূপে কল্পনা করবার প্রয়াস নিয়ে স্বদেশী আন্দোলনের সময় যে বিতর্ক ছিল তা ফুটে উঠেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “ঘরে বাইরে” উপন্যাসে। সেখানে উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র, উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রতিভূ সন্দীপ বলছেন, “দেশকে চোখে দেখতে না পেলে আমাদের দেশের লোক জাগবে না। দেশের একটা দেবী প্রতিমা চাই।... যে প্রতিমা চলে আসছে তাকেই আমাদের স্বদেশের প্রতিমা করে তুলতে হবে। পূজার পথ আমাদের দেশে গভীর করে কাটা আছে; এই রাস্তা দিয়েই আমাদের ভক্তির ধারাকে দেশের দিকে টেনে আনতে হবে”। উপন্যাসের আরেক চরিত্র সন্দীপের বন্ধু নিখিলেশ এভাবে মোহ সৃষ্টির বিরোধী ছিলেন। নিখিলেশের বক্তব্য, “যে কাজকে সত্য বলে শ্রদ্ধা করি তাকে সাধন করবার জন্য মোহকে দলে টানা চলবে না”। নিখিলেশের বক্তব্য ছিল দেশের রক্ত- মাংসের মানুষের সুখ-দুঃখের প্রতি নজর দেবার বদলে দেশকে কেবল একটা আইডিয়া বলে মনে করে তার স্তব-স্তুতি করা হলে দেশেরই ক্ষতি হবে। তিনি বলছেন, “প্রমত্ততা থেকে দেশকে যদি বাঁচাতে না পারি তবে দেশের পূজা হবে দেশের বিষ নৈবেদ্য, দেশের কাজ বিমুখ ব্রহ্মাস্ত্রের মতো দেশের বুকে এসে বাজবে”। কোন সন্দেহ নেই আমাদের দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় হিন্দু পুনরুত্থানবাদী শক্তির কার্যকলাপ ব্রিটিশ শাসককে “বিভেদ করো, শাসন করো নীতি” প্রণয়ন করতে সহায়তাই করেছিল। উৎসাহিত হয়েছিল মুসলিম সাম্প্রদায়িক শক্তি। আমাদের সমাজজীবনে ভেদ-বিভেদের ফাটল দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষকে ব্রিটিশ শাসক যে সহজে প্রবাহিত করতে পারছে তা রোধ করতে হলে এই ভেদ বিভেদকে নির্মূল করবার কথা বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যদিও সেই সাবধান বাণী যে ফলপ্রসু হয়নি তা তো বলাই বাহুল্য।

ঔপনিবেশিক শাসকের ষড়যন্ত্র এবং হিন্দু ও মুসলিম উভয় সাম্প্রদায়িক শক্তির তৎপরতা বারে বারে আমাদের দেশের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনকে কণ্টকিত করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সহ আমাদের দেশের জাতীয় নেতারা জনগণের ঐক্য বজায় রাখবার স্বার্থেই “বন্দেমাতরম” গানটিকে সংক্ষিপ্তভাবেই পরিবেশন করার পক্ষে ছিলেন যা ছিল অত্যন্ত যথাযথ এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।

আজ আমাদের দেশে বিভেদকামী শক্তি যেভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদকে নির্লজ্জভাবে ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আরোপ করবার চেষ্টা হচ্ছে তা গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। তর্ক-বিতর্ক, আলাপ-আলোচনাকে দূরে সরিয়ে রেখে, যুক্তিবাদের কন্ঠ রোধ করে উগ্র জাতীয়তাবাদের এক ধ্বংসাত্মক বয়ানকে যেভাবে গ্রাহ্য করে তোলবার চেষ্টা চলছে তাতে দেশের মানুষের কল্যাণ হতে পারে না। বিরুদ্ধতা ও বৈচিত্র্যের স্বর দমন করবার এই প্রয়াস ব্যর্থ হোক।


প্রকাশের তারিখ: ২৬-জুন-২০২৬

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org