|
রুশ বিপ্লব ও নারীমুক্তি - মালিনী ভট্টাচার্য...Unknown |
|
৭ নভেম্বের ২০২১ , রবিবার
![]() মনে রাখতে হবে ইউরোপের কোনো কোনো অংশে বিশেষত ভোটাধিকারের দাবি নিয়ে মেয়েদের নিজস্ব কিছু সংগঠন এসময়ে গড়ে উঠেছিল। নারীসাম্যের কিছু কিছু বিষয় ইউরোপীয় বুর্জোয়াসমাজে কিঞ্চিৎ পরিসর আদায় করতে সক্ষম হচ্ছিল। কিন্তু সমাজতন্ত্রীরা খুব স্পষ্টভাবেই বুঝেছিলেন যে এই সাফ্রাজেট সংগঠনগুলি নিজেদের শ্রেণীস্বার্থের বাইরে যেতে আগ্রহী নয়, সমাজের বৃহদংশের শ্রমজীবী মেয়েদের মুক্তিসন্ধানে সেখানে সহযোগিতার খোঁজ করে লাভ নেই। আর্থ-সামাজিক স্থিতাবস্থা বজায় রেখে যারা শুধু ওপর থেকে কিছু সংশোধন চায় তাদের পথে নয়, যেতে হবে সমাজের আমূল পরিবর্তনে ব্রতীদের কঠিন রাস্তায়। কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোতে শ্রেণীসমাজের আশিরনখর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যে নারীমুক্তির কথা বলা আছে, এঙ্গেলস বা বেবেল ব্যক্তি-সম্পত্তির বিনাশে পারিবারিক-সামাজিক কর্তৃত্ববাদের যে অবসানের আশা দেখান, লেনিন অন্ধ, অধঃপতিত, অবিরাম গৃহশ্রমের নিগড় থেকে সামাজিক উৎপাদনের সম-অধিকারের জগতে যে মুক্তির বার্তা আনেন, সমাজতন্ত্রী বিপ্লবীরা সাব্যস্ত করলেন সেদিকেই নারীমুক্তির প্রকৃত পথ। ![]()
আইনগুলো যে কেবলমাত্র পুঁথির পাতায় আবদ্ধ ছিল না, তাকে কার্যকরী করার পরিকাঠামো চারিদিকের আক্রমণ ও গৃহযুদ্ধের মধ্যেই অতিদ্রুত তৈরি হয়েছিল এবং শিশুরাষ্ট্রের সুরক্ষা ও বিকাশে দীর্ঘ বঞ্চনার অন্ধকারে পড়ে-থাকা লক্ষ লক্ষ মেয়ের সজীব অংশগ্রহণকে সম্ভব করেছিল, তার অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে বিপ্লবী রাষ্ট্রে লিঙ্গসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। লেনিন বলেছিলেন, এই লম্বা লড়াই যতদিন না আমরা জিতব ততদিন সমাজতন্ত্রের লড়াইও বিলম্বিত হবে। গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের ওপর ধর্মের প্রভাব কাটাতে হলে কতখানি সংবেদনশীলতার প্রয়োজন তার উল্লেখ করেছিলেন। ক্লারা জেটকিনের সঙ্গে কথোপকথনে মন্তব্য করেছিলেন, অনেক কমরেডের সম্বন্ধেই একথা বলা যায় যে ওপর থেকে নখের আঁচড় দিলেই তার ভিতরের সংকীর্ণতা বেরিয়ে আসবে। লঘু আলাপচারিতা নয়, এ ছিল সতর্কবাণী।
১৯৫৫র পরে রক্ষণশীল সংশোধনীগুলি তুলে নেওয়া হলেও, পরে ১৯৭৭এর সংবিধানে মেয়েদের সমানাধিকারের কথা নতুন করে ঘোষিত হলেও এবং রাষ্ট্র থেকে প্রাপ্য সুযোগসুবিধা একই রকম থাকলেও নতুন মানুষ গড়তে পারিবারিক ও পিতৃতান্ত্রিক আদলের বিরুদ্ধে প্রথম পর্যায়ের তুমুল সামাজিক আন্দোলনকে ফিরিয়ে আনা যায়নি। সোভিয়েট রাশিয়ার পতনের পরে একথাও শোনা গিয়েছিল যে রুশ মেয়েরা সাম্য চায় না, চায় গৃহের আশ্রয়ে ফিরতে। এই পরিপ্রেক্ষিতে স্পষ্ট হয় যে সমাজতন্ত্রের আদলে নারীমুক্তির প্রস্তাবের বিরুদ্ধে শ্রেণী-প্রতিপক্ষ, এমনকী সমাজতন্ত্রী নারীবাদীরাও যেসব প্রশ্ন সময়ে সময়ে তোলেন তা এড়ানোর নয়।
১) পারিবারিক নিষ্পেষণ ও ধর্মীয় সংস্কারের নিগড় থেকে মেয়েদের মুক্তি দেয় সমাজতান্ত্রিক পরীক্ষানিরীক্ষা, কিন্তু রাষ্ট্রের উন্নয়নের স্বার্থের কথা বলে এক নতুন রক্ষণশীলতায় বিপ্লবের সঙ্গীহিসাবে তার আত্মবিকাশকে সীমিত করা যায়কি? বিপ্লবের গতি নিছক অর্থনৈতিক উপযোগিতাবাদের দিকে গেলে নতুন মানুষ গড়ার বৃহত্তর গণতান্ত্রিক সক্রিয়তায় ঘাটতি হয়ে যেতেই পারে। ২) শ্রেণীনিরপেক্ষ কোনো নারীমুক্তির আন্দোলন যেমন আজকের পরিস্থিতিতেও হয় না, বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নারীমুক্তির সামগ্রিক আন্দোলন যেমন কখনো করা যায় না, তেমনি অন্যদিকে সর্বহারা শ্রমজীবী কিছুটা ক্ষমতার অধিকারী হলেই নারীসাম্যের পক্ষ স্বাভাবিকভাবেই অবলম্বন করবে এমনটা নয়। তার চেতনারও বিকাশ চাই। ৩) আগের প্রশ্নের সূত্র ধরেই বলা যায়, শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী পার্টি বা সংগঠনকেও অভ্যন্তরীণ শ্রেণীসাম্য ও লিঙ্গসাম্যের পাঠ অহরহ নিতে হয়। নইলে অতিকেন্দ্রিকতা সমাজতন্ত্রের চেতনা জাগানোর বদলে কর্মীদের সংগঠনের অভ্যন্তরীণ পিতৃতন্ত্রেরই বশংবদ সৈনিক বানিয়ে ফেলতে পারে।
প্রকাশের তারিখ: ০৭-নভেম্বর-২০২১ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|