মোদি-আদানি ফাইল মুছলেই কি সত্য মুছে যাবে?

Krishnayan Ghosh
সাবির ভাটিয়ার তৈরি তথ্যচিত্রে নতুন কিছু নেই। সংসদে বিরোধীপক্ষ থেকে শুরু করে রাস্তায় নেমে শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষরাও এই একই প্রশ্ন তুলেছে বার বার। কীভাবে আদানির সম্পদ কয়েক বছরে কয়েকশো গুণ বেড়ে গেল? কেন বছরের পর বছর ঋণ মকুব করা হলো? কোন নীতিতে? কার স্বার্থে?
কলকাতা হাইকোর্টের একটি অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশে মোদি সরকার ও আদানি গোষ্ঠীর বন্ধুত্ব নিয়ে তৈরী হওয়া একটি ডকুমেন্টরি "How Modi & Adani Stole India: The Friendship Files" ভিডিওটি সমস্ত সামাজিক মাধ্যম থেকে সরিয়ে ফেলতে বলা হয়েছে। বিচারপতি আর্যক দত্তের বেঞ্চ ৩১ জানুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছেন। YouTube, X, Instagram-কে শুধু ভিডিও সরাতেই নয়, কে দেখেছে, কে আপলোড করেছে তার IP লগ পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে।
প্রশ্ন হল, কে মুছতে চাইছে এই ৩৬ মিনিটের ভিডিওটি, আদানি গোষ্ঠী নাকি মোদি সরকার? 
২০১৪ সাল থেকে এই দেশ দেখছে কীভাবে একদিকে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ আদানি গোষ্ঠীর হাতে একের পর এক বন্দর, বিমানবন্দর, কয়লা খনি, বিদ্যুৎ প্রকল্প তুলে দেওয়া হচ্ছে, আর অন্যদিকে যে কোনো প্রশ্নকেই 'দেশদ্রোহ' বা 'মানহানি' বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সাবির ভাটিয়ার তৈরি তথ্যচিত্রে নতুন কিছু নেই। সংসদে বিরোধীপক্ষ থেকে শুরু করে রাস্তায় নেমে শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষরাও এই একই প্রশ্ন তুলেছে বার বার। কীভাবে আদানির সম্পদ কয়েক বছরে কয়েকশো গুণ বেড়ে গেল? কেন বছরের পর বছর ঋণ মকুব করা হলো? কোন নীতিতে? কার স্বার্থে? এই প্রশ্নগুলো সাংবাদিক পরঞ্জয় গুহ ঠাকুরতা তুলেছিলেন বলে তার বিরুদ্ধেও দিল্লির আদালতে মামলা হয়েছে। এর আগে কেন্দ্রীয় সরকার গত বছর সমস্ত ডিজিটাল নিউজ পোর্টালকে আদানির হিন্ডেনবার্গ সংক্রান্ত রিপোর্ট সরাতে নির্দেশ দিয়েছিল।
আদানি গোষ্ঠী বলছে, তাদের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু এই দেশের কোটি কোটি মানুষের অবস্থা? যাদের জমি গেছে, যাদের কয়লা খনির পাশে বসবাস বিষাক্ত হয়েছে, যাদের বিমানবন্দরে বেশি ফি দিতে হচ্ছে, তাদের কী হবে? কর্পোরেটের সুনাম রক্ষার জন্য যদি আইপি লগ সংরক্ষণ করতে হয়, তাহলে জনগণের সম্পদ লুটের হিসাব কে রাখবে?
সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রবণতা হল, ভয় তৈরি করা। ভিডিও সরাও, ক্লিপ সরাও, রিলস সরাও। কাল রাজ ঠাকরে মুম্বই পুলিশের এক ফোনে পোস্ট মুছে দিলেন। পরশু আপনি, আমি মুছব। আজ 'ফ্রেন্ডশিপ ফাইলস' নিষিদ্ধ, কাল 'হিন্ডেনবার্গ রিপোর্ট' নিয়ে লেখা নিষিদ্ধ হবে, অর্থাৎ গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধে সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারি বিধিনিষেধের খাঁড়া নামিয়ে আনা। 
এই লড়াই আদানি বনাম ইউটিউবারের লড়াই নয়। এই লড়াই দুটি মডেলের লড়াই। একদিকে মোদি-আদানি নেক্সাস- যেখানে রাষ্ট্র কর্পোরেটের দারোয়ান, যেখানে প্রশ্ন করলেই ED, CBI এর মতো কেন্দ্রীয় এজেন্সি দিয়ে হয়রানি। অন্যদিকে জনগণের মডেল - যেখানে বন্দর, খনি, বিমানবন্দর জনগণের সম্পদ, যা নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার সংবিধান দেয়।
আদালত বলেছেন, আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে সুনামের ক্ষতি পূরণ হয় না। আমরা বলি, একটি ভিডিও মুছে দিয়েও সত্যকে ধামাচাপা দেওয়া যায় না। সত্য হল, এই মোদি-আদানি সখ্যতার খেসারত দিচ্ছে গোটা দেশ।
একটি ভিডিও মুছে ফেলা যায়। একটি ফাইল ডিলিট করা যায়। কিন্তু যে ঘনিষ্ঠতায় দেশের সম্পদ লুট হচ্ছে, তার ইতিহাস কি ডিলিট করা যাবে?
মহামান্য কলকাতা হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায়ে আশা করব, বিচার শুধু কর্পোরেট সুনামের মানদণ্ডে হবে না, হবে সংবিধানের দেওয়া বাক স্বাধীনতার মানদণ্ডেও।
ফাইল ডিলিট করলেই মোদি-আদানি ঘনিষ্ঠতা আর দেখা যাবে না - এই ধারণাটাই সবচেয়ে বড় ভ্রম।

প্রকাশের তারিখ: ২৭-অক্টোবর-২০২৬

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org