অন্ধকার যখন ক্লিন্ন, বিকল্পই তখন আলোকরেখা

Samik Lahiri
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ছিলেন অনেকটা নাজমুল হুদার সেই কবিতার মতো - ‘মৃত্যু আমার শেষ কথা নয়, লড়াই আমার শেষ কথা।’

‘নক্ষত্রও একবার নিভে গেলে আবার কি জ্বলে? 
আমরা কি তবুও নতুনের কথা বলি না?’



এক বিষণ্ণ উত্তরাধিকারের পদধ্বনি

১ মার্চ। বসন্তের সজল হাওয়ায় আজ থেকে ৮২ বছর আগে জন্ম নিয়েছিলেন এমন এক মানুষ, যাঁর জীবন ছিল ধ্রুপদী সাহিত্য এবং রূঢ় শ্রেণি রাজনীতির এক অদ্ভুত বর্ণময় মেলবন্ধন। কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য — বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ঋজু, সৌম্য, তেজস্বী নাম। আজ তাঁর ৮২ তম জন্মবার্ষিকীতে আমরা তাঁকে স্মরণ করছি কেবল প্রথাগত শ্রদ্ধায় নয়, বরং তাঁর স্বপ্নের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে এক নতুন বাংলা গড়ার শপথ নিয়ে। তিনি আজ নেই, কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্নের বিষণ্ণ অথচ দৃপ্ত উত্তরাধিকার। 
আজ যখন বাংলার সমাজজীবন এক অদ্ভুত চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে, চারিদিক যখন ঢেকেছে এক ক্লিন্ন অন্ধকারে, তখন মনে পড়ে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্যের অনুরণিত কণ্ঠে উচ্চারিত জীবনানন্দের কবিতা — ‘অদ্ভূত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ, যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা’। তবে এই নিগূঢ় অন্ধকারের শেষপ্রান্তে তিনিই আমাদের দেখিয়েছিলেন নতুনের আলোকরেখা।

নাগিনীর বিষাক্ত নিশ্বাস ও নিখোঁজ সত্য
‘আলোর নিচে লুকিয়ে আছে এক গহীন কাদা, যেখানে সত্যের সমাধি খুঁড়ছে একদল অন্ধ কারিগর।’ বাংলার বর্তমান রাজনৈতিক দৃশ্যপট আসলে অনেকটা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। একদিকে শাসকদলের পাহাড়প্রমাণ পচন — নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে গরীব মানুষের রেশনের চাল চুরি। মানুষের দারিদ্র্য দূর করার বদলে কেবলমাত্র ‘খয়রাতি’তে সীমায়িত থেকে সেই দারিদ্র্যকে লালন করার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতেছে শাসক দল। অন্যদিকে,  ‘সরকারি বিরোধী’ দলের উগ্র ধর্মীয় মেরুকরণ — যা মানুষের শ্রেণি-চেতনাকে ভোঁতা করে দেয়, মানুষের ধর্ম-জাতের পরিচয়কে ক্ষমতা দখলের রাজনৈতিক পণ্য হিসেবে ব্যবহার করতে চায় এরা। তৃণমূল-বিজেপি’র এই দ্বিমেরু বা ‘বাইনারি’-এর রাজনীতি আসলে আধিপত্যের লড়াই, উন্নয়নের নয়। এদের ভাষা সুস্থ সংস্কৃতির নয়, বরং বিদ্বেষ আর হিংসার। বুদ্ধদেব তাঁর চিরপ্রিয় রবীন্দ্রনাথের ভাষায় আজও আবার আমাদের যেন স্মরণ করিয়ে দেন — 'ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে / অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।' এই মরণখেলা আর অন্ধত্বের বিপরীতে তিনি আমাদের শিখিয়েছেন - এক স্বচ্ছ, যুক্তিবাদী সমাজ প্রগতির পথে হাঁটা।

বিদ্বেষ বনাম রুটি-রুজি
বিগত দেড় দশকে বাংলার রাজনীতিকে সুকৌশলে ‘সাম্প্রদায়িক ও বিভেদকামী খাঁচায় বন্দি’ করা হয়েছে। শাসকদল মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে কায়েম করেছে দলতন্ত্র আর লুম্পেন রাজ। আর কাগুজে ‘সরকারি বিরোধী পক্ষ’ সেই বিধ্বস্ত বাংলার হাহাকারে জ্বালিয়ে দিচ্ছে ধর্মান্ধতার আগুন। মানুষের আসল সংকট — কাজ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থানের অধিকার আজ বিদ্বেষ, বিভাজনের আস্ফালন আর লুটের পাহাড়ের স্তূপে চাপা পড়ে যাচ্ছে। 
সত্য আজ হয়তো দুই মেরুর মাঝখানে নিখোঁজ, কিন্তু মানুষের ক্ষুধা আর বাঁচার লড়াইটা ধ্রুব। এই গোলকধাঁধা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো বিভাজনের দেয়াল ভেঙে মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানো। দিনশেষে আমরা শুধুই 'মানুষ'। আমাদের এই যাত্রায় সেই কর্ণধারের প্রয়োজন, যিনি সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে বলতে পারেন — ‘ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।’ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য আজীবন এই সংকীর্ণ পরিচিতি সত্তার রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন। তাই তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বারবার বলতেন, ‘মানুষের পেট যখন খালি থাকে, তখন তাকে ভগবান বা আল্লার দোহাই দিয়ে ভোলানো যায় না।’এই যুক্তিপূর্ণ বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে তাই জ্যোতি বসু’র যোগ্য এই উত্তরসূরি নির্ভয়ে প্রকাশ্য জনসভায় বলতে পারতেন – ‘বাংলায় কোনও শক্তি দাঙ্গা করতে এলে মাথা ভেঙে দেওয়া হবে’।

সত্যের সন্ধানে বিকল্পের প্রস্তাবনা
২০২৬-এর জন্য বামপন্থীরা আজ যে 'বিকল্প কর্মসূচি'র প্রস্তাবনা করেছে, তা আসলে এই বাইনারি ভাঙার হাতিয়ার। যখন তৃণমূল ভাতার নামে ভোট চাইছে আর মন্দিরের নামে আবেগ ফেরি করছে, অন্যদিকে বিজেপি দাঙ্গার কৌশল রচনায় মত্ত; বামপন্থীরা তখন বলছে 'শিল্পায়নের' কথা। বুদ্ধদেবের সেই অসম্পূর্ণ স্বপ্ন —‘কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ’ - আজ এটা আর কেবল স্লোগান নয়, বাংলার মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার মন্ত্র। প্রতিটি জেলায় নতুন শিল্পপার্ক, পাট, চা ও চর্ম শিল্পের আধুনিকীকরণ এবং বন্ধ কলকারখানা খোলার দাবি কেবল অর্থনৈতিক দাবি নয়, এ দাবি - বাংলার ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ের শপথ। শুধু ভাতায় সংসার চলে না, ভাতাপ্রাপ্ত সকলকে নিয়ে হাজারে হাজারে স্বনির্ভর গোষ্ঠী বা সমবায় গড়ে, নিজেদের ব্যবসায় তাঁরা প্রত্যেকেই এর ৫ গুন বেশী টাকা রোজগার করতে পারেন। বামপন্থীদের দৃষ্টিতে – ভাতা দয়ার দান নয়, এটা অধিকার। নিজের পায়ে শক্ত জমিতে দাঁড় করাবার লক্ষ্যেই বামপন্থীরা ভাতা দেয়, তাই ভাতার উৎপাদনমুখী ব্যবহারে জোর দিয়েছিল জ্যোতি বসু-বুদ্ধদেবের নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকার। এজন্যই বুদ্ধদেবের প্রিয় কথা ছিল – ‘আমাদের যাত্রা হলো শুরু এখন, ওগো কর্ণধার।/তোমারে করি নমস্কার।’ তাঁর 'কর্ণধার' কোনো ব্যক্তি বিশেষ নয়, তা এক আদর্শ বা লক্ষ্য। 

শিল্পের হাহাকার ও বুদ্ধদেবের স্বপ্ন
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য স্বপ্ন দেখতেন আধুনিক বাংলার। তিনি বুঝতেন তথ্যপ্রযুক্তির গুরুত্ব, তিনি বুঝতেন ভারী শিল্পের আবশ্যকতা। আজ যখন বাংলার যুবকরা পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে ভিনরাজ্যে প্রাণ হারাচ্ছেন, তখন সিঙ্গুর বা শালবনীর সেই ধূসর স্মৃতিগুলো আমাদের অপরাধী করে তোলে। 
বামপন্থীদের বিকল্প কর্মসূচি — বিগত ১৫ বছরে রাজ্য ছেড়ে যাওয়া তথ্যপ্রযুক্তিসহ অন্যান্য শিল্পগোষ্ঠীকে ফিরিয়ে আনার বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে। রুগ্ন শিল্পের জমিকে শিল্পের কাজেই ব্যবহার করা হবে এবং কৃষিভিত্তিক খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। এসবই তো ছিল বুদ্ধবাবুর সেই অসম্পূর্ণ ক্যানভাস। আবার রঙ তুলি নিয়ে নতুন বাংলার ছবি আঁকতে হবে গ্রাম-শহরে, নগরে-বন্দরে।

হিংসার রাজত্ব বনাম 'অভয়া'র স্বপ্ন
আজকের বাংলায় নারী সুরক্ষা কেবল অর্থহীন দুটি শব্দ মাত্র। আরজি কর থেকে জয়নগর হয়ে জয়গাঁও — সর্বত্রই লোলুপ কুদৃষ্টির থাবা। বুদ্ধদেবের সরকার যে সুস্থ সমাজ ও সংস্কৃতির পরিমণ্ডল তৈরি করতে চেয়েছিল, আজ সেখানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দুর্বৃত্তরা। বামপন্থীদের বিকল্প কর্মসূচিতে তাই সংগত কারণেই ঠাঁই পেয়েছে ‘স্বশাসিত অভয়া পুলিশ বাহিনী’ গঠন। এর লক্ষ্য কেবল অপরাধ দমন নয়, বরং নারীর সামাজিক ও আইনি মর্যাদা নিশ্চিত করা। ‘পুরোনো জগতকে ধুলোয় মিশিয়ে দাও, / যেখানে নারী ছিল কেবল আসবাব।/ আজ থেকে তুমি কর্মী, তুমি সৈনিক, লাল পতাকার নিচে তোমারও সমান অধিকার, তোমারও সমান দাবি।’মায়াকোভস্কি’র এই কবিতা শুধু তাঁর কণ্ঠেই ধ্বনিত হতো না, এই বিশ্বাস ছিল তাঁর প্রতিটি রক্তকণিকায়। 
অধিকার কেড়ে নিতে হয়
আমরা বিভাজন চাই না, আমরা চাই শ্রমিকের অধিকার — গিগ শ্রমিক থেকে অসংগঠিত কর্মী, সবার জন্য তৈরি করতেই হবে সামাজিক সুরক্ষা। তৃণমূল-বিজেপি’র দ্বিমেরু রাজনীতি যখন ধর্মের ধ্বজা আর দুর্নীতির ঘেরাটোপে বাংলাকে বন্দি করতে চাইছে, তখন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যান সেই মেহনতি মানুষের কাছে, যাঁরা সভ্যতার আসল কারিগর। তাই তাঁর জলদগম্ভীর কণ্ঠে প্রায়শই শোনা যেত — 'ওরা কাজ করে / নগরে প্রান্তরে। / রাজছত্র ভেঙে পড়ে, রণডঙ্কা শব্দ নাহি তোলে, / জয়স্তম্ভ মূঢ়সম অর্থহীন গতার্থতা ভোলে; ...... ওরা কাজ করে।' সেজন্যই ভূমিহীন খেতমজুরদের সামনে বছরে ৪০০০ টাকার ‘তামাসার বাতাসা’ ঝুলিয়ে ভোট আদায় নয়, বামপন্থীদের প্রস্তাবিত বিকল্প কর্মসূচী – বছরে ১২০ দিন কাজ, রাজ্যের গ্রাম-শহরের সব প্রান্তিক মানুষের জন্য। তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরই গান, তারাই সভ্যতার পিলসুজ — যারা দিয়ে যায় শ্রম।

ভঙ্গুর শিক্ষা, ভগ্ন স্বাস্থ্য - বামপন্থীদের বিকল্প দিশা
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে আজ বাংলায় এক ভয়ঙ্কর নৈরাজ্য চলছে। তোলাবাজি আর দুর্নীতির কারণে সরকারি স্কুল-মাদ্রাসা-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মান তলানিতে, সরকারি শিক্ষার অস্তিত্বই বিপন্ন। তাই বামপন্থীদের প্রস্তাবিত কর্মসূচি - দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত টিউশন ফি মকুব এবং উচ্চশিক্ষায় নামমাত্র খরচে ভর্তির ব্যবস্থা। প্রতিটি জেলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (STEM) শিক্ষায় জোর দেওয়ার পরিকল্পনা আসলে বুদ্ধদেবের সেই বৈজ্ঞানিক মননকেই প্রতিফলিত করে। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার এবং প্রতিটি ব্লকে আর্সেনিকমুক্ত পানীয় জল সরবরাহের প্রতিশ্রুতি আসলে এক উন্নত নাগরিক জীবন গঠনের অঙ্গীকার। স্বাস্থ্য-শিক্ষা অবাধ লুটের পণ্য হতে পারে না, মূল দায়িত্ব সরকারের – এ ঘোষণা বামপন্থীরা ছাড়া আর কে করতে পারে!

সংগ্রাম ও সম্প্রীতির সেতু
বিজেপি ও তৃণমূল, মানুষকে জাত আর ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করছে, কারণ তারা ভয় পায় মানুষের ঐক্যকে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য ছিলেন সেই ঐক্যের প্রতীক। যুদ্ধ-হিংসা-দ্বেষ এর মূর্ত প্রতিবাদ রবীন্দ্রনাথের সেই গানটি তাঁর খুব প্রিয় ছিল —‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী, নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব, / ঘোর কুটিল পন্থ তার, লোভজটিল বন্ধ।’

প্রস্তুত হও, মানুষের অধিকার
তাঁর কাছে সমাজতন্ত্র মানে কেবল রুটি-মাখনই নয়, সমাজতন্ত্র মানে মানুষের মনুষ্যত্বের জাগরণ। বামপন্থীদের এবারের প্রস্তাবিত বিকল্প কর্মসূচি হলো - সেই মানুষের কাছেই ফিরে যাওয়ার শপথ। ১৬টি ফসলের সহায়ক মূল্য নিশ্চিত করা, সস্তায় বীজ ও সার সরবরাহ এবং পঞ্চায়েত ভিত্তিক কৃষি সমবায় গড়ে হিমঘর ও গোডাউন তৈরি করার লক্ষ্য আসলে, কর্পোরেট তোষণ আর ফড়ে-দালালদের দখলদারীর ওপর এক প্রবল আঘাত হানা। 

পরিবেশ ও উন্নয়নের ভারসাম্য 
পরিবেশ রক্ষা আজ কেবল শৌখিন বিলাসিতা নয়, এটি বেঁচে থাকার অপরিহার্য শর্ত। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নিজেই ছিলেন এক রুচিশীল মানুষ, যাঁর হৃদস্পন্দনে মিশে ছিল আরণ্যক প্রশান্তি। আজ যখন নগরায়নের নামে নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে, জলাভূমি ভরাট করে গড়ে উঠছে কংক্রিটের জঙ্গল, তখন বুদ্ধদেবের চিরপ্রিয় রবীন্দ্রনাথের আর্তি যেন এক কঠোর সতর্কবার্তা হয়ে ফিরে আসে— 'দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর, / লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর... হে নবসভ্যতা! হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী!'
বর্তমান সরকারের ১৫ বছরের বাংলায় জলাভূমি ভরাট আর গাছ কাটার যে মচ্ছব চলছে, বামপন্থীদের ছাত্র-ছাত্রী-যুব-মহিলা সহ সব মানুষকে নিয়ে ‘সবুজ বাহিনী’ গঠনের প্রস্তাব তার বিরুদ্ধে এক তীব্র লড়াইয়ের ইশতেহার। তিনি যেমন চেয়েছিলেন — পরিবেশ রক্ষা আর উন্নয়নের মধ্যে এক বিজ্ঞানসম্মত ভারসাম্য - ২০২৬-এ বামপন্থীদের প্রস্তাবিত বিকল্প কর্মসূচি ঠিক সেই লক্ষ্যেই স্থির। জীবনান্দের কবিতায় বুদ্ধদেব প্রশ্ন তুলেছিলেন – ‘পৃথিবীর এই ক্লান্তিকর আবর্তের ভেতর / আবার কি দেখা দেবে সেই ঘাস, সেই বনচ্ছায়া?’ সেই বনচ্ছায়ার শপথই উচ্চারিত হয়েছে বামপন্থীদের প্রস্তাবিত আগামী কর্মসুচীতে।

তাঁর স্বপ্নের সংস্কৃতি-চর্চাকেন্দ্র
আজ তাঁর জন্মদিবস। কিন্তু কেবল মাল্যদান বা আনুষ্ঠানিকতায় নয়, আমরা তাঁকে স্মরণ করতে চাই এক বৃহত্তর অঙ্গীকারে — তাঁর স্বপ্নের সেই সংস্কৃতি-চর্চা কেন্দ্র গড়ে তোলার শপথ নিয়ে।
এক সময়ে যে বাংলা ছিল মুক্তচিন্তা ও সৃজনশীলতার চারণভূমি, আজ সেখানে নেমে এসেছে এক অদৃশ্য অর্গল। দলতন্ত্রের নিগড়ে আজ বন্দি সরকারি প্রেক্ষাগৃহের আঙিনা। যেখানে শিল্পীর স্বকীয়তা আর স্পর্ধিত প্রতিবাদ ডানা মেলার কথা ছিল, সেখানে আজ শাসকের ভ্রূকুটি আর নিষেধাজ্ঞার কাঁটাতার। আমাদের স্মৃতিতে অমলিন সেই দিনগুলো, যখন বামফ্রন্ট সরকারের আমলে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ঐকান্তিক উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল শুধু একটি ‘নন্দন’ নয়, বরং জেলায় জেলায় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত, উৎপল দত্ত সহ আরও অনেক গুণিজনের নামাঙ্কিত অসংখ্য মুক্তমঞ্চ ও প্রেক্ষাগৃহ। সেই সৃষ্টিশীল আবহাওয়াকে আজ কলুষিত করা হয়েছে; জনমানসের সেই সম্পদকে পরিণত করা হয়েছে স্তাবকতার ভরকেন্দ্রে।
এই রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির প্রতিবাদেই মাথা তুলে দাঁড়াবে ‘বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র’। কলকাতা শহরের ৭৩ নম্বর জগদীশ বসু রোডে এই কেন্দ্রটি হয়ে উঠবে মুক্তচিন্তার বিনিময় কেন্দ্র, নাটক, গান আর কবিতার এক অবাধ্য আশ্রয়। আমাদের সাধ আকাশছোঁয়া, কিন্তু সাধ্য সীমিত। একটি প্রকৃত গণ-সংস্কৃতির পীঠস্থান গড়ে তুলতে প্রয়োজন আপনাদের অকৃপণ শুভেচ্ছা, সহযোগিতা আর সক্রিয় অংশগ্রহণ। ‘কহিল সগর্বে সূর্য, আমার অভাব / পূরিবে কি তোমরা কেউ আছে কোনো জীব? / শুনিয়া জগত রহে নিরুত্তর ভাব, / মাটির প্রদীপ কহে, ‘আমি পারি শিব’। সুর্য হয়ত আমরা কেউ নই, কিন্তু মাটির প্রদীপ তো হতে পারি।
আসুন, সংস্কৃতির লুপ্তপ্রায় গরিমাকে পুনরুদ্ধার করতে আমরা হাতে হাত মেলাই। আপনার সামান্যতম সাহায্যই পারে আগামীর সৃষ্টশীল মনন চর্চার জন্য এক চিলতে খোলা আকাশ নিশ্চিত করতে।

লড়াইটাই শেষ কথা
১ মার্চের এই আলো-আঁধারির সকালে কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্যের ছবির দিকে তাকালে মনে হয়, তিনি যেন আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন — মানুষের লড়াই কোনোদিন শেষ হয় না। 
তৃণমূলের 'লুম্পেনবাদ' আর বিজেপির 'সাম্প্রদায়িকতাবাদ' — এই দুইয়ের বিপরীতে দাঁড়িয়ে শান্তি, গণতন্ত্র আর প্রগতির যে বিকল্পের জন্য আজ লড়ছে বামপন্থীরা, তা আসলে বাংলার প্রাণের স্পন্দন। এই লড়াই দীর্ঘ, এই লড়াই কঠিন। কিন্তু অজেয় নয়। 

নতুনের কেতন
বিদ্বেষ আর হিংসার কারবারিরা বিদায় নিক। বাংলার পথে আবার শোনা যাক কারখানার সাইরেন, প্রান্তিক কৃষকের গান আর মেধার অবাধ জয়যাত্রা। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি বাংলার মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। বামপন্থীদের এবারের প্রস্তাবিত কর্মসূচি আসলে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্যের দেখা স্বপ্নের এক আধুনিক সংস্করণ। 
কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্যের স্বপ্ন হোক আমাদের পথের দিশা। ২০২৬ হোক বিকল্পের পুনর্জাগরণ। তাঁর সেই ঋজু ব্যক্তিত্ব, সেই স্বল্পভাষী অথচ ধারালো যুক্তিবোধ আজও আমাদের পাথেয়। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, কর্মসংস্থান, দারিদ্র-ক্ষুধার বিসর্জনে, সম্প্রীতির বাংলা গড়ার লড়াইয়ে আমাদের জিততেই হবে।
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ছিলেন অনেকটা নাজমুল হুদার সেই কবিতার মতো - ‘মৃত্যু আমার শেষ কথা নয়, লড়াই আমার শেষ কথা।’


প্রকাশের তারিখ: ২৮-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org