|
বাংলায় ২০২৬ সালের নির্বাচনে আরএসএস কী ভূমিকা নেবে?Dr.Debesh Das |
২০০৩ সালে দিল্লীতে একটি বই প্রকাশের অনুষ্ঠানে আর-এস-এস মমতাকে আমন্ত্রণ করে, সেখানে তাকে দুর্গা বলে অভিহিত করে ও কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে উৎসাহ দেয়। টাইমস-অফ-ইন্ডিয়া লিখেছে যে সভায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জর্জ ফার্নান্ডেজ, আর-এস-এসের গুরুত্বপূর্ণ নেতা মোহন ভাগবত, এইচ ভি শেষাদ্রি, মদন দাস দেবী থাকলেও আর-এস-এস নেতা কর্মীদের কাছে মূল আকর্ষণ ছিলেন মমতা |
দ্বিতীয় পর্ব ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ লিখেছেন যে ১৯৮০ সালে বিজেপির প্রতিষ্ঠার পর উত্তর ও পশ্চিম ভারতে ধর্মীয় দাঙ্গা শুরু হয়, দেশে জাত ও ধর্মের সংঘর্ষ একসাথে চলতে থাকে[১৯]। নিঃসন্দেহে, এই সমস্ত ঘটনার পিছনে আরএসএস-এর হাত ছিল, আরএসএস-এর শক্তি তখন অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৮২ তে আরএসএস-এর শাখা সংখ্যা ১৯০০০ [১৫]। কিন্তু ১৯৮৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি ২২৪টি আসনে প্রার্থী দেয়, কিন্তু আরএসএস আসন্ন নির্বাচনে সমর্থন করে কংগ্রেসকে। আরএসএস-এর শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব নানাজী দেশমুখ, যিনি প্রথম আরএসএস-এর স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, আরএসএস-এর তিনটি মুখপত্র প্রকাশনার দায়িত্বে ছিলেন দীর্ঘকাল, তিনি ১৯৮৪ সালের নির্বাচনের আগে শ্লোগান দেন - 'না জাত পর না পাত পর, মোহর লাগায়ে হাত পর’ [১৬]। বুঝুন, জাতপাতের ভিত্তিতে ভোট দিতেও বারণ করতে পারে আরএসএস। নির্বাচনের আগে ইন্দিরা গান্ধী খুন হন, কংগ্রেস ৪০৪টি আসন পায়, বিজেপি মাত্র ২টি। প্রধানমন্ত্রী হন রাজীব গান্ধী। ১৯৮৯ সালে লোকসভা নির্বাচন রাজীব গান্ধীর প্রধানমন্ত্রীত্ব কালে, ১৯৮৭ সালে তার বিরুদ্ধে সংসদ বোফর্স কেলেঙ্কারি নিয়ে উত্তাল হয়ে ওঠে। জানুয়ারি মাসে রাজীব গান্ধী মন্ত্রিসভা থেকে অর্থমন্ত্রী ভি পি সিং পদত্যাগ করেন। আরএসএস প্রধান তখন দেওরস, বিজেপির সভাপতি আদবানী। অক্টোবর মাসে নাগপুরে প্রায় ২০০ জনকে নিয়ে একটা সম্মেলন হয় যে সম্মেলনে আরএসএস-এর বিভিন্ন সংগঠন (ভারতীয় মজদুর সংঘ, অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ, ভারতীয় জনতা পার্টি, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, ইত্যাদি) থেকে প্রতিনিধি ছিলেন [২০]। তারা আলোচনা করছিলেন ভারতের তদানীন্তন রাজনীতিতে আরএসএস-এর কৌশল নিয়ে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় ১৫ অক্টোবর, ১৯৮৭ একটি খবর প্রকাশিত হল যে বিজেপি নেতা আদবানী ও বাজপেয়ী এই সম্মেলনে একটা গোপন আলোচনা করেছেন আরএসএস প্রধান দেওরসের সাথে, তারা দেওরসকে রাজি করাতে গেছিলেন যে আরএসএস যেন বোফর্স ও অন্যান্য কেলেঙ্কারিতে যুক্ত কংগ্রেস(আই)-কে সমর্থন না করেন। কিন্তু আরএসএস প্রধান দেওরস বিজেপির নেতাদের সাথে তিনি একমত নন, তিনি রাজীব গান্ধীর বিরোধিতা করতে রাজি ছিলেন না। তবে ১৯৮৭ সালে দেওরস জানতেন যে কংগ্রেস জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে, তার বক্তব্য ছিল যে কংগ্রেস পুরোপুরি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন, কিন্তু এই শূন্যস্থান পূরণ করতে কোনও বিরোধী দলকে উঠে আসতে দেখা যাচ্ছে না[২০]। দেওরস এই মনোভাব কিন্তু গোপন আলোচনাতেই শুধু ব্যক্ত করেননি, সাংবাদিকদের সাথে সাক্ষাৎকারেও তিনি বলছেন। এই সাক্ষাৎকারে কিন্তু তিনি ভি পি সিং-এর লড়াইয়ের পক্ষে একটা কথাও বলেননি, যদিও সারা দেশ তখন ভিপিসিং-এর রাজীব গান্ধীর বোফর্স কেলেঙ্কারী নিয়ে অভিযোগে উত্তাল। সংসদে বিজেপির দুজন সাংসদও এটা নিয়ে রাজীব গান্ধীর বিরোধিতা করছেন। আরএসএস প্রধান ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে বললেন - ‘আগামী নির্বাচনে উপযুক্ত প্রার্থীকে খোলাখুলি সমর্থন করতে দ্বিধা করবে না” [২০]। উপযুক্ত প্রার্থী কারা? যাকে ভোট দিলে হিন্দুত্বের প্রসার হবে বা হিন্দুত্বের পক্ষে বিপদ হবে না, সেই উপযুক্ত প্রার্থী। রাজীব গান্ধী হিন্দুত্বের প্রসারে কোনও কাজ করেননি তা নয়, তিনিই ১৯৮৬ সালে বাবরি মসজিদের তালা খুলে দিয়েছিলেন। আবার যদি দেখা যায়, যে কোনও একটি আসনে বিজেপির প্রার্থী আছে, কিন্তু তার জেতার সম্ভাবনা নেই, বরং উদ্দেশ্য সফল করতে পারে বিজেপি বাদে অন্য পার্টির কোনও লোক, তবে বিজেপিকে বাদ দিয়ে সেই লোককে সমর্থন করবে আরএসএস। ১৯৮৯ সালের নির্বাচনের আগে, বিজেপির নেতৃত্বর সাথে আরএসএস-এর মতান্তরে আরএসএস অবিচল থাকে। এমনকি এটা পর্যন্ত আরএসএস প্রধান বলেন যে আরএসএস এমন কোনও শপথ নেয়নি যে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না, সেই সম্ভবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না [২১]। আরএসএস ভি পি সিং-এর পক্ষে নেমে রাজীব গান্ধীর বিরোধিতা করে না, রাজীব গান্ধীর বিরুদ্ধে বিজেপিকেও ভোট দিতে বলে না, রাজীব গান্ধীকেই ফেরানোর চেষ্টা করে। ভবিষ্যতের ঘটনাবলী প্রমাণ করে যে আরএসএস প্রধান দেওরসের সেদিনের এই সিদ্ধান্ত ছিল হিন্দুত্বের স্বার্থে বাস্তবসম্মত। ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস ১৯৭ আসন পায়, জনতা দল ১৪৩টি আসন পায়, বিজেপি ৮৫টি আসন পেয়ে ভি পি সিং-কে বাইরে থেকে সমর্থন করে, আরও কিছু দলের সমর্থনে ভি পি সিং মন্ত্রিসভা হয়। এই মন্ত্রিসভা আরএসএস-এর হিন্দুত্বের কাছে বিপদস্বরূপ হয়ে দাড়ায়, কারণ এই ভিপি সিং মন্ত্রিসভা মন্ডল কমিশন চালু করে সমাজের পিছিয়ে পড়া জাতগুলিকে উপরে তুলে নিয়ে আসতে যায়, যা বর্ণ হিন্দু পরিচালিত আরএসএস-এর হিন্দুত্ব আদর্শের বিরোধী। দেওরস ঠিকই বুঝেছিলেন যে ভি পি সিং হিন্দুত্বের পক্ষে বিপদ। ২০০১ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন ১৯৮০ সালে বিজেপি তৈরি হলেও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রথম কিছুটা আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে যখন বিজেপি লোকসভার ১২টি আসনে ও বিধানসভার ২৯১টি আসনে প্রার্থী দেয়, ভোট পায় ১২ শতাংশ। আরএসএস-এর কাজও পশ্চিমবঙ্গে বৃদ্ধি পায়। ১৯৯২ সালে আরএসএস-এর শাখা ছিল ১৫০০ [২২]। এরপরে ১৯৯৬ সালে বিজেপি পায় ৭ শতাংশ। ১৯৯৮ সালে তৃণমূল দলের জন্ম। ১৯৯৮, ১৯৯৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের সাথে বিজেপির জোট হয়, তৃণমূলের সমর্থনে বিজেপি এমপি জেতে দমদমে। এক নিবিড়, তীব্র সাম্প্রদায়িক প্রচার হলো এই কেন্দ্রে, বিশেষতঃ ওপার বাংলা থেকে আসা মানুষজনের মধ্যে। পশ্চিমবঙ্গে গ্রামের রাজনীতি কিছু জেলায় বদলাতে থাকে, আগে যেখানে বামেদের কংগ্রেসের সাথে মোকাবিলা করতে হতো, ১৯৯৮-২০০০ সালে কিছু জেলায় তৃনমূল-বিজেপির জোটের সাথে সংঘর্ষ হয় [২২] । ভোটগুলির ফলাফল দেখে বোঝা যাচ্ছে যে এই রাজ্যে আলাদা করে বিজেপির ৭ থেকে ১২ শতাংশ ভোট তখন আছে। কিন্তু সেই ভোটটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তাতে একটা লোকসভা বা বিধানসভা জেতা সম্ভব নয়। কিন্তু কংগ্রেস আলাদা লড়ে ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে ভোট পেয়েছে যথাক্রমে ১৫ ও ১১ শতাংশ, এবং সেই সমর্থন কোনও কোনও কেন্দ্রে কেন্দ্রীভূত, যাতে নিজের কোমরের জোরেই কংগ্রেস জিততে পারে। এই হিসাব থেকেই বামফ্রন্টকে হারাতে ২০০১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল বিজেপিকে ছেড়ে দিয়ে কংগ্রেসের সাথে জোট বাধে। বিজেপি একাই লড়ে, কেন্দ্রে তখন বিজেপির এনডিএ-র সরকার। পশ্চিমবঙ্গেও আরএসএস সক্রিয়, সম্ভবত আরএসএস-এর নির্দেশেই বিজেপি প্রচারকে স্তিমিত করে রাখে, বামফ্রন্টকে হঠানোটা বেশি জরুরি। প্রায় সব আসনে লড়ে বিজেপি ভোট পায় ৫ শতাংশ। ২০০৯ সালে পশ্চিমবঙ্গে লোকসভা নির্বাচন ২০০১ সালের নির্বাচনের কিছুদিন পরে তৃণমূল আবার জোট বাধে বিজেপির সাথে। ২০০৪-এর লোকসভা ও ২০০৬-এর বিধানসভা নির্বাচন তৃণমূল ও বিজেপির জোট বেধে লড়ে। সূত্রঃ (১) https://www.rss.org//Encyc/ (২) Coomi Kapoor, ‘The Emergency: A personal story’, Penguin, page 19 (৩) Neerja Chowdhury, ‘How Prime ministers decide’, Aleph Book Company, 2023, page 66 (৪) T V Rajeswar, ‘India, The crucial years’, Harper Collins, 2015, page 79 (৫) Coomi Kapoor, ‘The Emergency: A personal story’, Penguin, page 117 (৬) Neerja Chowdhury, ‘How Prime ministers decide’, Aleph Book Company, 2023, page 64 (৭) D R Goyal, ‘Rashtriya Swayamsevak Sangh’, Radhakrishna Prakashan, 1979, page 124-125 (৮) Neerja Chowdhury, ‘How Prime ministers decide’, Aleph Book Company, 2023 page 79 (৯) Bipan Chandra, ‘In the name of democracy: JP movement and the emergency’ Penguin, 2003, page 217-218 (১০) T V Rajeswar, ‘India, The crucial years’, Harper Collins, 2015, page 79 (১১) The Indian Express, 26 February 1977 (১২) A G Noorani, ‘The RSS A Menac to India’, Left Word, 2019, page 197 (১৩) The Times of India 13 February 1980 (১৪) EMS Namboodripad, ‘From congress to coalition’ in the book The Frontline years, Leftword Books, 2010 (১৫) A G Noorani, ‘The RSS A Menac to India’, Left Word, 2019, page 214 (১৬) Neerja Chowdhury, ‘How Prime ministers decide’, Aleph Book Company, 2023 page 67 (১৭) https://www.bjp.org/ (১৮) https://www.rss.org//Encyc/) (১৯) Rama Chandra Guha, ‘India after Gandhi’, Picador India, 2017, page 559-560 (২০) A G Noorani, ‘The RSS A Menac to India’, Left Word, 2019, page 228-230 (২১) Hindustan Times 17 November, 1987 (২২) Snigdhendu Bhattacharya, ‘Mission Begal: A Saffron Experiment’, Harper Collins Publishers India, 2020, page 18 (২৩) Times of India 15 September, 2003 (২৪) Snigdhendu Bhattacharya, ‘Mission Begal: A Saffron Experiment’, Harper Collins Publishers India, 2020, page 20-21 (২৫) Snigdhendu Bhattacharya, ‘Mission Begal: A Saffron Experiment’, Harper Collins Publishers India, 2020, page 171 (২৬) Snigdhendu Bhattacharya, ‘Mission Begal: A Saffron Experiment’, Harper Collins Publishers India, 2020, page 158 (২৭) The Telegraph, 26 May, 2025 (২৮) Walter K Anderson and Shridhar D Damle, ‘The RSS: A view to the inside’, Penguin, India 2018, page 245 (২৯) Hindustan Times, 15 september, 2019 (৩০) Hindustan Times, 26 september, 2023 (৩১) Bhamwar Meghwansh, ‘I coud not be Hindu’, Chapter 12, Navayana Publishing Pvt. Ltd, 2020 (৩২) Snigdhendu Bhattacharya, ‘Mission Begal: A Saffron Experiment’, Harper Collins Publishers India, 2020, page 169 (৩৩) Snigdhendu Bhattacharya, ‘Mission Begal: A Saffron Experiment’, Harper Collins Publishers India, 2020, page 193 (৩৪) https://www.indiatvnews.com/west-bengal/kolkata-lok-sabha-elections-2024-tmc-mla-humayun-kabir-threatens-to-drown-hindus-in-bhagirathi-river-video-latest-updates-2024-05-02-929122 (৩৫) https://hinduexistence.org/2024/05/03/wb-tmc-mla-humayun-kabir-threatens-hindus-for-mass-killing-and-to-throw-them-in-ganga/, (৩৬) https://hindupost.in/politics/humayun-kabir-threatened-to-drown-hindus/ (৩৭) Hindustan Times, 22 August, 2023 (৩৮) Budget Publication number 17, 2025-26, Government of West Bengal, page 187 (৩৯) ‘The Print’ 2 september 2022 https://theprint.in/india/mamata-praises-rss-says-all-are-not-bad-in-sangh-pariwar-other-parties-react/1113051/ (৪০) Times of India, 6 January, 2019 (৪১) Times of India, 9 December 2016
প্রকাশের তারিখ: ১০-সেপ্টেম্বর-২০২৫ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|