|
ভেনেজুয়েলায় কী চলছে?Satyaki Bhattacharya |
এই বাজারেও বীভৎস অর্থনৈতিক পতনের মধ্যেও ভেনেজুয়েলা ক্ষুধা সূচকে ভারতের চেয়ে ঢের বেশি এগিয়ে ছিল। মানুষের জীবনের অন্যান্য দিকগুলো খারাপ হয়ে মালটি ডাইমেনশনাল পভার্টি ভীষণ বাড়লেও মানুষ যাতে অভুক্ত না থাকে তার দিকে নজর দিয়েছিল সরকার। |
এতক্ষণে সকলেই জানতে পেরেছেন ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে মার্কিন রাষ্ট্রপতি যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছেন। উদ্দেশ্য নাকি ভেনেজুয়েলা থেকে সমানে যুক্তরাষ্ট্রে আসতে থাকা মাদকবাহী জাহাজগুলোকে আটকানো। এ প্রসঙ্গে হবুচন্দ্র এবং গবুচন্দ্রের শরণাপন্ন হতেই হয়, যারা রাজার পায়ে যাতে ধুলো না লাগতে পারে তাই সারা পৃথিবীকে চামড়া দিয়ে ঢেকে দেওয়ার কথা ভেবেছিল। পৃথিবীর এখান থেকে মাদক আসছে, ওখান থেকে সন্ত্রাসবাদী আসছে ইত্যাদি নানা অভিযোগ তুলে পৃথিবীজুড়ে নিজেদের ৮০০ এর ওপর সামরিক ঘাঁটি রাখার অধিকারের পিছনে যুক্তি দেয় ওরা। অথচ বিমানযাত্রার পথে ওদের দেশে স্টপওভার থাকলেও ভিসা করাতে হয়। মিলিটারির বাজেট ১ ট্রিলিয়ন (১ লক্ষ কোটি) ডলারের কাছে। তাহলে নিজের দেশকে নিরাপত্তা দেওয়ার এত বাধা কোথায়? এগুলো আসলে অছিলা। ইতিহাস বলছে, লাতিন আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে যখনই বাম গণতান্ত্রিক কোনও সরকার এসেছে, তাদের উৎখাত করার জন্য মাদক পাচার চক্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় সহায়ক হয়েছে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অনায়াসে নিজের দেশে মাদক পাচার করার অধিকার দিয়েছে। বিশেষত কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে মাদক ছড়িয়ে সেখানকার তরুণ প্রজন্মকে নেশায় বুঁদ রেখে রুটি রুজির লড়াইয়ে জোট বাধার বিরুদ্ধে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন। এর অন্যতম সবচেয়ে জঘন্য উদাহরণ হিসেবে মার্কিন সেনা অফিসার অলিভার নর্থের ভূমিকা স্মর্তব্য। অথবা বলিভিয়ার কোকেন ক্যু। অথবা পানামা আক্রমণ করে ম্যানুয়েল নোরিয়েগার সরকারকে ফেলা। উদাহরণ অজস্র। ভেনেজুয়েলার কথায় আসা যাক। ২০১৪ সালে তেলের বাজারে ক্রাইসিস শুরু হল। স্পেকুলেটিভ অতি উৎপাদন যার কারণ। স্বাভাবিক ঘটনা হত বিশ্বজুড়ে তেল উৎপাদন বন্ধ হলে। ওপেক এবং মার্কিন শেভ্রন, এক্সনরা তেল উৎপাদন বন্ধ করল না। তাৎক্ষণিক ক্ষতি মেনে নিয়েই সাংঘাতিক কম দামে তেল উৎপাদন করতে থাকল। এই কোম্পানীগুলো মনোপলি পুঁজির প্রতিনিধি। নিজ নিজ রাষ্ট্রের ওপর এদের যথেষ্ট কর্তৃত্ব আছে। এরা সেই ধাক্কা সামলাতে পারে। কিন্তু ভেনেজুয়েলার মত একটা রাষ্ট্র, যে দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসন, ক্রমাগত ড্রাগলর্ডদের অত্যাচারে জর্জরিত, যেখানে উৎপাদন প্রক্রিয়া অত উন্নত নয়, তার পক্ষে এই ধাক্কা সামলানো সম্ভব না। এদিকে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি তেল নির্ভর। অতএব, অর্থনীতি প্রায় ধ্বসে পড়ল। আর গরীব দেশগুলোর এই হাঁড়ির হাল হলে সেই সুযোগ কাজে লাগায় সাম্রাজ্যবাদীরা। নানা উপায়ে অসম বাণিজ্যের বোঝা চাপিয়ে তাদের নিষ্পেষিত করে দিতে থাকে। এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের মদতপুষ্ট এনজিওরা সরকার ফেলার চেষ্টা করে এবং সৌভাগ্যক্রমে ব্যর্থ হয়। আসলে একচেটিয়া পুঁজিদের পরিকল্পনা এটাই ছিল। বাজারকে একটা অস্ত্র হিসেবে কাজে লাগিয়ে এরা যাবতীয় প্রতিযোগিতা শেষ করতে চায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও ছোট কোম্পানিদের কিনে নেয় এক্সন, শেভ্রনের দল। অবশ্যই অতি সাংঘাতিক এনজিও মদতপুষ্ট অভ্যুত্থানের সম্মুখে ভেনেজুয়েলার সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকাও হিংসাত্মক হয় এবং বেশ কিছু মানুষ নিহত হন। আন্তর্জাতিক মিডিয়া, যা মূলত মার্কিন কর্পোরেট মিডিয়ার টুকলি করেই অভ্যস্ত, সেখানে রাষ্ট্রপতি মাদুরোকে আদত ক্রিমিনাল বানিয়ে দেওয়া হয়। এই ‘হিটলারিফিকেশন’ এর আগে যেকোনও সার্বভৌম নীতি অনুসরণকারী সরকারের নেতার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করে এসেছে। ২০১৭ সালে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের’ অভিযোগে ভেনেজুয়েলার ওপর ব্যাপক স্যাংশন বসে। এর বিস্তারিত বর্ণনায় না গিয়েও বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্যদের অর্থনৈতিক যুদ্ধের নিকৃষ্টতম মাধ্যম হল এটা। প্রথমে আসে ভেনেজুয়েলার সরকার যাতে ঋণ নিতে না পারে, সেই ব্যবস্থা। অথচ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রায় সবটাই মার্কিন ডলারে হয়। অতএব ডলারের নাগাল না পেলে মুশকিল। এরপর নোংরামির চূড়ান্ত করে হুয়ান গাইদোকে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে ট্রাম্প প্রশাসন, এবং ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ এর মার্কিন সাবসিডিয়ারিকে বাজেয়াপ্ত করে তার মুনাফা গাইদোর হাতে তুলে দেয়। আর বিদেশী ব্যাংকে ভেনেজুয়েলার যত সোনা মজুত ছিল তাতে ভেনেজুয়েলার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ভেনেজুয়েলার ৯৬ শতাংশ রপ্তানী আয়ের উৎস তেলের ওপর এমবারগো চাপিয়ে যেকোনও মার্কিন নাগরিক বা কোম্পানিকে ভেনেজুয়েলার তেল কিনতে নিষেধ করে দেওয়া হয়। এরপর বিশ্বের সমস্ত কোম্পানিকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়, যে ভেনেজুয়েলার সাথে কোনওরকম ব্যবসা করলে মার্কিন ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম ব্যবহার করা বন্ধ হয়ে যাবে। আবারও, মার্কিন ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম হল ডলার নির্ভর সিস্টেম এবং সেটাই এ যাবতকাল অবধি সারা পৃথিবী জুড়ে চলছিল। এই সময়ে ভেনেজুয়েলায় নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরো আর মার্কিন ঘোষিত রাষ্ট্রপতি হুয়ান গাইদো। যাই হোক। ভেনেজুয়েলার সরকার কী পদক্ষেপ নিল? অন্যান্য কিছু দেশের মত ভেনেজুয়েলা যদি আইএমএফের কথা শুনত, মেহনতি মানুষের ওপর শোষণের মাত্র বাড়িয়ে দিত, দেশের তেলের ওপর মার্কিন কর্পোরেটের অবাধ অধিকার দিত, তাহলে গোল মিটে যেত। কিন্তু ভেনেজুয়েলার সরকার বলিভারিয় বিপ্লবের ঐতিহ্য বহন করে। তারা কোনও শর্তেই শ্রমজীবী মানুষকে বিপদে ফেলতে চায়নি। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না কমাতে দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সরকার যথেচ্ছ "বলিভার" ছাপিয়ে মানুষকে মাইনে দিতে থাকে। আর এইই হল সাংঘাতিক মুদ্রাস্ফীতির আদর্শ প্রেসক্রিপশন। সত্যিকারের উৎপাদন নেই। অথচ ব্যাপক পরিমাণ ‘বলিভার’ বাজার ছেয়ে দিয়েছে। মানুষ মাসের শুরুতে যে মাইনে পাচ্ছে, মাসের শেষে তার ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়ে হাস্যকর স্তরে নেমে গেছে। বলা যেতে পারে আইএমএফ এর অস্টারিটি প্রোগ্রাম মেহনতি মানুষের ওপর না চাপাতে চেয়ে ভেনেজুয়েলার সরকার মুদ্রাস্ফীতি ঘটিয়ে ফেলে। অথচ এই বাজারেও বীভৎস অর্থনৈতিক পতনের মধ্যেও ভেনেজুয়েলা ক্ষুধা সূচকে ভারতের চেয়ে ঢের বেশি এগিয়ে ছিল। মানুষের জীবনের অন্যান্য দিকগুলো খারাপ হয়ে মালটি ডাইমেনশনাল পভার্টি ভীষণ বাড়লেও মানুষ যাতে অভুক্ত না থাকে তার দিকে নজর দিয়েছিল সরকার। রাষ্ট্রপতি মাদুরো পরবর্তীতে চেষ্টা করেছেন ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিকে তেল রপ্তানি নির্ভর না রেখে অন্য কোনও উপায় নেওয়ার। ইদানিংকালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতা তাদের সেই অবকাশ দিয়েছে। এছাড়া একধরণের অদ্ভুত উপায়ে বাজারে ডলার ঢুকতে দিয়েই তিনি আপাতত জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি আটকেছে। বলিভারের দাম পতনশীল হলেও ডলার কিছুটা স্টেবল। এবং যারা প্রবাসী, তারা পরিবারে ডলার পাঠালেও সেটা মানুষের কাজে লাগছে। আপাতত অবস্থা হল, ভেনেজুয়েলার পাশে ১২০০ মিসাইল নিয়ে ৮ টা মার্কিন যুদ্ধজাহাজ আর একটা নিউক্লিয়ার সাবমেরিন ঘুরছে। গত নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট মাদুরো জয়ী হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্র সেই নির্বাচনকে ধাপ্পাবাজি বলেছিল। কিন্তু আদালতে সেই সংক্রান্ত মামলা হলে মাদুরোর বিরোধী সদস্য হাজিরা দেয়নি। সিআইএ পরিচালিত রিসার্চ ইনস্টিটিউট মাদুরোকে ভোট চুরির অপবাদ দেয়। সে সময়ে সরকারকে ফেলতে পথে নামে এনজিওর দল, সিআইএ অপারেটিভের দল। এবং মাদুরোর বিরুদ্ধে নয়া উদারবাদের অভিযোগ এনে তাদের সাথে যোগ দেয় ভেনেজুয়েলার কমিউনিস্ট পার্টি! এ এক চূড়ান্ত কলঙ্কের কথা, যেখানে একটি কমিউনিস্ট পার্টি প্রাথমিক দ্বন্দ্বকে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের শিবিরে যোগ দেয়। মাদুরোকে অ্যারেস্ট করতে পারলে মার্কিন সরকার ৫ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে। কিন্তু চাঞ্চল্যকর তথ্য হল — মার্কিন হুমকির সম্মুখে পিছু না হঠে প্রেসিডেন্ট মাদুরো ঘোষণা করেছেন ভেনেজুয়েলায় ৪৫ লক্ষ মানুষের সশস্ত্র রক্ষী বাহিনী তৈরী হবে। জেনেজুয়েলায় পা রাখল মার্কিন সেনাকে ভয়ানক শাস্তি পেতে হবে — এ কথা তিনি জানিয়েছেন। মাত্র ২ কোটি ৮৪ লক্ষ মানুষের দেশে এই জিনিস তৈরি করতে পারার ক্ষমতা সোশ্যালিস্ট পার্টির সরকারের গণভিত্তির প্রমাণ এবং সেই ভিত্তিকেই আরও দৃঢ় করে। অবশ্যই ইদানিংকালে চীন রাশিয়া মৈত্রী এবং সাহেল রাষ্ট্রগুলোতে বিপ্লব পৃথিবীকে এক নতুন আশা দেখাচ্ছে। ভেনেজুয়েলার ওপর সর ভৌগোলিকভাবে ভেনেজুয়েলা, কিউবা, নিকারাগুয়ার মত দেশগুলো চীন রাশিয়ার থেকে বহু দূরে হওয়ায় এবং মার্কিন ছায়ার মধ্যে হওয়ায় সেই আশার আলো ওখানে পৌঁছতে হয়তো একটু বেশি সময় লাগে। প্রেসিডেন্ট মাদুরো বলেছেন, গত ১০০ বছরের মধ্যে ভেনেজুয়েলায় এই সংকট আর কখনও আসেনি। ভেনেজুয়েলার মানুষের সামনে দুটি পথ। এক, যুক্তরাষ্ট্রের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়ে বহুজাতিক কোম্পানিদের জন্য শ্রম দান করে, তাদের পুষ্ট করা, এবং স্বাভাবিক ক্রাইসিসের সময়ে বিশ্বজোড়া মার্কিন পুঁজিবাদের ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া উদ্বৃত্তে পরিণত হওয়া। দুই, সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে, নিজেদের শিল্পায়িত করে এর ঊর্ধ্বে ওঠা। আপাতত ভেনেজুয়েলার মানুষের সার্বভৌমত্বের লড়াইয়ে তাঁদের পাশে সর্বতোভাবে দাঁড়ানো সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন যেকোনও মানুষেরই অবশ্য কর্তব্য। প্রকাশের তারিখ: ০৬-সেপ্টেম্বর-২০২৫ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|