পুঁজিবাদের কানাগলি– দু’ই অভিব্যক্তি

Prabhat Patnaik
আজকের নয়া-ফ্যাসিবাদ আর আগের মতো যুদ্ধেও যায় না- ফলে সাধারণ নির্বাচন হয়। নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে ফ্যাসিবাদীরা যদি কোনও সময় ক্ষমতা হারায়ও তবে যারা ক্ষমতায় আসছে, তারা যদি সংকট কাটিয়ে উঠতে নয়া-উদারবাদী পথ ত্যাগ করতে না পারে, তাহলে নয়া-ফ্যাসিবাদীরা পুনরায় ফিরে আসবে। দ্বিতীয়বার ট্রাম্পের জয়ও সেভাবেই ঘটেছে।

বিশ্ব পুঁজি আজ এক অন্ধগলিতে এসে দাঁড়িয়েছে। নয়া-উদারবাদী জমানায় প্রতিটি দেশেই আয় বৈষম্যের চিত্রে বিরাট উল্লম্ফন ঘটেছে। গোটা ব্যবস্থাকে এক স্থবিরতায় নিয়ে এসেছে। গরিব মানুষের তুলনায় ধনীদের খরচের মাত্রা একক আয়ের নিরিখে অনেক কম। এর ফলে আয়ের বৈষম্য বাড়লে চাহিদার বৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধি আর একে অন্যের সঙ্গে তাল রেখে এগোয় না। এজন্যই বৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়ে স্থবিরতায় পর্যবাসিত হয় এবং সমাজে বেকারত্ব বৃদ্ধি পায় বহুগুণ। ২০০৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘আবাসন ক্ষেত্রের আর্থিক বুদবুদ’ ফেটে পড়ার পর থেকেই বিশ্বঅর্থনীতি ঐ পরিস্থিতিতে আটকে রয়েছে। ঐ বুদবুদ ক্ষণিকের জন্য স্থবিরতাকে রোধ করেছিল ঠিকই, কিন্তু ফেটে পড়ার পরে এক প্রবল স্থবিরতা গোটা বিশ্ব অর্থনীতিকে গ্রাস করেছে।

বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যে পদ্ধতিতে আর্থিক স্থবিরতাকে অতিক্রম করার চেষ্টা করা হত, অর্থাৎ বাজেট ঘাটতি স্বীকার করে কিংবা ধনীদের উপরে বাড়তি কর চাপানর মধ্যে দিয়ে বড় আকারের সরকারি খরচের মাধ্যমে। এ দুটি উপায় ছাড়াই যদি সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতির প্রসার ঘটানো নয়া-উদারবাদী শাসনে সম্ভব নয়। কারণ বিশ্বায়িত লগ্নী পুঁজি, নয়া-উদারবাদের অধীনে যে নিজের আধিপত্য বিস্তার করেছে, তা অধিক বাজেট ঘাটতি স্বীকার করে নেওয়া কিংবা ধনীদের উপরে বাড়তি কর চাপানো- দুটিতেই বাধা দেয়। ফলে আজ যে কানাগলিতে পুঁজিবাদ এসে ঠেকেছে সেই স্থবিরতার কারণ শুধু নয়া-উদারবাদ ও তার সৃষ্ট বিকট বেকারত্ব নয়। নব্য-উদারবাদী পদ্ধতিতে ন্যায্য কিছু সীমানার মধ্যে আটকে থেকে এমন স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভবও নয়। আবার একে ছাড়িয়ে যদি আমরা পুঁজিবাদের নতুন কোনও পর্যায়ে কিংবা নিদেনপক্ষে দেশের সীমানা পারাপার করতে স্বাধীন আর্থিক প্রবাহের শাসনকে অতিক্রম করতে চাই, তাও সম্ভব নয়, যতক্ষণ অবধি আন্তর্জাতিক লগ্নী পুঁজির আধিপত্য বজায় রয়েছে।

এ অন্ধগলিকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করতে হবে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা ভিক্টোরীয় ও এডওয়ার্ডীয় ‘উনবিংশ শতাব্দী’- যার বেশিরভাগটিই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে অবধি কার্যকর ছিল। ঐ বন্দোবস্তের টিকে থাকা সম্ভবপর হয়েছিল ঔপনিবেশিক ও আধা-ঔপনিবেশিক বাজার থেকে বলা যায় মূলত বিনা খরচে সম্পদ আহরণ ও দখল করার ফলে। ব্রিটেন থেকে ইউরোপ হয়ে ইউরোপীয় জনবসতির দেশসমূহ- কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো ভূখণ্ডের উপর এমন দখলই শিল্পপুঁজির বিশাল বিস্তৃতিকে সম্ভব করে তোলে।

ঐ দীর্ঘ উত্থানের পর্যায় শেষ হয় ঔপনিবেশিক রপ্তানি শেষ হয়ে যাওয়ার ফোলে বাজার সংকুচিত হয়ে পড়ায়। ভারত, চীন প্রভৃতি দেশের ক্ষেত্রে - মহামন্দার ছাপ সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পুঁজিবাদ নতুন করে তাগিদ খুঁজে পায়। সেটি ঘটেছিল সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে, এটিই ‘পুঁজিবাদের স্বর্ণযুগ’ বলে পরিচিত। নয়া-উদারবাদের আগমনে, ঐ রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ক্রমশঃই ক্ষীণ হতে থাকে। এর ফলে নয়া-উদারবাদী ব্যবস্থা আজ কানাগলিতে এসে ঠেকেছে। এই কানাগলি যদিও ৩০-র দশকের মহামন্দার মতো গভীর ও ব্যাপক নয়, তবুও তুলনীয় সংকটধর্মী যুগ বলা যায়। এখান থেকে উদ্ধার পাওয়া সম্ভব এমন কোনো পথ আজ দৃশ্যমান নয়। “পুঁজিবাদের জন্য অসম্ভব পরিস্থিতি বলে কোনওকিছু নেই”- লেনিনের উক্তিটি মানতে হবে ঠিকই, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জগুলিকেও অবহেলা করা যাবে না।

এ পরিস্থিতির দুটি বহিঃপ্রকাশ আজ স্পষ্ট। প্রথমটি বিশ্বজুড়ে নয়া-ফ্যাসিবাদের উত্থান। ফ্যাসিবাদের দু’টি স্তম্ভ রয়েছে। একদিকে চরম দমনপীড়ন, অন্যদিকে ধর্ম বা জাতি ভিত্তিক দুর্ভাগা কোনও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা সৃষ্টির প্রচেষ্টা। এর জন্য সমাজে ইতিপূর্বে বিদ্যমান বিভেদকে তারা ব্যবহার করলেও এ কৌশল আসলে আধুনিক যুগেরই বিষয়– পুঁজিবাদের শেষ পর্যায়ে উৎপন্ন এক কৌশল। সংখ্যাগরিষ্ঠদের মধ্যে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে যে ঘৃণা তা স্বতঃস্ফূর্ত নয়, এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মিডিয়া ও বড় পুঁজিপতিরা সংগঠিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবেই তাকে ব্যবহার করছে। এর উদ্দেশ্য, সংকটকালে একচেটিয়া পুঁজির আধিপত্য যাতে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি না হয়, আলোচনার অভিমুখ ফহুরিয়ে দেওয়া। লক্ষ্য শোষিত শ্রেণীগুলিকে বিভক্ত রাখা, যাতে তারা একচেটিয়া পুঁজির আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে না পারে। সংকটকালে উচ্চ হারে বেকারত্ব ফ্যাসিস্ত গোষ্ঠীগুলিকে সদস্য সংগ্রহে সহায়তা করে- বড় পুঁজিপতিরাও আর্থিক সহায়তা যোগায়।

১৯৩০ নাগাদ পুঁজিবাদী বিশ্ব মহামন্দার ধাক্কা খায়, তখনও এমনটাই ঘটে, আজও প্রায় একই দশা। এ দুটি পরিস্থিতির পার্থক্য এই যে আজকের ফ্যাসিবাদ সেই মহামন্দার অন্ধগলি থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম নয়, এজন্যই ‘নয়া’- শব্দটির ব্যবহার উপযুক্ত। পূর্বতন ফ্যাসিবাদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সুবাদে সামরিক খাতে ব্যয়বরাদ্দ বাড়িয়ে বিশাল বাজেট ঘাটতির মাধ্যমে মহামন্দার প্রভাব কাটিয়ে তুলেছিল। অর্থাৎ বড় আকারের বাজেট ঘাটতির বিরুদ্ধে আর্থিক পুঁজির বাধাকে তারা কাটিয়ে উঠেছিল। এ কাজে তাদের সাফল্যের কারণ এই যে তখন পুঁজির চরিত্র জাতীয় ছিল। আজ নয়া-ফ্যাসিবাদ আন্তর্জাতিক লগ্নী পুঁজিকে বড় আকারের বাজেট ঘাটতির বিরোধিতা ছেড়ে দিতে বাধ্য করতে পারে না, আন্তর্জাতিক পুঁজি বলেই আন্তঃ-সাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বও কম।

আজকের নয়া-ফ্যাসিবাদ আর আগের মতো যুদ্ধেও যায় না- ফলে সাধারণ নির্বাচন হয়। নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে ফ্যাসিবাদীরা যদি কোনও সময় ক্ষমতা হারায়ও তবে যারা ক্ষমতায় আসছে, তারা যদি সংকট কাটিয়ে উঠতে নয়া-উদারবাদী পথ ত্যাগ করতে না পারে, তাহলে নয়া-ফ্যাসিবাদীরা পুনরায় ফিরে আসবে। দ্বিতীয়বার ট্রাম্পের জয়ও সেভাবেই ঘটেছে।

দ্বিতীয় বহিপ্রকাশ- ট্রাম্প প্রশাসনের তরফে দ্বারা উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করার ঘটনা। এমন কৌশল নয়া-উদারবাদী কায়দা থেকে আংশিক সরে আসা হলেও, ঐ বন্দোবস্তের মূল হিসাবে আন্তর্জাতিক লগ্নী পুঁজির যে প্রবাহ চলে তার এক বিন্দুও বদল হয়নি। ট্রাম্পের শুল্ক-আরোপ আসলে যা বোঝায় তা হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব অর্থনীতির বহুমুখী সংকটের মোকাবিলা করতে গিয়ে অন্যান্য দেশে উচ্চ হারের বেকারত্ব রপ্তানি করছে। ‘প্রতিবেশীকে দেউলিয়া করো’ হল ঐ নীতির মূল কথা। ৩০-র দশকের মহামন্দার সময়ে প্রতিযোগিতামূলক এক্সচেঞ্জ রেট কমানোর কৌশলও একইভাবে ব্যর্থ হয়েছিল।

নয়া-উদারবাদী শাসনের নিয়ম থেকে এ ধরনের আংশিক সরে আসার কৌশল গ্রহণ করতে পারে কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই। অন্যান্য দেশ এমন কিছু করলেই ‘বিনিয়োগকারীদের আস্থা’ চলে যায়। অর্থাৎ দেশীয় বাজার থেকে পুঁজি পালিয়ে যায়, মুদ্রার মূল্যমান পড়ে যায়। কিন্তু মার্কিন ডলার এখনও এত শক্তিশালী যে এ ধরনের পদক্ষেপেও ইউরোর তুলনায় এক বছরে মাত্র ৪.৫৭ শতাংশ মূল্য হ্রাস ঘটেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয়ত চাহিদা অনুযায়ী দেশীয় বাজারে কর্মসংস্থান বাড়াবে না, কারণ অধিক শুল্কের ফলে মূল্যবৃদ্ধি বেড়ে যাবে এবং ঐ প্রভাব আংশিক হলেও নিরসন হবে। কিন্তু এহেন উচ্চ শুল্ক চাপানোর ফলে যতক্ষণ না অন্যান্য দেশগুলি নতুন কোনও কৌশল নিচ্ছে (যদি তেমন কিছু আদৌ ঘটে) নিশ্চিতভাবেই বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট অন্তত তাৎক্ষণিকভাবে হলেও বৃদ্ধি পাবে।

উপরে বলা দুটি বহিঃপ্রকাশই হল অর্থনীতির ক্ষেত্রে চরম পদক্ষেপ। নয়া-ফ্যাসিস্ত শাসনাধীন পুঁজীবাদী ব্যবস্থা ‘স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের আধার’ হবার দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করে দেয়। ঠিক তেমনি বৃহৎ পুঁজীবাদী দেশ যে কায়দায় ‘প্রতিবেশীকে দেউলিয়া করো’ নীতি গ্রহণ করে তৃতীয় বিশ্বের দিকে তো বটেই, অন্যান্য মেট্রোপলিটান রাষ্ট্রের দিকেও ঝুঁকে পড়ছে, তা আকস্মিক ও সংকটগ্রস্থ অবস্থারই সাক্ষ্য দেয়। এমন চরম পদক্ষেপ থেকেই পরিস্থিতির গভীরতা উপলব্ধি করা যায়।

পিপলস ডেমোক্রেসী পত্রিকার সেপ্টেম্বর ২৮ – অক্টোবর ৫, ২০২৫ সংখ্যায় প্রকাশিত

বাংলায় অনুবাদঃ সৌভিক ঘোষ, অঞ্জন মুখোপাধ্যায়


প্রকাশের তারিখ: ০৪-অক্টোবর-২০২৫

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org