|
শ্রমিকদের ও কৃষকদের পার্টি গঠনের দিকেE M S Namboodiripad |
ভারতে একটা প্রকৃত কমিউনিস্ট পার্টি হয়ে উঠতে গেলে, তার প্রধান কর্তব্য হতো, দেশের মানুষের স্বাধীনতার আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বিশ্বের বিপ্লবী শ্রমিক-শ্রেণীর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া। |
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ভূমিষ্ঠ হয়েছিল তাসখন্দে। আর এই ব্যাপার থেকেই কালক্রমে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তুষ কাঁকর মাটি প্রভৃতি বাজে জিনিস থেকে চাল কাঁড়ার কাজটার সূত্রপাত। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি "ভারতের মাটিতে” ভূমিষ্ঠ হয়নি বলে, ভারতের অনেক সোস্যালিস্ট আর কমিউনিস্ট সহমর্মীদের কাছ থেকে তাকে খোঁটা খেতে হয়েছিল। কিন্তু ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে সেদিন "খোদ ভারতের মাটিতে” দাঁড়িয়ে যাঁরা কাজ করছিলেন, তাঁদের অনেকের চাইতে তাসখন্দের নবজাতক পার্টিরই অবদান অনেক দামি ছিল।
তাসখন্দের সংস্থায় এম এন রায় ছিলেন এক নামকরা ব্যক্তি। পরবর্তি কালে কিন্তু তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলন থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির সুসংগঠিত চেহারার আবির্ভাবের লগ্ন যখন সমাগত, তখন দেখা গেল, রায় কার্যত বনে গেছেন কমিউনিস্টবিরোধী। তাই বলে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিকে গড়ে তোলায় তাঁর ভূমিকাকে কোনমতেই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা ঠিক হবে না। এমন কি পরবর্তিকালে তাঁর শ্রেণীগত বিশ্বাসঘাতকতা করাটা যে কী ভয়ংকর অপকর্ম' হয়েছিল, সেটাকে ভালো করে বুঝে নিতে গেলে তাঁর ভারতে গোড়ার দিকে কাজকর্মকে বস্তুনিষ্ঠভাবে পর্যালোচনা করা উচিত।
ভারতে একটা প্রকৃত কমিউনিস্ট পার্টি হয়ে উঠতে গেলে, তার প্রধান কর্তব্য হতো, দেশের মানুষের স্বাধীনতার আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বিশ্বের বিপ্লবী শ্রমিক-শ্রেণীর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া। এই কর্তব্যসম্পাদনে রায়ই ছিলেন উপযুক্ত ব্যক্তি।
আগেই আমরা দেখেছি, বঙ্গভূমিতে "বোমার রাজনীতি"-করা এক গোষ্ঠীর সদস্যরূপে রায়ের রাজনৈতিক কাজকর্মে' হাতেখড়ি হয়েছিল। এক ডাকাতির মামলায় তিনি সাজা পান। জেল থেকে খালাস পাবার পর, তিনি ভারত থেকে বিদেশে চলে গিয়ে সেখানকার কয়েকটি দেশে বৈপ্লবিক কাজকর্মের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। শেষকালে তিনি নিজেকে কমিউনিস্ট বলে ঘোষণা করলেন, এবং অন্যরাও তাঁকে কমিউনিস্ট বলে স্বীকার করে নিলেন। তিনি মস্কোতে হাজির হয়ে সেখানে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কাজকর্ম' করতে লাগলেন।
এইভাবে রায় হয়ে উঠলেন একদিকে ভারতের পের্টিবুর্জোয়া বিপ্লবীদের, অন্যদিকে মস্কোভিত্তিক বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের মধ্যে একটি সেতুবন্ধ।
পেটিবুর্জোয়া বিপ্লবীদের যে-সমস্ত চরিত্রগত দুর্বলতা থাকে, রায়ও সে-সব থেকে মুক্ত ছিলেন না। তাদের মধ্যে যেগুলো ছিল সবচেয়ে গুরুতর, তা হচ্ছে তাঁর হামবড়াই-ভাবটা আর আমলাতান্ত্রিক সুলভ আচার-আচরণ। আর তাঁর এই বদগুণই ভীষণ প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেছিল, সেদিন ভারতের বিভিন্ন স্থানে যে-সব গোষ্ঠীর উদ্ভব হচ্ছিল, তাদের সবাইকে একসঙ্গে মিলিয়ে একটি সুসংগঠিত পার্টি গড়ে তোলায়। যাঁরা তাঁর হুকুম তামিল করবে না, তাদের বারোটা বাজিয়ে দেবার ঝোঁক তাঁর মধ্যে গোড়া থেকেই দেখা গিয়েছিল।
তবে এই দুর্বলতাটা একমাত্র রায়েরই একচেটিয়া বদগুণ নয়। যাঁরা মুখে বলতেন, রায়ের আত্মপ্রবঞ্চনা আর আমলাতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে তাঁরা লড়াই করছেন, তাঁদেরও এই সব বদগুণ পেয়ে বসেছিল। কিন্তু তাঁদের কারুরই তো একটা সেই সম্পূণ ছিল না, যা ছিল রায়ের মধ্যে। মার্কসবাদী-লেনিনবাদী চিন্তাভাবনা-যা বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের অভিন্ন ধর্ম', তারই সাহায্যে
তিনি সাধারণভাবে ভারতীয় পরিস্থিতিটাকে এবং বিশেষ করে তার প্রতিদিন যে-সব পরিবর্তন ঘটছে, সে-সবকে বিচার-বিশ্লেষণ করতে পারতেন, তাদের মূল্যায়ন করতে পারতেন। ভারতের গোড়ার দিকের বৈপ্লবিক আন্দোলন সম্বন্ধে ছিল তাঁর অভিজ্ঞতা। সেই বৈপ্লবিক অভিজ্ঞতা, আর অন্য সব দেশে, বিশেষত মস্কোতে যে বৈপ্লবিক অভিজ্ঞতালাভ হয়েছিল তাঁর, তাদের সবার আলোয় ভারতবর্ষের সমকালিক রাজনৈতিক ঘটনাবলী সম্বন্ধে, ওই সবের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সম্বন্ধে তিনি সঠিক ধারণা করতে পারতেন। সবার উপরে, বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের শীর্ষস্থানীর নেতাদের সঙ্গে তাঁর বেশ যোগাযোগ ছিল। এই সব গুণেই তিনি অন্য আর পাঁচটা বিপ্লবীদের কাছ থেকে স্বতন্ত্র হয়েই ছিলেন।
এস এ ডাঙ্গের ১৯২১ আর ১৯২২ সালের রচনাবলী, সেই সময়কার বিচারে বেশ গুরুত্বপূণই ছিল। তাঁর "গান্ধী বনাম লেনিন” (তার শত দুর্বলতা সত্ত্বেও, যা ডাঙ্গে নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন), আর তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত "জার্নাল সোস্যালিস্ট" ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সেই শৈশব অবস্থায় তার পথের দিশারি হয়ে উঠেছিল বৈকি। ঠিক অমনভাবেই লেখালিখি করে সেদিন ভারতবর্ষে সোস্যালিস্ট ও কমিউনিস্ট মতাদর্শকে প্রচার করতে সাহায্য করেছিলেন আর যাঁরা, তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন সিংগারাভেলু (মাদ্রাজ), মুজফফর আহমদ (কলকাতা) গোলাম হোসেন (লাহোর)। সেদিনকার প্রথম যুগে "ভারতবর্ষে'র মাটিতে" যে মার্কসবাদী রচনাবলী জন্ম নিয়েছে, তাদের সঙ্গে ঠিক ওই সময়েই রায়ের নিজের লেখা এবং তাঁর পরিচালনায় লেখানো বইপত্রের তুলনা করলে শেষোক্ত রচনাবলীরই উৎকর্ষ নিঃসন্দেহে স্বীকার করে নিতে হয়। দুঃখের কথা, ডাগের লেখা বইপত্র ছাড়া, সেদিনকার "ভারতবর্ষে'র মাটিতে" বসে লেখা অন্যসব বইপত্রের হদিস এখন আর মেলে না। (ডঃ অধিকারীর সম্পাদিত গ্রন্থাবলীতে সিংগারাভেলুর কিংবা মুজফফর আহমদের লেখা কোনো কিছু পাওয়া যায় না; শুধুমাত্র ডাঙ্গের কিছু লেখা সেখানে পাওয়া যায়)।
তবে, ১৯২০-এর দশকের গোড়ার দিকে ভারতবর্ষে প্রকাশিত কোনো মার্কসবাদী লেখাই রায়ের ১৯২২ সালে লেখা "ইনডিয়া ইন প্ল্যানজিসান"-এর সামনে যে দাঁড়াতেই পারে না, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। একথা বলতে মোটেই বাধবে না, রায়ের লেখা ওই বইখানাই (এর সমস্ত ভুলভাল,দোষত্রুটি সত্ত্বেও) ও'র কয়েকবছর পরে লেখা রজনী পাম দত্তের 'ইনডিয়া টুডে"-র অগ্রদূতের কাজ করেছিল।
বৃটিশসাম্রাজ্যবাদ আর ভারতের বুর্জোয়াশ্রেণীর মধ্যে সম্পর্ক, এবং ভারতবর্ষে বুর্জোয়াশ্রেণীর বিকাশ ঘটায় বৃটিশসাম্রাজ্যবাদ পিছু হটে যেতে বাধ্য হয়েছে (Decolonization Theory) (অ-উপনিবেশীকরণ তত্ত্ব- অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদ স্বেচ্ছায় সব ক্ষমতা ছেড়েছ,ড়ে দেবে-এই তত্ত্ব। অনুবাদক) এই ছিল রায়ের বই-এর সিদ্ধান্ত। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে "বুর্জোয়াশ্রেণীটাকে সীমিত পরিমাণে রাখা যাবে"- লেনিনের এই করণকৌশলের সম্পূর্ণ উল্টো ছিল রায়ের ওই বক্তব্য। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কংগ্রেসে এই ব্যাপারটা নিয়েই লেনিনের মতামতের সঙ্গে রায়ের মতামতের ঠোকাঠুকি লেগে গিয়েছিল। আর, এই ব্যাপারেই রায়কে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক থেকে পরে বার করে দেওয়া হয়। আর কী? রায় হয়ে গেলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিরও ঘোর শত্রু!
তবু, এই রকমের ভুল সিদ্ধান্ত করতে গিয়েও রায় ভারতের সমস্ত পরিস্থিতিকে তন্ন তন্ন করে খুটিয়ে খতিয়ে দেখেশুনে চিরে চিরে বিশ্লেষণ করেছিলেন। ভারতীয় পরিস্থিতির বিচার-বিশ্লেষণে, মূল্যায়নে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পদ্ধতি-প্রকরণের সুনিপুণ ব্যবহারে তিনি এক নতুন ঐতিহ্যের স্রষ্টা বৈকি।
কিন্তু এইখানেই রায়ের অবদান শেষ হয়ে যায়নি; সেদিন ভারতবর্ষের রাজনীতিতে দিনের পর দিন যে-সব পরিবর্তন ঘটছিল, তিনি সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে বসতেন কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সার্বি'ক প্রেক্ষাপটের বিচারে তাদের বিশ্লেষণ করতে, সেই সব বিশ্লেষণের ওপরে ভিত্তি করে দিনের পর দিন রাজনৈতিক করণীয় সম্বন্ধে স্লোগান তৈরি করতেন।
কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের মুখপত্র “ইম্পেকর"-এ এবং রায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত "ভ্যানগার্ডে" সম্পাদকীয় প্রবন্ধ, টীকাটিপ্পনী, প্রতিবেদন লেখা হতো প্রাত্যহিক রাজনৈতিক আন্দোলনে সহায়তাসাধনের জন্যে। তা ছাড়া আমেদাবাদ কংগ্রেসের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে যে-আহ্বান দেওয়া হয়েছিল, তারই মতো আরো অনেক দলিল তৈরি হয়েছিল রায়ের পরিচালনায়। ভারতীয় জাতীর কংগ্রেসে এবং অন্য আর সব সংগঠনে কীরকমের ব্যাপার সব ঘটছে, সেগুলোকে বেশ ভালো করে দেখেশুনে বিচারবিবেচনা করবার উদ্দেশ্যে আর ওই প্রতিষ্ঠান-
গুলোর ওপরে বিপ্লবী শ্রমিকশ্রেণীর প্রভাববিস্তারের জন্যেই ওইসব দলিলপত্র ভালো করে ভেবেচিন্তে লেখা হচ্ছিল।
যেমন, চৌরিচৌরার ঘটনার পর অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেওয়ায় সে-সময় এভেলিন রায় (শান্তি দেবী এই ছদ্মনামে) গান্ধী আর গান্ধীবাদী রাজনীতিকে বিশ্লেষণ করে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন "ভ্যানগার্ডে"। তাতে তিনি বলেছেন:
"এই অর্ধনগ্ন, কৃশ, তাম্রাভ দেহের ওপরে অন্তরিন্দ্রিয়ের পূর্ণ আধিপত্য। এই দেহে যে-শক্তি তাকে রণতরী দিয়ে জয় করা যায় না, মেসিনগানে হার মানানো যায় না (ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে-অনুবাদক) যদিও রণতরীতে মেসিনগানে দেহটাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়া যায়। এটি সুনিশ্চিতভাবে অবগত হয়েই শ্রদ্ধাপ্লুত হৃদয়ে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাঁকে অক্ষতই রেখেছে। ছ-বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড। সেখানে তাঁকে যথাসম্ভব আরামে রাখার জন্যে সবরকমের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। এর বেশি আর কোনো শাস্তি দেবার দুঃসাহস হয়নি ওদের। আর এই শাস্তিটা ওরা দিয়েছিল, তাঁকে সক্রিয় রাজনীতির কর্মক্ষেত্র থেকে দূরে সরিয়ে রাখারই উদ্দেশ্যে। ঝড়টা একটু কমে গেলেই ওরা তাঁকে ছেড়ে দেবে। ওরা ইতিমধ্যে যদি টের না পেয়ে থাকে, তবে শিগগিরই ওরা টের পাবে-কারারুদ্ধ সন্তপুরুষ গান্ধী তাঁর লক্ষ লক্ষ ভক্তের কাছে সহিদ গান্ধী হয়ে গেছেন। "কারাগারে আটকে রাখা মহাত্মা কারাগারের বাইরে থাকা মহাত্মার চাইতে অনেক বেশি শক্তিধর-এটি উত্তম কথা-সত্য কথাই বটে।"৪
ব্যক্তি হিসাবে গান্ধীর মহত্বকে প্রশংসা করে শান্তি দেবী ওই প্রবন্ধে গান্ধীকে নিয়ে তিনটি বিভিন্ন দিক থেকে পর্যালোচনা করেছেন- "দার্শনিক গান্ধী", 'রাজনীতিবিদ গান্ধী", "দেশপ্রেমিক গান্ধী।" গান্ধীর রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণা আর করণকৌশলের মধ্যে যে-বৈপরীত্য, তাকে নিষ্করুণভাবে খুলে দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি। রাজনৈতিক দাবি আদায়ে, কংগ্রেস দলকে গড়ে তোলায়, গণসংগ্রামের পদ্ধতি-প্রকরণ নিয়ে গান্ধী যে গঠনমূলক ভূমিকা নিয়েছিলেন, শান্তি দেবী সেটিও তুলে ধরেছেন। তিনি প্রবন্ধটি শেষ করেছেন এইভাবে: "ভারতের আন্দোলনে মিস্টার গান্ধীর প্রভাব সম্বন্ধে নিরপেক্ষ পর্যালোচনায় ইতি টানতে গিয়ে রাজনীতিবিদ গান্ধীর উদ্দেশে অন্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন করতেই হচ্ছে। আমরা মনে করি, দেশের দুঃখী নিপীড়িত মানুষের প্রতি মিস্টার গান্ধীর অগাধ ভালোবাসা। তাঁর অনেক করণ-কৌশলগত মস্ত মস্ত ভুলভ্রান্তি সত্ত্বেও জনগণের প্রতি তাঁর যে-ভালোবাসা মহনীয় হয়ে রইবে, সেই ভালোবাসাতেই তো তাঁর সমস্ত রাজনৈতিক কর্ম-ধারা উদ্দীপিত। মাতৃভূমিকে দাসত্বশৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার, দেশমাতৃকার সন্তানদের সুখীজীবনলাভের জন্যে সাহায্য করার তীব্র আকাঙ্ক্ষাই তাঁর সমস্ত কথাবার্তায় ফুটে বেরুচ্ছে। আদালতে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে গান্ধী বৃটিশসরকারের বিরুদ্ধে ভারতের যে দুর্বিষহ জালাময় অভি-যোগগুলি হাজির করেছিলেন, আর, বৃটিশসরকারের বিরুদ্ধে জনগণকে খেপিয়ে তুলছেন বলে তাঁর বিরুদ্ধে যে-অভিযোগ খাড়া করা হয়েছিল, তিনি তা স্বীকার করে নিয়ে তাঁকে তার জন্য প্রাপ্য সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে বলেছিলেন জজসাহেবকে। খুব অল্পসংখ্যক ঘটনার দৃশ্য ইতিহাসের পাতায় চিরঞ্জীব হয়ে থাকে। সেদিনকার আদালতের এই দৃশ্যটা তাদের মধ্যে নিশ্চয় অনেক বেশি চিরঞ্জীব।
"কালের যাত্রায় অনেক দিন পরে লোক ভুলে যাবে গান্ধীর সব রাজনৈতিক ভুলত্রুটি। কিন্তু মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী স্বদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন একজন মহাপুরুষরূপে, দেশপ্রেমিকরূপে।"*
যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গান্ধীবাদের উদ্ভব, প্রবন্ধটিতে তার পর্যালোচনা করে শ্রমিকশ্রেণীর দৃষ্টিতে গান্ধীবাদী দর্শন ও রাজনীতির বিচার করতে গিয়ে ভারতের জনজাগরণে গান্ধী আর গান্ধীবাদের ভূমিকার বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিচার করে দেখলে ডাঙ্গের উল্লিখিত রচনার দোষত্রুটিগুলো সহজেই ধরা পড়ে।
মহাত্মা গান্ধীর শুধু একটি মাত্র দিক নিয়েই আলোচনা করেই থেমে যাওয়া হয়নি। কংগ্রেস গান্ধীর অসহযোগের কর্মসূচি যখন গ্রহণ করল, তখন রায় আর তাঁর সহকর্মীরা বিপ্লবীশক্তিগুলোর অনুকূল কংগ্রসের প্রতিদিনকার অবস্থাতে পরিবর্তন আনার জন্যে উঠে পড়ে লেগে গিয়েছিলেন। গান্ধী আর চিত্তরঞ্জন দাশের মধ্যে মতবৈষম্য দেখা দিলে, রায় এক প্রবন্ধে সে-সম্বন্ধে
পর্যালোচনা করে কিছু সর্তসাপেক্ষে দাশকে সমর্থন করেছিলেন। পরবর্তিকালে জওহরলাল নেহরুর মধ্যে বামঘোষা ঝোঁকটা দেখে, তিনি তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন, তবে তার সঙ্গে একটু সমালোচনার ঝাঁঝালো ফোড়নটুকুও ছিল। দেশে যখন যেমন পরিস্থিতি দেখা দিচ্ছিল, রায় এই ভাবে সরাসরি তাদের মধ্যে ঢুকে পড়ে কংগ্রেসের ভেতরে একটি বিপ্লবীগোষ্ঠীগঠনে লেগে গিয়েছিলেন।
অসহযোগ আন্দোলন চালাবার জন্যে কংগ্রেসের আগ্রহ-উৎসাহকে স্বাগত জানিয়ে তিনি গান্ধীবাদী তত্ত্বের চিন্তাভাবনার বদলে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী চিন্তাভাবনা নেবার জন্যে বামপন্হী জাতীয়তাবাদীদের কাছে আবেদন করেছিলেন। নরমপন্থী আন্দোলন, অহিংস গণসংগ্রাম, "বোমার রাজনীতি"" -এ-সবের জায়গায় শ্রমিক ও কৃষকদের সংগঠিত শক্তির ওপরে গড়ে তোলা সংগ্রামে প্রয়োজনীয়তাকেই তিনি তুলে ধরেছিলেন তাঁদের সামনে।
এই ব্যাপারে রায়ের ওপরে একটু বেশি গুরুত্ব দিয়ে তাঁর নামটা উল্লেখ করা হলেও, একথাটা কিন্তু ভালো করে মনে রাখতে হবে যে, বিশ্ব কমিউনিস্ট নেতৃত্বই রায়ের বকলমে ভারতীয় রাজনীতিতে এই সব প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। ডঃ অধিকারীর সম্পাদনায় যে-সব দলিলপত্র প্রকাশিত হয়েছে, তাতে আছে, কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক এবং বিপ্লবী ট্রেড ইউনিয়ন সংস্থা রেড ট্রেড ইউনিয়ন ইনটারন্যাশনাল-এর পক্ষ থেকে ভারতীয় বিপ্লবীদের কাছে পাঠানো আবেদন-গুলো। সমস্ত বিভ্রান্তি দূর করে দিয়ে সুস্পষ্ট স্বচ্ছ ভাবনাচিন্তা আনা; এখানে সেখানে টুকরো টুকরো গণ-আন্দোলন যে-সব চলছিল, তাদের সবাইকে একটা সুসংগঠিত বিপ্লবী আন্দোলনের মধ্যে মিলিত করা-এই সব কাজ তো কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকই করেছিল। রায় যে-সব কাজকর্ম' করেছিলেন, সে-সব তো এই সংস্থারই প্রতিনিধি হিসাবে।
এই সব কাজকর্মের ফলে একটা বাম গণতান্ত্রিক পার্টি আস্তে আস্তে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছিল। মাদ্রাজে সিংগারাভেলু চেট্রিয়ারের হিন্দুস্তান লেবার কিষাণ পার্টি, বোম্বাই-এ ডাঙ্গের নেতৃত্বে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ভারতীয় সোস্যালিস্ট লেবার পার্টিগড়ার কাজ চলল। অল ইনডিয়া ওয়ার্কার্স' অ্যান্ড পেজান্টস্ পার্টি গড়ে তুলতে আরো কয়েক বছর লেগেছিল।
এই যে-সব নতুন দল জন্ম নিচ্ছিল, এদের কর্মসূচি কী হবে, তা নিয়ে কিন্তু "ভারতের মাটিতে” তখন নানা মুনির নানা মত। ভবিষ্যৎ সমাজতান্ত্রিক সমাজের চরিত্রটা কীধরনের হবে, তা স্থির করার ওপরেই সিংগারাভেলু আর
ভাঙ্গের কর্মসূচি বেশি জোর দিয়েছিল। চলতি সব বিষয় নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলার ব্যাপারে কিন্তু ওই সব দল ছিল খুবই কমজোরি। ওই দলগুলোর কাজকর্মের মূল দুর্বলতাগুলোকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কার্যনির্বাহক কমিটি নিম্নলিখিত মৌলিক বিষয়গুলিরই ওপরে তাদের সব প্রয়াসকে অভিনিবিষ্ট করার জন্যে আবেদন জানাল:
১. সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্কচ্ছেদ।
২. গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা।
৩. জমিদারিপ্রথার উৎখাত করা আর জমির মালিকানার আমূল-পরিবর্তনসাধন।
৪. পরিবহণ এবং জনসাধারণের ব্যবহার্য' অন্য সব ব্যবস্থার জাতীয়করণ।
৫. দিনে আট ঘণ্টার খাটুনি।
৬. ন্যূনতম মজুরি।
৭. শ্রমজীবী মানুষদের স্বার্থরক্ষার জন্যে কারখানায় ওয়ার্কার্স কাউন্সিল আর গ্রামে পেজান্টস্ ইউনিয়ন গঠন।
"ভারতের মাটিতে" বিশ্ব বিপ্লবী আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসাবে বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের উদ্যোগে একটা পার্টি' গড়ে তোলায় এই হলো প্রথম প্রয়াস। প্রকাশের তারিখ: ১২-আগস্ট-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|