|
সঙ্কটের পথেSoumyadip Raha |
ভারতের ৬৫% মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত। সুরক্ষিত চাল তৈরিতে ও তার বণ্টনের ক্ষেত্রে বৈষম্য আজ তীব্র । শিশুদের অপুষ্টিতে উচ্চতা অনুযায়ী শিশুদের ওজন কম প্রায় ১৮.৭ % । বয়সের তুলনায় খর্বাকৃতি হয়ে রয়েছে ৩৫.৫ % এবং পাঁচ বছরের কম বয়সি বাচ্চাদের মৃত্যুর হার ২.৯ % । |
.১
আমরা প্রতিনিয়ত এক কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি । দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস সহ খাদ্য - বস্ত্র - বাসস্থান ; নির্দিষ্ট ও ন্যায্য পাওয়ার ক্ষেত্রে যে বাঁধা তা আমাদের অনিশ্চয়তার মুখে ফেলছে। অত্যন্ত কৌশলে পুঁজিবাদ চালিয়ে যাচ্ছে আদিম পুঁজির সঞ্চয়। আর এই প্রক্রিয়া চলবেই। যার মূল লক্ষ্য প্রকৃতি আর মানুষ । ধীরে ধীরে প্রাকৃতিক সম্পদকে ধ্বংস করে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার কাজটা রোজকারের। করোনার সময় যখন সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মত রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে হাজির করে সাধারণ মানুষের নূন্যতম বেঁচে থাকার লড়াইকে সর্বোপরি শ্রেণি সংগ্রামকে খাটো করার চেষ্টা তা আমাদের শিক্ষা দিয়েছে ।
.২
বর্তমানে খাদ্যের সম বণ্টনে কেন্দ্র ও রাজ্যের সরকার যে বঞ্চনা করছে যেখানে বিদ্যালয়ের মিড ডে মিল গ্রহণকারীদের সংখ্যা কমছে । বাড়ছে স্কুল ছুটদের সংখ্যা । আমাদের রাজ্যে ২০২৫-২৬ সালে ১০ লক্ষ কম শিক্ষার্থী এই সুবিধা গ্রহণ করছে । সরকারি প্রাইমারি স্কুলগুলো আজ বন্ধের মুখে । দারিদ্র্যের পরিমাপ শুধু আয়ের উপর নয় পুষ্টির প্রাপ্যতাটাও বিবেচনা রাখা উচিত। দেশের অভ্যন্তরে এই বৈষম্যের মাত্রা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। শস্য বৈচিত্র্যকরণ, খাদ্যশস্য ব্যাংক স্থাপন এসব নানা কৌশল আজ শাসক শ্রেণীর ভাঁওতায় পরিণত হয়েছে। বিকেন্দ্রীভূত খাদ্য ব্যাংক তৈরিতে অনীহা। বহুমুখী পদ্ধতি অবলম্বনে অনীহা। যার ফলস্বরূপ, বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে । বিশেষ করে শিশুরা দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টির শিকার হচ্ছে। গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স (Global Hunger Index) অনুযায়ী ভারত বিশ্বের নিরিখে অনেক পিছিয়ে আছে, এবং যদিও খাদ্য উৎপাদন বেশি, অপুষ্টির হার কমছে না। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে প্রায় ১৯.৫ কোটি মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছেন, যা বিশ্বের মোট অপুষ্টির একটি বড় অংশ। ২০২৪ সালের গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে ভারত ১২৭টি দেশের মধ্যে ১০৫তম স্থানে রয়েছে । রেশন কার্ডের ক্ষেত্রে দুর্নীতি , BPL শ্রেণির আওতাধীন পরিবারগুলো পরিশুদ্ধ খাদ্য দ্রব্য পাওয়ার দিকে নূন্যতম সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত । ভারতের ৬৫% মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত। সুরক্ষিত চাল তৈরিতে ও তার বণ্টনের ক্ষেত্রে বৈষম্য আজ তীব্র । শিশুদের অপুষ্টিতে উচ্চতা অনুযায়ী শিশুদের ওজন কম প্রায় ১৮.৭ % । বয়সের তুলনায় খর্বাকৃতি হয়ে রয়েছে ৩৫.৫ % এবং পাঁচ বছরের কম বয়সি বাচ্চাদের মৃত্যুর হার ২.৯ % । এর থেকেই পাঠক বুঝতে পারবেন বর্তমান চিত্রটি ।
.৩
মার্কসীয় ধারণায় খাদ্য উৎপাদন হল পুঁজিবাদের শোষণ এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের ফল । পুঁজিবাদের দ্বন্দ্বের মূল কেন্দ্র যেখানে শ্রমিকের শোষণ এবং অতিরিক্ত মূল্যের (surplus value) ধারণা খাদ্য উৎপাদন ও ভাগের বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ বিষয়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা দরকার । মার্কস জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে একটি স্বাধীন কারণ হিসেবে দেখেননি। তিনি মনে করতেন যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমের শোষণ ও দারিদ্র্যের কারণে শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে জন্মহার বাড়ে, যা আদতে একটি অর্থনৈতিক বৈষম্যের ফল। যার ফলে হয় সম্পদের অসম বণ্টন । আর এই অসম বণ্টন - ই সমাজে ধনী আর দরিদ্র সৃষ্টি করে। অতএব এটা পরিষ্কার যে , সামাজিক ও মূলত তার অর্থনৈতিক কাঠামো গুলোই জনসংখ্যা এবং খাদ্য উৎপাদনের প্রেক্ষাপটকে নির্ধারণ করে।
.৪
সমসাময়িক বিশ্বে দেখা যাচ্ছে , প্রচুর খাদ্য উৎপাদনের মধ্যেও ক্ষুধা একটা দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। সমস্ত শ্রম- এর কথা প্রসঙ্গে মার্কস ক্যাপিটালে লিখেছেন , "মূলত প্রথমে খাদ্যের বরাদ্দ এবং উৎপাদনের দিকে পরিচালিত হয়।" ১৮৪৫ সালে ফ্রেডরিক এঙ্গেলস " দ্য কন্ডিশন অফ দ্য ওয়ার্কিং ক্লাস ইন ইংল্যান্ড" বইতে কৃত্রিম খাদ্য ঘাটতি এবং স্ফীত মূল্যবৃদ্ধির দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন যা শহুরে শ্রমিকদের পুষ্টির অভাবের দিকে পরিচালিত করে, সেই সাথে দূষণ এবং পচনের সমস্যার বিষয়ও তিনি উল্লেখ করেন।
কোভিড-১৯ মহামারীর ফলস্বরূপ প্রায় প্রতিটি দেশেই আয় কমে যাওয়া এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার বৈষম্য বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি করেছে—এর মধ্যে রাশিয়া ইউক্রেনের যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে । এই মহামারী বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের উপর বিধ্বংসী প্রভাব ফেলছে - বিশেষ করে শ্রমিক শ্রেণির উপর। মহামারীর আগের তুলনায় ২০২০- তে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীন মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ২৭ কোটি ৬০ লাখে পৌঁছেছে। কোভিড-১৯ মহামারী বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তাকে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত করেছে, যার ফলে চারটি স্তম্ভই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে: প্রাপ্যতা, অ্যাক্সেস, ব্যবহার এবং স্থিতিশীলতা। মূলত চলাচলের উপর বিধিনিষেধ, চাকরি হারানো এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাতের ফলে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পেয়েছে । যার থেকে এখনও বেরিয়ে আসতে পারেনি আমাদের দেশ সহ গোটা বিশ্ব ।
.৫
খাদ্য উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় জটিলতা বৃদ্ধি আর তার সম বণ্টনের সমস্যা এ ব্যাপারে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। যা এই সামাজিক অর্থনৈতিক পরিকাঠামোই সম্ভব কখনোই নয় । একবিংশ শতাব্দীতে শ্রমিক শ্রেণি তাদের লড়াইয়ের ময়দানে দেখেছে করোনা মহামারীর দুটি পর্ব । নূন্যতম পুষ্টি যুক্ত খাবার কিনে খাওয়ার অক্ষমতা এই অংশের মানুষকে ভাবিয়েছে । আজ যখন আমাদের দেশের কেন্দ্র আর রাজ্য সরকার তাদের পরিকল্পিত ভাঁওতাবাজি প্রকল্প গুলো নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য আপামর জনগণের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে এই জনবিরোধী নীতিগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তিযুক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা এ সময়ের অন্যতম কর্তব্য । প্রতিনিয়ত সংগ্রামকে শ্রেণী সংগ্রামের পর্যায়ে উন্নীত করে তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এ সময় সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতে আমাদের রাজ্যে খাদ্যের দাবিতে আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে ।১৯৫৫ সালের ডিসেম্বরে চালের মূল্য-সূচক প্রতি টন ৩৮২ টাকা থেকে বেড়ে ১৯৫৬ সালের ডিসেম্বরে ৫৩২ টাকায় পৌঁছোয় । ১৯৫৯ সালের গোড়ার দিকে পরিস্থিতি আরও জটিল পর্যায়ে পৌঁছোয় । খাদ্য ও কর্মসংস্থানের সন্ধানে লক্ষ লক্ষ মানুষ গ্রামাঞ্চল থেকে শহর, বিশেষ করে কলকাতায় ব্যাপক অনাহার, মৃত্যু, আত্মহত্যা দৈনন্দিন রুটিনে পরিণত হয়। এর পরিত্রাণের জন্য খেটে খাওয়া বঞ্চিত মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল হিসেবে অধিকার রক্ষা হয় । আর আজ পরিস্থিতি অন্য। শোষণের কৌশলটাও ভিন্ন কিন্তু শোষনটা একই রয়ে গেছে । খাদ্য আন্দোলনের অমর শহীদের স্মরণ করে আজ শপথ নেওয়ার দিন । সকলের হাতে কাজ আর সকলের পেটে ভাত । মুখোশধারী প্রকল্পগুলোর মুখোশ উন্মোচন করে সত্যটাকে তুলে ধরার সংগ্রামে সকলে একত্রিত হই। প্রকাশের তারিখ: ৩১-আগস্ট-২০২৫ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|