থাকা অথবা না-থাকা! রাস্তা একটাই, অপসারণ এবং বিচার

Samik Lahiri
ভোটার তালিকা শুদ্ধ হোক, কিন্তু প্রকৃত ভোটার বাদ দিয়ে নয়। প্রযুক্তি ব্যবহার হোক, কিন্তু নাগরিকের অধিকারকে প্রযুক্তির হাতে সমর্পণ করে নয়। নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী হোক, কিন্তু সেই শক্তি যেন নাগরিকের বিরুদ্ধে না যায়।
ভোটার তালিকায় একটা নাম থাকে। নামের পাশে নম্বর, ঠিকানা, বুথ। তারপর আসে ভোটের দিন। সেই ভোটার লাইনে দাঁড়ান। আঙুলে কালি লাগে। তিনি একটা বোতাম টিপে বাড়ি ফিরে যান। গণতন্ত্রের অভিধানে এই ঘটনা এতটাই সাধারণ যে তার ভিতরে লুকিয়ে থাকা অসাধারণ ঘটনাটগুলোকে আমরা প্রায় ভুলেই যাই। কিন্তু সেই নাম যদি ভোটের দিন আসার আগেই অদৃশ্য হয়ে যায়? তখন একজন নাগরিক হঠাৎ একটা ফাইলে পরিণত হয়। ফাইল চলে যায় সার্ভারে। সার্ভার চলে যায় সফটওয়্যারের অধীনে। সফটওয়্যার চলে যায় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে। আর সেই নাগরিক দাঁড়িয়ে থাকেন এমন একটা দরজার সামনে, যার চাবি তার হাতে নেই।
২৩ সেপ্টেম্বর দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আসলে সেই দরজার কথাই বলছে। শুধু নির্বাচন কমিশনের অন্দরমহলের মতপার্থক্যের খবর নয়; ভোটার তালিকা কীভাবে তৈরি হচ্ছে, কার হাতে তার প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ, কে নাম যোগ বা বাদ দেওয়ার ক্ষমতা প্রয়োগ করছে এবং এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ভিতরে সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে নেওয়া হচ্ছে, তার এক ভয়ংকর ছবি উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে। গত দশ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী, অন্তত ১৪ বার লিখিতভাবে কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছেন। এর মধ্যে একই দিনে চারটে আপত্তিও নথিভুক্ত হয়েছে।
মোট চোদ্দবার আপত্তি জানিয়েছেন অন্য দুই কমিশনার বিবেক জোশী এবং সুখবীর সিং সান্ধু। এই সংখ্যা শুনলে মনে হয় কোনো সরকারি ফাইলে চোদ্দটা সাধারণ লাল দাগ। কিন্তু সেই ফাইলগুলো ছিল ভারতের ভোটার তালিকা। আর ভোটার তালিকা কোনো সাধারণ সরকারি রেজিস্টার নয়। সেখানে একটা নাম বাদ পড়া নিছক একটা প্রশাসনিক সংশোধন নয়। তার সঙ্গে যুক্ত একজন নাগরিকের ভোট দেওয়ার অধিকার, রাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর সাংবিধানিক সম্পর্ক এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তাঁর দৃশ্যমান থাকার অধিকার।

প্রথম আপত্তি যখন এসেছিল
এসআইআর-এর বিরুদ্ধে সিপিআই(এম)’র আপত্তি ২৩ সেপ্টেম্বরের বিস্ফোরণের পরে শুরু হয়নি। অনেক আগেই শুরু হয়েছিল। বিহারে এসআইআর ঘোষণার পর, ২৭ জুন ২০২৫-এ সিপিআই(এম)’র পলিটব্যুরো সদস্য নীলোৎপল বসু মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি লিখে প্রশ্ন তুলেছিলেন, কেন ভোটার তালিকায় নাম রাখা বা বাদ দেওয়ার দায় সাধারণ ভোটারের ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে? কেন নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে এমন একটা বিশাল প্রক্রিয়া? কেন এমন নথি চাওয়া হচ্ছে যা বহু সাধারণ মানুষের হাতে নেই? কেন স্বল্পশিক্ষিত বা ডিজিটাল-সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে অনলাইন ফর্ম পূরণের দায় নিতে হবে? এবং কেন বাবা-মায়ের নথিও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে? তখনই সিপিআই(এম) সতর্ক করেছিল, এই পদ্ধতিতে প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থাৎ সিপিআই(এম)’র আপত্তির কেন্দ্রে ছিল প্রথম থেকেই একটা সহজ প্রশ্ন -- ভোটারকে কি তার ভোটাধিকার প্রমাণ করতে হবে, নাকি রাষ্ট্রের দায়িত্ব ভোটার তালিকা তৈরি করা? 
অক্টোবর ২০২৫-এ এসআইআর ১২টি রাজ্যে সম্প্রসারিত করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও সিপিআই(এম) বলেছিল, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে নির্বাচন কমিশন যেন নাগরিকত্ব নির্ধারণের ক্ষমতা নিজের হাতে না নেয়। সিপিআই(এম)’র স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, নাগরিকত্বের প্রশ্ন নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক এক্তিয়ারের বিষয় নয়; একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের উপর নথিপত্রের বোঝা চাপালে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তারপর নভেম্বরেও সিপিআই(এম) বলেছিল, যে প্রক্রিয়া হওয়ার কথা ছিল নিয়মিত, স্বচ্ছ এবং নাগরিকবান্ধব, সেটাই তাড়াহুড়ো, প্রযুক্তিগত সমস্যা এবং অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপের কারণে বহু মানুষের জন্য নতুন বাধায় পরিণত হয়েছে।
অর্থাৎ আজকের এই প্রশ্ন হঠাৎ জন্ম নেয়নি, বরং এই প্রশ্ন ধীরে ধীরে বড়ো হয়েছে। প্রথমে ছিল ফর্ম। তারপর নথি। তারপর ডেটাবেস। তারপর সফটওয়্যার। এখন প্রশ্ন, ক্ষমতা আসলে কার হাতে?

সফটওয়্যারও রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারে
নির্বাচন কমিশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি ছিল ভোটার তালিকা বিকেন্দ্রীভূত। স্থানীয় নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিকরা (ERO) আইন অনুযায়ী তালিকা প্রস্তুত ও সংশোধনের দায়িত্ব পালন করেন। অর্থাৎ নাগরিকের নাম নিয়ে শেষ সিদ্ধান্ত কোনো দূরবর্তী কেন্দ্রীয় কম্পিউটার নেবে না; স্থানীয় আইনসঙ্গত আধিকারিক নথি দেখবেন, শুনবেন, সিদ্ধান্ত নেবেন। কিন্তু প্রযুক্তি যখন প্রশাসনের হাতিয়ার হয়, তখন ক্ষমতা কখনো কখনো সফটওয়্যারের ভিতরেও লুকিয়ে যেতে পারে।
সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শ্রী সান্ধু ও শ্রী যোশী বারবার ভোটার ডেটাবেসের ‘ক্রমাগত কেন্দ্রীকরণ’ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। শ্রী যোশী এমনকী প্রযুক্তিগত অডিটের প্রস্তাব করেছিলেন, যাতে নিশ্চিত করা যায় সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আধিকারিক ছাড়া অন্য কেউ ভোটার ডেটাবেসে পরিবর্তন করার অধিকার না পান।
প্রশ্ন তাই খুব সাধারণ। আইন যদি বলে একজন ইআরও সিদ্ধান্ত নেবেন, কিন্তু তার হাতে যদি সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার প্রযুক্তিগত ক্ষমতা না থাকে, তাহলে আইনের অর্থ কী! শুধু কাগজে-কলমে? নাকি সার্ভারের ভিতরে?
গোয়ার ৯৭ জন ভোটারের ঘটনা এই প্রশ্নকে আরও নগ্ন করে দিয়েছে। স্থানীয় ইআরও-রা শুনানি করে তাঁদের যোগ্য বলে মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রযুক্তিগত অনুমোদন কার্যকর না হওয়ায় তাঁদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় যুক্ত করা যায়নি বলে এই প্রতিবেদনে জানা গেছে। সেখানে ৯৭ জন মানুষ, কিন্তু প্রশ্ন ৯৭ জনের নয়। প্রশ্ন হলো, আইন বলবে একজন নাগরিক ভোটার, আর সফটওয়্যার বলবে তিনি নন; তাহলে শেষ কথা কে বলবে? আইন? নাকি কোড?

ফর্মের ভিতরে ঢুকে পড়ার ইতিহাস
তারপর এলো ফর্ম ৬। নতুন ভোটার হওয়ার ফর্মে এসআইআর-পরবর্তী পুরোনো ভোটার তালিকার সঙ্গে সম্পর্কিত নতুন প্রশ্ন যুক্ত হলো। আবেদনকারীকে জানাতে হচ্ছিল তাঁর নিজের, অথবা বাবা-মা কিংবা দাদা-ঠাকুমার নাম আগের এসআইআর তালিকায় ছিল কি না। বিবেক যোশী ১৬ মে লিখিত আপত্তি জানান এবং সুখবীর সিং সান্ধু ১৯ মে তাঁর সঙ্গে একমত হন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, বিধিবদ্ধ ফর্ম ৬-এ এমন পরিবর্তন করতে হলে সংশ্লিষ্ট নিয়ম সংশোধন করতে হবে। পরে ১৩ আগস্ট সান্ধু এই পরিবর্তনকে ‘বেআইনি’ বলে তা প্রত্যাহারের দাবি জানান।
একটা ফর্ম। দেখতে ছোটো। কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে ফর্ম কখনো ছোটো নয়। একটা ঘর যোগ হয়। একটা প্রশ্ন ঢোকে। একটা উত্তর বাধ্যতামূলক হয়। আর নাগরিকের সামনে হঠাৎ একটা নতুন পরীক্ষা এসে দাঁড়ায়। যে তরুণ প্রথমবার ভোট দিতে এসেছে, তাকে বলা হচ্ছে, তোমার বর্তমান পরিচয় যথেষ্ট নয়; তোমার পরিবারের অতীতও সঙ্গে নিয়ে এসো। গণতন্ত্র তখন ভবিষ্যতের ভোটারকে অতীতের ফাইলে খুঁজতে শুরু করে।

কমিশনের ভিতরে ঘণ্টা বাজল
একটা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ভিতরে মতভেদ থাকা অপরাধ নয়। বরং মতভেদ প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যের লক্ষণও হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মতভেদের পরে কী হলো?
২০২৩ সালের Chief Election Commissioner and Other Election Commissioners Act-এর ১৮ নম্বর ধারা বলছে, কমিশনের কাজ যতদূর সম্ভব সর্বসম্মতভাবে হবে; মতভেদ হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে। একই ধারায় কমিশনের কার্যপদ্ধতি ও কাজের বণ্টনের ক্ষেত্রেও সর্বসম্মতির কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC)-এর চেয়ার এক জনের। কিন্তু প্রতিষ্ঠান একজনের নয়। সিইসি হলেন তিনজনের মধ্যে প্রথম, কিন্তু সর্বেসর্বা নন। তাই দুই কমিশনার যখন লিখিতভাবে আপত্তি জানান, তখন প্রশ্নটা শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত মতামতের থাকে না, প্রশ্ন ওঠে, সেই আপত্তির সাংবিধানিক পরিণতি কী হয়েছিল? কোন আপত্তি গ্রহণ করা হলো? কোনটা প্রত্যাখ্যাত হলো? কোন সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত ছিল? কোন সিদ্ধান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নেওয়া হলো? আর সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার নথি কোথায়?
এইসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বার্থেই।

পশ্চিমবঙ্গ - প্রশ্ন এবার দরজার ভিতরে
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এর শেষ পর্যায়ে প্রশ্ন আরও জটিল হয়েছে। কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৭.১৬ লক্ষ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে ২২ লক্ষের বেশি পুনর্বহালের জন্য আপিল করেছেন। মোট আপিলের সংখ্যা ৩৮.৩১ লক্ষ, যার মধ্যে ১৬.১০ লক্ষ ছিল অন্তর্ভুক্ত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন।
কিন্তু এই দ্বিতীয় শ্রেণির আপিলগুলিই নতুন প্রশ্ন তুলেছে। কে আবেদন করলো? কার অনুমতিতে করলো? কেন করলো?
শ্রী সান্ধু নিজেই এই প্রশ্ন তুলেছেন, ইসিআই-এর পক্ষ থেকে এই আপিলগুলি দায়ের করার জন্য কাকে কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছিল এবং কে বাস্তবে সেগুলি দায়ের করেছিল? তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি, যোশী এবং পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন সিইও -- কেউই এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না।
গণতন্ত্রে কখনো কখনো সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্ন এটা নয় যে, কী সিদ্ধান্ত হলো? প্রশ্ন, এই সিদ্ধান্ত নিল কে?
২০২৬ সালের এপ্রিলেই সিপিআই(এম)’র সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি লিখে পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক ভোটার বাদ পড়া নিয়ে তীব্র উদ্‌বেগ জানান। দলের বক্তব্য ছিল, এসআইআর ক্রমশ এমন একটা প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে যেখানে ‘যুক্তিসঙ্গত সামঞ্জস্য’ (logical consistency)-এর মতো মানদণ্ড এবং ‘অ্যালগরিদমের ভিত্তিতে নাম বাদ দেওয়া’ (algorithm-driven exclusion)-এর উপর নির্ভরতা বেড়েছে, অথচ প্রকৃত স্বচ্ছ যাচাই কমেছে। তিনি আরও লিখেছিলেন, এর ফলে ভোটারের উপর নিজের বৈধতা প্রমাণের দায় এসে পড়েছে। জুন ২০২৬-এ সিপিআই(এম) আরও বলেছিল, বিভিন্ন রাজ্যে এসআইআর-এর ফলে প্রায় ছয় কোটি ভোটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং নির্বাচন কমিশনের কার্যপ্রণালীর সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার দাবিতে দেশজুড়ে প্রচার চালানো হবে।
সিপিআই(এম) দলের মূল বক্তব্য ছিল -- ভোটার তালিকা শুদ্ধ হোক, কিন্তু প্রকৃত ভোটার বাদ দিয়ে নয়। প্রযুক্তি ব্যবহার হোক, কিন্তু নাগরিকের অধিকারকে প্রযুক্তির হাতে সমর্পণ করে নয়। নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী হোক, কিন্তু সেই শক্তি যেন নাগরিকের বিরুদ্ধে না যায়।

কমিশনের জবাবও থাক
নির্বাচন কমিশন অবশ্য এই ব্যাখ্যা মেনে নেয়নি। তাদের বক্তব্য ছিল, অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ এবং গত এক বছরের সিদ্ধান্তগুলি, এসআইআর-সহ, সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়েছে। এই বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, গণতন্ত্রে শুধু অভিযোগের নথি থাকবে না, জবাবের নথিও থাকবে। কিন্তু এখানেই আরও কিছু প্রশ্ন জন্ম নেয়।
যদি ১৪টা আপত্তি কেবল পরামর্শ হয়ে থাকে, তবে সেই পরামর্শগুলি কীভাবে নিষ্পত্তি হলো? ফর্ম ৬ কে বদলাল? ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ কে নির্ধারণ করলো? পশ্চিমবঙ্গে আপিলের অনুমোদন কে দিল? কোন সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত ছিল? তা কী সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে? এই প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ্যে আসতেই হবে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে রক্ষা ও শক্তিশালী করার জন্যই। কারণ, অন্ধকার কোনো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের রক্ষাকবচ নয়। স্বচ্ছতাই তার রক্ষাকবচ।

ভোটের আগে ভোটার
আমরা নির্বাচনকে দেখি ভোটের দিন থেকে। কিন্তু নির্বাচন শুরু হয় তার অনেক আগে। ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগে ভোটার হতে হয়। ভোটার হওয়ার আগে তালিকায় নাম থাকতে হয়। তালিকায় নাম থাকার আগে একটা ডেটাবেসে অস্তিত্ব থাকতে হয়। আর সেই ডেটাবেসের আগে থাকে মানুষ, আইন, নিয়ম, সফটওয়্যার, সার্ভার এবং নিয়ন্ত্রণ। তাই গণতন্ত্রের প্রথম যুদ্ধ ব্যালট বাক্সের সামনে নয়, ডেটাবেসের ভিতরে।
একটা ভোট কখনো কখনো ব্যালট বাক্সে হারায় না। হারায় তার আগেই; ফর্মে, তালিকায়, ‘যুক্তিসঙ্গত সামঞ্জস্য’-এর নামে অযৌক্তিক ব্যবস্থায়, সফটওয়্যারের অস্বীকৃতিতে। এখানেই ওঠে আসল প্রশ্ন। একজন জীবন্ত মানুষকে যদি একদিন তার নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে হয়, তবে রাষ্ট্রের কাছে সেই প্রশ্ন উলটো করে রাখা দরকার – ‘তুমি আমাকে ভোটার হিসেবে তৈরি করোনি; আমি তোমাকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে তৈরি করেছি। এখন আমার অস্তিত্বের প্রমাণ আমি দেব কেন?’
এই প্রশ্ন সিপিআই(এম)’র রাজনৈতিক অবস্থানের কেন্দ্রে প্রথম থেকেই ছিল এবং রয়েছে। শুরু থেকেই এসআইআর-কে কেবল ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রশাসনিক কাজ হিসেবে তারা দেখেনি; বরং ভোটাধিকার, নাগরিকত্ব নির্ধারণের সীমা, নথির বোঝা এবং প্রান্তিক মানুষের বঞ্চনার প্রশ্ন হিসেবে দেখেছে।

আর ২৩ সেপ্টেম্বরের নতুন প্রকাশিত নথি সেই বিতর্কে আর একটা দরজা খুলে দিয়েছে। দরজার ওপারে দেখা যাচ্ছে, শুধু বাইরে থাকা নাগরিক নয়, ভিতরে থাকা দুই নির্বাচন কমিশনারও একই প্রশ্ন তুলেছিলেন -- দশ মাসে চোদ্দ বার। তাই এখন এই প্রশ্ন আর শুধু এসআইআর-এর নয়। প্রশ্ন হলো -- নির্বাচন কমিশনের ভিতরে সিদ্ধান্ত নেয় কে? ভোটার তালিকার চাবি কার হাতে? আইনের কথা শেষ পর্যন্ত বলে কে? মানুষ, প্রতিষ্ঠান, না সফটওয়্যার? আর সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন, গণতন্ত্রের দরজা খুললে ভিতরে সত্যিই কতজন বসে আছেন?
ভোটার তালিকা শুধু নামের তালিকা নয়। এটা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আয়না। সেই আয়না যদি কুয়াশায় ঢেকে যায়, তখন আয়নাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। দেখতে হয়, কুয়াশা এলো কোথা থেকে। এই অস্বচ্ছ ব্যবস্থা বিজেপি-আরএসএস-এর আজ্ঞাবাহী মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারই গড়ে তুলেছিলেন। 
তাই দেশের গণতন্ত্র, সংবিধান এবং নির্বাচন কমিশনের মতো সর্ব্বোচ্চ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা করার জন্য এখন রাস্তা একটাই – জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং আদালতের কাঠগড়ায় তাঁকে দাঁড় করানো।
প্রকাশের তারিখ: ২৭-সেপ্টেম্বর-২০২৬

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org