‘ওরা বীর, ওরা আকাশে জাগাত ঝড়’ – পর্ব ৫

Webdesk
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্বাধীনতা আন্দোলনের নতুন পর্যায়ে তিনি বন্দিমুক্তি আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৬ সালের ৩১ আগস্ট আলিপুর জেল থেকে বহু রাজনৈতিক বন্দীর মুক্তির ক্ষেত্রে এই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ থেকে বিপুল সংখ্যক উদ্বাস্তু পশ্চিমবঙ্গে এসে চরম দুর্দশায় পড়েন। অম্বিকা চক্রবর্তী ও কমিউনিস্ট আন্দোলন উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন ও অধিকার রক্ষার সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫০ সালে ইউনাইটেড সেন্ট্রাল রিফিউজি কাউন্সিল (UCRC) গঠিত হয়।
অম্বিকা চক্রবর্তী ছিলেন চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান বিপ্লবী এবং পরবর্তীকালে কমিউনিস্ট আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। ১৯২০-এর দশকের শেষদিকে বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন উত্তাল সেই সময়ে ছাত্র যুবরাও আন্দোলনকে এগিয়ে জিয়ে যাচ্ছিলেন।সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন, ভগৎ সিংদের বিপ্লবী কর্মকাণ্ড সারা দেশে ছড়িয়ে পরেছে, সেই সময় অম্বিকা চক্রবর্তী চট্টগ্রামের বিপ্লবী যুব আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। ১৯২৯ সালের চট্টগ্রাম যুব সম্মেলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৮ এপ্রিল ১৯৩০ সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখলের যে ঐতিহাসিক অভিযান শুরু হয়, অম্বিকা চক্রবর্তী তাতে অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী দল পুলিশ অস্ত্রাগার দখল করে এবং টেলিফোন-টেলিগ্রাফ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার কাজেও অংশ নেয়। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীন বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণার পর বিপ্লবীরা পাহাড়ে আশ্রয় নেন।

২২ এপ্রিল ১৯৩০-এর জালালাবাদ যুদ্ধের পর অম্বিকা চক্রবর্তী গুরুতর আহত অবস্থায়ও আত্মগোপন করে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান। গ্রামে গ্রামে ব্রিটিশ সেনার তল্লাশি ও নির্যাতনের মধ্যেও সাধারণ মানুষ তাঁকে আশ্রয় ও সাহায্য করেন। দীর্ঘদিন আত্মগোপনের পর তিনি ধরা পড়েন। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা চলে এবং তাঁকে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

কারাগারই পরবর্তীকালে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। আলিপুর জেলে আবদুল হালিম ও সরোজ মুখার্জির সংস্পর্শে এসে তিনি মার্কসবাদী চিন্তায় আকৃষ্ট হন। ১৯৩০-এর দশকে বিভিন্ন জেলে কমিউনিস্ট মতাদর্শের প্রসার ঘটতে থাকে এবং অম্বিকা চক্রবর্তীও কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্বাধীনতা আন্দোলনের নতুন পর্যায়ে তিনি বন্দিমুক্তি আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৬ সালের ৩১ আগস্ট আলিপুর জেল থেকে বহু রাজনৈতিক বন্দীর মুক্তির ক্ষেত্রে এই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ থেকে বিপুল সংখ্যক উদ্বাস্তু পশ্চিমবঙ্গে এসে চরম দুর্দশায় পড়েন। অম্বিকা চক্রবর্তী ও কমিউনিস্ট আন্দোলন উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন ও অধিকার রক্ষার সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫০ সালে ইউনাইটেড সেন্ট্রাল রিফিউজি কাউন্সিল (UCRC) গঠিত হয়।

১৯৪৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ঘোষিত হলে তিনি আবার আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন। পরে নির্বাচনী রাজনীতিতেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল—তিনি ১৯৪৯ সালে রাজ্য পরিষদের সদস্য এবং ১৯৫২ সালে বিধানসভায় নির্বাচিত হন। কংগ্রেস আমলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁকে বারবার কারাবরণ করতে হয়; মোট প্রায় ২৬ বছর তাঁর জীবনের বিভিন্ন সময় কারাগারে কেটেছে।

অম্বিকা চক্রবর্তী ৬ মার্চ ১৯৬২ সালে কলকাতায় এক পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। বিপ্লবী আন্দোলন থেকে কমিউনিস্ট রাজনীতি এবং উদ্বাস্তু অধিকার আন্দোলন—তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন ছিল ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংগ্রামের ইতিহাস।
প্রকাশের তারিখ: ০৮-সেপ্টেম্বর-২০২৬

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org