‘ওরা বীর, ওরা আকাশে জাগাত ঝড়’ – পর্ব ১

Webdesk
কমিউনিস্টদের “দেশদ্রোহী” বলে দাগিয়ে দিতে চায় আরএসএস। ব্রিটিশ শাসকের সমীপে ক্ষমাভিক্ষার মুচলেকা লেখা সাভারকর’রা হয়ে ওঠে বীর, স্বাধীনতার সংগ্রাম ও তার ইতিহাসকে ভুলিয়ে দেওয়ার, গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে। শাসককে খুশি করতে লেখা ইতিহাস বইয়ের পাতা দেশের স্বাধীনতার লড়াই’র ঐতিহ্যকে বিকৃত করতে চায়। ভুলিয়ে দিতে চাওয়ার রাজনীতি যেমন চলছে, তার প্রতিরোধে তথ্যনিষ্ঠ, প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার রাজনীতিও চলবে। সে ভাবনা থেকেই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনন্য সৈনিক যারা কমিউনিস্ট আন্দোলনে, পার্টিতে যুক্ত হয়েছিলেন তাদের জীবন ও কাজ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত, ধারবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ শুরু হল।

স্বাধীনতা সংগ্রামী গণেশ ঘোষ। জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী থেকে কমিউনিস্ট বিপ্লবীতে উন্নীত কমরেড গণেশ ঘোষ তার জীবনের মোট ২৭ টা বছর কেবল কারাবাসেই ছিলেন৷ প্রথমে পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের হাতে “দেশপ্রেমিক” হওয়ার অপরাধে গ্রেফতার হয়েছিলেন, পরে স্বাধীন ভারতে কংগ্রেস সরকারের হাতে “কমিউনিস্ট” হওয়ার অপরাধে গ্রেফতার হয়েছিলেন।

১৯০০ সালে অবিভক্ত বাংলার যশোর জেলাতে জন্ম  কমরেড গণেশ ঘোষের। চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল স্কুল থেকে লেখাপড়া শুরু। ক্লাস সেভেনে মাস্টারদা সূর্য সেনের সাথে পরিচয় এবং সেখান থেকেই স্বাধীনতা সংগ্রামে হাতেখড়ি। গান্ধীজির ডাকে চট্টগ্রামে ছড়িয়ে পরেছিল অহিংস আন্দোলন।গণেশ ঘোষ ও অনন্ত সিংহ এর নেতৃত্বে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্কুল কলেজে ব্রিটিশ শাসনের বিরূদ্ধে ধর্মঘট শুরু হয়।

১৯২০ এর দশকে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার হলে গণেশ ঘোষ কলকাতায় বেঙ্গল টেকনিক্যাল এডুকেশন স্কুলে (বর্তমান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে) পড়তে আসেন। এখানে এসে বিপ্লবী কর্মপদ্ধতি আরো বাড়তে থাকে। কলেজের ল্যাবরেটরি থেকে রাসায়নিক পদার্থ নিয়ে এসে বোমা তৈরী করা শিখতেন, ধরাও পড়ে যান। প্রমাণের অভাবে ছাড়া পেলেও ১৯২৪ সালে ভারতরক্ষা আইনে তিনি গ্রেফতার হন এবং চার বছর বন্দী থাকেন। ১৯২৮ সালে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে প্রতিনিধি হিসাবে যোগ দিয়েছিলেন গণেশ ঘোষ। মাস্টারদা চট্টগ্রামে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর আদলে যে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন তার অন্যতম সংগঠক ছিলেন গণেশ ঘোষ। মাস্টারদের নেতৃত্বে ১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিল চট্টগ্রাম রিপাবলিকান আর্মি যেভাবে ব্রিটিশ সরকারের চট্টগ্রাম দখল করে ও দুদিন চট্টগ্রাম জেলাকে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত করে তার ফিল্ড মার্শাল ছিলেন গণেশ ঘোষ। সরকারি অস্ত্রাগার দখল ও ব্যারাক আক্রমণ করে চট্টগ্রামে স্বাধীন জাতীয় সরকার গঠন করে। জনগণের উদ্দেশ্য প্রচার ও আবেদন জানান বিপ্লবীরা - যা লিখেছিলেন গণেশ ঘোষ। যা কেবলমাত্র ঐতিহাসিক ঘটনাই নয় বরং বৈপ্লবিকও বটে। পরে স্বাধীনতা সংগ্রামীরা জালালাবাদ পাহাড়ে আশ্রয় নিলে গণেশ ঘোষ ও অনন্ত সিংহ মূল দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং কলকাতার দিকে আসেন। তারপর চন্দননগরে আশ্রয় নেন। ওই বছরই চার্লস টেগার্টের নেতৃত্বে এক বিরাট পুলিশ বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে আহত অবস্থায় ধরা পরেন তিনি। জেল থেকে পালানোর চেষ্টা করেও সফল হননি।

চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখলের মামলায় তাঁকে অন্যান্য বন্দীদের সাথে আন্দামান সেলুলার জেলে পাঠানো হয়। সেখানেই ডা: নারায়ন রায় সহ একাধিক কমিউনিস্ট নেতার মাধ্যমে সাম্যবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন। কেবল ভারতের স্বাধীনতা নয়, সারা বিশ্বের খেটে খাওয়া মানুষের মুক্তির দাবীতে, শোষণের বিরূদ্ধে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্টেটসম্যান পত্রিকায় চিঠির মাধ্যমে বার্তা দিলেন ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রামে কেন সোভিয়েত’কে রক্ষা করতে হবে এবং মানুষকে এই বিশ্বসংগ্রামে কেন ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করতে হবে।

১৯৪৬ সালে মুক্তি পাবার পর ১৯৪৮ সালে স্বাধীন ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ঘোষিত হলে তিনি আবার গ্রেপ্তার হন। মুক্তি পাবার পর একদিকে যেমন ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি এবং পরবর্তীতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র প্রতিনিধি হিসাবে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন, খাদ্য আন্দোলনের মত উত্তাল গণ-আন্দোলনেও নেতৃত্ব দেন।

১৯৯৪ সালের ১৬ অক্টোবর, কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়।


প্রকাশের তারিখ: ১৫-আগস্ট-২০২৬

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org