|
‘ওরা বীর, ওরা আকাশে জাগাত ঝড়’ – পর্ব ২Webdesk |
কমিউনিস্টদের “দেশদ্রোহী” বলে দাগিয়ে দিতে চায় আরএসএস। ব্রিটিশ শাসকের সমীপে ক্ষমাভিক্ষার মুচলেকা লেখা সাভারকর’রা হয়ে ওঠে বীর, স্বাধীনতার সংগ্রাম ও তার ইতিহাসকে ভুলিয়ে দেওয়ার, গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে। শাসককে খুশি করতে লেখা ইতিহাস বইয়ের পাতা দেশের স্বাধীনতার লড়াই’র ঐতিহ্যকে বিকৃত করতে চায়। ভুলিয়ে দিতে চাওয়ার রাজনীতি যেমন চলছে, তার প্রতিরোধে তথ্যনিষ্ঠ, প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার রাজনীতিও চলবে। সে ভাবনা থেকেই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনন্য সৈনিক যারা কমিউনিস্ট আন্দোলনে, পার্টিতে যুক্ত হয়েছিলেন তাদের জীবন ও কাজ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত, ধারবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ শুরু হল। |
স্বাধীনতা সংগ্রামী সতীশ পাকড়াশী। ১৮৯১ সালে ঢাকা জেলার মাধবদি গ্রামে জন্ম। বাবা জগদীশ পাকড়াশী, মা মৃণালিনী পাকড়াশী। ১৯০৫-০৬ সাল। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে উদ্বেলিত বাঙলা। বালক সতীশ সেই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সতীশ বসু, ব্যারিস্টার পি মিত্র, পুলিন দাস প্রমুখ ‘অনুশীলন সমিতি’ নামে একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলেন। শরীর চর্চা, ব্যায়াম, লাঠি খেলা, ছোঁড়া খেলা, কুস্তি ইত্যাদির আড়ালে রাজনৈতিক শিক্ষা, বিপ্লবাত্মক প্রচার। সতীশের মাটির পাড়া গ্রামেও অনুশীলন সমিতি গঠিত হয়। বালক সতীশ এই সমিতির সভ্য হলেন। স্কুল ছটির পরে অতি সংগোপনে নোট বইয়ে লিখে রাখা লাঠি খেলার সাংকেতিক ফরমুলা (সংকেতশব্দ) মুখস্থ করতেন। পড়লেন ইতালির মাৎসিনি ও গ্যারিবল্ডির গুপ্ত সমিতি ও স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস। আয়ারল্যান্ডের সশস্ত্র সংগ্রামের কাহিনি, ফরাসি বিপ্লব কাহিনি ইত্যাদি। ১৯১১, অনুশীলন দলের নেতা নরেন সেন প্রায় দশ মাইল দূর থেকে ৪৫০ বোরের রিভলবার, কার্তুজ নিয়ে আসার জন্য সতীশকে দায়িত্ব দিলেন। সতীশ ধরা পড়ে যান এবং এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়। ১৯১২ সালে জেল থেকে মুক্তি পান। ১৯১৩ সালে রাজাবাজার বোমার মামলায় ষড়যন্ত্রকারী হিসাবে তাঁর ও আরো কয়েকজনের নামে ওয়ারেন্ট বের হয়। বরানগরে গোপনে আশ্রইয়ে থাকার সময়ই রাসবিহারী বসুর সঙ্গে পরিচয়। প্রবল ম্যালেরিয়া জ্বরে আক্রান্ত হন। সেখান থেকে তাঁকে দিনাজপুরের সংগঠনের কাজে পাঠানো হয়। ১৯১৪ সালে দলের একটি ‘এ্যাকশন’-এ যোগদানের জন্য তিনি কলকাতা মুসলমানপাড়া লেনে আসেন। ২৫ নভেম্বর আই বি পুলিশের ডেপুটি সুপারিন্টেডেন্টকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁর বৈঠকখানায় বোমা নিক্ষেপ করা হয়। কিন্তু তাদের নিক্ষিপ্ত বোমায় তাঁরা নিজেরাই আহত হন। সতীশ প্রচণ্ডভাবে আহত হন। রাজশাহী সায়েন্স কলেজের হোস্টেলে ছাত্ররা তাঁকে আশ্রয় দেয় ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। প্রায় পাঁচ বছর আত্মগোপনে থাকার পর সতীশ পাকড়াশী ১৯১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কলকাতা হাইকোর্টের সামনে ধরা পড়েন। তাঁকে ইলিসিয়াম রো স্পেশাল ব্রাহ্ম অফিসে এনে নির্যাতন করা হয়। ১৯১৮ সালের মার্চ মাসে তাঁকে প্রেসিডেন্সি জেলের কুখ্যাত চুয়াল্লিশ নম্বর সেলে আবদ্ধ করা হয়, তালাবদ্ধ নির্জন কক্ষ। ১৯২১ সালের জানুয়ারিতে মুক্তি পান। ১৯২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি আবার গ্রেপ্তার হন এবং স্টেট প্রিজনার হিসাবে পাঁচ বৎসর জেল খাটেন। মেদিনীপুর জেলে তাঁর সাথে ছিলেন বিপ্লবী গণেশ ঘোষ, নিরঞ্জন সেন। নিরঞ্জন সেন বহরমপুর কলেজ থেকে গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তারের সময় কলেজের ছাত্ররা তাদের প্রিয় নেতাকে ফুলের মালা দিয়ে বিদায় অভিনন্দন দেয়। জেলে এসেই ফুলের মালাটি সতীশ পাকড়াশীর গলায় পড়িয়ে দিয়ে বলেন 'এ মালা আপনারই প্রাপ্য'। মেদিনীপুর জেলে তাঁর সাথে ছিলেন বিপ্লবী সূর্য সেন। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি ঢাকা জেলা স্বাধীনতা সংঘের সম্পাদক হন। তিনি, নিরঞ্জন সেন প্রমুখ অনুশীলন সমিতিতে 'রিভোল্ট গ্রুপ' বলে পরিচিত ছিলেন। ১৯২৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর ২২/৩ মেছুয়া বাজার স্ট্রিটের বাড়িতে তিনি, নিরঞ্জন সেন প্রমুখ বোমা বানাবার সাজ-সরঞ্জাম ও ফরমুলা সহ ধরা পড়েন। সুধাংশু দাসগুপ্তও ঐ বাড়িতে এসে ধরা পড়েন। মোট ৩২ জনের নামে মেছুয়াবাজার ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। সতীশ পাকড়াশীর ৭ বছরের সাজা হয়। আলিপুর জেল থেকে প্রথমে রাজশাহী জেল, পরে হাজারিবাগ জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকেই আন্দামান দ্বীপান্তর। হাতে হাতকড়া, পায়ে পাঁচ সের ওজনের বেড়ি পরে তিনি, নিরঞ্জন সেন, ডাক্তার নারায়ণ রায় ও উনিশ বছরের ছেলে হরেকৃষ্ণ কোঙার 'মহারাজা' স্টিমারে আন্দামান সেলুলার জেলে পৌঁছন। আন্দামানে তিনি কমিউনিস্ট কনসলিডেশনের সভ্য হন। সতীশ পাকড়াশী জীবনের ৩২টি বৎসর জেলে কাটিয়েছেন, আত্মগপনে কাটিয়েছেন এগারো বছর। ১৯৩৮ সালে মুক্তি পান। কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং ১৯৬৪ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র রাজ্য কমিটির সদস্য হন। পিপলস রিলিফ কমিটির দায়িত্বে, ইউসিআরসির সহ সভাপতি ছিলেন। ১৯৭৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর এসএসকেএম হাসপাতালে ৮১ বৎসর বয়সে মৃত্যু হয়। তাঁর লেখা বই ‘অগ্নিযুগের কথা’ আজও ছাত্র-যুব বয়সীদের জন্য ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস চর্চায় অবশ্যপাঠ্যের অন্যতম। প্রকাশের তারিখ: ১৫-আগস্ট-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|