বাংলা বাঁচাতে ,রুটি রুজির জন্য লড়াই চলবে

Ayanangshu Sarkar               
লক্ষ লক্ষ শূন্য পদ অথচ স্থায়ী কোনো নিয়োগ নেই। যতটুকু নিয়োগ ততটুকুতেই ব্যাপক দুর্নীতি। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বেকার যৌবন প্রতিদিন প্রতারিত হচ্ছে আমাদের রাজ্যে ।

রাজ্যের ভালো থাকা মানে একটা মানচিত্রের ভালো থাকা নয় , রাজ্যের ভালো থাকা মানে রাজ্যের মানুষের ভালো থাকা। আচ্ছা আমদের বাংলার মানুষ সত্যিই কি ভালো আছেন ?

এই রাজ্যের কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে ফসল উৎপন্ন করেন , সেই ফসলের লাভজনক মূল্য কি কৃষক পান ?

 যে শ্রমিক দিন রাত মেহনত করে উৎপাদন ব্যবস্থাকে সচল রাখেন তিনি কি তার শ্রমের সম্মানজনক মূল্য পান?

 রাজ্যের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার পরিবেশ কি সত্যিই উপযোগী অবস্থায় আছে ? বেকারত্বের যন্ত্রণা ঘুচে সত্যিই কি কাজ জুটছে ?

কাজের স্থায়িত্ব - নিরাপত্তা কি থাকছে ?

রাজ্যে মহিলারা কি নিরাপদ ? - এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই বোঝা যাবে আসলে ভালো নেই আমাদের বাংলা।   

  আমাদের দেশের জনসংখ্যার সংখ্যা গরিষ্ঠ অংশ তরুণ , স্বাভাবিকভাবেই আমাদের রাজ্য তার বাইরে নয় । বিপুল শ্রমশক্তি, কিন্তু কাজ নেই - কাজের নিরাপত্তা নেই, স্থায়িত্ব নেই । ঘোর অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন । দেশ গড়ার কাজে যে তরুণ অংশের ভূমিকা নেওয়ার কথা , আসলে তারাই কর্মহীন । স্থায়ী কর্মসংস্থানের বিষয়ে সরকারের কোন পরিকল্পনা নেই । আসলে  পরিকল্পনা না থাকার পিছনে একটা গভীর ষড়যন্ত্রমূলক পরিকল্পনা শাসকের আছে।

 কর্পোরেটদের স্বার্থে মালিকের স্বার্থে কারখানা সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গেটে বেকার যুবকের লাইন লাগিয়ে রাখো যাতে অল্প পয়সায় শ্রমিক পাওয়া যায় । বেকারত্বের তীব্র জীবন যন্ত্রণাকে ব্যবহার কর - চেতনাহীন করো, বিপথগামী করো , ভোট লুটেরায় পরিণত কর । পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে বামপন্থী ফ্রন্ট সরকারের পরিকল্পনা ছিল ঠিক তার উল্টো । লক্ষ্য ছিল কর্মসংস্থান বিপুল তরুণ অংশের শ্রম শক্তিকে মর্যাদা দিয়ে তাদের কাজের ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজ্যের অগ্রগতি ঘটানো । তরুণ অংশের মধ্যে চেতনা গড়ে তোলা । রাজ্যের বর্তমান শাসক দল এই অংশকে চেতনাহীন করতে চায় । লক্ষ লক্ষ শূন্য পদ অথচ স্থায়ী কোনো নিয়োগ নেই। যতটুকু নিয়োগ ততটুকুতেই ব্যাপক দুর্নীতি । সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বেকার যৌবন প্রতিদিন প্রতারিত হচ্ছে আমাদের রাজ্যে ।

আমাদের রাজ্যে কাজের আকাল এতই তীব্র যে লক্ষ লক্ষ মানুষ কাজের খোঁজে ভিন রাজ্যে চলে যাচ্ছে। গ্রামের মহিলারাও ঘর ছেড়ে শ্রমিক হয়ে ভিন রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছে । রাজ্যের বহু গ্রামে শূন্য হয়ে যাচ্ছে যৌবন । ভিড়ে ঠাসা জেনারেল কামরায় শুধুমাত্র একটা কাজের চাহিদায় ঝুলতে ঝুলতে আমাদের বাংলার যৌবন প্রতিদিন পাড়ি দিচ্ছে ভিন রাজ্যে । অপরদিকে একাংশ কাজের আশায় মোটর ভ্যানে চেপে ভোর বেলায় স্টেশনে যাচ্ছে , স্টেশন থেকে ট্রেনে চেপে শহর মফস্বলের বিভিন্ন মোড়ে এসে দাঁড়িয়ে থাকছে একটা ছোট্ট কাজের আশায় । কোনদিন কাজ পাওয়া যায় কোনদিন কাজ পাওয়া যায় না। যেদিন কোন কাজ জোটে না সেদিন শুকনো মুখে তীব্র বেকারত্বের যন্ত্রণা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসতে হয়।  আবার যে সকল ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ থাকছে তাকে প্রতিদিন সংকুচিত করা হচ্ছে । উৎপাদন মুখী, কর্মসংস্থান মুখী শিল্প থেকে সরে এসে ফাটকা বাজীর দিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। । দেদার লোন নিয়ে টাকা বিভিন্নভাবে লগ্নি হচ্ছে । ২০১৪ সাল থেকে বাংলার যুবসমাজ জোড়া আক্রমণের সামনে। একদিকে তৃণমূলের সৌজন্যে হলদিয়া, রঘুনাথপুর, কাটোয়া, চকচকা সিঙ্গুর, শালবনী সহ সারা রাজ্যের কর্মসংস্থানের ধ্বংসের ছবি আজ সকলের সামনে এসেছে, অন্যদিকে বিজেপি গোটা দেশের শিল্পসম্ভাবনা কে পরিকল্পনা মাফিক শেষ করছে । বি এস এন এলের প্রযুক্তি ও পরিকাঠামো ব্যবহার করে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা মোবাইলে ৫জি পরিষেবা দিতে পারছে অথচ শুধু বি এস এন এলের অধিকার নেই ৫জি পরিষেবা দেওয়ার। আক্রমণ শুধু বিএসএনএল’এ সীমাবদ্ধ নয়। চিত্তরঞ্জন লোকোমোটিভ ওয়ার্কস, অ্যালয় স্টিল প্ল্যান্ট, ব্রিজ অ্যান্ড রুফ, বেঙ্গল কেমিক্যালের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বন্ধ করার ফতোয়া দিয়েছে নতুন বিজেপি সরকার। সরকারি তথ্য বলছে, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই ১০ বছরে সরকারি বিভিন্ন চাকরির আবেদনপত্র জমা পড়েছে ২৫ কোটি, কিন্তু নিযুক্ত হয়েছেন মাত্র ৮.১ লক্ষ। ২০২২-২৩ সালে ২ কোটি ৯৬ লক্ষ আবেদনকারীর মধ্যে নিযুক্ত হয়েছেন মাত্র ৪৮ হাজার ৩৫০ জন। স্বাধীনতার পরবর্তী পর্যায়ে এদেশের তরুণ সমাজের জন্য এত ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি কখনো ছিল না।

 পুঁজি চায় আরো আরো মুনাফা , অতএব দেশ রাজ্যের মানুষ বেকার থাকলো কি না খেয়ে থাকলো তাতে তার কিচ্ছু যায় আসেনা । গত ১৫ - ১৬ বছরে আমাদের রাজ্যে যোগ্যতা ভিত্তিক কোন শিল্প স্থাপিত হয়নি। অথচ এই রাজ্যে বামপন্থী সরকারের পরিকল্পনায় বক্রেশ্বর, হলদিয়া পেট্রো কেমিক্যালস এর মত স্কিল ভিত্তিক নিয়োগ হয়েছে।  গৃহ সহায়িকা থেকে খেতমজুর, ভূমিহীন চাষী, রিক্সা - টোটো - ভ্যানচালক এর সাথে যুক্ত হয়েছে গিগ ওয়ার্কার যাদের ভবিষ্যৎ কর্ম ধারা সম্পূর্ণভাবে অনিশ্চিত । ঠিকা কর্মী নিয়োগ করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পদ অবলুপ্তি ঘটানো হচ্ছে । একদিকে কৃষকের ফসলের দাম নেই , সারের দাম বাড়ছে । অন্যদিকে শ্রমিকদের কাজের কোন নিরাপত্তা নেই ,  সঠিক ন্যায্যমজুরি নেই । ৮ হাজারের উপর স্কুল বন্ধ করে শিক্ষার পরিবেশকে নষ্ট করা হচ্ছে । প্রতিদিন আমাদের সামনে মহিলাদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসছে । আসলে আমাদের বাংলার মানুষ ভালো নেই । বাংলার গ্রাম শহরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে - বাংলার মানুষের স্বার্থে বাংলাকে বাঁচানোর স্বার্থে । কাজের দাবিতে , বাংলা কে বাঁচানোর লক্ষ্য নিয়ে প্রত্যক্ষ পরোক্ষ সংগ্রামের এক বৃহত্তর লড়াইয়ের ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে । 

 উনবিংশ শতকে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মশাল জ্বলেছে এই বাংলার মাটিতে , স্বাধীনতা আন্দোলনে আপোষহীন সংগ্রামের ঐতিহ্য আছে এই মাটিতেই । খাদ্য আন্দোলন, বেকারি বিরোধী আন্দোলন, জমির আন্দোলন হয়েছে এই বাঙলাতেই । সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনের অতীত ঐতিহ্য আছে বাংলার মানুষের। বর্তমানে বাংলার এই অতীত ঐতিহ্যের উপর আক্রমণ নামিয়ে এনেছে রাজ্যের - দেশের কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থবাহী শাসকগোষ্ঠী । এই ঘৃণ্য রাজনীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেই হবে । সর্বোপরি যে রাজনীতি কর্পোরেটদের স্বার্থ না দেখে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের স্বার্থের কথা বলে , সেই রাজনীতিই পারে দেশের মানুষদের হাতে কাজ তুলে দিতে তাকেই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে ।  আর এই সংগ্রামের লক্ষ্যেই বাংলা বাঁচানোর যাত্রা শুরু হয়েছে ২৯ নভেম্বর কোচবিহার জেলা থেকে । গ্রাম থেকে গ্রামান্তর হয়ে শহরতলীর রাস্তায় জনগণের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলা বাঁচানোর যাত্রা । মানুষ আসছেন পথ হাঁটছেন । নতুন লড়াইয়ের বার্তা দিচ্ছেন।  জীবন যন্ত্রণার কথা তুলে ধরছেন বিভিন্ন অংশের মানুষ। এসব মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন অংশের মানুষের ঐক্য গড়ে বৃহত্তর লড়াই এর ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হবে বাংলার স্বার্থে , বাংলা কে - বাংলার মানুষ কে বাঁচানোর স্বার্থে ।


প্রকাশের তারিখ: ১১-ডিসেম্বর-২০২৫

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org