নতুন কণ্ঠস্বর

E M S Namboodiripad
এই আহ্বান এসেছিল যুক্তভাবে দুই কমিউনিস্ট-এম এন রায় আর অবনী মুখার্জির নামে। ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের আমেদাবাদ অধিবেশনের প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে লেখা এই আহ্বান-লিপিটি সেখানে তাঁদের মধ্যে বিলি করা হয়েছিল। দুই পরিচিত কমিউনিস্টের নামে প্রকাশিত এই দলিলটায় কংগ্রেসের কাছে এই প্রস্তাব রাখা হলো-শ্রমিকদের, কৃষকদের, আর সব মানুষের যে সংগঠিত আন্দোলন গড়ে উঠছে, তারই ওপরে নির্ভর করে কংগ্রেস এগিয়ে চলুক।

আইন অমান্য আন্দোলন গুটিয়ে নেবার পরই দেশের রাজনৈতিক আকাশ ঘন অন্ধকারে আচ্ছন্ন। অসহযোগ-খিলাফত আন্দোলনের সময় সাম্রাজ্যবাদের বিরুখে যে জাতীয় একাত্মতা গড়ে উঠেছিল, তা ভেঙে হয়েছে খান খান। অসহযোগ আর বয়কট আন্দোলনের বহুবিচিত্র কর্মধারার ভেতর দিয়ে চলে এসে ভারতের মানুষ দেশব্যাপী যে আইন অমান্য আন্দোলনের মধ্যে এখন প্রবেশ করেছে, তাতে সাম্রাজ্যবাদী শাসনটাকে উপড়ে ফেলে দিয়ে স্বাধীনতাকে জয় করে আনতে তাদের লাগবে আর মাত্র একটা বছর-এটা মুর্খের আশা।

আর এই আশা যে অপাত্রেই স্থাপন করা হয়েছিল, অনুপযুক্তদেরই সামনে তুলে ধরা হয়েছিল, তা প্রমাণিত হলো। যে-সব নেতা অসহযোগ-খিলাফত আন্দো-লনের একেবারে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব করেছিলেন, তাঁদের একদল এখন আইনসভায় প্রবেশের পক্ষে ওকালতি করছেন, আর একদল সরকারের পৌঁ ধরেছেন। এই রকম-সকম দেখে তো দারুণ হতাশাগ্রস্ত তরুণ দল। তাঁরা আবার ফিরে চললেন তাঁদের সেই পুরনো "বোমার রাজনীতিতেই"। যে-মাতব্বররা খিলাফত আন্দোলনটার পতাকার তলায় একদিন একসলো সবাইকে এনে জড়ো করেছিলেন, তাঁদেরই কিছু অংশ এখন মুসলিমসাম্প্রদায়িক সংস্থা গড়ার দিকে ঢলে পড়লেন, আর একদল অমন করেই ঢলে পড়লেন, হিন্দু-সাম্প্রদায়িক সংস্থা গড়ার কাজে। নিজের নিজের দলের সাম্প্রদায়িক বিশেষ স্বার্থ'রক্ষার কাজটাই এখন তাঁদের কাছে বড়ো হয়ে উঠল। ইতিমধ্যে শিখরা, খৃস্টানরা, ব্রাহ্মণেতর জাতিরা, অনুন্নতশ্রেণীর মানুষরা তাঁরাও ওঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে নিজেদের নিজেদের সংস্থা গড়ে তুলে নিজেদের সম্প্রদায়গত বিশেষ স্বার্থগুলো বাঁচিয়ে রাখার জন্যে লড়াই শুরু করে দিলেন।

সেদিনকার এই রকম জটপকানো বিভ্রান্তকারী রাজনৈতিক পরিমন্ডলে একটা নতুন কণ্ঠম্বর কানে আসছে, যা ওই সব সাম্প্রদায়িক ঝোঁকগুলো থেকে একেবারে আলাদা ধরনের, একেবারে উল্টোরকমের। সে হচ্ছে একটি আহ্বান। সংগঠিত শ্রমিকশ্রেণী, সংগঠিত কৃষকশ্রেণী, এবং অন্য আর সব গতর-খাটা মানুষ যারা সবাই মিলে সংগ্রামের ভেতরে সবেমাত্র ঢুকছে, তাদেরই ক্রমবর্ধমান শক্তির ওপরে, তাদেরই ঐক্যের সংহতির ওপরে ভিত তৈরি করে কংগ্রেসকে একটা বিপ্লবী গণ-আন্দোলনে রূপান্তরিত করার জন্যে কংগ্রেসকে আহ্বান।

এই আহ্বান এসেছিল যুক্তভাবে দুই কমিউনিস্ট-এম এন রায় আর অবনী মুখার্জির নামে। ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের আমেদাবাদ অধিবেশনের প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে লেখা এই আহ্বান-লিপিটি সেখানে তাঁদের মধ্যে বিলি করা হয়েছিল। দুই পরিচিত কমিউনিস্টের নামে প্রকাশিত এই দলিলটায় কংগ্রেসের কাছে এই প্রস্তাব রাখা হলো-শ্রমিকদের, কৃষকদের, আর সব মানুষের যে সংগঠিত আন্দোলন গড়ে উঠছে, তারই ওপরে নির্ভর করে কংগ্রেস এগিয়ে চলুক। এই দলিলই ভারতের কমিউনিষ্ট আন্দোলনের একটাই গুরুত্বপূর্ণ' পদক্ষেপরূপে চিহ্নিত হয়ে রইল। 

কমিউনিস্ট আন্দোলনের পক্ষ থেবেই আনুষ্ঠানিকভাবে যে এই আহ্বানটা রাখা হয়েছিল, তা কিন্তু নয়। দুটি লোকের নামে এই দলিলটা যে প্রকাশ করা হয়েছিল, তার প্রধান কারণ, কমিউনিস্ট আন্দোলনটা কীরকমের ব্যাপার, এর সংগঠনটাই বা কীধরনের এসব কংগ্রেসীদের কাছে একদম অজানা ব্যাপারই তখন। তবে এম এন রায়কে, অবনী মুখার্জিকে তাঁরা জানতেন চিনতেন।

রায় আর মুখাজি ভারতের বিপ্লবী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন আগে।

অনেকগুলো মামলায় রায়কে জড়িয়ে শান্তিও দেওয়া হয়েছিল। তিনি কিন্তু পরে বিদেশে চলে গিয়ে সেখানকার ভারতীয় বিপ্লবী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। মুখার্জি'ও বিদেশে চলে গিয়েছিলেন, সেখানকার ভারতীয় বিপ্লবী-দের সঙ্গে কাজ করতে। তাই যাঁরা অসহযোগ-খিলাফত আন্দোলনে বিশিষ্ট ভূমিকা নিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকের সঙ্গ্যে ও'দের দুজনের ব্যক্তিগতভাবে জানা শোনা ছিল।

ভারতবর্ষে অনেক কংগ্রেসনেতা আর সাধারণ কর্মী অসহযোগ-খিলাফত আন্দোলনের কার্যক্রমে যেমন, তেমনি ওই আন্দোলনের ব্যর্থতাতেও যে খুবই অসন্তুষ্ট, সে-কথাটা রায় আর মুখার্জি'র অজানা ছিল না। বুর্জোয়া আর পেটিবুর্জোয়াদের চিন্তাভাবনার ঘূর্ণাবর্তে পড়ে হাবুডুব, খাওয়া কংগ্রেসিদের উদ্ধার করে এনে তাঁদের মনে সংগঠিত গণ-বিপ্লবের চৈতন্য জাগাবার এটাই তো প্রকৃষ্ট সময় বলে তাঁরা ভাবলেন। এই চেষ্টাই করেছিলেন তাঁরা, আমেদাবাদে কংগ্রেসের উদ্দেশ্যে তাঁদের আহহ্বান জানিয়ে।

অবশ্য, এর আগেই ভারতবর্ষে' হাজির হয়ে গেছে-কমিউনিস্ট আন্দোলন শুরু করে দেবার, "ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি'-র নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালু করে দেবার মতো পরিপক্ক অবস্থা সব।

এই পটভূমির সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো।

(১) কার্ল মার্কসের ভাবনাচিন্তাগুলো ভারতবর্ষের একটি ক্ষুদ্র বৃদ্ধি-জীবী গোষ্ঠীর সীমিত বেষ্টনীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল-প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বাধবার আগেই। স্বদেশে যে-সব ভারতীয় বিপ্লবী ছিলেন, তাঁদের মধ্যে লালা হরদয়াল মার্কসের একটি জীবনচরিত লিখেছিলেন। ১৯১২ সালের মার্চ মাসের "মডার্ন' রিভিউ"-তে সেটি প্রকাশিত হয়েছিল। এর কয়েক মাস পরেই মালয়ালম ভাষায় মার্কাসের জীবনী লিখেছিলেন স্বদেশাভিমানী রামকৃষ্ণ পিল্লাই হরদয়ালের বই থেকে অধিকাংশ তথ্য নিয়ে। "মহামতি মার্ক'সে'র সঙ্গে এদেশের মানুষের পরিচয় ঘটাবার জন্যেই এই দুই লেখক প্রয়াসী হয়েছিলেন। (হরদয়াল যে মার্কসের তত্ত্বের সঙ্গে একমত নন, সে-কথাটা কিন্তু তিনি খোলাখুলিভাবেই ব্যক্ত করেছিলেন তাঁর রচনায়)। তবে হরদয়াল আর রামকৃষ্ণ পিল্লাই ভবিষ্যতে যে-সব ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, তার যেন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।

(২) ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর মার্কসের ধ্যানধারণা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল। অক্টোবর বিপ্লবের আগেই রুশ বিপ্লবীদের কাজকর্ম অন্যসব দেশের বিপ্লবীদের কাজকর্মে'র মতোই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল ভারতের বিপ্লবীদেরও। যেমন, ১৯০৫ সালের রুশ বিপ্লব তিলকের মতো চরমপন্থী রাজনীতিকদেরও উদ্দীপিত করে তুলেছিল। তবে এ-সবই ভারতের বিপ্লবীদের ভেতরে "বোমার রাজনীতি"-র জন্ম দিতেই। সাহায্য করেছিল। কিন্তু ১৯১৭ সালের বিশ্লবের সঙ্গে সঙ্গে তার শ্রেণীভিত্তিক সংগ্রামে, তার ভাবাদর্শে'র ছায়াপাত শুরু হয়েছিল ভারতবর্ষের বিপ্লবীদের ওপরে অত্যন্ত সীমিত আকারে।

(৩) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগে আর তা চলার সময় ভারতবর্ষের যে-সমন্ত বিপ্লবী কাজ করেছিলেন জার্মানিতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, তুরষ্কে, আফগা-নিস্তানে ও অন্যর, তাঁরাই রুশ বিপ্লবের দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হন। তাঁদেরই মধ্যে ছিলেন বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় (হরীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় আর সরোজিনী নাইডুর ভাই), বরকতুল্লা, এম পি বি টি আচার্য' প্রভৃতি, আর ছিলেন এম এন রায় ও অবনী মুখার্জি।

(৪) সমকালিক আর একটি গোষ্ঠীরও উদ্ভব ঘটেছিল। এ'রা ছিলেন মুসলিম। যুদ্ধের সময় সাম্রাজ্যবাদের বিরোধীই ছিল এ'দের ধ্যানধারণা, এ'রাই পরে খিলাফত আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁরা রুশ বিপ্লবের কথা জানতে পারেন-আফগানদের সংস্পর্শে এসে এবং অসহযোগ আন্দোলন ও খিলাফত আন্দোলনের সময় অন্যান্যদের সংস্পর্শে এসে। এই বিপ্লবসম্বন্ধে আরও ভালো-ভাবে সব কিছু জানতে তাঁরা খুব কৌতূহলী হয়ে, আর ভারতবর্ষে বৃটিশ-সরকারের লাগামছাড়া দমনপীড়নের অত্যাচারের হাত থেকে মুক্তি পাবার আশায় তাঁরা আফগানিস্তানের ভেতর দিয়ে ছুটলেন রাশিয়াতে। (মুসলিমদের মক্কায় তীর্থ' করতে যাবার ছলে তাঁদেরও এই রাশিয়াযাত্রা)। এ থেকেই এক বিরাট আন্দোলনের পরিণতি। রাশিয়াতে তাঁরা শিখলেন বিন্ধবের তত্ত্বটা কী, বিপ্লবকে কেমন করে চালাতে হবে। এ-সব শেখাটেখার পর ভারতবর্ষে' ফিরে আসার সময় ভারত-আফগান সীমান্তে বৃটিশদের হাতে তাঁরা ধরা পড়লেন। কুখ্যাত পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁদের আসামি বানানো হলো। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সৌকত উসমানি। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি'র প্রারম্ভিক পর্বে তার কাজের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে দিয়েছিলেন সৌকত উসমানি, আর তার জন্যে অশেষ নির্যাতন-নিপীড়ন তাঁকে সহ্য করতে হয়েছিল। আর ছিলেন ফিরোজুদ্দিন মনসুর। তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে কাজ করেছিলেন, দেশভাগের পরে পাকিস্তানে চলে যান, সেখানকায় কমিউনিস্ট পার্টিতে কাজ করার জন্যে।

(৫) এই দুটি গোষ্ঠী ছাড়া গদর পার্টির মতো আরো কিছু ভারতীয় বিপ্লবী সংগঠন কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলেন। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক এই সব ভারতীয় বিস্সবীদের মার্কসবাদ-লেনিনবাদ। সম্বন্ধে শিখিয়ে-পড়িয়ে তাঁদের একটি বিপ্লবী দলে সুসংগঠিত করে তুলতে প্রয়াসী হন। এই প্রয়াসেই ভারতীয় বিপ্লবীরা কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সম্মেলনে, তার কমিটিগুলোর বিচার-বিশ্লেষণ-আলোচনার কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে শুরু করলেন। এ'দের মধ্যেই একজন (এম এন রায়) আন্তর্জাতিকের নেতৃমণ্ডলীতে ভারতবর্ষের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

(৬) এই কর্মপ্রবাহেই সোভিয়েত উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দে ১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি' নামে একটি প্রতিষ্ঠানের জন্মলাভ। এর সদস্যরা ছিলেন এম এন রায়, এভেলিন রায় (এম এন রায়ের স্ত্রী), অবনী মুখার্জিজ', রোজা ফিটিংগোভা, মহম্মদ আলি, মহম্মদ সফিক সিদ্দিকি এবং এম পি বি টি আচার্য'। সিদ্দিকি সেক্রেটারিপদে নির্বাচিত হলেন। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের তুর্কিস্তান ব্যুরো ২০ ডিসেম্বর-এই দলকে দিলেন স্বীকৃতি।

(৭) ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ভারতবর্ষেরই মাটিতে ভূমিষ্ঠ হলো না বটে, কিন্তু তার জন্মলাভ ভারতবর্ষে'র কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে এক মস্ত ঘটনা বৈকি। (এরই কাজে রায় আর মুখার্জি' কংগ্রেসের আমেদাবাদ অধিবেশনের প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে একটি আহ্বানলিপি প্রকাশ করেছিলেন)।

(৮) ইতিমধ্যে ভারতের তরুণ রাজনৈতিক কর্মীদের ওপরে মার্কসবাদের প্রভাবের ছায়া বিস্তৃত হতে শুরু করেছে। এদের মধ্যে বাংলার মুজফফর আহমদ, বোম্বাই-এর এস এ ডাঙ্গে, মাদ্রাজের সিংগারাভেলু, চেট্রিয়ারের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। তাঁরা বাংলায়, মারাঠিতে, হিন্দিতে, উর্দুতে এবং অন্য আর সব ভাষায় সাময়িক পত্রপত্রিকা, পুস্তিকা ইত্যাদি প্রকাশে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন।

সারা দেশে তখন এমন অনেক রাজনৈতিক কর্মী'র দেখা মিলছে যাঁরা গান্ধীর অসহযোগ-খিলাফত আন্দোলনের পেছনকার ধর্মীয় আর সেকেলে ধ্যানধারণার একদম বিরোধী, আর, যখনই গান্ধীর নেতৃত্বে পরিচালিত কোনো জোরদার গণ-আন্দোলন তাঁর নির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতির ছকের বাইরে চলে যাচ্ছে, তখনই সেটাকে তাঁর ফস করে প্রত্যাহার করে নেওয়াটা আদৌ বরদাস্ত করতে পারছেন না। পুরনো নরমপন্থী দলের পন্থা-পদ্ধতি কাজকম' থেকে শুরু করে একদম হাল আমল পর্যন্ত সব রকমের পন্থা-পদ্ধতি, কায়দাকানুনের স্বাদ তাঁরা পেয়েছেন, সে-সব দেখেশুনে তাঁদের মোহমুক্তি ঘটেছে। এখন নতুন আলোর প্রত্যাশায় তাঁরা বসে আছেন। সেই প্রত্যাশা মিটাতেইতো আমেদাবাদ কংগ্রেসের উদ্দেশে রায় আর মুখার্জি'র আহ্বান।

"১৯২১ সালে আমেদাবাদে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ৩৬তম অধিবেশনে প্রতিনিধিদের উদ্দেশে ইশতেহার"-এই শিরনামায় লেখা আহ্বানটির আরম্ভ হয়েছিল এইরকম:

"আমাদের জাতীয় জীবনের ভবিষ্যৎ আর অগ্রগতির সঙ্গে বিচিত্র যে-সমস্যাভার জড়ানো, সেগুলোর মীমাংসার জন্যে আমাদের দেশের ইতি-হাসের এই সংকটসমাকুল মুহূর্তে আমরা মিলিত হয়েছি। ভারতের মানুষের সামনে উপস্থিত হয়েছে এক মহাবিপ্লবের প্রাকংলগ্ন কেবলমাত্র রাজনৈতিক ব্যাপারেই নয়, বৈষয়িক ও সামাজিক সর্বব্যাপারেই এই মহাবিব সমাসন্ন। এই বিশাল উপদ্বীপে যে-মানবসমুদ্র থৈ থৈ করছে, সে আজ ধেয়ে চলেছে এক সুনিশ্চিত লক্ষ্যের পানে। কত না শতাব্দী ধরে তারা অর্থনৈতিক রাজনৈতিক অত্যাচারে পীড়িত মূর্ছিত হয়ে বন্ধ জলা-ভূমিতে আটকে পড়েছিল, এখন তা থেকে তাদের মুস্তি ঘটছে, তাদের ঘুম টুটছে। তাদের সামনে ছুটে চলার পুরোভাগে এসে দাঁড়িয়েছে জাতীয় কংগ্রেস। অতি কঠিন আপনাদের কাজ। আপনাদের চলার পথে অনেক দূরতায় বাধ্য, অনেক দুঃখযন্ত্রণার চোরাগতের ফাঁদ। জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যকে সামনে রেখে, সেই লক্ষ্যপথে ভারতের মানুষকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলা-সে তো এক মহনীয় ব্রত। আপনারা সেই মহনায় রতপালনকে নিজেদেরই রতরূপে গ্রহণ করেছেন। অলস তর্কবিতর্কে' মেতে থাকার জন্যে, নিষ্ফল প্রস্তাব গ্রহণ করার জন্যে ছুটিছাটার দিনের মিলনমেলা আর নয় কংগ্রেস। কংগ্রেস আজ এক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে জাতীয় মুক্তি-আন্দোলনের অগ্রনায়ক হয়ে উঠেছে।"

একটা বড়ো দায়িত্বভার কংগ্রেসের নিজের কাঁধে তুলে নেবার কথা। কিন্তু নরমপন্থী নেতাদের পাল্লায় পড়ে সেই কংগ্রেসের নেওয়া রাজনৈতিক পদ্মা-পদ্ধতির কী যে দেউলিয়া অবস্থা, সেটা ওই ইশতেহারে খুলে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছিল। "এক বছরেরই মধ্যে স্বরাজ"-এই আওয়াজ তুলে গান্ধীর নেতৃত্ব মানুষের মনে যে ঢেউ তুলেছিল, তাকেও বেশ খতিয়ে দেখা হয়েছিল ওই ইশতেহারে। এই স্লোগানকে "মহাঘোষণা"-আখ্যা দিয়ে ইশতেহার বলে চলেছে:

"জাতির নায়ক হিসাবে কংগ্রেসের কাজটা শুধুমাত্র অভীষ্ট লক্ষ্যটাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়াই নয়, ওই লক্ষ্যের পানে মানুষকে ধাপে ধাপে পা ফেলে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াও তার কাজ বৈকি। মানুষকে উদ্দীপিত করে তুলতেই হবে স্বরাজের জন্যে লড়াই-এ। এই লড়াই-এ তাদের ঐক্যবদ্ধ করতেই হবে, কারণ ঐক্য ছাড়া কিছুতেই অভীষ্টপুরণ হবে না।

জাতির কাজে সমস্ত মনপ্রাণ ঢেলে কাজ করার জন্যে জনসাধারণকে কেমন করে টেনে আনা যায়, কেমন করে অজ্ঞ মুঢ় মুক জনস্রোতকে স্বরাজের পতাকার তলায় জড়ো করা যায় সেটাই তো ৩৬তম কংগ্রেসের সামনে আজকের সবচেয়ে বড় সমস্যা। এই সমস্যার সমাধান করতে হলে প্রথম জিনিস যেটা দরকার, সেটা হচ্ছে-জানতে হবে, কাঁসে তারা দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত? তারা কী চায়? বে'চে থাকার জন্যে তাদের চারপাশের অবস্থার উন্নতির জন্যে কী করা দরকার? কারণ, তাদের আশ্ দুঃখ-হৃদ'শামোচনের কাজটাকে কংগ্রেসের কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করতে পারলেই কংগ্রেস বিশাল জনসমষ্টির প্রকৃত নেতা হয়ে উঠতে পারবে।"

গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলনের যে-কার্যক্রম তৈরি হয়েছিল, আর, তারই অংশস্বরূপ যে-খিলাফতের দাবিকে তুলে ধরা হয়েছিল, সে-সবকে তীক্ষ। সমালোচনায় তুলোধোনা করে ইশতেহারের উপসংহারে বলা হয়েছে:

"কথার ফুলঝুরি জ্বালিয়েই মানুষকে লড়াই-এর ময়দানে নামানো যায় না। অপ্রতিরোধ্য বাস্তব যে-সব ব্যাপার দেখা দেবে, তাদেরই উপরে ভিত্তি করে মানুষকে লড়াই-এ অনুপ্রাণিত করতে হবে। নিপীড়িত, নিঃস্ব, চরম শোচনীয় অবস্থায় পড়ে থাকা শ্রমিকরা কৃষকরা তো লড়াই-এ নামবেই নামবে, কারণ কোনো কিছুর মুখ চেয়ে যে থাকবে তারা, এমন আশা-ভরসা তাদের তো সব ফরসা। শ্রমিকদের কৃষকদের টেনে এনে নিজের পেছনে তাদের দাঁড় করাতেই হবে কংগ্রেসকে। আর, কংগ্রেস তাদের দৃঢ়মূল সূচিরস্থায়ী আস্থা একমাত্র তখনই অর্জন করতে পারবে, যখন কংগ্রেস তথাকথিত জাতীয় স্বার্থে'র লোকদেখানো একটা উচ্চতর আদর্শে'র নামে-আসলে কিন্তু ব্যবসাদার আর কলকারখানার মালিকদের ধনসম্পদ বৃদ্ধিরই জন্যে-শ্রমিকদের কৃষকদের জবাই করা থেকে নিরস্ত হবে। আজ যে-বিপ্লবে ভারতবর্ষের ভিত্তিমূল পর্যন্ত থর থর করে কেপে উঠছে, তাতে কংগ্রেসকে নেতৃত্ব করতে হলে, শুধুমাত্র বিক্ষোভসভা আর ঠুনকো উদ্দাম মাতামাতির ওপরে ভরসা করে থাকলে চলবে না। ট্রেড ইউনিয়নগুলোর আশু দাবিগুলো কানপুরের শ্রমিকরা সেগুলোকে সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরেছে-সেই দাবিগুলোকে কংগ্রেস নিজের দাবি বলে তুলে ধরুক, কিষাণ সভাগুলোর কার্যসূচিকে কংগ্রেস নিজের কার্যসূচি বলে গ্রহণ করুক। আর শীগগিরই এমন সময় আসবে, যখন কংগ্রেসকে আর কোনও বাধার সামনেই থমকে দাঁড়াতে হবে না, আর, তখন কংগ্রেসকে হতাশায় বুক চাপড়াতেও হবে না, এই বলে যে, দেশের মানুষগুলো যথেষ্ট ত্যাগ স্বীকার করতে পারল না বলেই তো নির্দিষ্ট দিনে স্বরাজটা হাতে পাওয়া গেল না। তখন কংগ্রেসকে মদত জোগাবে নিজেদের জীবনের সমস্ত বাস্তব সমস্যা নিয়ে সচেতনভাবে লড়াইকরা দেশের সমগ্র জনসমাজের অপ্রতিরোধ্য শক্তি। এইরকম না করতে পারলে, কংগ্রেস অসহযোগ নিয়ে যত মাতামাতিই করুক না কেন, সেভেরস চুক্তির সংশোধনের জন্যে যত গোঁ ধরেই থাকুক না কেন, "আত্মিক শক্তি-তত্ত্বকে" যত অআঁকড়েই ধরুক না, কেন, কংগ্রেসকে হার মেনে নিয়ে নিজের জায়গায় আর একটা সংগঠনকে আসতে দিতেই হবে, যে-সংগঠন সাধারণ মানুষের স্বার্থনিয়ে লড়াই করার জন্যে সাধারণ মানুষদেরই ভেতর থেকে জন্মলাভ করবে। কংগ্রেস যদি চায়, সমগ্র জাতিটা তাদের পেছনে এসে দাঁড়াক, তা হলে একটা ছোট্টো শ্রেণীর স্বার্থ' যেন তাদের অন্ধ করে না রাখে। যে-সব "ব্যবসাদার, কলকারখানার মালিক" কংগ্রেসের ভেতরে "প্রতিভাধর আইনজীবীদের" জায়গাটা দখল করে বসেছে, "শয়তানিতে ভরা" বৃটিশের জায়গায় যাদের প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে নানারকম কলাকৌশল নেওয়া হচ্ছে, সেই "ব্যবসাদার, কলকারখানার মালিকদের" অদৃশ্য হাতের দ্বারা কংগ্রেস যেন পরিচালিত না হয়।

এইভাবে কংগ্রেসের ইতিহাসে এই সর্ব প্রথম একটা নতুন, কণ্ঠস্বর শোনা গেল আমেদাবাদে।

এই কণ্ঠম্বর শোনা গিয়েছিল, এমন একটা রাজনৈতিক আবহাওয়ায় যার কথা আগেকার উপ-অধ্যায়ে বলা হয়েছে যেখানে একটা সংগঠিত শ্রমিক-শ্রেণীর এবং সংগ্রামী কৃষকদের আন্দোলন-তেমন ভালোভাবে সংগঠিত হতে না পারলেও, ক্রমশ মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছিল।


প্রকাশের তারিখ: ১২-আগস্ট-২০২৬

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org