রাজ্যের শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে থাকবে বামপন্থীরা

Sk Saidul Haque
সুফীবাদ (যেমন লালন ফকির,হাসন রাজা, শাহ আব্দুল করিম প্রমুখ) এবং বৈষ্ণববাদ (মূলত শ্রীচৈতন্য প্রবর্তিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব মত) এবং বাউল দর্শন প্রচার করেছে জাতি,ধর্ম, গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষ সমান। এই ভাবধারাগুলি  বাংলায় মিলনের সংস্কৃতি এবং সম্প্রীতির সমাজ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।
দেশের ও রাজ্যের মানুষ নানা সমস্যায় জর্জরিত। কৃষক ফসলের দাম পায় না, মহাজনি দেনায় অনেকে বাঁধা পড়েছেন। শ্রমিকরা কাজ হারাচ্ছেন এবং শ্রমকোড লাগু হওয়ায় তাঁদের অস্তিত্ব সংকটে। বেকার যুবক যুবতীরা কাজ না পেয়ে যন্ত্রণাক্লীষ্ট,হতাশায় নিমজ্জিত। নারীদের সম্মান ভুলুন্ঠিত।নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া। সরকারি মদতে চলছে দূর্নীতি ও সম্পদ লুঠ।
             সমস্যা জর্জরিত এই পটভূমিতে মানুষের দৃষ্টিকে ঘুরিয়ে দিতে কেন্দ্রের এবং রাজ্যের শাসক দল ধর্ম কে রাজনীতির অঙ্গনে ব্যবহার করে বিভেদ বিভাজন এবং ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি করে দেশে ও রাজ্যে শান্তি ও সম্প্রীতির যে সুমহান ঐতিহ্য আছে তাকে ভেঙে ফেলতে চাইছে।

কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা:
২০১৪ সালে মোদি সরকার প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর পরই সংঘ পরিবারের এজেন্ডা অনুযায়ী শুরু হয়েছে ধর্মীয় সংখ্যালঘু বিশেষ করে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের উপর পরিকল্পিত আক্রমণ।   নাগরিকত্ব আইনের সংশোধন, ওয়াকফ আইনের সংশোধন করে সংখ্যালঘুদের নিশানা বানিয়েছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যে বুলডোজার দিয়ে সংখ্যালঘু বস্তি ও বাসস্থানে আক্রমণ চালানো হয়েছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাংলাভাষী সংখ্যালঘু পরিবারের শ্রমিকরা আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। এসআইআর এর নামে সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার কেড়ে নিতে চাইছে। সঙ্ঘ পরিবার এবং তাদের শাখা প্রশাখারা ধর্মের নামে, ভাষার নামে ঘৃনা ভাষন দিচ্ছে এবং উর্দু ভাষাকে টার্গেট করে বিষোদগার করছে ।এর ফলে দেশের শান্তি ও সম্প্রীতি বিঘ্নিত হচ্ছে  এবং দেশের সুমহান মিলনের   ঐতিহ্য ভেঙে পড়ছে।যুগ যুগ ধরে ভারত বর্ষের মানুষ উদার ও পরমত সহিষ্ণু।
কবি গুরুর ভাষায়: "দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে/ এই ভারতের মহামানবের সাগর তীরে।" 
 ভারতের এই বহুত্ববাদী সংস্কৃতিতে সম্প্রীতির শিকড়কে গভীর ভাবে গ্রোথিত করার শপথ নিতে চায় বামপন্থীরা।

আমাদের রাজ্য:
আমাদের রাজ্যেও শান্তি ও সম্প্রীতি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আমাদের রাজ্যের শাসক দল রাজনীতির অঙ্গনে ধর্ম কে ব্যবহার করে যে বিভেদ বিভাজনের রাজনীতি করছে তাতে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তিগুলি উৎসাহিত হচ্ছে। এই রাজ্যে বিগত পনেরো বছর ধরে কৃষক অবর্ণনীয় দূর্দশার মধ্যে আছে।কৃষক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।নতুন কল কারখানা না হওয়ায় কাজের সুযোগ নেই। বাড়ছে বেকার বাহিনী। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে।নারী নির্যাতন বেড়েছে । এই সব সমস্যার সমাধান না করে রাজ্য সরকার খেলা মেলায় ভুলিয়ে রাখতে চাইছে।এই সরকার প্রতিযোগিতা মূলক সাম্প্রদায়িকতার পথ নেওয়ায় মৌলবাদীদের যেমন সক্রিয়তা বাড়ছে তেমনি রাজ্যে সঙ্ঘ পরিবারের শাখা বাড়ছে।এই সব শক্তি মেরুকরণের আবর্তে রাজ্যের জনগনকে টেনে নেবার চেষ্টা করছে। ফলশ্রুতিতে সম্প্রতি চেতনা আঘাত প্রাপ্ত  হচ্ছে।বিগত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক ভাবে রাজ্যের বেশ কিছু জায়গায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে, হিংসার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।৩৪ বছরের বাম জমানায় এই সব ভাবাই যেত না।  বর্তমান সরকারের আমলে কয়েক বছর ধরেই কিছু জায়গায় রাম নবমীর দিন হিংসার পরিবেশ তৈরি হয়েছে এবং কয়েক বছর আগে এই পরিস্থিতির জন্য আসানসোলের ইমামের মাধ্যমিক পরিক্ষার্থী পুত্রকে প্রান দিতে হয়েছে। কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসক দলের ভোট ব্যাঙ্কের রাজনীতি রাজ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে সুমহান ঐতিহ্য আছে তাকে ভেঙে ফেলতে চাইছে।

মনে রাখতে হবে রাজ্যের শাসক দলের সুপ্রীমো সংখ্যালঘু ভোটের জন্য যেমন হিজাব পরে রেড রোডে ঈদের ময়দানে খোদা হাফেজ বলছেন, সংখ্যালঘুদের দুধেল গাই বলেছেন বা তাঁদেরকে হিংস্র জনসমষ্টি বলে চিহ্নিত করছেন,তেমনি সংখ্যাগুরু জনগণের একটা অংশকে সন্তুষ্ট করতে দীঘায় সরকারি অর্থে জগন্নাথ মন্দির বানাচ্ছেন এবং শিলিগুড়িতে মহাকাল মন্দির ও নিউটাউনে দূর্গাঙ্গন বানানোর কথা ঘোষণা করেছেন। দূর্গা পূজা কমিটিকে সরকারি অর্থ দিচ্ছেন ও দূর্গা কার্নীভালের ব্যবস্থা করছেন।এই সব রাজ্যের ধর্মনিরপেক্ষতার সুমহান ঐতিহ্যকে ভেঙে ফেলছে এবং রাজ্যের জনগনের সম্প্রীতি চেতনাকে আঘাত প্রাপ্ত করছে। আমাদের রাজ্যে এই ঐতিহ্য ছিল না।বাম সরকারের দৃঢ় ভূমিকায় এবং বাম গণতান্ত্রিক জনগণের অতন্দ্র প্রহরায় রাজ্যের সম্প্রীতি ও শান্তি অটুট ছিল। সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথা চাড়া দিতে পারেনি।

মিলনের সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির বাংলা:
রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও লালন ফকির এর এই বাংলায় ধর্মীয় মৌলবাদীরা এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবাজরা রাজ্যে মিলনের সংস্কৃতি এবং সম্প্রীতির যে সুমহান ঐতিহ্য আছে তাকে ভেঙে ফেলতে চাইছে। অথচ এই বাংলায় আজও গ্রামে গ্রামে সত্যনারায়ণ এবং সত্যপীরের গান হয়। এই বাংলায় আজও কবিয়ালি, ভাটিয়ালী, আলকাপ,লেটো গান ধর্মমত নির্বিশেষে মানুষকে এক টানে বেঁধে রাখে।শারদীয়ার উৎসবে মেতে উঠে সব অংশের মানুষ। ঈদের নামাজ শেষে আলিঙ্গনাবদ্ধ হয় রাম - রহিম। এই বাংলায় সুন্দরবনর  মাঝি, মাল্লার, মালুয়া ও কাঠুরেরা বাঘের দেবতা দক্ষিণ রায় ও বনবিবির পূজো করেন।ঝড় ঝঞ্চার সময়  দরিয়া পীর বদর বদর বলেন। এই বাংলায় ঘুটিয়ারী শরীফের গাজী বাবার মাজারে ঊরসের সময় প্রথম চাদর চড়াই বারুইপুরের চৌধুরী পরিবারের কোন প্রবীণ মানুষ। বসিরহাট মহকুমার হাড়োয়ার গোরাচাঁদ পীরের ঊরস উৎসবের প্রথম দিন পীরের মাজার দুধ দিয়ে ধুয়ে দেয় সেখানকার ঘোষ পরিবারের মেয়েরা। মালদার চাঁচলে দূর্গা প্রতিমা বিসর্জনের সময় মুসলিম মহিলারা আলো জ্বালিয়ে সামনে এগিয়ে চলে।হাড়োয়ার চৌধুরী পরিবারের পূজার বিসর্জনের আগে গ্রামের মুসলিম পরিবারের প্রবীনতম ব্যক্তি কাটারি দিয়ে প্রতিমার একটা অংশ কাটার পর বিসর্জন শুরু হয়। এটাই হলো বাংলার মিলনের সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির সমাজ। 

 অবিভক্ত বাংলায় মিলনের সংস্কৃতি এবং সম্প্রীতির সমাজ গড়ে তুলতে এখানকার সুফীবাদ, বৈষ্ণববাদী দর্শন এবং বিভিন্ন লোকজ প্রথা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।সুফীবাদ (যেমন লালন ফকির,হাসন রাজা, শাহ আব্দুল করিম প্রমুখ) এবং বৈষ্ণববাদ (মূলত শ্রীচৈতন্য প্রবর্তিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব মত) এবং বাউল দর্শন প্রচার করেছে জাতি,ধর্ম, গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষ সমান। এই ভাবধারাগুলি  বাংলায় মিলনের সংস্কৃতি এবং সম্প্রীতির সমাজ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।

         বর্তমান সময়ে বাংলার মিলনের এই সুমহান ঐতিহ্যকে , সম্প্রীতির সমাজকে ভেঙে ফেলতে চাইছে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তিগুলি। দুই শাসক দল তাতে ফুঁ দিচ্ছে।ধর্মীয় আগ্রাসন এই সম্প্রীতির মিলন ক্ষেত্রকে বধ্যভূমিতে পরিণত করতে চাইছে। রাম নবমীর মিছিলে অস্ত্র হাতে দাপাদাপি কিংবা মহরমের শোক মিছিলে লাঠি বল্লম ঢাল তরোয়াল এর আস্ফালন বাংলার ঐতিহ্য নয়। কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসক দলের ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি এই মিলনের পরিসরকে ভেঙে দিচ্ছে।বাম জমানায় রাজ্যের শান্তি ও সম্প্রীতির পরিবেশ অটুট ছিল।আগামী দিনেও রাজ্যের বামপন্থীরা ও গনতান্ত্রিক জনগন এই সম্প্রীতির সমাজকে রক্ষা করতে অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে কাজ করবে। বামফ্রন্ট চায় রাজ্যে ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি বন্ধ করে শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের ঐক্যকে গড়ে তুলতে এবং রুটি রুজির সংগ্রামকে আরো বলিষ্ঠ ও দৃঢ় করতে। তাঁরা চায় হিংসা ও ঘৃনা ছড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে।কম জ্যোতি বসু ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এর ভাষায় বলা যায় এদের হাত ভেঙে দেওয়া হবে।রাজ্যের আসন্ন বিধান সভা নির্বাচনে তাই বিভেদকামী শক্তি সমূহকে পরাজিত করে মেহনতি মানুষের সরকার গঠন করার অঙ্গীকার আমাদেরকে গ্রহণ করতে হবে। বামপন্থীরা সংবিধানকে রক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সংবিধান মাতৃভাষায় কথা বলার এবং নিজ ধর্ম পালন করার অধিকার দিয়েছে।  শান্তি,সম্প্রীতি রক্ষার কথা বলেছে। বামপন্থীরা সেই অধিকারকে রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ।
প্রকাশের তারিখ: ১১-এপ্রিল-২০২৬

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org