|
আজকের পশ্চিমবাংলায় শিল্প স্থাপন ও কর্মসংস্থানের পথে বাম বিকল্পAbhas Roy Chowdhury |
দৈনিক ন্যূনতম ৭০০ টাকা মজুরি নিশ্চিত করতে সরকার তার করণীয় কাজ করবে। সমস্ত অ্যাপ ভিত্তিক ও অসংগঠিত শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বন্ধ শিল্পের শ্রমিক কর্মচারীদের বন্ধ কালীন ভাতার ব্যবস্থা করা হবে। |
তিন দশকের বেশি সময় ধরে নয়া উদার অর্থনীতি সারা বিশ্বের মতোই আমাদের দেশ ও রাজ্যের ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর সহ রাষ্ট্রায়ত্ত্ব অর্থনীতি কার্যত ধ্বংস করেছে। এই সময় পর্বের প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রীয় সরকারই নয়া উদারবাদী নীতিগুলি কার্যকর করেছে। জাতীয় কিংবা আঞ্চলিক শাসক শ্রেণির প্রতিটি রাজনৈতিক দলই নয়া উদারবাদের সমর্থক। একমাত্র ব্যতিক্রম কমিউনিস্ট ও বামপন্থীরা। ১৯৯১ সাল থেকে সারা বিশ্বের মতো ভারতেও নয়া উদারবাদী নীতি চালু হয়েছে। ১৯৯১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার নয়া উদারবাদী ভারতের কাঠামোগত সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্যেই কাজ করেছে। কাঠামোগত সংস্কারের নামে সারাদেশে চলা জন বিরোধী নীতিগুলির মোকাবিলা করতে করতেই শ্রমজীবী মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা পালনে সচেষ্ট ছিল বামপন্থীরা। মায়ের বুকের ওমের উষ্ণতা পেতে থাকা শিশুটি কি বুঝতে পারে, কত ত্যাগ তিতিক্ষা মমত্ব নিয়ে মা সন্তান বড় করেন ! নয়া উদারবাদের আক্রমণের মধ্যে সরকার চালিয়ে বামপন্থীরা রাজ্যের জনগণকে সেভাবেই বুকে করে আগলে রেখেছিল। কোনো কঠিন চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা গুলির কোন আঁচ জনগণের উপরে পড়তে দেয়নি। ১৯৭৭ সালে সরকারে আসার পর বামপন্থীদের অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে ছিল রাজ্যের সামন্তবাদী ভূমি সম্পর্কে পরিবর্তন করা। ভূমি সংস্কারে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার সারা দেশে অনন্য নজির সৃষ্টি করে। ভূমি সংস্কারের এই সাফল্যই পশ্চিমবঙ্গে শিল্প স্থাপনের ভিত্তি তৈরি করেছিল। শুধুমাত্র কৃষি অর্থনীতির উন্নয়ন একটা সমাজের উন্নয়নকে দীর্ঘ সময় ধরে ধরে রাখতে পারে না। কৃষি উন্নয়নের সঙ্গে শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরী। স্বাধীনতার সময় পশ্চিমবাংলা ছিল শিল্পে এগিয়ে থাকা রাজ্য। স্বাধীন ভারতে কেন্দ্রীয় নীতি ও বঞ্চনার কারণে শিল্পে ক্রমশ পিছিয়ে পড়েছিল পশ্চিমবঙ্গ। কৃষি অর্থনীতির রূপান্তর ঘটনার সময় বামফ্রন্ট সরকার প্রথম থেকেই ভবিষ্যতের শিল্প স্থাপনের চেষ্টা চালিয়েছিল। ১৯৭৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় আলোচনার ভিত্তিতে হলদিয়ায় পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। তখনকার ভাষায় পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প ছিল সানরাইজ ইন্ডাস্ট্রি বা সূর্যোদয়ের শিল্প। কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির কারণে ওই সময় ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যাল, বক্রেশ্বর থার্মাল পাওয়ার, সল্টলেক ইলেকট্রনিক কমপ্লেক্স - রাজ্যে বামপন্থীদের শিল্প স্থাপনের জন্য সংগ্রামের প্রতীক। অনেক বাধা অতিক্রম করে এগুলি আজ বাস্তব। ১৯৯১ সাল থেকে সারা পৃথিবীর মতোই ভারতেও নয়া উদারবাদী অর্থনীতি কার্যকর হয়। নয়া উদারবাদী অর্থনীতিতে ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর ক্রমশ দুর্বল হয়েছে। ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর দুর্বল হাওয়া এবং সর্বব্যাপী লুটতন্ত্রের প্রত্যক্ষ ফলাফল বেকারি, মজুরি হাস, দারিদ্র, অনাহার, অপুষ্টির মতো বিপর্যয়কর উপাদানগুলি। শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান ক্রমশ নামতে নামতে তাদের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করেছে করে চলেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত পরিকল্পিত অর্থনীতিতে শ্রমিকশ্রেণি ও শ্রমজীবী মানুষের দরকষাকষির শক্তি বেড়েছিল। আসলে নয়া উদারবাদে ফিন্যান্স নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজি শ্রমিকশ্রেণির এই ক্ষমতাকে খর্ব করতে মরিয়া। কাঠামোগত সংস্কারের নামে ভারতে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ক্ষেত্র ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গে ভারী শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছিল রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ক্ষেত্র। রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ক্ষেত্রের ক্রমশ বিপর্যয় এবং ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরকে দ্রুত কমিয়ে দেওয়ার প্রত্যক্ষ ক্ষতিকর প্রভাব পশ্চিমবঙ্গের শিল্প ক্ষেত্র আছড়ে পড়ে। কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের ফলে সর্বত্র চুক্তিভিত্তিক, ক্যাজুয়াল কর্মীর সংখ্যা দ্রুত উর্দ্ধমুখী হতে থাকে। পশ্চিমবঙ্গেও এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেই তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান এবং শ্রমিকশ্রেণির অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে সাধ্যমতো শিল্প গড়ে তোলার প্রয়াস চলতে থাকে। মাশুল সমীকরণ ও লাইসেন্স প্রথা বাতিল হওয়ার ফলে যে সুযোগ তৈরী হয় তার সদ্ব্যবহার করে বামফ্রন্ট সরকার। ১৯৯৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় রাজ্যের নতুন শিল্পনীতি গৃহীত হয়। তার ভিত্তিতে এরাজ্যে শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনা গড়ে ওঠে। ইতিমধ্যে নয়া উদারনীতি কার্যকর হওয়ার ফলে সরকার ক্রমশ অর্থনীতি পরিচালনা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করতে শুরু করে। রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলি সংকটের মধ্যে পড়তে থাকে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের শিল্প সম্ভাবনাকে কার্যকর করতে বেসরকারি পুঁজির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাজ্যে শিল্পের পরিবেশ সৃষ্টিতে বামপন্থীদের ইতিবাচক ভূমিকার ফলে রাজ্যে বিনিয়োগ বাড়তে থাকে। ১৯৯৪ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরে বৃদ্ধির হার ছিল ৭.৩ শতাংশ, ২০০০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত ছিল ৭.১শতাংশ। ১৯৯১ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে রাজ্যে বড় এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ২৫৩১ টি শিল্প ইউনিট প্রতিষ্ঠিত হয়। অনেক পিছন থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্পে দ্রুত সারাদেশে প্রথম স্থান অধিকার করে। ন্যাশনাল স্যাম্পেল সার্ভে অর্গানাইজেশন তথ্য অনুযায়ী ২০০৪-০৫ থেকে ২০১১-১২ পর্যন্ত সময়কালে পশ্চিমবঙ্গে ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রে প্রায় ২৪ লক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। ওই সময় গুজরাটে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছিল ১৪.৯ লক্ষ। সেই সময় ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রে সারা ভারতের মোট কর্মসংস্থানের ৪০ শতাংশ ছিল পশ্চিমবঙ্গে। খেয়াল রাখা দরকার যে তৃণমূল কংগ্রেস কে সামনে রেখে রাজ্যের সব বাম বিরোধী শক্তির শিল্পায়ন বিরোধী ধ্বংসাত্মক আন্দোলন চলা সত্ত্বেও শিল্প ও কর্মসংস্থানের এই অগ্রগতি ঘটে। ২০০৭-০৮ সালে পশ্চিমবঙ্গে ১২ শতাংশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ সম্ভব হয়েছিল। ২০১০-১১ সালে ১ লক্ষের বেশি মানুষ কাজ পেয়েছিলেন।(সূত্র, দ্য হিন্দু আইডিএসকে রিপোর্ট) এখানে একটি আন্তর্জাতিক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। সমাজতান্ত্রিক চীন আজকের নয়া উদারবাদী বিশ্বব্যবস্থার মধ্যেই রয়েছে । নয়া উদারবাদের সংকট চীনের অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করছে। কিন্তু তার মধ্যেও চীন গ্রোথ অব্যাহত রাখতে পারছে। অর্থনীতির মাপকাঠিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অতিক্রম করে প্রথম স্থানের জন্য লড়াই করছে। চীনের এই সাফল্যের ভিত্তি ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরের বিপুল অগ্রগতি। চীনের বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন সমাজতন্ত্র নির্মাণ নিয়ে অসংখ্য বিতর্ক আছে এবং থাকবে। কিন্তু উন্নততর সমাজ গড়ে তুলতে সমগ্র জনগণের 'সমৃদ্ধি' নিশ্চিত করার পথে চীন এগিয়ে চলেছে। নয়া উদারবাদী অর্থনীতিতে সাধারণ ভাবে ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে। সেখানে ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরের বিপুল অগ্রগতি ঘটিয়ে বিশ্ব বাজার ধরার চেষ্টা আসলে নয়া উদারবাদী ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানো। ভারত রাষ্ট্র কাঠামোর ভিতরে একটি অঙ্গরাজ্যের সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে হলেও উন্নত কৃষির ভিতর উপর শিল্পায়নের সংগ্রাম বামপন্থীদের এই দৃষ্টিভঙ্গিরই পরিচায়ক। চলমান পনেরো বছরে সেই সম্ভাবনা ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে। ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করত। ২০১১ সালে সরকার পরিবর্তনের সময় পশ্চিমবঙ্গের কমবেশি ৭৫ শতাংশ মানুষ ছিলেন দারিদ্র সীমার উপরে। এই পরিসংখ্যান বামফ্রন্ট সরকারের সাফল্যের উদাহরণ এবং সরকার পরিচালনার শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক। এখন কেন্দ্রীয় ও পশ্চিমবঙ্গ উভয় সরকারই জনগণের তথ্য জানার গণতান্ত্রিক অধিকারের বিশ্বাস করেনা। তাই কোন সরকারি তথ্য কার্যত পাওয়া যায় না। গ্রাম-শহরের চারপাশের অবস্থা দেখে সহজেই বোঝা যায় যে রাজ্যে সাধারণ ও খেটেখাওয়া মানুষের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ এবং তা ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। সরকারি প্রকল্প গুলি সাধারণ মানুষের জীবন ধারণ কে কোনো রকমে টিকিয়ে রেখেছে। এই মুহূর্তে এগুলির প্রয়োজন আছে এবং তাকে আরও জনমুখী ও দুর্নীতিমুক্ত করা প্রয়োজন। তবে জনগণের স্থায়ী কাজ, বাঁচার মতো মজুরি নিশ্চিত না করে দীর্ঘদিন এভাবে কোনো সমাজ অনিবার্য বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচতে পারে না। পশ্চিমবঙ্গে শিল্প ও কর্মসংস্থানের বর্তমান অবস্থাঃ আজ পশ্চিমবঙ্গে শিল্প ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর পশ্চিমবঙ্গ থেকে গড়ে ১৫ লক্ষ ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়স্ক যুবক-যুবতী পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে রাজ্যের বাইরে পাড়ি দিচ্ছে। রাজ্যে শিল্প ও কৃষিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে তারা নিজের রাজ্যে কাজ পেতে পারেন। আদর্শ ও রাজনৈতিক ভাবে আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির বিরুদ্ধে লড়াই করতে দায়বদ্ধ ও সচেষ্ট বাম গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে এই দুঃসময়েও মানুষের কাছে বিকল্প তুলে ধরার আন্তরিক প্রচেষ্টা চলবে। রুক্ষ মরুভূমিতে মরুদ্যান সৃষ্টির কর্মযজ্ঞ চলবে। আজ যা দেশ এবং রাজ্যে অনুপস্থিত। আমাদের সমাজের মতো জনবহুল সমাজে শুধুমাত্র কৃষি ও পরিষেবা ক্ষেত্র কে আঁকড়ে ধরে সমাজের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ধারাবাহিক ও শক্তিশালী হতে পারে না। আজকের পরিস্থিতিতে রাজ্যের কৃষি, কৃষক ও খেতমজুর সকলেই বিপন্ন। উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর পরিষেবা ক্ষেত্রে যে সম্ভাবনা পশ্চিমবঙ্গে সৃষ্টি হয়েছিল, তাও আজ ধ্বংসের মুখে। অটোমোবাইল হাব যেমন গুজরাটে চলে গেছে। পশ্চিমবঙ্গের আইটি সেক্টরের সম্ভাবনা এখন মুখ ঘুরিয়ে দক্ষিণ রাজ্যে পাড়ি দিয়েছে। কৃষিকে উন্নত করে ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের দিকে আমাদের এগোতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। প্রতিটি পরিবারে একটি কাজ নিশ্চিত করতে হলে যেমন কৃষি ও কৃষককে রক্ষা করতে হবে, তেমনি শিল্পের বিস্তার ঘটাতেই হবে। রাজ্যে বাম গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির বিকল্প কর্মসূচির প্রধান বিষয়বস্তু হলো, শিল্প কারখানার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নিয়মিত স্বচ্ছ পদ্ধতিতে নিয়োগ, কাজ এবং মজুরি ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা আজ লঙ্ঘিত। এই অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা রক্ষা করা। কৃষি, কৃষক ও কৃষি শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত গ্রামীণ অর্থনীতির জনমুখী রূপান্তর ঘটানো। এইসব কিছুর মাধ্যমে শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের জীবন ধারণের উপযোগী আয় সুরক্ষিত রাখা। রাজ্যের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আজ কার্যত পণ্যে পরিণত হয়েছে। বামপন্থীদের বিকল্প কর্মসূচির লক্ষ্য সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধার। লুটেরা পুঁজির স্বার্থের সামনে সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ ব্যবহারের অধিকার আজ আক্রান্ত। তথাকথিত স্মার্ট মিটার বাতিল করে বিদ্যুৎ মাশুলের ছাড় দিয়ে সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ ব্যবহারের অধিকার নিশ্চিত করা। শিল্প স্থাপন ও কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে বামপথেই দিশা ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনী ইশতেহারে বামফ্রন্ট স্পষ্ট সঙ্গে ঘোষণা করেছে,কাজের সুযোগ, সামাজিক সুরক্ষা এবং আধুনিক জীবনের সকল সুবিধা সুনিশ্চিত করতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। বাংলার মেধা বিশ্বজয়ী কিন্তু বাংলার মানুষ আজ কর্মসংস্থানের অভাবে ঘরছাড়া। আমাদের লক্ষ্য এমন আর পশ্চিমবঙ্গ গড়ে তোলা, যেখানে ধর্ম বর্ণ লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের পরিচয় হবে তাঁর কর্মে। স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে প্রতিটি পরিবারে থাকবে অন্তত একটি স্থায়ী কাজ। স্বচ্ছ নিয়োগ পদ্ধতির মাধ্যমে পাঁচ বছরের মধ্যে সমস্ত সরকারি শূন্যপদ পূরণ করা হবে। গ্রামে ২০০ দিনের কাজ এবং শহরে ১২০ দিনের কাজ ও ৬০০ টাকা মজুরির গ্যারান্টি দেয়া হবে। স্বনিযুক্তি প্রকল্পের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। শিল্প কৃষি শিক্ষা স্বাস্থ্য এগোবে একসাথে শান্তি সম্প্রীতি গণতন্ত্র ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত হবে। শিল্প ও কারখানার পুনরুজ্জীবন প্রসঙ্গে এই সময়ের বাম বিকল্প কর্মসূচির লক্ষ্য আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পাট, চা, চর্ম এবং ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা।ক্ষুদ্র ও কুটীর শিল্পকে আবার দেশের মধ্যে প্রথম স্থানে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ। তার জন্য বিশেষ ঋণদান প্রকল্প, পণ্য বিপননের জন্য নানাবিধ উদ্যোগ নেওয়া হবে। এই শতাব্দীর প্রথম দশকে বামফ্রন্ট সরকারের উদ্যোগে এ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় শিল্প পার্ক তৈরী হয়েছিল। বাংলায় বাম গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে প্রতিটি জেলায় নতুন শিল্পপার্ক তৈরি করে স্থানীয় স্তরে কাজের সুযোগ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে বাম বিকল্প ইশতেহার ঘোষণা করেছে। রাজ্যের বেশ কয়েকটি জেলায় সরকারি কিংবা বেসরকারি অসংখ্য কারখানা বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। এ বিষয়ে মিথ্যে প্রচার ও প্রতিশ্রুতির ভাঁওতা দিয়ে পনেরো বছর আগে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার এসেছে। এখন বন্ধ কারখানার জমি গুলি কার্যত তৃণমূল কংগ্রেস কিংবা প্রাক্তন তৃণমূলী বর্তমান বিজেপি-র নেতা মন্ত্রীদের প্রোমোটিংয়ের মৃগয়া ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এলাকার মানুষের লড়াই করে অনেক জায়গায় প্রতিরোধ করে তোলা গেছে। জমি আইনের পরিবর্তন করে চা বাগানের জমিগুলিও জমি মাফিয়াদের লুট করার সুযোগ করে দিয়েছি। জমি মাফিয়াদের বিরুদ্ধে চা বাগানের শ্রমিকেরা ঐক্যবদ্ধ ভাবে লড়াই করছে। বামপন্থীরা ঘোষণা করেছে সুযোগ পেলে বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা এবং চা-বাগান খোলার জন্য কার্যকর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজ্যে শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসার এবং ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকীকরণের পাশাপাশি একটি গভীর সমুদ্র বন্দর (Deep Sea Port) গড়ে তোলা হবে। সপ্তম বামফ্রন্ট সরকার এই কাজ করতে সচেষ্ট ছিল। গত পনেরো বছরে রাজ্য ছেড়ে চলে যাওয়া তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য বড়-মাঝারি শিল্পকে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ প্যাকেজ ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা হবে।নতুন সফটওয়্যার ও হার্ডওয়ার পার্ক তৈরি করা হবে।কৃষিভিত্তিক খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে বামফ্রন্ট সরকারের সময় দুর্গাপুরের পাশে অন্ডালে নতুন বিমানবন্দর তৈরি হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে শিল্প বিকাশের সম্ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে এই বিমানবন্দর তৈরী হয়েছে। এর মূল লক্ষ্যই ছিল রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চল সহ পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়ন প্রক্রিয়াকে এই বিমানবন্দর সাহায্য করবে। ওই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে যে বিস্তীর্ণ কোলিয়ারি অঞ্চল, ইস্পাত, বিদ্যুৎ, ইঞ্জিন তৈরীর কারখানা সহ রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠানগুলি কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের কর্পোরেট স্বার্থবাহী নীতির কারণে বিপদের মধ্যে রয়েছে। বামপন্থীরা রাষ্ট্রায়ত্ত্ব শিল্প রক্ষার জন্য লড়াই চালাচ্ছেন। মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এ লড়াই চলবে। কিন্তু সুযোগ পেলে এই বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বিমান কার্গো ও লজিস্টিকস হাব গড়ে তোলা হবে। তার জন্য কোল স্টোরেজ ও গুদাম নেটওয়ার্ক তৈরি করা হবে। রাজ্যের কৃষি পণ্য উৎপাদনকারী জেলার মানুষেরা প্রত্যক্ষভাবে এর দ্বারা উপকৃত হবেন। প্রতিটি ব্লকের স্মার্ট বাজার ও আধুনিক হাট নির্মাণ করা হবে। এই সমগ্র নেটওয়ার্কের মধ্যে বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি নয়া উদারবাদী ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এই শতাব্দীর প্রথম দিকে এ রাজ্যে যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। নতুন উদ্যোগ(স্টার্ট আপ) ও গবেষণা কেন্দ্রের সুবিধার জন্য গড়ে তোলা হবে বেঙ্গল হাব। স্টার্ট আপ ব্যর্থ হলে ৫০ শতাংশ ঋণ মকুব করা হবে। সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি উদ্যোগের অভাবে রাজ্যের সৃষ্টিশীল বৈশিষ্ট্য ও বেশ কিছু পণ্যের পেটেন্ট হাতছাড়া হয়ে গেছে। পেটেন্ট নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়তা কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। এই মুহূর্তের অন্যতম বিকাশমান ক্ষেত্র ওষুধ শিল্পের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে। নয়া উদারবাদের তিন দশক পেরিয়ে গেছে। নতুন শিল্প গড়ে তুলতে কিংবা অর্থনীতি পরিচালনা রাষ্ট্র নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। সেখানে একটি অঙ্গরাজ্যের সরকারের পক্ষে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি পুঁজির উপর নির্ভর করতে হয়। বেসরকারি পুঁজি রাজ্যের মানুষকে সেবা করতে আসবেনা, মুনাফার ক্ষেত্রেই খুঁজবে। ফলে কর্পোরেট সম্পর্কে স্পষ্ট নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিধানসভা নির্বাচনের বাম বিকল্প কর্মসূচিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে বাংলায় সদর দপ্তর থাকলে সরকারি টেন্ডার এ অগ্রাধিকার দেয়া হবে।নতুন শিল্প স্থাপনের জন্য ওয়ান উইন্ডো পলিসি ফিরিয়ে আনা হবে। পাশাপাশি গণ উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। প্রচার ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মানুষের চেতনাকে উন্নত করে সঙ্গে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সেই কাজ বামপন্থীরা করবে। শিল্প স্থাপনের জন্য ভূমিদাতাদের সম্মতি বাধ্যতামূলক করা হবে। পাশাপাশি 'উন্নয়ন বন্ডের' মাধ্যমে সাধারণ মানুষের বিনিয়োগে পরিকাঠামো উন্নয়ন করা হবে। বেসরকারি পুঁজির আক্রমণের সামনে শ্রমিকশ্রেণি ও শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে কি অবস্থান নিতে উদ্যোগী হবে বামপন্থীরা ? এই বিধানসভা নির্বাচনের বাম বিকল্প ইশতেহার দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেছে, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা রক্ষা করা হবে। দৈনিক ন্যূনতম ৭০০ টাকা মজুরি নিশ্চিত করতে সরকার তার করণীয় কাজ করবে। সমস্ত অ্যাপ ভিত্তিক ও অসংগঠিত শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বন্ধ শিল্পের শ্রমিক কর্মচারীদের বন্ধ কালীন ভাতার ব্যবস্থা করা হবে। নারী পুরুষ স্থায়ী অস্থায়ী নির্বিশেষে সমস্ত শ্রমিক কর্মচারীদের সমকাজে সম মজুরির দাবিকে মান্যতা দেওয়া হবে। সুপ্রিম কোর্ট এই নির্দেশ দিলেও এখনও পর্যন্ত এদেশে কোনো দক্ষিণপন্থী সরকার এ কাজ করেনি। কেন্দ্রীয় সরকারের ৪টি শ্রমকোড অনুসারে কোনো শ্রমিক-কর্মচারী বিরোধী আইন পশ্চিমবঙ্গে প্রয়োগ করতে দেয়া হবে না। সমস্ত শ্রমিক কর্মচারীদের ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিত করা হবে। বামফ্রন্ট সরকারের সময় এই অধিকার নিশ্চিত ছিল। এরাজ্যে সরকারের থেকেও নয়া উদারবাদের বিরুদ্ধে মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক সংগ্রাম চালিয়েছে বামপন্থীরা। পাশাপাশি প্রতিকূল পরিস্থিতিতে লগ্নি পুঁজির আক্রমণাত্মক ঝাপটা থেকে শ্রমজীবী মানুষকে রক্ষার আন্তরিক প্রচেষ্টা নিয়েছিল। এই কাজ এখন কেরালার বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের সরকার করে চলেছে। যদিও কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু বামপন্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি সর্বত্র এক। তাইতো মানুষকে সঙ্গে নিয়ে উন্নয়নে কেরালা ভারতে প্রগতিশীলতার মডেল। আর পশ্চিমবঙ্গ কিংবা বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে তথাকথিত উন্নয়নে মানুষের অবস্থা বিপর্যয়কর। তাই ভুক্তভোগী মানুষদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পথে বাধা তৈরির জন্য বিদ্বেষ-বিভাজনের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল গড়ে তোলা হচ্ছে। বামপন্থীদের শিল্পায়নের পথে চলার উদ্দেশ্য প্রথমত নতুন প্রজন্মের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিশ্চিত করা এবং শেষ পর্যন্ত শ্রমিকশ্রেণি ও সব ক্ষেত্রের শ্রমজীবী মানুষের অস্তিত্ব রক্ষা ও লড়াই করার ক্ষমতা বজায় রাখা। আজকের নয়া উদারবাদী পৃথিবীতে কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের কাছে ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর স্থাপন করার সংগ্রামের লক্ষ্য আসলে নিজের শ্রেণি গঠন ও শ্রেণি সংগ্রামের সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করা। একটা জনমুখী সরকার পরিচালনা করার সঙ্গে সঙ্গে বামপন্থীরা কখনও এই পথ ও লক্ষ্য সম্পর্কে বিস্মৃত হবে না। প্রকাশের তারিখ: ১২-এপ্রিল-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|