|
আগ্রাসন ও প্রতিরোধের দ্বান্দ্বিকতাPrabhat Patnaik |
তৃতীয় বিশ্বের স্বাধীনতা সম্ভব হয়েছিল একটি বিশেষ ঐতিহাসিক পরিস্থিতির কারণে। বলশেভিক বিপ্লবের পর নিপীড়িত মানুষ বিশ্বব্যাপী জেগে উঠেছিল। তখন সাম্রাজ্যবাদ দুর্বল ছিল |
ভারত সরকার অত্যন্ত কাপুরুষতার পরিচয় দিয়েছে। ইরানের ওপর আমেরিকা-ইসরায়েলের হামলার নিন্দা পর্যন্ত তারা করেনি। উল্টো এখন তারা মিডিয়ায় নিজেদের লোকজন দিয়ে একটি কথা ছড়াচ্ছে। তারা বলছে, ‘এই সংঘাতে ভারতের পক্ষ না নেওয়াই নাকি দেশের স্বার্থে, আসলে কৌশলগত সাফল্য’। তাদের যুক্তি হল—ইসলামি দেশগুলোর সঙ্গে হাত মেলানো নৈতিক দিক থেকে ঠিক হতে পারে। কিন্তু বৈদেশিক নীতি নৈতিকতার ভিত্তিতে চলে না। এটি চলে দেশের স্বার্থের ভিত্তিতে। তাই ভারতের উচিত পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা। তৃতীয় বিশ্বের সঙ্গে সংহতি দেখিয়ে সেই সম্পর্ক নষ্ট করা ঠিক হবে না। তাতে নৈতিক তৃপ্তি মিলতে পারে, কিন্তু বাস্তবিক লাভ হবে না। এই যুক্তি অত্যন্ত বিপজ্জনক। দুটি কারণে। প্রথম কারণ, আন্তর্জাতিক বিষয়ে নৈতিকতার কথা এড়িয়ে যাওয়া মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ফেলে দেওয়া। সেটি খুবই বিপজ্জনক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সাম্রাজ্যবাদ দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তখন নৈতিকতার ভিত্তিতে একটা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। জাতিসংঘও তার অংশ। সাম্রাজ্যবাদ মাঝে মাঝে কুটকৌশল করলেও সেটা লুকিয়ে করতে হতো। সরাসরি আগ্রাসন চালানো যেত না। এখন যদি নৈতিকতার ভিত্তি ফেলে দেওয়া হয়, তাহলে সাম্রাজ্যবাদ সরাসরি আগ্রাসন চালানোর পথ পাবে। দ্বিতীয় কারণ, তখন সাম্রাজ্যবাদ শুধু মাঝে মাঝে আগ্রাসন চালাবে না। এটি একটানা আগ্রাসন চালাতে থাকবে। তখন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো যে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, তা ধ্বংস হয়ে যাবে। একসময় তৃতীয় বিশ্বের স্বাধীনতা সম্ভব হয়েছিল একটি বিশেষ ঐতিহাসিক পরিস্থিতির কারণে। বলশেভিক বিপ্লবের পর নিপীড়িত মানুষ বিশ্বব্যাপী জেগে উঠেছিল। তখন সাম্রাজ্যবাদ দুর্বল ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ধ্বংস হওয়ার পর সেই পরিস্থিতি আর নেই। এখন সাম্রাজ্যবাদ আবার শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। আগ্রাসনের এই নতুন ধারা শুরু হয়েছে। এই ধারায় এখন পর্যন্ত অনেক ঘটনা ঘটেছে— সাবেক সোভিয়েত দেশগুলোতে তথাকথিত ‘রঙিন বিপ্লব’ ঘটানো। রাশিয়ার সীমান্ত পর্যন্ত ন্যাটো জোট বাড়ানো। গাজায় গণহত্যা চালানো। ইসরায়েলের বসতি বাড়ানো। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়া। কিউবায় হামলার হুমকি দেওয়া। এখন ইরানের ওপর সরাসরি যুদ্ধ শুরু করা। ইরান এখন যে ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, সেটাই সাম্রাজ্যবাদের এই আগ্রাসনের গতিকে আটকে রেখেছে। যদি ইরানের প্রতিরোধ ভেঙে যায়, তাহলে সাম্রাজ্যবাদ আরও বেশি নির্লজ্জ হয়ে উঠবে। তখন আর কোনো বাধা থাকবে না। ইরানের শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে কারও মতামত যাই হোক না কেন, আজ যদি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ইরানকে সমর্থন না করি, তাহলে আগামীকাল আমাদের দেশের ওপরেও সাম্রাজ্যবাদ আক্রমণ চালাবে। তাই ইরানকে সমর্থন করা শুধু নৈতিকতার প্রশ্ন নয়। এটি আমাদের নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্ন। ইরানে যা ঘটছে, তা শুধু ইরানের সঙ্গে জড়িত নয়। আমাদের স্বাধীনতাও তার সঙ্গে জড়িত। সাম্রাজ্যবাদ কেন এভাবে এগিয়ে যাচ্ছে? এটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত কোনো খেয়াল খুশি নয়। এটি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার স্বভাব। লেনিন অনেক আগেই বলেছিলেন, সাম্রাজ্যবাদ সবসময় নতুন নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল দখল করতে চায়। এটি তার অস্তিত্বের প্রশ্ন। আগে এক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আরেক সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল। এখন সেই প্রতিযোগিতা কিছুটা কমেছে। কিন্তু কাঁচামালের উৎস দখলের লোভ কমেনি। আজও সাম্রাজ্যবাদ চায়, তৃতীয় বিশ্বের সরকার যেন কাঁচামালের উৎসের নিয়ন্ত্রণ না নেয়। সাম্রাজ্যবাদ কখনো স্থির হয়ে বসে থাকতে পারে না। এটি চিরকাল এগিয়ে যেতে চায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ধ্বংস হওয়ায় এটি আরও বেশি সাহস পেয়েছে। এখন তৃতীয় বিশ্বের জনগণকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এই প্রতিরোধের মূল কথা হবে—যে কেউ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়ছে, তাকে সমর্থন করা। এখানে আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। সাম্রাজ্যবাদ তৃতীয় বিশ্বের প্রগতিশীল শক্তিগুলোকে দুর্বল করতে দীর্ঘদিন ধরে ইসলামবাদকে ব্যবহার করেছে। উইনস্টন চার্চিল ভারতে মুসলিম separatism-কে সমর্থন করেছিলেন। আমেরিকা ইরানে মোসাদ্দেকের সরকারকে উৎখাত করতে আয়াতুল্লাহ কাশানীর সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ক্লান্ত করতে আমেরিকা ইসলামি জিহাদিদের ব্যবহার করেছিল। কিন্তু ইতিহাসে দেখা গেছে, ইসলামি শক্তিগুলো যখন ক্ষমতায় এসেছে, তখন তারা প্রায়ই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তখন সাম্রাজ্যবাদ তাদের বিরুদ্ধে ‘গণতন্ত্র’ ও ‘স্বাধীনতার’ নামে হামলা চালায়। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সাম্রাজ্যবাদ ইরানের ইসলামি শাসনের বিরুদ্ধে ইরাকের ধর্মনিরপেক্ষ শাসনকে সমর্থন করেছিল। সাম্রাজ্যবাদ তার এনজিও যেমন ন্যাশনাল এন্ডোউমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি (এনইডি)-র মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অসন্তোষ তৈরি করে। ইউক্রেনে তারা সফল হয়েছিল। ইরানেও তারা চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ইরানে তারা ব্যর্থ হয়। তখনই তারা ইরানের ওপর সরাসরি হামলা শুরু করে। এখন এই হামলাকে আলাদাভাবে না দেখে বরং সাম্রাজ্যবাদের পুরো বিশ্ব আধিপত্যের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। একে আলাদা করে দেখলে বড় ভুল হবে। আগে ইসলামবাদীরা এই ভুল করেছিল। তারা তৃতীয় বিশ্বের প্রগতিশীল শাসনের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করা যাবে না। সাম্রাজ্যবাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ করতে হলে তৃতীয় বিশ্বের মানুষকে এক হতে হবে। আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। হিন্দুত্ববাদীরা এসব বোঝে না। তাদের অন্যতম আদর্শ বীর সাভারকর ভারতের ভেতরে ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’ দিয়েছিলেন। এই তত্ত্বকেই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তুলে ধরেছিলেন। সাম্রাজ্যবাদী নেতা চার্চিলও তা সমর্থন করেছিলেন। আজ হিন্দুত্ববাদীরা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে, আমেরিকার তোষামোদ করছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিয়ে তারা নীরব। এই নীরবতা কাপুরুষতা। এটি কোনো প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা নয়। এই নীরবতা ভারতের স্বার্থে—এই কথা বলা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এটি সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্তের চোখে না দেখার মতো। এটি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি অপমান। পিপলস ডেমোক্রেসী ১৬-২২ মার্চ ২০২৬ অনুবাদ করেছেনঃ অঞ্জন মুখোপাধ্যায় প্রকাশের তারিখ: ২৫-মার্চ-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|