বাংলায় আলু ও ধান চাষীর সংকট

Snehasish Roy
মাত্র ৬ টাকা-৭ টাকা কেজি করে কৃষকরা আলু বিক্রি করেন এবং চরম লোকসানের সম্মুখীন হন। কিন্তু রাজ্য সরকার এই সময় আলু কিনে হিমঘরে সংরক্ষিত করেনি এবং সংকটগ্রস্ত চাষীর পাশেও কোনভাবেই রাজ্য ও কেন্দ্রীয় কোন সরকারেরই দেখা পাওয়া যায়নি।
কৃষি ও কৃষকের সংকটের অন্যতম কারণ যেকোনো ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়া। দীর্ঘকাল কৃষক সভা ফসলের ন্যায্য দামের দাবীতে আন্দোলন করে আসছে। কিন্তু কেন্দ্রের মোদি সরকার ফসলের ন্যায্য দামের সঙ্গে প্রতারণা করে চলেছেন। নানা আক্রমণ শানিয়ে কৃষি সংকটকে  তীব্র করে কৃষকদের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছেন। এসবই করা সাম্রাজ্যবাদ ও কর্পোরেটদের স্বার্থে। কারণ কর্পোরেটদের মুনাফার সাথেই কৃষি পণ্যের ব্যবসাকেও ওদের হাতে তুলে দিতে চায় কেন্দ্রীয় সরকার। কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির সঙ্গে এ রাজ্যের সরকারের নীতির কোন তফাৎ না থাকায় পশ্চিমবঙ্গের চাষীদের ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এ কারণে সমগ্র রাজ্যের সঙ্গে হুগলী জেলার অন্যতম ফসল আলু চাষ ও আলু চাষীও গভীর সংকটে। সবচেয়ে সমস্যার দিকটি হল আলুর দাম কোনও কোনও সময় কিছুটা বৃদ্ধি পেলেই অপদার্থ বর্তমান সরকার ভয়ংকর ভাবে কৃষকদের ওপর আক্রমণকারী ভূমিকা গ্রহণ করেন।

বিগত ২০২০ সালে আলুর দাম একটু বৃদ্ধি পাওয়ায়  সরকার ঝাড়খন্ড ও ওড়িশার সীমান্ত সীল করে বাইরের রাজ্যে আলু রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। হিমঘর থেকে চাষীর আলু জোর জবরদস্তি বের করে বাজারে আলুর যোগান, বাড়ানোর জন্য ব্যাপক পুলিশি জুলুম শুরু হয়। আলু বাবসায়ীগণও প্রচন্ড হয়রানির শিকার হন। এসবের ফলে বিগত বছরে আলু ওঠার সময়ে ব্যবসায়ীগণ একদমই আলু কিনতে নামেননি, আলু হিমঘরে সংরক্ষণ করতে বাধ্য হন। মাত্র ৬ -৭ টাকা কেজি করে চাষী আলু বিক্রি করেন এবং চরম লোকসানের সম্মুখীন হন। কিন্তু রাজ্য সরকার এই সময় আলু কিনে হিমঘরে সংরক্ষিত করেননি এবং সংকটগ্রস্ত চাষীর পাশেও কোনভাবেই রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারেরই দেখা পাওয়া যায়নি। চাষীর আলুর দাম কমালেও রাজ্য জুড়ে আলুর দাম সেভাবে কমেনি। বিক্রি করতে না পারায় বিগত বছরের আলু এখনো প্রায় ৩০ শতাংশ হিমঘরে থেকে গেছে। জানুয়ারী মাস পর্যন্ত এই আলু হিমঘর থেকে বাজারে আসবে। ফলে বর্তমান বছরেও আলু দামে প্রবল ভাবে সংকট তৈরী হবে। 

অন্যদিকে বর্তমান বছরে চাষের মরশুম শুরু হওয়ার সাথে সাথে চাষীকে প্রায় ৮০ টাকা কেজি দরে পাঞ্জাব বীজ কিনতে বাধ্য হতে হয়েছে। সারের দাম ৫০০ টকা বেড়েছে। আবার হিমঘরে আলু সংরক্ষণের জন্য এক মরশুমে দুবার বৃদ্ধি পেয়েছে আলুর দাম,বস্তায় ১০০ টাকা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে অস্বাভাবিক গতিতে বিদ্যুতের নাম। সবমিলিয়ে এবছর আলু চাষের খরচ বিঘা প্রতি ৩০-৩৫ হাজার টাকা বেড়েছে। আবাহাওয়া অনুকূল থাকলে উৎপাদন হবে বিঘায় ৪০ কুইন্টাল। সামান্যতম সুরাহা পেতে হলে চাষীকে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বস্তা অর্থাৎ ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা কুইন্টাল আলুর দাম পেতেই হবে। এজন্য পূর্বের বামফ্রন্ট সরকারের মত বর্তমান সরকারকে চাষীর আলুর একাংশ কিনতে হবে। বাইরের রাজ্যে ও বিদেশে রপ্তানির ব্যবস্থা করতে হবে। চাষীর সকল প্রকার ঋণ মুকুব করতে হবে। একদিকে কৃষকরা ফসলের দাম পাচ্ছেনা, অন্য দিকে জনগণ বাজারে জিনিস কিনতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে।  আমাদের লড়াই দুতরফেই। কৃষি ফসলের লাভজনক দামের দায়িত্ব কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে নিতে বাধ্য করতে হবে।

ধান চাষীর লড়াই -
রাজ্যের অন্যান্য জেলার সাথে হুগলী জেলাতেও খারিফ মৌসুমের ধান মাঠ থেকে তোলা প্রায় শেষের পথে। চাষের উপকরণের খরচ মিটিয়ে পরবর্তী আলু ও অন্যান্য এই চাষের জন্য ন্যূনতম পুঁজি সংগ্রহ ও জীবিকা নির্বাহ করতে ধান ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অভাবী চাষীর একমাত্র উপায় হল দ্রুত ধান বিক্রি করা। আর ধান বিক্রির সময় দরকার হয় সরকারি সহযোগিতা। ২০২৫ সালে ধানের সরকারি ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ছিল কুইন্টাল প্রতি ২,৩৬৯ টাকা। এর সঙ্গে রাজ্য সরকারের কুইন্টাল প্রতি ২০ টাকা বোনাস ধরলে কুইন্টাল প্রতি দাম দাঁড়ায় ২,৩৮৯ টাকা। ধানের বিক্রি শুরু হয়েছে। কিন্তু সব সরকারি মান্ডিতে এখনো ধান কেনা শুরু হয়নি। ১লা নভেম্বর থেকে সরকারিভাবে ধান কেনা শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু ধান বিক্রি রোধে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত সদর্থক পদক্ষেপ না নেওয়ার ফলে ফড়েদের কাছে চাষীরা ১,৬০০ টাকা থেকে ১,৭০০ টাকা কুইন্টাল দরে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। সরকার যে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ঘোষণা করেছে ভারতে কৃষকেরা ড. এম. এস. স্বামীনাথন নেতৃত্বাধীন কৃষি আয়োগের সুপারিশ (সি২-সি২-র ৫০ শতাংশ)'র থেকে কুইন্টাল প্রতি কমবেশি ৭০০ টাকা কম পাচ্ছে। তা সত্বেও সরকার ঘোষিত ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে ধান কিনতে রাজ্য সরকারের ইচ্ছাকৃত গড়িমসিতে ফড়েরা লাভবান হচ্ছে। আবার সরকারি মান্ডিতে ধান বিক্রির ক্ষেত্রে নানা ছলাকলা, কুইন্টাল প্রতি ৫ থেকে ১০ কেজি বলতা বা বলন ইত্যাদি নানা হয়রানিতে কৃষকরা দিশেহারা।

ধান বিক্রি রোধে সরকারি মান্ডিতে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে ধান কেনা, কৃষকদের হয়রানি বন্ধ করার দাবিতে ইতিমধ্যে জেলায় জেলায় মান্ডিতে মাণ্ডিতে বিক্ষোভ, অবস্থান শুরু হয়েছে। কৃষক সভার দাবী হচ্ছে-

১) অবিলম্বে সরকারের পক্ষ থেকে কৃষক মান্ডিতে ও সমবায় সমিতিতে প্রয়োজনে প্রতি গ্রাম পঞ্চায়েতে অস্থায়ী শিবির করে ন্যূনতম সহায়ক মূলো ধান কিনতে হবে।

২) নানা অছিলায় ধান কেনার ক্ষেত্রে কৃষকদের হয়রানি বন্ধ করতে হবে।

৩) চাষীর সমস্ত ধান সরকারকে কিনতে হবে।

৪) বলন প্রথা বাতিল করতে হবে।

৫) ধান কেনার ক্ষেত্রে ফড়েদের উপদ্রব বন্ধ করতে হবে।
প্রকাশের তারিখ: ১৩-ডিসেম্বর-২০২৫

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org