|
চির তারুণ্যের কবি: সুকান্ত ভট্টাচার্যTuhina Islam |
শুধু কবিতার মধ্য দিয়ে নয়, তার কাজের মধ্য দিয়েও তাঁর কথার দায়বদ্ধতার পরিচয় রেখেছেন। তাঁর কবিতার ছত্রগুলোকে জীবনের মধ্যে গ্রহন করে পোষণ করে আত্মস্থ করে এগিয়ে যেতে হবে আমাদের। |
"বুকে বেঁধে দুর্জয় দৃঢ় - সংকল্প,
সামনে এগিয়ে চলো, টলবো না অল্পও,
আমরা হবো না কভু ক্লান্ত...
সুকান্ত! সুকান্ত! সুকান্ত!"
কবি ভবানীপ্রসাদ মজুমদার। 'প্রার্থনা ক’রো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,
যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!' শ্রেণী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যারা বঞ্চিত লাঞ্ছিত শোষিত মানুষদের জীবনটাকে বদলে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন দেশে দেশে লড়াই সংগ্রাম করেন, বড়লোক গরিব লোকের মধ্যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষকে প্রতিবাদী করে তোলেন, চরম অসাম্যের ব্যবস্থাকে বদলানোর জন্য চিরন্তন সংগ্রাম চালান তাঁদের কাছে নজরুল সুকান্তদের কবিতা উদ্দীপনা জোগায়। সুকান্ত নজরুলের মত কবিরা উচ্চকিত বলিষ্ঠ কন্ঠে সমাজের নিপীড়িত মানুষের হয়ে যা বলেন তা অসুন্দর নয়। এইসব কবিতা ছন্দ, ভাবব্যঞ্জনা ইত্যাদি কবিতার শর্ত লঙ্ঘন করেনা।'হে মহাজীবন ' কবিতায় সুকান্ত যে গদ্য চাইছেন,কবিতার গঠনে ছন্দ আছে,মিল আছে। কবিতার নতুন ধরনের সংজ্ঞা চাইছেন কবি। দরিদ্র নিপীড়িত মানুষের জীবন সংগ্রামের অঙ্গ হয়ে উঠেছে তাই- "ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়,
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।"
ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে পূর্ণিমার চাঁদের চেয়ে ঝলসানো রুটির আকর্ষণ অনেক বেশি। কবি সুকান্তের জন্ম শতবর্ষকে সামনে রেখে একথা জোর গলায় বলতে হবে। তারুণ্যের, চির যৌবনের স্বপ্ন বর্তমান পচা-গলা, চরম বৈষম্যমূলক সমাজটাকে বদলানো। তাকে বদলানোর অন্যতম প্রধান অস্ত্র সুকান্তের কবিতা গান। মানুষের নৈতিক সামাজিক মূল্যবোধ তছনছ করে তাকে সম্পূর্ণ সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে ভোগবাদী সাহিত্য শিল্প নানা মাধ্যম।বিজ্ঞানের যুক্তি বাস্তবতাকে পরিত্যাগ করা হচ্ছে, ইতিহাসকে আচ্ছন্ন করা হচ্ছে অন্ধ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের দৃষ্টিতে। সেই সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার সর্বনাশ ঘটিয়ে সভ্যতার অগ্রগতিকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। মানব সভ্যতার শত্রু এই পাঁচিলগুলোকে ধাক্কা দেওয়া ভাঙ্গার চেষ্টা করা প্রগতিশীল সংস্কৃতির কাজ। সুকান্ত আমাদের সঙ্গে ছিলেন, আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন। এই কথা ভেবে সুকান্তের জন্ম শতবার্ষিকীর নানা অনুষ্ঠান করতে হবে আমাদের। এমন ভাবে পরিকল্পনা নিতে হবে যাতে সমাজের নিচু তলার মানুষের পাশাপাশি ছাত্রকিশোর যৌবনকে বেশি বেশি করে এইসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করানো যায়, তা কবিতা আবৃত্তি হোক,চিত্রাংকন হোক, আলোচনা সভা হোক। ব্যাপক অংশের ছাত্র-কিশোর যৌবনের সক্রিয় অংশগ্রহণ হবে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবার্ষিকী পালনের সার্থকতা এবং তাঁর স্বপ্নকে পূরণের পথে এগিয়ে যাওয়া। শতবর্ষ যাবে আসবে কিন্তু সুকান্ত সমস্ত ক্ষণ আমাদের কাজে এবং চিন্তায় সঙ্গে থাকবে- বিদ্রোহ আজ, বিদ্রোহ চারিদিকে,
আমি যাই তারি দিনপঞ্জিকা লিখে।
এ বছর ২০২৫ সাল কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্ম শতবর্ষ। স্বল্প জীবনের যে মহামূল্যবান সৃষ্টি সম্পদ তিনি আমাদের তুলে দিয়েছেন তা নিয়ে আলোচনা পর্যালোচনা করব আমরা। শিক্ষা গ্রহণ করবো,আমাদের রসদ সংগ্রহ করবো, আমাদের চিন্তা ভাবনাকে করবো আরও শানিত, প্রসারিত। তাঁর প্রথম কবিতা ছাড়পত্র। এই কবিতায় তিনি তাঁর স্বপ্ন- সাধ -কামনা উচ্চারণ করেছিলেন ঋজু- শানিত ভাষায়, "এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।"
শুধু কবিতার মধ্য দিয়ে নয়, তার কাজের মধ্য দিয়েও তাঁর কথার দায়বদ্ধতার পরিচয় রেখেছেন। তাঁর কবিতার ছত্রগুলোকে জীবনের মধ্যে গ্রহন করে পোষণ করে আত্মস্থ করে এগিয়ে যেতে হবে আমাদের। গণমানুষের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্ম ১৯২৬ সালের ১৫ ই আগস্ট, মতান্তরে ১৬ আগস্ট এবং মৃত্যু ১৯৪৭ সালে ১৩ মে, তখন বয়স মাত্র কুড়ি বছর ৯ মাস। ৮-৯ বছর বয়স থেকেই তাঁর লেখা শুরু, হস্তলিখিত 'সঞ্চয়' স্কুল পত্রিকায় রম্যরচনা লিখে তাঁর সাহিত্য জগতে আত্মপ্রকাশ। তার দিন কয়েক পরেই 'শিখা' পত্রিকায় প্রথম ছাপার মুখ দেখে তাঁর লেখা 'বিবেকানন্দের জীবনী'। ১১ বছর বয়সে 'রাখাল ছেলে' নামে একটি গীতিনাট্য রচনা করেন,যা পরে তাঁর 'হরতাল' গ্রন্থে সংকলিত হয়। পাঠশালাতে পড়বার সময়ে 'ধ্রুব' নাটিকার নাম ভূমিকাতে অভিনয় করেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। বেলেঘাটা দেশবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় বাল্যবন্ধু লেখক অরুণাচল বসুর সঙ্গে মিলে আরেকটি হাতে লেখা কাগজ 'সপ্তমিকা' সম্পাদনা করেন। অরুণাচল বসু ছিলেন তাঁর আমৃত্যু ঘনিষ্ঠ বন্ধু । ১৯৪১ সালে সুকান্ত আকাশবাণী কলকাতার গল্প দাদুর আসরে যোগদান করেন। সেখানে প্রথমে তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করেন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর সেই আসরেই নিজের লেখা কবিতা পাঠ করে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান তিনি । গল্প দাদুর আসরের জন্যই সেই বয়সে তাঁর লেখা গান মনোনীত হয়েছিল, আর সেই গান সুর দিয়ে গেয়েছিলেন সেকালের অন্যতম সেরা গায়ক পঙ্কজ মল্লিক। সুকান্তকে আমরা সাধারণত কবি হিসেবে জানলেও তিনি কবিতার পাশাপাশি গান, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ ইত্যাদিও রচনা করেন। ১৯৪৪ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করেন এবং সেই বছর 'আকাল' নামক একটি সংকলন গ্রন্থ তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। সুকান্ত ভট্টাচার্যের সাহিত্য রচনার সময় কাল অতি অল্প, মাত্র ছয়-সাত বছর, তাঁর অধিকাংশ সৃষ্টি ১৯৪১-৪৬এর মধ্যে লিখিত। বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে মুখরিত জনতার গণআন্দোলনের মাধ্যমে কেটেছে দিনরাত। জীবদ্দশায় দেখা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পঞ্চাশের মন্বন্তর, রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ইত্যাদির বিরুদ্ধে অজস্র কবিতা লেখেন তিনি। পরাধীন দেশের দুঃখ দুর্দশা, ব্যক্তি ও সমষ্টির যুগ যন্ত্রণা, শোষণমুক্ত পূর্ণ স্বাধীন সমাজের স্বপ্ন, শোষিত মানুষের কর্মজীবন এবং একটি উজ্জ্বল সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ পৃথিবীর স্বপ্ন ছিল তাঁর কবিতার মূল প্রেরণা। সুকান্ত গণমানুষের কবি, চিরসংগ্রামী, অসহায় নিপীড়িত সর্বহারা মানুষের কবি, তাঁদের সুখ দুঃখ তাঁর কবিতার প্রধান বিষয়। অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ের স্বার্থে ব্রিটিশ শাসক, ধনী মহাজন, অত্যাচারী জমিদার, লোভী মুনাফাখোর কালোবাজারী মজুতদার, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে সুকান্ত ছিলেন আপোষহীন সংগ্রামী। এদের বিরুদ্ধে তাঁর লেখনি গর্জন করেছে বারে বারে। তিনি তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে দূর করতে চেয়েছেন শ্রেণী বৈষম্য, ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন মানবতার জয়গান। তারজন্য তিনি লড়াকু ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন, শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে কখনো দমিয়ে রাখতে পারেনি।মানুষের কল্যাণের জন্য সুকান্ত নিরন্তর থেকেছেন নিবেদিত প্রাণ। তিনি মানবিক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে দিয়েছেন বিদ্রোহ, লড়াই, সংগ্রামের ডাক। অগ্নিদীপ্ত সৃষ্টি প্রণোদনা দিয়ে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে প্রয়াসী ছিলেন সুকান্ত। সুকান্ত কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা দৈনিক 'স্বাধীনতা'র কিশোর সভা বিভাগ সম্পাদনা করতেন ১৯৪৫ সাল থেকে। তাঁর কবিতায় অনাচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ পাঠকদের উদ্দীপ্ত অনুপ্রাণিত করে তোলে। গণমানুষের প্রতি গভীর মমতা ও সহমর্মিতাবোধের প্রকাশ ঘটেছে তাঁর সৃষ্টিতে। প্রথমে ম্যালেরিয়া ও পরে দুরারোগ্য যক্ষা রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৪৭ সালের ১৩ মে কলকাতা যাদবপুরে কে এস রায় টিবি হাসপাতালে প্রয়াত হন কবি। জীবদ্দশায় তাঁর কোনো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ হয়নি, মৃত্যুর পর একে একে প্রকাশ পায় ছাড়পত্র (১৯৪৭), পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠেকড়া (১৯৫১), অভিধান (১৯৫৩), ঘুম নেই (১৯৫৪), হরতাল (১৯৬২), গীতিগুচ্ছ (১৯৬৫) ইত্যাদি। পরবর্তীকালে উভয় বাংলা থেকে 'সুকান্ত সমগ্র' নামে তার রচনাবলী প্রকাশিত হয়। সুকান্ত ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের পক্ষে পঞ্চাশের ভয়াবহ মন্বন্তর দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে 'আকাল' (১৯৪৪) নামে একটি কাব্যগ্রন্থ সম্পাদনা করেন। সুকান্তের কবিতা বিষয় বৈচিত্রে ও শিল্পগুনে বেশ সমৃদ্ধ। অতি সাধারণ বস্তুকে কবিতার বিষয় করে গভীর ভাবব্যঞ্জনা ফুটিয়ে তোলেন কবি। বাড়ি,রেলিং, ভাঙা সিড়ি, দিয়াশলাই কাঠি, সিগারেট ইত্যাদি উপকরণ হয়ে উঠেছে অসাধারণ কালজয়ী কবিতা। সব ধরনের বাধা-বিপত্তিকে জয় করতে শেখায় তাঁর কবিতা। যাপিত জীবনের দুঃখ যন্ত্রণাকে মোকাবিলা করার সাহস পাওয়া যায় তাঁর সৃষ্টি থেকে । তারুণ্যের শক্তি দিয়ে উন্নত শিরে মানুষের মর্যাদার জন্য মানুষকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান সুকান্তের কবিতা সাহসী করে উদ্দীপ্ত করে আমাদের পাঠক সমাজকে। তাঁর সাম্যবাদী বস্তুনিষ্ঠ রচনা মানুষকে সন্ধান দেয় উজ্জ্বল প্রগতিশীল জীবন ভাবনার । স্বল্প সময়ের জীবনেই তিনি বাংলা সাহিত্যকে অনেক কিছু দিয়ে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ দাশসহ সেই সময়ের বড় বড় কবিদের ভিড়ে তিনি হারিয়ে যাননি,নিজের যোগ্যতার সাক্ষ্য রেখে গেছেন তার পরিণত ভাবনায়। ভাবনা গত দিকে সুকান্ত তার বয়স থেকে এগিয়েছিলেন অনেক বেশি। তাঁর কবিতা দুর্ভিক্ষ, ফ্যাসিবাদী আক্রমণ, সমাজের মানুষের চরম দারিদ্র্য - বৈষম্য, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে আজও সমান প্রাসঙ্গিক ও তা থেকে মুক্তিকামী মানুষকে অনুপ্রেরণা উদ্দীপনা যোগায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহ কারণে বাংলা ১৩৫০ ইংরেজি ১৯৪৩ সালে অবিভক্ত বাংলাসহ বহু রাজ্যে ভয়ানক দুর্ভিক্ষের দেখা দেয়। এই দুর্ভিক্ষে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ মারা যান। এই প্রেক্ষাপটে রচিত হয় বিজন ভট্টাচার্যের নবান্ন, আগুন,তুলসী লাহিড়ীর ছেঁড়া তার ইত্যাদি নাটক। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অশনি সংকেত, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসহযোগী, কে বাঁচায় কে বাঁচে, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্বন্তর, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের স্বাগত, প্রেমেন্দ্র মিত্রের ফ্যান ইত্যাদি কবিতা রচিত হয় দুর্ভিক্ষ মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটে অনাহার ক্লিষ্ট অস্থি চর্মসার মানুষ সম্পর্কে কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র বলেন, "যেন তার ব্যঙ্গচিত্র বিদ্রুপ বিকৃত।" দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে তিনি বেশ কিছু কবিতা লিখেন যাতে তৎকালীন সমাজের প্রতিচ্ছবি ও দুর্ভিক্ষের বিভীষিকা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। আকাল,ছাড়পত্র, মহুয়ার পালা, দুর্মর ইত্যাদি কবিতা কেবল দুর্ভিক্ষের চিত্রায়ন নয় বরং সমাজের প্রতি তাঁর গভীর মন্তব্য ও মানবিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ। তাঁর কবিতার আজও দুর্ভিক্ষের শিকার হওয়া মানুষের জন্য এক জীবন্ত দলিল। সেই দুর্ভিক্ষ প্রসঙ্গে সুকান্ত ভট্টাচার্য লেখেন, "সে ইতিহাস একটা দেশ শ্মশান হয়ে যাওয়ার ইতিহাস, ঘরভাঙ্গা গ্রাম ছাড়ার ইতিহাস, দোরে দোরে কান্না আর পথে পথে মৃত্যুর ইতিহাস,আমাদের অক্ষমতার ইতিহাস।" ১৩৫০ সালের দুর্ভিক্ষ মন্বন্তরের ভয়াবহতা সম্পর্কে কবি সুকান্ত রবীন্দ্রনাথের প্রতি কবিতায় বলেন "আমি এক দুর্ভিক্ষের কবি,
প্রত্যহ দুঃস্বপ্ন দেখি,মৃত্যুর সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
আমার বসন্ত কাটে খাদ্যের সারিতে প্রতীক্ষায়,
আমার বিনিদ্ররাতে সতর্ক সাইরেন ডেকে যায়,
আমার রোমাঞ্চ লাগে অযথা নিষ্ঠুর রক্তপাতে,
আমার বিস্ময় জাগে নিষ্ঠুর শৃঙ্খল দুই হাতে।"
কবি আরো বিস্মৃত হন যখন তিনি দেখেন,
"সোনার দেশে অবশেষে মন্বন্তর নামে।"
প্রতিদিন রাস্তায় রাস্তায় খাদ্যের অন্বেষণে আসা অস্থিচর্মসার মানুষের তীব্র যন্ত্রণা আর্তনাদ দেখতে পেয়ে কবি 'বিবৃতি' কবিতায় লেখেন, "বুভুক্ষা বেঁধেছে বাসা পথের দুপাশে,
প্রত্যহ বিষাক্ত বায়ু ইতস্তত ব্যর্থ দীর্ঘশ্বাসে।"
কবি উপলব্ধি করেন যে ক্ষুধার আগুনের মধ্য দিয়ে রক্তাক্ত সূর্যোদয় সম্ভব, কাতারে কাতারে সাধারণ মানুষের মৃত্যু মিছিল দেখে কবি উপলব্ধি করেন এটি সমাজ ব্যবস্থার শবযাত্রা। তাই তিনি সংগ্রামী মানুষের কন্ঠে ভাষা দিয়ে বলেন বিবৃতি কবিতায় "রক্তে আনো লাল,
রাত্রির গভীর বৃন্ত থেকে ছিঁড়ে আনো ফুটন্ত সকাল।"
অন্যায়কে সহ্য করলে অন্যায় কারীর শক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করা হয়। তাই কবি সকলের হয়ে তিনি অন্যায়কারীর প্রতি এই সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেন 'বোধন' কবিতায়, "শোন রে মালিক,শোন রে মজুতদার।
তোদের প্রাসাদে জমা হলো কত মৃত মানুষের হাড় -
হিসাব কি দিবি তার?"
শুধু তাই নয়,কবি চরম সাবধান বাণী করে রক্তচোষা মজুতদার কালোবাজারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, "আদিম হিংস্র মানবিকতার যদি আমি কেউ হই,
স্বজন হারানো শ্মশানে তোদের
চিতা আমি তুলবই।"
এই আমি কোন ব্যক্তি বিশেষ নয়,এই আমি বিরাট জনগণের এক সংগ্রামী চেতনা। রবীন্দ্রনাথের প্রতি,ইউরোপের উদ্দেশ্যে,চট্টগ্রাম ১৯৪৩, শত্রু এক,ডাক,মৃত্যুঞ্জয়ী গান, ফসলের ডাক, কৃষকের গান, অভিযান, ইত্যাদি কবিতা,নাটিক, গল্পের মধ্যেও দুর্ভিক্ষ মন্বন্তরের বাস্তব মর্মবিদারী চিত্র পাওয়া যায়। জনতার দাবিতে রেশনিং প্রথা ও চালু হয় কিন্তু সেই ব্যবস্থাকে ঘিরে ভেজাল ও চোরাকারবারও চলতে থাকে পুরো দমে। যার বিশ্বস্ত চিত্র পাই আমরা বিজন ভট্টাচার্যের আগুন নাটকে। কবি তার 'ভেজাল' কবিতায় বলেন, "ভেজাল পোশাক, ভেজাল খাবার,ভেজাল লোকের ভাবনা,
ভেজালেরই রাজত্ব এ পাটনা থেকে পাবনা।"
'ব্ল্যাক মার্কেট' কবিতায় ধনী রাম পোদ্দার ব্ল্যাক মার্কেট করে গরিব কৃষককে মেরে বালিগঞ্জে খান ছয় বাড়ি হাকিয়েছিলেন। একদিন তিনি দেখতে পেলেন যে তার বাড়ির চাকরটা রোজ বাজারে গিয়ে পয়সা চুরি করে। এরপরে তিনি সেই চাকরকে ধমক দেন। তারপর যা ঘটে, "খানিকটা চুপ করে বলল চাকর হরি,
আপনারই দেখাদেখি ব্ল্যাক-মার্কেট করি।''
'ক্ষুধা' ও 'দুর্বোধ্য' নামে দুটি গল্পে সুকান্ত দুর্ভিক্ষ মন্বন্তরের মর্মস্পর্শী কাহিনী তুলে ধরেন। ক্ষুধার জ্বালায় হিরু নিলু ও যশোদার মত কত মানুষ যে আত্মহত্যা করেছিলেন এবং অন্ধের স্ত্রীর মতো কত স্ত্রী যে ক্ষুধার জ্বালায় নিজের স্বামীকে ত্যাগ করে বাঁচবার জন্য অন্ধকারের পথ বেছে নিয়েছিলেন তার মর্ম বিদারী বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি অনুভব করেন, "আগ্নেয়গিরির অভ্যন্তরে লাভার মতোই তলে তলে উত্তপ্ত হচ্ছে দুর্ভিক্ষ' প্রতীক্ষা করছে বিপুল বিস্ফোরণের।" মন্বন্তরের পরের বছর অর্থাৎ ১৩৫১ বঙ্গাব্দে কৃষক সমিতি ও কমিউনিস্ট পার্টি কৃষকদের পুনর্বাসনের জন্য উদ্যোগ নেয়। কৃষকরা নতুন উদ্যমে কৃষিকার্য শুরু করেন কিন্তু কিছুতেই ভুলতে পারছিলেন না তারা মৃত আত্মপরিজনের কথা- "গত হেমন্তে মরে গেছে ভাই, ছেড়ে গেছে বোন,
পথ-প্রান্তরে খামারে মরেছে যত পরিজন।"
মহা দুর্ভিক্ষ মন্বন্তরের বছর দুয়েক পরেই তেভাগা আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে অবিভক্ত বাংলা। অহল্যা, গৌতমী, বাতাসীর রক্তে রাঙা বাংলায় হিন্দু-মুসলমান কৃষকের মিলিত বিদ্রোহে শোষণ মুক্তির দৃপ্ত শপথ দেখা দেয় বাংলার মানুষের মধ্যে। 'দুর্মর' কবিতায় শুনতে পাই এবার লোকের ঘরে ঘরে যাবে
সোনালী নয়কো, রক্তে রঙিন ধান,
দেখবে সকলে সেখানে জ্বলছে
দাউ দাউ করে বাংলাদেশের প্রাণ।
পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষের সময়ে এক অনাগত রবীন্দ্রনাথকে পঁচিশে বৈশাখের উদ্দেশ্যে কবিতায় প্রত্যক্ষ করেন কবি তিনি আশা করেন যে এই রবীন্দ্রনাথ এক নতুন রূপে দেখা দেবেন যাঁর- "বিপ্লবের স্বপ্ন চোখে, কন্ঠে গণ সংগীতের সুর।" প্রকাশের তারিখ: ১৬-আগস্ট-২০২৫ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|