সুভাষচন্দ্র বসু: স্বাধীনতার লড়াই, দেশপ্রেম ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী ঐতিহ্যের এক আইকন

Soumyadip Raha
কমিউনিজম ও ভারতীয় কমিউনিস্টদের প্রতি তাঁর আস্থা ১৯৩৮ সালেই দেখা যায় । সেইসময় শ্রেণি সংগ্রামের প্রতিও তাঁর আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। তিনি বলেন ," আমি আরও একটি কথা বলতে চাই । মার্কস ও লেনিনের লেখা থেকে এবং কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের নীতি সংক্রান্ত সরকারী বিবৃতি থেকে যে কমিউনিজমকে জানা যায়....


নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ভারতের স্বাধীনতা  আন্দোলনের এক অবিস্মরণীয় নাম । ভারতের জাতীয় আন্দোলন বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে এক নতুন মোড় নেয় । ছাত্র - মহিলা - শ্রমিক কৃষকদের রাজনৈতিক সংগঠিত সংগ্রাম এই সময় এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । সেইসময় বামপন্থী রাজনীতির উত্থান জাতীয় আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা যোগ করে । আর জাতীয় আন্দোলনের ঠিক এই সময় নেতাজির উত্থান । তাঁর আপোষহীন দেশপ্রেম , সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম ও জাতীয়তাবাদ এক উল্লেখযোগ্য অংশ। রবীন্দ্রনাথের কথায় হয়ে ওঠা দেশপ্রেমিক পরবর্তীতে হয়ে উঠলেন দেশনায়ক । 
             ১৯১৯ সালে তিনি ইংল্যান্ড যাত্রা করেন । ততদিনে রাশিয়ায় ঘটে গেছে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। বন্ধু চারুচন্দ্র গাঙ্গুলিকে কেমব্রিজ হতে লিখলেন , " স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন যে, ভারতের উন্নতি চাষা, ধোপা , মুচি, মেথরের দ্বারাই হইবে । কথা গুলি বড় ঠিক । পাশ্চাত্য জগতে দেখাইয়াছে, " Power of the People " কি করিতে পারে। তার উজ্জ্বলতর দৃষ্টান্ত হচ্ছে The first Socialist Republic in the world অর্থাৎ রাশিয়া । ভারতের উন্নতি যদি কোন দিন হয় সেটা আসবে ঐ Power of the People এর ভিতর দিয়া।  আধুনিক জগতে যে সব দেশ উন্নীত হইয়াছে সে সব দেশ ঐ Power of the People এর জাগরণ হইয়াছে। "১৯২২ সালে আগষ্ট মাসে নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য ওরফে মনোবেন্দ্রনাথ রায় কমিউনিষ্ট আন্তর্জাতিকের চতুর্থ কংগ্রেসে যোগদানের জন্য সুভাষচন্দ্র বসু ও চিররঞ্জন দাশকে (চিত্তরঞ্জন দাশের পুত্র) আমন্ত্রণ জানান। 
              উচ্চতর শিক্ষা সেরে আই সি এস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ইংল্যান্ড থেকে দেশে ফিরে তিনি সরাসরি রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন।  অসহযোগ আন্দোলন, আইন অমান্য আন্দোলন এসবের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে গান্ধীজির প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই একমুখী আন্দোলনের পন্থা থেকে নিজেকে বার করে আনেন । ১৯২৮ - র  সময় থেকে ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাসের পরিবর্তে নেতাজি পূর্ণ স্বরাজ কেই একমাত্র লক্ষ্য করার জন্য কংগ্রেসের অভ্যন্তরে দাবি জানান। এই সময় তৎকালীন কংগ্রেসের রক্ষণশীল ও দক্ষিণপন্থী অবস্থানের বিরূদ্ধে তাঁর নিরন্তর সংগ্রাম এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।  সুভাষচন্দ্র ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের অনুগামী। সুভাষচন্দ্র যুক্ত হয়ে পড়লেন শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের মধ্যে। ১৯৩০ এর মাঝামাঝি সময় থেকেই সি পি আই এর সাথে সম্পর্ক তৈরি হয়।  এই সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয় যখন গান্ধীজি সমর্থিত দক্ষিণপন্থী প্রার্থী পট্টভি সীতারামাইয়াকে ত্রিপুরী কংগ্রেসের সভাপতির পদে নির্বাচনে হারাতে সুভাষ চন্দ্র বসুকে সমর্থন করার সময়। দক্ষিণপন্থী কংগ্রেসীদের ক্রমাগত বাঁধা দানের জন্য তিনি সভাপতির পদে থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন । 

           কমিউনিষ্ট নেতা জ্যোতি বসু ছিলেন লন্ডন মজলিশের সম্পাদক । তাঁর কথা থেকে জন্য যায় , ত্রিপুরী ঘটনার ওপর তাঁরা লন্ডনে একটি সভা করেন।  সেখানে জ্যোতি বাবু নিজের বক্তব্য রাখেন সভা শেষে মজলিশের পক্ষ থেকে সুভাষচন্দ্রকে অভিনন্দন জানিয়ে একটি তারবার্তা ও প্রেরণ করা হয় । ১৯৩৮ এ কমিউনিষ্ট পার্টির পত্রিকা গণশক্তিতে তিনি শুভেচ্ছা বার্তা প্রেরণ করেন। প্রবন্ধ  লিখতেন মুখপত্র National Front - এ। হরিপুরা কংগ্রেসে সভাপতির অভিভাষনে ভারতের প্রধান জাতীয় সমস্যা হিসাবে তিনটি বিষয়কে চিহ্নিত করেছিলেন । দারিদ্র দূরীকরণ, শিক্ষার প্রসার ও উৎপাদন এবং বণ্টনের বিজ্ঞান সম্মত পদ্ধতি গ্রহণ । জাতীয় অর্থনীতির বিকাশের জন্য সুভাষচন্দ্র সোভিয়েত ধাঁচের পঞ্চ বার্ষিকী পরিকল্পনাকে উপযোগী বলে মনে করতেন । 
           সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ছাড়াও কমিউনিষ্ট পার্টি ১৯৩৮ সালে বন্দী মুক্তি আন্দোলন কংগ্রেসের অভ্যন্তরে কমিউনিস্টদের প্রভাব বৃদ্ধি করেছিল । নিউ এজ পত্রিকায় কমিউনিস্টরা "Vote for Bose - A vote for struggle." শীর্ষক একটি লেখা প্রকাশিত হয় । 
কমিউনিজম ও ভারতীয় কমিউনিস্টদের প্রতি তাঁর আস্থা ১৯৩৮ সালেই দেখা যায় । সেইসময় শ্রেণি সংগ্রামের প্রতিও তাঁর আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। তিনি বলেন ," আমি আরও একটি কথা বলতে চাই । মার্কস ও লেনিনের লেখা থেকে এবং কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের নীতি সংক্রান্ত সরকারী বিবৃতি থেকে যে কমিউনিজমকে জানা যায় , আমার বরাবর ধারণা এবং আমি নি:সন্দেহ যে,সেই কমিউনিজম জাতীয় স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামকে পুরোপুরি সমর্থন করে এবং তা তার বিশ্ববীক্ষার অঙ্গাঙ্গী অংশ বলেই স্বীকৃত। "একটা কথা মনে রাখা প্রয়োজন যে, কমিউনিস্টরাই তাঁকে ভারত থেকে বেরোতে সহায়তা করেছিল । তারপরের ইতিহাস এক অন্য ঘটনা।  
          তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ, ভাবনা চিন্তা সবটাই কেন্দ্রীভূত ছিল দেশের মুক্তি সংগ্রামকে ঘিরে । ধর্মনিরপেক্ষতা তাঁর এক অন্যতম পন্থা।  তাঁর সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী মনোভাব আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে। সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা আমাদের জাতীয় আন্দোলনের ভিতকে আরও শক্তিশালী করেছে । আজ যখন দুনিয়া জুড়ে অতি দক্ষিণপন্থীদের বাড়বাড়ন্ত । ভোগবাদী বনসাই কালচারে অভ্যস্ত করে একপেশে ভাবনাকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিকে স্বার্থান্বেষী গড়ে তোলার যে বিশাল চক্রান্ত তাঁকে ভাঙতে দরকার সুভাষচন্দ্রের চর্চা । বিচ্ছিন্নতাবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তির হাত থেকে সুভাষচন্দ্র বসুকে রক্ষা করা এ সময়ের সবথেকে বড় কর্তব্য । বৃহত্তর স্বার্থেই বামপন্থার বিকাশে ও ঐক্য গড়ে তুলতে সুভাষ বসুর চর্চা খুবই প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রকাশের তারিখ: ২৩-জানুয়ারি-২০২৬

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org