স্টেফান জুইগ: ফ্যাসিবাদী আক্রমণের রূপরেখা

Shyamashis Ghosh
ভারতের নয়া ফ্যাসিবাদীরা সংসদ ভেঙে দেয়নি, কিন্তু সংসদকে গুরুত্বহীন করে চলেছে। স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার কোমর ভেঙে দিচ্ছে। প্রশাসনিক বিভাগকে আর এসএস’র নিয়ন্ত্রণে আনার যাবতীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইতিহাসের শিক্ষা, সমসাময়িকরা তাঁদের সময়ের তোলপাড় করা নির্ণায়ক ঘটনাবলির শুরুর সময়কার লক্ষণগুলি প্রায়শই চিনতে পারেন না একইভাবে, আমিও ঠিক বলতে পারি না প্রথম কবে অ্যাডলফ হিটলারের নাম শুনেছিলাম, যে নামটি বছরের পর বছর ধরে, আমরা রোজ চিন্তা করতে বা উচ্চারণ করতে বাধ্য হয়েছি; সেই ব্যক্তি যিনি আমাদের পুরো ইতিহাসের সময়ের মধ্যে অন্য যে কারও চেয়ে বেশি অমঙ্গল নিয়ে এসেছেন … 

অস্ট্রিয়ান ইহুদি লেখক, স্টেফান জুইগ, ১৯৪১ সালে তাঁর স্মৃতিচারণা, The World of Yesterday, গ্রন্থে উপরের কথাগুলি লিখেছিলেন চরম আফসোসের সঙ্গে- সভ্যতা অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। তিনি নিজের চোখে দেখেছেন অস্ট্রিয়া এবং পাশের দেশ জার্মানিতে ফ্যাসিজমের উত্থান, লেখক বুদ্ধিজীবী সমেত সকলেই কীভাবে এর প্রাথমিক লক্ষণগুলিকে সমর্থন বা উপেক্ষা করেছেন, কীভাবে মিডিয়ার নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে এর স্বপক্ষে প্রচার চলেছিল। জুইগ ১৯৩৪ সালে অস্ট্রিয়া থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর স্যালজবুর্গের (অস্ট্রীয়-জার্মান সীমান্তের কাছাকাছি একটি শহর) বাড়িতেও তল্লাশি চালানো হয়েছিল গোপন অস্ত্র খুঁজে বের করার নামে। সেই রাতেই তিনি দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। জুইগ এবং তাঁর স্ত্রী ইংল্যান্ডে চলে যান, তারপর নিউ ইয়র্ক শহর তাঁদের বাসস্থান হয়ে ওঠে।

জুইগের এক পরিচিত জনের কাছে অনেক দিন আগে শুনেছিলেন যে মিউনিখ আবার অশান্ত হয়ে উঠছে, হিটলার নামের এক উন্মত্ত আন্দোলনকারীর জন্য, যিনি প্রজাতন্ত্র ও ইহুদিদের বিরুদ্ধে অশালীনভাবে বিষোদ্গার করছেন। নামটি অবশ্য তখন জোইগের মনে বিশেষ ছাপ ফেলেনি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং ভার্সাই চুক্তির ফলস্বরূপ, জার্মান নাগরিকদের অর্থনৈতিক দুর্দশা এবং অপমানের মুখোমুখি হয়েছিলেন; জন্ম দিয়েছিল ব্যাপক ক্ষোভের। এই জাতীয়তাবাদী আবেগ, পরবর্তী বছরগুলিতে নতুন বর্ণবাদী মতবাদের দৌলতে আরও বৃদ্ধি পায় – যে কোনও ধরনের চরমপন্থী প্রকল্পকে উজ্জীবিত করার জন্য যথেষ্ট। বিশ্বজুড়ে এই নীতিগত অবক্ষয়ের পিছনে প্রচারমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। হিটলারের ভাষণে শুধু ‘শান্তি’ শব্দটি একবার উচ্চারিত হলেই সংবাদপত্রগুলি উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠত, তাঁর সব অতীত কর্মকাণ্ড ভুলে যেত, এবং এই প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকত, কেন, জার্মানি এত পাগলের মতো অস্ত্র সজ্জিত হচ্ছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই প্রচারাভিযানের জোয়ার বাড়তে থাকে, সংবাদপত্র, পত্রিকা এবং রেডিওয় তা ছড়িয়ে পড়ে এবং পাঠকদের অনুভূতি বোধকে নষ্ট করে দেয়। অবশেষে, এমনকি সৎ উদ্দেশ্যবিশিষ্ট সাংবাদিক এবং বুদ্ধিজীবীরাও এতে জড়িয়ে পড়েন – জোয়িগের ভাষায় ‘উত্তেজনার ডোপিং’। এই কৃত্রিম আবেগের প্ররোচনারই পরিণতি অকল্পনীয় গণবিদ্বেষ এবং আতঙ্ক। হিটলার মিথ্যা বলাকে একটি স্বাভাবিক বিষয় করে তুলেছিলেন, ঠিক যেমন তিনি মানবতার বিরোধীতাকে আইনসংগত করে তুলেছিলেন।

জুইগ একটি সুযোগ পেয়েছিলেন, এস এ ঝটিকাবাহিনীর রণকৌশল দেখার। একটি সীমান্ত গ্রামে, সোস্যাল ডেমোক্র্যাটদের একটি শান্তিপূর্ণ সভায়, হঠাৎ চারটি লরি এসে দাঁড়ায়, একটি চমকের মতো একদল তরুণ, ন্যাশনাল সোস্যালিস্ট ঝটিকাবাহিনীর সদস্য, একটি হুইসেলের শব্দে গাড়ি থেকে নামে, সবাইকে রাবারের লাঠি দিয়ে পেটায়; পুলিশ হস্তক্ষেপ করার আগে বা শ্রমিকরা নিজেদের সংগঠিত করার আগে, তারা লরিতে ফিরে গিয়ে তীব্র গতিতে উধাও হয়ে যায়। এটি পরিষ্কার ছিল যে প্রত্যেকে জানত তাদের কী কী করতে হবে – প্রতিটি কাজ নিখুঁতভাবে অনুশীলন করা।

সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের সমাবেশগুলির দিকে তাকালেই চোখে পড়ত শৃঙ্খলা এবং আর্থিক সংস্থানের দিকে – তাল-মেলানো অনুশীলন এবং নতুন ইউনিফর্ম এবং অটোমোবাইল, মোটরসাইকেল এবং ট্রাকের অসাধারণ বহর, প্রত্যেকের আস্তিনে স্বস্তিকা চিহ্ন। এই বাহিনী প্রশিক্ষিত ছিল আক্রমণ, বলপ্রয়োগ এবং ভয় দেখানোয়। এই তরুণেরা সেনাবাহিনীর কাছ থেকে কৌশল শিখছিল – প্যারামিলিটারি শৃঙ্খলা।

শীঘ্রই এই গোপন কৌশলগুলির বিষয়ে আরো খবর পাওয়া যায়। গভীর রাত্রিতে, যুবকেরা তাদের বাড়ি থেকে চুপিসাড়ে বেরিয়ে এসে মধ্যরাত্রির ‘এলাকাভিত্তিক অনুশীলনে’ যোগ দিত; রেইখসওয়েহর এর সক্রিয় দায়িত্বে থাকা বা অবসরপ্রাপ্ত অফিসাররা, রাষ্ট্র বা দলের আর্থিক সাহায্য পেত, এই বাহিনীদের প্রশিক্ষণ দিতে। কর্তৃপক্ষ এই অদ্ভুত রাত্রিকালীন কার্যকলাপের প্রতি তেমন মনোযোগ দিত না। এমনকি, যাঁরা গোপনে এই আন্দোলনকে সমর্থন করেছিল, তাঁরাও অবশেষে এর নৃশংসতা এবং দ্রুত বৃদ্ধি দেখে আশঙ্কিত হয়ে পড়েছিল।

১৯২৩ সালের এক সকালে, হিটলার মিউনিখ দখল করেন, সকল সরকারি ভবন দখল করে, সংবাদপত্রগুলিকে বন্দুকের মুখে বিজয়ের সংবাদ ঘোষণা করতে বাধ্য করেন। তবে এই অভ্যুত্থান দুপুরের মধ্যে শেষ হয়ে যায়; হিটলার পালিয়ে যায় এবং শীঘ্রই গ্রেপ্তার হয়; ‘স্বস্তিকা’ অদৃশ্য হয়ে যায়, ঝটিকাবাহিনী এবং অ্যাডলফ হিটলারের নাম প্রায় অগোচরে চলে যায়। কয়েক বছরের মধ্যেই আবার দ্রুতগতিতে উত্থান ঘটে, সেই সময়কার অসন্তোষ কাজে লাগিয়ে। মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, রাজনৈতিক সংকট, জার্মান জনগণকে অশান্ত করে তুলেছিল; বৈশিষ্টগতভাবে, জার্মান জনগণের সকল স্তরে একটি শৃঙ্খলার আকাঙ্ক্ষা ছিল – স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই শৃঙ্খলার প্রতিশ্রুতি দিয়েই হিটলার বহু মানুষের সমর্থন পান।

১৯৩০ সালের নির্বাচনে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা, দু বছর আগের দশ লক্ষের নিচে থেকে, ষাট লক্ষের বেশি ভোট পান। এই ব্যাপক জনসমর্থনের পরিণাম কী হতে পারে তা বোঝেননি জুইগ। তিনি নাৎসিদের জয়ের দায় চাপিয়েছিলেন দেশের প্রাচীন পন্থার ডেমোক্র্যাটদের সংকীর্ণতার উপর; ফলাফল অদূরদর্শী হলেও, প্রথাগত রাজনীতির মন্থরতা এবং অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে সঠিক এবং গ্রহণযোগ্য যুব বিদ্রোহ হিসাবে।

জুইগ নিজে অথবা তাঁর বৌদ্ধিক সঙ্গীরা প্রথমদিকে হিটলারের জয়ের তাৎপর্য বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। যাঁরা হিটলারের বইটি পড়েছিলেন, তাঁরা এর বাগাড়ম্বরপূর্ণ কৃত্রিম ভাষাকে উপহাস করেছেন, কিন্তু তাঁর পরিকল্পনার দিকে মনোযোগ দেন নি, হিটলারকে গুরুত্ব দেননি। এমনকি ১৯৩০ এর দশকে, বড় গণতান্ত্রিক সংবাদপত্রগুলি, তাদের পাঠকদের সতর্ক করার পরিবর্তে, তাদের আশ্বস্ত করছিল যে, এই আন্দোলন অতি শীঘ্রই ভেঙে পড়বে।

এতগুলি বছর ধরে কীভাবে জার্মানি হিটলারের ব্যক্তিত্ব এবং বেড়ে ওঠার ক্ষমতাকে অবহেলা করেছে, তার আসল কারণ হয়তো বাইরের বিশ্বে কখনোই স্পষ্ট হয়নি। জার্মানি কেবল একটি শ্রেণি-সচেতন দেশই নয়, বরং এই শ্রেণি-আদর্শের মধ্যেও, প্রথাগত শিক্ষার প্রতি অন্ধ ভক্তি এবং দেবত্বের মর্যাদা আরোপিত হয়েছিল। নিজেদের উচ্চশিক্ষার জন্য গর্বিত, বুদ্ধিজীবী শ্রেণি ধারণা করতে পারেনি যে, এর পিছনে রয়েছে অদৃশ্য মদতদাতাদের হাত, যাঁরা প্রত্যেকেই বিশ্বাস করেছিল যে তাঁরা এই ‘অজ্ঞাত সৈনিকে’র রহস্যময় শক্তিকে কাজে লাগাতে পারবে নিজেদের স্বার্থে। ১৯৩৩ সালের জানুয়ারিতে, তাঁর  চ্যান্সেলর হওয়ার ঘটনাকেও, জনসাধারণ এবং তাঁর সমর্থকরাও, স্বল্পস্থায়ী বিষয় হিসেবে দেখেছিলেন।

এখানেই হিটলারের আত্মবিশ্বাসী প্রতিভার কৌশল বড় পরিসরে প্রথমবারের মতো নজরে আসে। বহু বছর ধরে তিনি সকলকেই বহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন অর্জন করেছেন। তাঁর ক্ষমতায় আসায় বেশিরভাগ শিবিরই আনন্দ করেছিল। রাজতন্ত্রবাদীরা মনে করেছিল তিনি কাইজারের বিশ্বস্ত প্রতিভূ, এবং তাঁকে ‘নিজেদের লোক’ মনে করেছিল। জার্মান ন্যাশনালিস্টরা আশা করেছিল যে তিনি তাঁদের খাদ্যসংস্থান পূর্ণ করবেন; তাঁদের নেতা, হুগেনবার্গ, হিটলারের মন্ত্রিসভায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছিলেন, যদিও তাঁকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ছাঁটাই করা হয়। ভারী শিল্প নিশ্চিন্ত হয়েছিল বলশেভিকের বিপদ থেকে মুক্তি পাবে ভেবে; বহু বছর ধরে গোপনে অর্থসাহায্য করেছিল তারা; একইসাথে, দারিদ্র্যগ্রস্ত সাধারণ নাগরিক, যাদের জন্য বারবার ‘সুদ-দাসত্ব’ থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, আনন্দের নিঃশ্বাস ফেলেছিল। ক্ষুদ্র দোকানদারেরা মনে রেখেছিল, তাদের বড় প্রতিযোগী, বড় বিভাগীয় দোকানগুলি বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতি (এই প্রতিশ্রুতি কখনও পূর্ণ হয়নি); সামরিক বাহিনী, হিটলারের সামরিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং শান্তিবাদী আন্দোলনের বিরোধিতার জন্য, তাঁকে স্বাগত জানিয়েছিল। এমনকি স্যোশাল ডেমোক্র্যাটরাও তাঁর উত্থানে খুব অখুশী ছিল না; তারা আশা করেছিল যে তিনি তাদের প্রধান শত্রু, কম্যুনিস্টদের বিদায় করবেন। বিভিন্ন মতের, এমনকি বিপরীত মতের বিভিন্ন বিরোধী দল এই ‘অজানা সৈনিক’কে ভেবেছেন নিজেদের বন্ধু হিসেবে – এমনকি জার্মান ইহুদিরাও খুব চিন্তিত ছিল না। তাঁরা নিজেদের আশ্বস্ত করতেন যে একজন ইহুদি-বিদ্বেষী আন্দোলনকারী চ্যান্সেলর হওয়ার পরে, স্বাভাবিকভাবেই এমন অশিষ্টতা থেকে সরে আসবেন। আর সবার উপরে বিশ্বাস ছিল, এমন একটি রাষ্ট্রে জোর করে কিছু করা সম্ভব না, যেখানে আইন দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত, যেখানে পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাঁর বিপক্ষে, এবং যেখানে প্রতিটি নাগরিকের স্বাধীনতা ও সমানাধিকার দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত।

এরপর আগুন লাগল রাইখস্টাগে – এই অগ্নিসংযোগের ঘটনায়, হিটলার কমিউনিস্টদের উপর মিথ্যা দোষারোপ করেছিলেন। সংসদ অদৃশ্য হয়ে গেল, গোয়েরিং তাঁর বাহিনীকে লেলিয়ে দিল, এবং এক ধাক্কায় জার্মানির সমস্ত ন্যায়বিচার ভেঙে পড়ল। একটি প্রতীকি ভবনের ধ্বংস – সরকারের কাছে হয়ে উঠল নিজের দেশের নাগরিকদের সন্ত্রস্ত করার একটি অজুহাত। কাঁপতে কাঁপতে মানুষ জানল শান্তিকালের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প এবং ব্যারাকের মধ্যে নির্মিত গোপন কক্ষগুলির কথা, যেখানে নিরপরাধ মানুষকে বিচার বা আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই হত্যা করা হচ্ছিল। মানুষ নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছিল, এটি শুধুমাত্র একটি প্রাথমিক, অর্থহীন ক্রোধের বিস্ফোরণ। এই ধরনের আচরণ বিংশ শতাব্দীতে চিরকাল চলতে পারে না। কিন্তু এটি ছিল কেবল শুরু। বিশ্ব হতবাক হয়েছিল এবং প্রথমে এই অবিশ্বাস্য বিষয়টি বিশ্বাস করতে চায়নি।

তবে সেই দিনগুলিতেই প্রথম শরণার্থীদের দেখতে পেয়েছেন জুইগ। হিটলারের চ্যান্সেলর পদে নিয়োগের পরে অল্প সময়ের মধ্যেই, কীভাবে জার্মানি থেকে শরণার্থীদের দল সালজবুর্গ পর্বত হেঁটে পার হয়ে অস্ট্রিয়ায় চলে যাচ্ছিল – ক্ষুধার্ত, দীনহীন, চিন্তিত – মানবতাবিরোধী এই অসাধারণ ত্রাস থেকে বাঁচবার জন্য, যা অচিরেই পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু তখনও সেই পলাতকদের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি সন্দেহ করেননি যে তাঁরা সবাই, এক এক করে, একদিন এই ব্যক্তির ক্ষমতালালসার শিকার হবেন।

অনেক বছরের গভীর বিশ্বাসকে কয়েকটি সপ্তাহের সংক্ষিপ্ত সময়ে ঝেড়ে ফেলতে পারা যায় না। ন্যায়বিচারের ধারণার নিশ্চিন্ততার মধ্যে সকলে বিশ্বাস করেছিলেন যে জার্মান-, ইউরোপীয়- এবং বিশ্ব-বিবেক এখনও বেঁচে আছে এবং নিশ্চিত ছিলেন যে মানবজাতির উপর এমন একটি বর্বরতা অচিরেই বিলুপ্ত হবে। ১৯৩৩ এবং এমনকি ১৯৩৪ সালেও জার্মানীতে এবং অস্ট্রিয়াতে কেউই ভাবতে পারেননি যে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাঁদের উপর ভয়ঙ্কর কিছু নেমে আসতে চলেছে।

রাইখস্টাগ অগ্নিকাণ্ডের পরেই জুইগ তাঁর প্রকাশকের কাছে আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে জার্মানিতে তাঁর বই সম্ভবত নিষিদ্ধ হতে চলেছে। তাঁর প্রকাশক হতবাক হয়ে বলেছিলেন, “আপনার বই নিষিদ্ধ করার কে আছে; আপনি জার্মানির বিরুদ্ধে কখনো একটি শব্দও লেখেননি বা রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেননি।” বাস্তবেই জুইগ কোনওদিন রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েননি, এবং, জার্মান বা কোনও দেশের সরকারের সমালোচনা করেন নি। তাঁর স্মৃতিকথায় সে প্রসঙ্গে পরিষ্কার করে বলেছেন। বই জ্বালানোর এবং প্রকাশ্যে অবমাননা করার মতো ভয়ানক বিষয়গুলি, মাত্র কয়েক মাস পরেই বাস্তব হয়ে উঠেছিল।

ন্যাশনাল সোস্যালিস্টরা (নাৎসি বা নাজি) অবশ্য, এই বিবেকবর্জিত নীতিগুলি সম্পূর্ণ মাত্রায় বিশ্বের সামনে আনার ক্ষেত্রে খুব সতর্ক ছিল। তারা তাদের পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিল সাবধানে: শুরুতে শুধু একটি ডোজ এবং তারপর এর শক্তির প্রভাব দেখতে কিছু সময়ের জন্য অপেক্ষা করা, বিশ্বের আত্মসম্মান এই মাত্রার পরিমাণ হজম করতে পারে কিনা। বাকি ইউরোপ – সভ্যতার পক্ষে দুঃখ এবং লজ্জার কথা – উদ্বেগহীন ছিল, কারণ, এই অন্যায়গুলি ‘অন্য দেশে’ ঘটছিল। মাত্রাগুলি ক্রমাগত বাড়তে থাকে যতক্ষণ না সম্পূর্ণ ইউরোপ পরিশেষে ধ্বংস হয়। হিটলারের সব উদ্ভাবনী কৌশলের সেরা ছিল এটি – ধীর গতিতে নিজের পথ খুঁজে বের করা এবং নৈতিকভাবে এবং শীঘ্রই সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া ইউরোপের বিরুদ্ধে উত্তরোত্তর শক্তিপ্রয়োগে ধারাবাহিকভাবে চাপ বাড়ানো।

জার্মানিতে সবধরণের স্বাধীন বক্তব্য এবং প্রতিটি স্বাধীন বই ধ্বংসের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাও এই পদ্ধতি অনুযায়ী বাস্তবায়িত হয়। বইগুলি বন্ধ করার জন্য আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি করা হয়েছিল দু’বছর পর; প্রথম আক্রমণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ন্যাশনাল সোস্যালিস্ট ছাত্রদের উপর। ইহুদিদের বয়কট কার্যকর করার জন্য ‘জনতার ক্রোধ’ উসকে দেওয়ার পদ্ধতিটিই ব্যবহৃত হয়েছিল; প্রথমে ছাত্রছাত্রীদের প্ররোচিত করা বইয়ের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে তাদের “অসন্তোষ” প্রদর্শনের জন্য। জার্মান ছাত্রছাত্রীরা সমবেত হয়ে বইয়ের দোকান থেকে বইগুলির কপি সংগ্রহ করে এবং বইগুলি নিয়ে, পতাকা ওড়াতে ওড়াতে মার্চ করে; একটি খোলা চত্বরে প্রাচীন জার্মান প্রথা অনুযায়ী বইগুলি একটি কাঠের শাস্তিস্তম্ভের সাথে পেরেক দিয়ে গেঁথে দেয় – মধ্যযুগীয়তা হঠাৎ করে তাদের শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে। মানুষকে জ্বালানোর অনুমতি না মেলায়, তারা দেশপ্রেমের অনুভূতি নিয়ে বইগুলি পুড়িয়ে ছাই করে দিত বিশাল আগুন জ্বালিয়ে। যদিও প্রচারমন্ত্রী গোয়েবলস দীর্ঘ দ্বিধার পর শেষ মুহূর্তে বই পোড়ানোর অনুষ্ঠানে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তবুও এটি ছিল একটি অর্ধ-প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম; এবং সাধারণ জনগণ এইরকম বই পোড়ানো ও নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানায়নি। বই বিক্রেতাদের সতর্ক করা হয়েছিল বই প্রদর্শন না করার জন্য। এরপরে আসে সেই মহান আদেশ, যার মাধ্যমে ‘জার্মান জনগণের সুরক্ষার জন্য’ বইগুলির মুদ্রণ, বিক্রয়, এবং বিতরণকে অপরাধ ঘোষণা করা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রেও জুইগের জীবন খুব সুখের ছিল না। তিনি বারবার বলতেন, ইউরোপ আত্মহত্যা করছে; এক বন্ধুকে বলেছিলেন যে তিনি যেন একটি ‘মৃতপ্রায়’ জীবন কাটাচ্ছেন। সীমান্তহীন, সহিষ্ণু ইউরোপ নিয়ে তাঁর স্বপ্ন বিধ্বস্ত হয়েছে। লেখক জুল রোমাঁকে লিখেছিলেন, “আমার অন্তর্দ্বন্দ্ব এই যে পাসপোর্টের ‘আমি’র সঙ্গে, নির্বাসিত ‘আমি’কে মেলাতে পারছি না।”

১৯৪২ সালের ফেব্রুয়ারিতে, তাঁর স্ত্রীর সাথে একসঙ্গে জুয়িগ আত্মহত্যা করেন- অতিরিক্ত মাত্রায় ঘুমের বড়ি খেয়ে। যে আনুষ্ঠানিক আত্মহত্যার বার্তা তিনি রেখে যান, তাতে জুইগ লিখেছিলেন যে, সক্ষমতা থাকতে থাকতেই, সম্মানের সাথে নিজেকে সরিয়ে নেওয়াই অধিক শ্রেয় মনে করেন, কারণ তিনি এমন একটি জীবন কাটিয়েছেন যেখানে বৌদ্ধিক শ্রমের অর্থ ছিল বিশুদ্ধ আনন্দ এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতাই পৃথিবীর সর্বোচ্চ কাম্য।

স্টেফান জুইগ কমিউনিস্ট-বিরোধী নন, তবে তার রচনায় প্রায়শই অবাধ ক্ষমতার বিপদ এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার দমনকে ফুটিয়ে তোলে। তিনি সাধারণভাবে যে কোনও ধরণের কর্তৃত্ববাদী শাসনের সমালোচক ছিলেন। ১৯২৭ সালে লেখা তার বই ‘Decisive Moments in History’-তে লেনিনের নেতৃত্বে ১৯১৭ সালের অক্টোবর মাসে রাশিয়ার ক্ষমতা দখলকে বিশ্ব ইতিহাসের তিনটি সবচেয়ে নির্ধারক ‘মুহূর্ত’র একটি হিসেবে গণ্য করেন। অন্য দুটি ঘটনা ছিল ১৪৫৩ সালে কন্সটান্টিনোপলের পতন এবং ১৮১৫ সালে ওয়াটারলুতে নেপোলিয়নের পরাজয়। রাশিয়ায় বিপ্লবের প্রভাব সম্পর্কে তার মতামত এক ধরণের সচেতনতা ও স্বীকৃতিরই ইঙ্গিত দেয়, যদিও একে কোনোভাবেই কমিউনিজমের সমর্থন বিবেচনা করা যায় না।

চীনে, ১৯৪৯ সালের কমিউনিস্ট বিজয়ের পরে জুইগের কাজকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। বুর্জোয়া শ্রেণির পটভূমি এবং তার লেখার বিষয়বস্তু সত্ত্বেও সমালোচকরা মূলত তার লেখায় মধ্যবিত্ত সমাজের নৈতিক অধঃপতন, কপটতার বর্ণনা ইত্যাদির প্রতি মনোযোগ দেন। পরে চীনের কয়েকজন সমালোচক জুইগের বক্তব্যকে বুর্জোয়া সমাজের প্রতি সমালোচনা হিসাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জুইগের লেখা জোরের সঙ্গে বুর্জোয়া সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, শূন্যগর্ভ আস্ফালন, কপটতা এবং পাশবিকতার বিরোধিতা করে, বিশেষ করে নারীরা ঐ ব্যবস্থায় ভোগান্তির শিকার হন। জুইগের লেখায় বিশদ মনস্তাত্ত্বিক বিবরণ এক নিষ্ঠুর এবং ভণ্ড বুর্জোয়া পুঁজিবাদী সমাজকেই উন্মোচিত করেছিল।

স্টেফান একজন প্যাসিফিস্ট (শান্তিকামী) ছিলেন, আন্তর্জাতিক স্তরের সহযোগিতায় বিশ্বাস করতেন এবং জাতীয়তাবাদ ও যুদ্ধের সমালোচনা করতেন। শান্তিবাদ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বিশ্বাসই তাকে ইউরোপে উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং যুদ্ধবাজ মানসিকতার উদীয়মান প্রবাহের সঙ্গে বিরোধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

জুইগ উপলব্ধি করেছিলেন ভবিষ্যতের জন্য একটি বার্তা হিসাবেই আত্মজীবনী লেখা জরুরি। নাৎসিদের অত্যাচারের শাসন প্রতিষ্ঠা কিভাবে সম্ভব হল, তিনি এবং অনেকেই যে সেই ব্যবস্থা পত্তনের সময়ে চোখ বুজে ছিলেন, তার পদচিহ্নের সন্ধানে – যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানুষদের সুবিধা হয় একে বুঝতে।

অতীতের এইসব ফ্যাসিস্ট কার্যকলাপের দিকে ফিরে দেখলে দেখা যাবে, প্রাথমিকভাবে নানা আইনের মাধ্যমে নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া, রুটিরুজি কেড়ে নেওয়া, কাজের অধিকার কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমেই সবকিছুর শুরু। এইসবেরই চূড়ান্ত পরিণতি ছিল হলোকস্ট; প্রায় ৬০ লাখ ইহুদির পরিকল্পিত হত্যা। এই পদক্ষেপগুলি ছিল একটি জাতির অধিকার, সম্মান এবং অস্তিত্বকে ধাপে ধাপে কেড়ে নেওয়ার ভয়াবহ উদাহরণ।

আমেরিকা সমেত ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও নয়া ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। পুঁজিবাদের আর এক গভীর সংকট কাটানোর মরিয়া প্রচেষ্টা। বর্তমান ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্রের লক্ষ্যও ঐ একই দিকে। প্রথমে মুসলমান, খ্রীষ্টান ইত্যাদি ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং দলিত সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ, পিটিয়ে মারা– আসলে জনমানসে আতঙ্ক ধরিয়ে দেওয়া। এরপরেও যারা থেকে গেল তাদের ভিনদেশী চিহ্নিত করে তাড়াও, আইনের তোয়াক্কা না করেই। প্রথমে ভোটের অধিকার প্রথমে কেড়ে নাও, তারপর নাগরিকত্ব অবধি।

হিটলার মুসোলিনি’র সময়ের ফ্যাসিবাদের থেকে অবশ্যই ভিন্ন আজকের নয়া-ফ্যাসিবাদ। নতুন কায়দা, কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। ভারতবর্ষের গণতন্ত্রের মূল তিনটি স্তম্ভ হল আইনসভা, কার্যনির্বাহী বিভাগ বা প্রশাসন এবং স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা। এছাড়াও গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয় সংবাদ মাধ্যমকে।  ভারতের নয়া ফ্যাসিবাদীরা সংসদ ভেঙে দেয়নি, কিন্তু সংসদকে গুরুত্বহীন করে চলেছে। স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার কোমর ভেঙে দিচ্ছে। প্রশাসনিক বিভাগকে আর এসএস’র নিয়ন্ত্রণে আনার যাবতীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের ৭৫ শতাংশের বেশি সংবাদমাধ্যম নয়া-ফ্যাসিবাদী আরএসএস-এর ঘনিষ্ঠ কর্পোরেটের মালিকরাই। শিক্ষার গৈরিকিকরণ মানুষকে প্রকৃত ইতিহাস ভুলিয়ে দিতে চাইছে – অবৈজ্ঞানিক, অন্ধ কুসংস্কার গ্রাস করছে সমাজকে।

আজকের এই আক্রমণ ধর্মীয় সংখ্যালঘু, সাধারন শ্রমজীবী মানুষের ওপর। এরপরে তা নেমে আসবে সবার উপর।

এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।

চোখ খুলে রাখা, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ গড়ে তোলার গুরুত্ব এখানেই।

প্রকাশের তারিখ: ০৭-আগস্ট-২০২৫

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org