সঙ্ঘের ‘হেট ওয়াচ’: হিন্দুরা সবচেয়ে বিপদে যোগী রাজ্যে!

Chandan Das
যে রাজ্যগুলিতে সঙ্ঘের হিসাবে হিন্দুদের বিপন্নতা বেশি তার সবকটিই বিজেপি শাসিত। তার মধ্যে সবার আগে উত্তরপ্রদেশ।

‘হিন্দু খতরে মে হ্যায়’—  পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের আগেও বিজেপি’র প্রচারের অন্যতম ভাষ্য ছিল এমনই। পশ্চিমবঙ্গ ‘বাংলাদেশ’ হয়ে যাচ্ছে, রাজ্যের জনবিন্যাস বদলে যাচ্ছে, এই সব প্রচার লাগাতার চলেছে সেই ভাষ্যের ভিত্তিতে। বিধানসভা নির্বাচন উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী রাজ্যে দলীয় প্রচারে ১৯টি কর্মসূচিতে ছিলেন। তাঁর ভাষণেও ছিল, ‘অনুপ্রবেশকারীদের জন্য রাজ্যের যুবকরা কাজ পাচ্ছেন না’,‘মৎস্যজীবকীরা মাছ পাচ্ছেন না অনুপ্রবেশকারীদের জন্য’। এই বক্তব্যেরও মোদ্দা কথা ‘অনুপ্রবেশকারী’, অর্থাৎ আরএসএস-এর মতে যাঁরা শুধুই মুসলমান, তাঁদের জন্য রাজ্যের বাসিন্দারা বিপদে পড়ছেন। এছাড়া ‘হিন্দুরা বিপন্ন’ প্রচারের আরও অনেক মাধ্যমে লাগাতার সক্রিয় আরএসএস সহ হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি। যেমন, ‘লাভ জিহাদ’, ‘ধর্মান্তরকরণ’,‘হিন্দু দেবদেবীর অবমাননা’,‘মন্দির ধ্বংস’।

আরএসএস-এর মুখপত্র অরগানাইজার ‘হিন্দু খতরে মে হ্যায়’ প্রচারকে সংগঠিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। এই পত্রিকাটি ‘হেট হিন্দু ওয়াচ’ শিরোনামে খবর প্রকাশ করে ধারাবাহিকভাবে। প্রতি সপ্তাহে হিন্দুদের উপর আক্রমনের নানা ঘটনা ‘হেট হিন্দু ওয়াচ’ শিরোনামে প্রকাশিত হয় অরগানাইজারে। সেখানে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য তো বটেই কানাডা, পাকিস্তান, বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর আক্রমনের প্রমাণ হিসাবে নানা ঘটনার উল্লেখ করে তারা।

চলতি বছরে ২২শে মার্চ থেকে ৩রা মে—  এই সাত সপ্তাহের ‘হিন্দু হেট ওয়াচ’ পর্যালোচনা করলে কতগুলি বৈশিষ্ট্য উল্লেখযোগ্য। এই সাত সপ্তাহে ৩৬৯টি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে ‘হিন্দু হেট ওয়াচ’-এ। তার মধ্যে ৯৬টি ঘটনা ঘটেছে উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন থানা এলাকায়। সঙ্ঘের এই হিসাবে হিন্দুদের পক্ষে বিপজ্জনক দ্বিতীয় স্থান মহারাষ্ট্র। সেখানে এই সময়ে ঘটনা ঘটেছে ৪০টি। তৃতীয় স্থানে আছে মধ্যপ্রদেশ। এই রাজ্যে ৩৪টি এমন ঘটনা ঘটেছে, যাকে আরএসএস মনে করেছে হিন্দুদের পক্ষে বিপজ্জনক। সঙ্ঘের ‘হিন্দু হেট ওয়াচ’-এ বাংলাদেশে ‘হিন্দুদের উপর আক্রমন’-এর ঘটনা তুলনামূলক অনেক কম—  ২০টি। যে রাজ্য ‘বাংলাদেশ হয়ে যাচ্ছে’ বলে দেদার প্রচার হয়েছে, সেই পশ্চিমবঙ্গে সঙ্ঘের ধারনা অনুসারে হিন্দুদের বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রচার, হিন্দুদের উপর আক্রমনের ঘটনা ওই সাত সপ্তাহে ১৮টি ঘটেছে।

যে রাজ্যগুলিতে সঙ্ঘের হিসাবে হিন্দুদের বিপন্নতা বেশি তার সবকটিই বিজেপি শাসিত। তার মধ্যে সবার আগে উত্তরপ্রদেশ। ওই সাত সপ্তাহে পৃথিবীর খোঁজ রাখা ‘হিন্দু হেট ওয়াচ’-এর হিসাবে যত ঘটনা ঘটেছে, তার ২৬শতাংশ ঘটেছে উত্তরপ্রদেশে। অথচ উত্তরপ্রদেশ সারা পৃথিবীতে হিন্দুরাষ্ট্রকামীদের মডেল। সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের ভাষণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার তাঁর শাসনের পদ্ধতি নিয়ে সোসাল মিডিয়ায় জোরদার প্রচার হয়। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে আদিত্যনাথ ছিলেন বিজেপি’র অন্যতম তারকা-প্রচারক। কিন্তু এই ‘ধরা ধামে’ হিন্দুরা সবচেয়ে বেশি বিপদে আছে উত্তরপ্রদেশে। বামপন্থীরা নন, জানাচ্ছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস)।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে কী ধরনের ঘটনাকে ‘হিন্দুদের পক্ষে বিপজ্জনক’ বলে সঙ্ঘ মনে করছে? উত্তরপ্রদেশের উদাহরণই দেওয়া যায়। গত ৩০শে মার্চ থেকে ৫ই এপ্রিল, এই সাত দিনে উত্তরপ্রদেশে ‘হিন্দুদের পক্ষে বিপজ্জনক’ ২৩টি ঘটনা ঘটেছে বলে অরগানাইজার জানাচ্ছে।

উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর এলাকা, গোরখপুরের একটি ঘটনার উল্লেখ করা যাক। অরগানাইজার লিখছে—  ‘গোরখপুরের হরপুর-বুধাত থানা এলাকায় তথাকথিত ধর্মান্তরের ঘটনাটি এই অঞ্চলে পারিবারিক বিবাদ ও ধর্মীয় পরিচয়কে ঘিরে ক্রমবর্ধমান সংবেদনশীলতাকে তুলে ধরেছে’ শিরোনামে বর্ণিত হয়েছে খবরটি। লেখা হয়েছে—  ‘২০২৬ সালের ৩১শে মার্চ, দীপক শুক্লা এবং তাঁর স্ত্রী সন্ধ্যা শুক্লা তাঁদের পরিবারে ধর্ম পরিবর্তনের বিষয়ে ক্রমাগত হুমকি ও জবরদস্তির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন। দীপক শুক্লা তার অভিযোগে বলেছেন যে, তাঁর মা, যিনি প্রায় সাত বছর আগে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, তিনি দম্পতিকে তাঁদের হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করার জন্য ক্রমাগত চাপ দিয়েছিলেন। ধর্মান্তরিত হতে অস্বীকার করায় মা দম্পতিকে তাঁদের পৈতৃক বাড়ি থেকে উচ্ছেদ এবং সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার হুমকি দিলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। নিজেদের নিরাপত্তার ভয়ে দীপক ও সন্ধ্যা শুক্লা সন্তানদের নিয়ে গ্রাম ছেড়ে জিআইডিএ (গোরখপুর শিল্প উন্নয়ন নিগম) এলাকার একটি ভাড়া বাড়িতে উঠে পড়েন।’

একটি পরিবারে মা এবং সন্তানদের মধ্যেকার দ্বন্দ্বকে ‘হিন্দু খতরে মে’ হিসাবে বর্ণনা করছে সঙ্ঘ।

আর একটি ঘটনার শিরোনাম— ‘মিরাটে উৎসবের আগে মন্দিরে হনুমানজির মূর্তি অবমাননা’। সেখানে লেখা হয়েছে,‘৩০ মার্চ ২০২৬ তারিখে মিরাটের কিথাউর থানা এলাকার সিসৌলি গ্রামের একটি প্রাচীন হনুমান মন্দিরে মূর্তি অবমাননার ঘটনা ঘটে। হনুমান জয়ন্তী উৎসবের ঠিক কয়েক দিন আগে গভীর রাতে এই ঘটনাটি ঘটে এবং ভগবান হনুমানের মূর্তিটি ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। সকালে বিষয়টি জানাজানি হয় যখন পাচগাঁও পট্টির ব্লক গো-সুরক্ষা প্রধান বংশ তোমর মূর্তি অবমাননার বিষয়টি লক্ষ্য করেন এবং অন্যদের জানান। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরং দলের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। প্রতিবাদের সময় অঙ্কিত ধামা, হর্ষ শর্মা, নীতিন কুনটার, কপিল খাজুরি, রাজেন্দ্র ত্যাগী এবং ড. অরুণ সনাতনী সহ স্থানীয় বেশ কয়েকজন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। অঙ্কিত ধামা, সাব-ইন্সপেক্টর সুমিত উপাধ্যায় সহ পুলিশ কর্মকর্তাদের দুই দিনের মধ্যে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের জন্য সময়সীমা বেঁধে দেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ কর্মীরা আশ্বাস দেন যে এ বিষয়ে প্রচেষ্টা চলেছে।’

পুলিশ কী করতে পারলো, দুষ্কৃতী গ্রেপ্তার হলো কিনা, সেসবের কোনও উল্লেখ নেই বর্ণনায়।

আর একটি ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, ‘উত্তরপ্রদেশের বাস্তি জেলার পিপরাহিয়া গ্রামে, সোশ্যাল মিডিয়ায় হিন্দু দেব-দেবীকে লক্ষ্য করে আপত্তিকর ছবি, ভিডিও এবং অবমাননাকর মন্তব্য তৈরি ও প্রচার করার অভিযোগে অজিত কুমার নামে এক ব্যক্তিকে ২ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে গ্রেপ্তার করা হয়। সোনহা থানার তদন্তাধীন এই ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে উত্তেজনার সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে পুলিশ হস্তক্ষেপ করে সামগ্রীগুলো বাজেয়াপ্ত করে এবং সন্দেহভাজনকে হেফাজতে নেয়।’ সন্দেহভাজনের নাম নেই!

এমন আরও অনেক ঘটনাকে ‘হিন্দুদের পক্ষে বিপজ্জনক’ হিসাবে উল্লেখ করছে সঙ্ঘ। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের খ্রিষ্টান অথবা ইসলাম ধর্মের দিক্ষিত করার ঘটনার উল্লেখ আছে অনেকগুলি। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা, তাঁদের ধর্মান্তরের চেষ্টাকেও এই তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে। এমন ঘটনাও দেখা যাচ্ছে যে, হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারী ইসলাম ধর্মাবলম্বীর সঙ্গে সম্পর্কে যুক্ত হয়েছেন এই শর্তে যে, পুরুষটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তিনি হিন্দু হয়ে যাবেন বলে। পরে সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন।

গয়া, বেগুসরাই, ঔরঙ্গবাদের মতো জায়গায় রামনবমীর দিন ডিজে বাজাতে না দেওয়ার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও ‘হিন্দু খতড়ে মে’-র উদাহরণ হিসাবে বিবেচিত হয়েছে বেশ কিছু জায়গায়।

উত্তরপ্রদেশের উন্নাওয়ে বিজেপি নেতা, বিধায়ক কুলদীপ সিং সেঙ্গারের  নৃশংস অত্যাচারের ঘটনাকে গুরুত্ব না দেওয়া সঙ্ঘ তার তালিকায় উন্নাওয়ের অপর এক ঘটনার উল্লেখ করেছে। কী সেই ঘটনা? ‘হিন্দু হেট ওয়াচ’-এ দাবি করা হয়েছে, উন্নাও জেলার অচলগঞ্জ এলাকার ভদ্রকা গ্রামের এক হিন্দু বিএসসি-তে পাঠরত ছাত্রকে গত ২৪ মার্চ, ২০২৬ তারিখে মন্দির থেকে ফেরার পথে অপহরণ করা হয় এবং ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। নিতিন নামের ওই ছাত্র শুক্লাপুর দেবী মন্দিরে দর্শন শেষে ফিরছিলেন। মবৈয়া পোল্ট্রি ফার্মের কাছে কারিয়া খান এবং তার সহযোগীরা তাঁর পথ আটকায়। অভিযোগ উঠেছে যে, ওই দলটি হিন্দুধর্ম নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করে এবং নিতিনকে জোরপূর্বক আটকে রেখে নিজের ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। পথচারীরা বিষয়টি স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়িতে জানালে, পুলিশ কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ওই ছাত্রকে বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করেন।’ ​পরবর্তী সময়ে নিতিন পুলিশ সুপারের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। কেন? সেখানে তাঁর অভিযোগ, তাঁর অপহরণ, ধর্মকে অসন্মান করে মন্তব্য এবং ধর্মান্তরের চাপ সহ পুরো ঘটনাকে স্থানীয় পুলিশ গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য না করে একটি সাধারণ বিবাদ হিসেবে দেখেছে। সেই অনুসারে সাধারণ অভিযোগ হিসাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে।’

এই ঘটনায় অতিরিক্ত আর কতজন জড়িত ছিল, তার সঠিক সংখ্যা নির্দিষ্ট করে জানা যায়নি!

এমন ঘটনাকে ‘হিন্দুদের পক্ষে বিপজ্জনক’ হিসাবে দাবি করে তালিকা বানিয়েছে সঙ্ঘ।

এরই মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে দুটি ঘটনার উল্লেখ চমকপ্রদ। জলপাইগুড়িতে একটি মন্দির থেকে প্রতিমার অলঙ্কার চুরি হয়েছিল। তাও ‘হিন্দু হেট’ হয়েছে। পুরুলিয়ার বেগুনকোদরে হনুমান এবং বাসন্তী মূর্তি ভাঙার অভিযোগ যুক্ত হয়েছে সঙ্ঘের তালিকায়। চলতি বছরের মার্চে, রামনবমীর দিন সেই ভাঙা মূর্তি গ্রামবাসীরা দেখতে পান। এই ঘটনায় পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করে। তারা হলেন গারু মাহাতো, কিরীটি মাহাতো, অবিনাশ মাহাতো এবং কৃপানাথ মাঝাতো। আরএসএস এই পর্যন্ত লিখেছে এবং ‘হিন্দু খতরে মে হ্যায়’ বুঝিয়েছে।

কিন্তু এই চারজনের পরিচয় লেখেনি। কারন স্বাভাবিক। ওই চারজনই বিজেপি কর্মী!

ব্যবহৃত ছবি সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সংগৃহীত


প্রকাশের তারিখ: ১০-জুন-২০২৬

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org