|
সঙ্ঘ নারী সংগ্রাম - ৭Chandan Das |
ফরিদপুরের মাদারীহাটে একই ধরণের মিছিলে পা মেলালেন ২০০০ মহিলা—২৫শে মার্চ। ঢাকা, বরিশাল, নোয়াখালি, রাজশাহী, দিনাজপুর, পাবনা, জলপাইগুড়ি, রংপুর, মৈমনসিংহ—ছড়িয়ে পড়লো খাদ্য আন্দোলন। সামনের সারিতে মরীয়া মহিলারা। এই পরিস্থিতিতে ১৯৪২-এর ২৭-২৮ শে এপ্রিলে তৈরি হয় ‘কলকাতা মহিলা আত্মরক্ষা সংগঠন সমিতি।’ আহ্বায়িকা হন এলা রীড—তিনি চিকিৎসক মৃগেন্দ্রনাথ মিত্রের কণ্যা, স্টেটসম্যান পত্রিকার তৎকালীন চীফ রিপোর্টার অ্যালেক রীডের স্ত্রী। |
| সপ্তম পর্ব থানে আঁটা চট্টগ্রামের চিঠির দেখা মিললো কলকাতায়!
সঙ্ঘের দর্শন অনুসারী ’৪৬-এর ‘ফাইলস’ নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে। উৎসাহ বিশেষত হিন্দুত্ববাদীদের। আমরা ইতিহাসের খাঁচায় বন্দী থাকতে চাই না। ইতিহাস বিকৃত করারও তীব্র বিরোধী আমরা। তবে উদ্ভুত পরিস্থিতির সুযোগে কিছুক্ষণের জন্য ’৪৩-’৪৪-এ যাই?
একটি উদ্ধৃতির দিকে তাকানো যাক। ‘‘এই সঙ্কটের যুগেই আমাদের নারী আন্দোলন একটা নতুন গণ-আন্দোলনের রূপ নিয়েছে, এবং আমাদের নারী সংগঠন একটা গণসংগঠনে পরিণত হতে চলেছে। এই সংগঠন স্বদেশপ্রেম ও সভ্যতা বিস্তারের ক্ষেত্রে একটা অমূল্য সম্পদ।’’
উপরের বাক্যগুলি ১৯৪৩-এর একটি নথির অংশ। নথিটি আর কিছুই নয়। অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ৩য় বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনের রিপোর্ট।
সে সময় এক ঐতিহাসিক সময়। সম্ভাবনার সময়। আবার ‘সঙ্কটের যুগ’ও বটে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, সোভিয়েতে ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন, বাংলায় জাপানের হামলা, মন্বন্তর, দেশজুড়ে স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের সাম্প্রদায়িক প্রচারের সেই যুগে নানা সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়েছে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা, কর্মীদের। তেমনই সময়ে মাথা তুলে দাঁড়ালো ‘মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি।’
১৮ থেকে ২২শে মার্চে সিপিআই-এর বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির তৃতীয় সম্মেলন হয়েছিল। আর ওই মার্চেই, ১০ই মার্চ মহিলাদের প্রথম ‘ভুখ মিছিল’ হলো বাঁকুড়ায়। প্রায় ৪০০ মহিলা মিছিল করলেন। তাঁরা শ্রমিক এবং কৃষিজীবী। তাঁরা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটর কাছে ডেপুটেশন দিলেন। ফরিদপুরের মাদারীহাটে একই ধরণের মিছিলে পা মেলালেন ২০০০ মহিলা—২৫শে মার্চ। ঢাকা, বরিশাল, নোয়াখালি, রাজশাহী, দিনাজপুর, পাবনা, জলপাইগুড়ি, রংপুর, মৈমনসিংহ—ছড়িয়ে পড়লো খাদ্য আন্দোলন। সামনের সারিতে মরীয়া মহিলারা।
এই পরিস্থিতিতে ১৯৪২-এর ২৭-২৮ শে এপ্রিলে তৈরি হয় ‘কলকাতা মহিলা আত্মরক্ষা সংগঠন সমিতি।’ আহ্বায়িকা হন এলা রীড—তিনি চিকিৎসক মৃগেন্দ্রনাথ মিত্রের কণ্যা, স্টেটসম্যান পত্রিকার তৎকালীন চীফ রিপোর্টার অ্যালেক রীডের স্ত্রী। ১৯৪৩-এর ৭-৮ মে ওভারটুন হলে প্রাদেশিক মহিলা সম্মেলন হলো। ৮ই মে আত্মপ্রকাশ করে ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি।’ তখন সমিতির সদস্য ২২হাজার। প্রতিনিধি ছিলেন শতাধিক। ‘নারী আন্দোলন ও আমরা’-য় কমরেড কণক মুখার্জি লিখছেন,‘‘...গরিব কৃষক মজুর, বস্তিবাসী, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত—সর্বস্তরের বিভিন্ন দলমতের মহিলা এসেছিলেন। কলকাতার বহুসংখ্যক বস্তিবাসী মহিলাদের উপস্থিতি ছিল বিশেষ আকর্ষণীয়।’’
নারী আন্দোলনের গোড়া থেকেই অগ্রণী শ্রমিক, কৃষক, বস্তিবাসী মহিলারা।
ইতিহাস বলছে সেই সঙ্কটকালে ‘মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি’ই সবচেয়ে কার্যকর, সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। ইতিহাস আরও বলছে নারী আন্দোলন ‘সমাজ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে’ও সপ্তাহ পালন করেছে। সেবা এবং সংগ্রামের কাজ একইসঙ্গে চলেছে। একদিকে মিছিল, সভা, ডেপুটেশন, প্রচার চলেছে। সোভিয়েতের পক্ষে, বন্দীমুক্তির দাবিতে লড়াই করেছেন মহিলারা। আবার মহিলাদের স্বনির্ভর করা, উপার্জনের পথ বের করা, রেশনের দাবিতে আন্দোলন, সীমিত সামর্থ্যে চিকিৎসার উদ্যোগ— তাও চলেছে। বিভাজনের বিরুদ্ধে ঐক্যের সংগ্রাম— তাও চলছে।
একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক।
চট্টগ্রামের হাজং মহিলাদের আবেদন পাওয়া গেলো কলকাতায়, প্রেসিডেন্সি কলেজে—১৯৪৪-এর ডিসেম্বরে! তাঁরা ছিলেন না। ছিল তাঁদের সেই আবেদন। আর ছিল তাঁদের সৃষ্টি।
১৯৪৪-এর ২৭ থেকে ৩০শে ডিসেম্বর প্রেসিডেন্সি কলেজে ‘নারী সেবা সঙ্ঘ’র উদ্যোগে একটি কুটির শিল্প প্রদর্শনী হয়। মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি সহ বিভিন্ন নারী সংগঠন যৌথভাবে ‘নারী সেবা সঙ্ঘ’ গড়ে তোলে। ২৭শে ডিসেম্বর সেই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন সরোজিনী নাইডু। নাইডু বলেছিলেন,‘‘নারী সেবা সঙ্ঘের এই প্রদর্শনী দেখে আমরা সকলে পুনর্জীবন লাভ করলাম, বিপন্ন মানবের সাহায্যকল্পে বাংলার বিভিন্ন রাজনীতিক মতাবলম্বী সকল নরনারী মন্ত্রমুগ্ধের মতো একত্রিত হতে সমর্থ হয়েছেন। দুঃখ দুর্দশার দিনে বাংলা যে রকম ঐক্যবদ্ধ হতে সমর্থ হয়েছে, ভবিষ্যতের বৃহত্তর প্রয়োজনের সময়েও তারা সেইভাবে সমবেত হতে পারবেন এই আমার আশা।’’
সে আশা দুরাশায় পর্যবসিত হয়েছিল পরবর্তীকালে। কিন্তু তাতে অভিজ্ঞতা বৃথা হয়ে যায় না।
প্রদর্শনীতে অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন জেলা থেকে বিভিন্ন সংগঠন ২৫টি স্টল দিয়েছিল। মহিলাদের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি হয়েছিল। আসাম থেকে এসেছিল চামড়ার ও পশমের জিনিস, দার্জিলিঙ থেকে এসেছিল মোটা পশমের জামা, জয়নগর বারাসত হোমের কৃষক রমণীরা পাঠিয়েছিলেন মাটির তৈরি কৃষক পরিবার সহ অন্যান্য হাতের কাজ। সেই স্টলগুলির মধ্যে ছিল মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির কলকাতার ৮টি কেন্দ্র এবং ১০টি জেলার সংগঠক, কর্মীদের বানানো বিভিন্ন সামগ্রী। নারী সেবা সঙ্ঘের এই প্রদর্শনীর প্রভাব, কার্যকারিতা সম্পর্কে অনুমান করে স্টল দিয়েছিল হিন্দু মহাসভা নারীরক্ষা কেন্দ্র, ব্রাহ্মসমাজ, রামকৃষ্ণ মিশনের মতো সংগঠনও। সেই সময়ে ‘মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি’ কংগ্রেস মহিলা সঙ্ঘ, মুসলিম লীগ মহিলা সমিতি, মুসলিম নারী আত্মরক্ষা সমিতি, খ্রীষ্টান মহিলা সমিতির মতো সংগঠনগুলির সঙ্গেও নানা সেবামূলক কাজ করেছে। তবে মহিলাদের স্বনির্ভরতা, কুটির শিল্পে মহিলাদের উৎসাহ— এমন ধরণের কাজে নারী আন্দোলনের নেতৃত্বের বিশেষ নজর ছিল।
সেই সূত্রেই চলে আসে প্রায় ৫৬০ কিমি দূর থেকে আসা একটি আবেদনের কথা।
‘নারী সেবা সঙ্ঘ’-এর প্রদর্শনীতে দেখা যায় সেই আবেদনটি। চট্টগ্রামের হাজং মহিলাদের সেই আবেদন লেখা ছিল তাঁদের পাঠানো থানের সঙ্গে—‘‘আমরা গ্রাম হইতে থান বুনিয়া পাঠাইলাম, শহর হইতে আপনারা সুতা পাঠাইবেন। এখানে সুতার অভাব অত্যন্ত বেশি।’’
চট্টগ্রামের হাজং মহিলারা তখন পুরুষদের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে ব্রিটিশ, জোতদারদের বিরুদ্ধে লড়ছেন। ইতিহাসে স্থায়ী, গৌরবোজ্বল জায়গা করে নিচ্ছে টঙের হাজং বিদ্রোহ। নেতৃত্বে কমরেড মনি সিংহের মতো কমিউনিস্টরা। সেখানকার মহিলারাই তখন নিজের হাতের কাজ পাঠাচ্ছেন কলকাতায়।
সেবা, সংগ্রাম, ঐক্য— অবিভক্ত বাংলার নারী আন্দোলনের এক অবিস্মরণীয় উপাদান। সম্পূর্ণ প্রবন্ধটি ১০ টি পর্বে প্রকাশিত হবে। প্রকাশের তারিখ: ০১-সেপ্টেম্বর-২০২৫ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|