|
সঙ্ঘ নারী সংগ্রাম-১Chandan Das |
কেন্দ্রের মোদী সরকার তাদের বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে মহিলাদের জন্য তাদের বিভিন্ন ‘অবদান’-এর ঘোষণা করে। শতবর্ষের গৌরবের প্রচারে উচ্ছ্বসিত সঙ্ঘের রিপোর্ট স্পষ্ট করছে, ‘মোদী কী গ্যারান্টি’তে মহিলাদের জীবনে কোনও সমাধান আনেনি। |
মহিলাদের জন্য আলাদা রিপোর্ট তৈরি করেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ! ৩৫ পাতার সেই নথির শিরোনাম—‘মহিলা সমন্বয়— মহিলা সম্মেলন বিহঙ্গম দৃশ্য’। পিছনের পাতায় দু’জনের বানী—বিবেকানন্দ এবং আম্বেদকারের। ৩১নং পাতায় ভারতের মানচিত্রর পাশে মোটা হরফে, ইংরাজিতে আর একজনের বানী। তিনি এপিজে আবদুল কালাম। তাঁর বানীর বিষয়বস্তু? নারীদের কর্মসংস্থানের সঙ্গে দেশ, জাতি, পরিবার গঠনের সম্পর্ক। সঙ্ঘ বদলে যাচ্ছে নাকি? সঙ্ঘ কী অস্বীকার করছে তাদের ‘পরম পুজনীয় গুরুজী’র উপলব্ধি? ‘গুরুজী’ যে সে নন। তিনি মহাদেব সদাশিব গোলওয়ালকার। সঙ্ঘের দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক গোলওয়ালকারকে ‘গুরুজী’ বলে মান্য করে সঙ্ঘ। গোলওয়ালকারের ভাবনায় কোথাও নারীদের পুরুষের সমান মজুরি, নারীদের কাজের দাবি নেই। গোলওয়ালকারের ‘বাঞ্চ অব থটস’-এ ‘কল টু দ্য মাদারহুড’ আছে। সেখানে ‘সার্ভিস টু নিডি’ অর্থাৎ অসহায়দের পরিষেবা প্রসঙ্গে সঙ্ঘের গুরুজী লিখেছেন,‘‘আমরা আমাদের চারপাশে অনেক বোনকে দেখি যারা হয় দৈহিক শ্রমের কাজ করেন, নয়তো পুরোপুরি অসহায় এবং প্রতিবন্ধী।...আমাদের তাদের উপযোগী প্রকল্পের পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে, যা তাদের কিছু দরকারী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, যাতে তারা জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন।’’ নারীদের ‘উপযোগী প্রকল্প’ মানে কী? নারীদের ‘শারিরীক শ্রমের কাজ’ থেকে মুক্তির উপায় কী? ইঁট ভাটার মতো পরিশ্রম সাধ্য কাজ থেকে মহিলারা কী ভাবে সরে থাকতে পারেন, কী ভাবে নারীদের নির্মাণ শ্রমিক হওয়া, দিনে চার-পাঁচটি বাড়িতে ঘুরে ঘুরে অক্লান্ত গৃহ সহায়িকার কাজ থেকে রক্ষা করা যায়—গোলওয়ালকার কোথাও তার কোনও বর্ণনা দেননি। তাঁর কাছে নারী মানে প্রধানত ‘গো মাতার মতো’। ‘রাষ্ট্র গঠনে’ গোলওয়ালকারের অবধারিত উপদেশ, ‘‘উদীয়মান প্রজন্মকে লালন পালন করা আমাদের মা’দের বিশেষ দায়িত্ব।’’ গোলওয়ালকারের মতে,‘‘আধুনিকতা আমাদের সংস্কৃতি ধ্বংস করছে। ‘জ্ঞানেশ্বরী’র একটি পংক্তি বলছে একজন জ্ঞানী পুরুষ তার ভালো কাজ ঢেকে রাখে বিনয় দিয়ে, তেমনই এক জ্ঞানী নারীর তার দেহ ঢেকে রাখে। কিন্তু আধুনিক মহিলারা মনে করে যে, আধুনিকতার মানে হচ্ছে তাদের উন্মুক্ত দেহ বেশি করে দেখানো। কী লজ্জা।’’ সারা শরীর মুড়ে পরিবারের জন্য উপার্জনের ঠিক কোন কাজ মহিলারা করতে পারেন, তা গোলওয়ালকার বলে যানিনি। বাড়িতে বসে বিড়ি বাঁধা যায়। কিন্তু সেখানে মালিকের শোষণ আর অত্যন্ত কম মজুরির সঙ্কট থেকে কীভাবে মহিলারা রক্ষা পাবেন, তা গোলওয়ালকার লেখেননি। তবে গোলওয়ালকার ‘বাঞ্চ অব থটস’-এই জানিয়েছেন যে, তিনি ‘শোষণ’-এর ধারণা মানেন না। শ্রেণিসংগ্রাম বলে কিছু নেই! তাৎপর্যপূর্ণ হলো নারীদের সম্পর্কে ধারণায় গোলওয়ালকার এবং মৌদুদী খুব কাছাকাছি। ১৯৪১-র আগস্টে তৈরি হয় জামাত-ই-ইসলামী। প্রতিষ্ঠাতাদের প্রধান সইয়াদ আবু আলা মৌদুদী। মৌদুদী ‘আধুনিক নারী ও ইসলামী শরীয়ত’-এ লিখলেন,‘‘আপনাদের জানা দরকার, পাশ্চাত্যবাসী নারীদের যে ‘সমমর্যাদা’ দিয়েছে তা তাদেরকে নারীর অবস্থানে রেখে দেয়নি, দিয়েছে অর্ধ পুরুষ বানিয়ে। তারা চায় পুরুষরা যতো কাজ করে, নারীদেরও সেসব কাজ করতে হবে। কিন্তু একথা সবারই জানা, নারীরা যেসব কাজ সম্পাদন করে, পুরুষরা সেগুলো করতে সক্ষম নয়।...সুতরাং ‘সম’ দাবির অর্থ হলো, প্রকৃতি নারীদের উপর যেসব বাড়তি দায়িত্ব অর্পণ করেছে, একদিকে তাদেরকে সেগুলো সম্পাদন করতে হবে-যা পুরুষরা সম্পাদন করতে সক্ষম নয়। অপরদিকে, পুরুষদের সাথে সমভাবে ঐসব দায়িত্বও তাদের পালন করতে হবে, প্রকৃতি যেগুলোর দায়িত্ব পুরুষের উপর ন্যস্ত করেছে। অর্থাৎ ব্যাপারটা যেন এমন যে, তারা নারীদের দ্বারা দেড়গুণ বেশি কাজ করিয়ে নিতে চায়, আর নিজেরা করতে চায় অর্ধেক। এরই নাম দিয়েছে তারা নারী-পুরুষের সমতার বিধান।’’ অর্থাৎ নারীর সমানাধিকারের বিরোধী মৌদুদী। ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনে মরীয়া সলগঠনগুলির ভাবনা তাই অনেকটাই কাছাকাছি, বিশেষত নারী প্রসঙ্গে। কিন্তু ‘গুরুজী’র সেই সঙ্ঘ শতবর্ষ পালনের কর্মসূচির অংশ হিসাবে শ্রমজীবী মহিলাদের দাবিকে স্বীকার করে বসলো। সঙ্ঘের সেই রিপোর্টে মহিলাদের ‘রোজগার সম্বন্ধীয় সমস্যায়ে’ অংশে লেখা হয়েছে— প্রথমত, মহিলাদের উপার্জনের সুযোগ কম (‘রোজগার কে কম অবসর’), দ্বিতীয়ত, স্বনির্ভরতার প্রশিক্ষণের অভাব (‘স্বরোজগার প্রশিক্ষণ কী কমি’), তৃতীয়ত, কারিগরী প্রশিক্ষণের সুযোগ কম (‘কৌশল প্রশিক্ষণ কা অভাব’), চতুর্থত, স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির উৎপাদিত সামগ্রীর বিক্রির সমস্যা, বিপণনেরও সমস্যা (‘স্বয়ংসহায়তা সমূহকে উৎপাদোঁ কী বিক্রি কী সমস্যা, বিপণন মে সমস্যায়ে’) এবং পঞ্চমত, সমকাজে সমবেতন নেই (‘সমান বেতন কা অভাব’)। উল্লেখযোগ্য হলো, কেন্দ্রের মোদী সরকার তাদের বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে মহিলাদের জন্য তাদের বিভিন্ন ‘অবদান’-এর ঘোষণা করে। শতবর্ষের গৌরবের প্রচারে উচ্ছ্বসিত সঙ্ঘের রিপোর্ট স্পষ্ট করছে, ‘মোদী কী গ্যারান্টি’তে মহিলাদের জীবনে কোনও সমাধান আনেনি। দেশের ২৬টি রাজ্য এবং ৬টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে মহিলাদের সম্মেলন করেছে সঙ্ঘ। যে সঙ্ঘে নারীরা সদস্য হওয়ার ‘যোগ্য’ নন, যাঁদের জন্য আলাদা সংগঠন ‘রাষ্ট্রীয় সেবিকা সমিতি’, সেই সঙ্ঘ সেই সম্মেলনগুলিতে মহিলাদের বলতে দিয়েছে। তাঁদের বক্তব্য শুনেছে বলে নথিতে দাবি করেছে। সঙ্ঘ রিপোর্টে দাবি করেছে যে, ৫ লক্ষ ৭৫ হাজার ৭৪০ জন মহিলা তাদের বিভিন্ন আলোচনাসভা, বৈঠকে যোগ দিয়েছেন। ৪৭২টি মহিলা সম্মেলন (সঙ্ঘ ‘সম্মেলন’ই লিখেছে) করেছে। সর্বাধিক সম্মেলন হয়েছে যোগী আদিত্যনাথ-শাসিত উত্তর প্রদেশে—৬৪টি। সেখানে ১ লক্ষ ৩৮হাজার ৯৮৪ জন মহিলা সঙ্ঘের সম্মেলনগুলিতে যোগ দিয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে ২১টি সম্মেলনে ৮২৫৫ জন মহিলা যোগ দিয়েছেন। বিহারে সম্মেলন তারা করতে পেরেছে মাত্র ৯টি। এসেছিলেন ৬১০০ মহিলা। মহিলাদের অংশগ্রহণে উত্তর প্রদেশের পরেই স্থান মধ্য প্রদেশের। তারপর আছে যথাক্রমে মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, কর্নাটক। সঙ্ঘের আরও দাবি, দেশের প্রায় ৯ লক্ষ মহিলার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়েছে। প্রশ্ন হলো মনুস্মৃতি যাদের দর্শনের ভিত্তি তারা মহিলাদের নিয়ে এত উদ্যোগ নিচ্ছে কেন? উত্তরও খুব কঠিন নয়। দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্দ্ধেক মহিলারা। কিন্তু তা তো আগেও ছিল। আসলে কেন্দ্রীয় সরকার, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক, নাবার্ড সহ বিভিন্ন সংস্থার ধারাবাহিক রিপোর্ট বলছে দেশের শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ মহিলারা। কেন্দ্রীয় সরকার ই-শ্রম পোর্টাল খুলেছে। তাতে পশ্চিমবঙ্গের নথীভুক্ত শ্রমিকদের ৫৩শতাংশ মহিলা। ‘রোজগার’ হয়ে উঠেছে মহিলাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। নারীরা সেই বিষয়ে সোচ্চার হচ্ছেন। পরিস্থিতি বুঝে নেহাতই ‘সাংস্কৃতিক সংগঠন’ হিসাবে নিজেদের দাবি করা আরএসএস অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। মহিলাদের ডেকে এনে শুনতে বসেছে সঙ্ঘ, মহিলাদের মজুরি, বেতনের দাবি নিজেদের নথিতে উল্লেখ করতে বাধ্য হচ্ছে। সঙ্ঘ মহিলাদের আরও সমস্যা মানছে। তাদের রিপোর্টে তারা স্বীকার করছে যে, মহিলাদের অনেকগুলি সমস্যার মধ্যে আছে বাল্য বিবাহ, স্কুলছুট বৃদ্ধি, যথেষ্ট স্কুলের অভাব, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, নারী পাচার ইত্যাদি। রিপোর্টে সঙ্ঘ তার দর্শনের ভিত্তিতেই কিছু ‘সমাধান’ জানিয়েছে। তার মধ্যে ‘মহিলাদের সর্বাঙ্গীন বিকাশ’-এর কথা আছে। আছে ‘মহিলাদের আত্মনির্ভর’ করে তোলার কথা। আছে ‘আত্মরক্ষার জন্য প্রশিক্ষণ’, ‘আইনী পরামর্শ’ দেওয়ার ব্যবস্থার কথা।
আজকে প্রথম পর্ব প্রকাশিত হল, সম্পূর্ণ প্রবন্ধটি ৩ – ৫ টি পর্বে যাবে। প্রকাশের তারিখ: ২৬-আগস্ট-২০২৫ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|