|
আলেন্দে – ইতিহাস আমাদের, মানুষই তা গড়ে তুলবেShreyashi Chowdhury |
আলেন্দের নাড়ি পরীক্ষা করার পর তিনি সংকেত দেন যে রাষ্ট্রপতি মারা গেছেন। কেউ একজন হঠাৎ করেই চিলির জাতীয় পতাকা নিয়ে এসেছেন ইতিমধ্যে, এনরিকে প্যারিস নিথর দেহটি ঢেকে দেন। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, এই মৃতদেহ নিয়ে চলবে নক্কারজনক মিথ্যের খেলা। |
১১ই সেপ্টেম্বর, ১৯৭৩, দুপুর ২টো ৭, ক্যাপ্টেন রবার্তো গারিডোর নেতৃত্বে সান বেমার্দো ইনফ্যান্ট্রি স্কুলের একটি শাখা চিলির রাষ্ট্রপতিভবন সান্তিয়াগো পালাসিও দে লা মোনেদায় ঢুকে পড়ে। সশস্ত্র সামরিক বাহিনী সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসে দোতলায়, তাদের FAL মেশিনগান দিয়ে দোতলা ঝাঁঝরা করে দিয়ে স্টেট রিসেপশন হল 'সালোন রোজো'-র প্রবেশপথে এগিয়ে যায়। ভিতরে, ভবনের অন্যান্য অংশ থেকে আসা ঘন ধোঁয়া এবং টিয়ার গ্যাস বোমা, গ্রেনেড ও শেরম্যান ট্যাঙ্কের গোলার বিস্ফোরণের মাঝে, পেট্রোল ক্যাপ্টেন দেখেন এক আশ্চর্য্য দৃশ্য, সাব-মেশিনগান নিয়ে প্রাণপণ প্রতিরোধ করে চলেছেন গুটিকয় নাগরিক রক্ষী। ক্যাপ্টেন গারিডো তড়িঘড়ি ফায়ার করেন, করেই চলেন, তিনটি গুলির মধ্যে একটি এসে লাগে জনৈক নাগরিক রক্ষীর পেটে। গারিডোর দেখাদেখি তার পেট্রোলের আরেক সৈন্য আহতকে তাক করে আবার গুলি চালায়। যন্ত্রণায় মেঝেতে ছটপট করছিলেন যে ব্যক্তি গারিডো হঠাৎ বুঝতে পারেন তিনি কে: সালভাদোর আলেন্দে, দেশের রাষ্ট্রপতি। "We shit on the President!" (রাষ্ট্রপতির উপর আমরা থুথু দিই!) তিনি চিৎকার করে বলেন। গারিডোর সেনাবাহিনীর এতেও আশ মেটে না, পরপর গোলাগুলি চলতেই থাকে, মেশিনগানের আওয়াজে আর্তনাদে ফেটে পড়ে রাষ্ট্রপতিভবন। আলেন্দের নিথর দেহ গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে পড়ে থাকে । ঠিক তখনই একদল নাগরিক রক্ষী পাশের দরজা দিয়ে সালোন রোজোতে প্রবেশ করে। তাদের পালটা গুলিবর্ষণে গারিডো এবং তার বাহিনী পিছু হটতে থাকে, সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসে একতলার নিরাপদ আশ্রয়ে, প্রতিবিপ্লবী সৈন্যের দল ইতিমধ্যেই দখল করে ফেলেছে একতলা। উপরের অবস্থা বুঝতে এবং প্রয়জনে সাহায্য করতে কিছু প্রতিরোধকারী নাগরিক রক্ষী সালোন রোজোতে ফিরে আসেন। তাদের মধ্যেই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এনরিকে প্যারিস যিনি প্রেসিডেন্ট আলেন্দের ব্যক্তিগত চিকিৎসক। আহত দেহটির দিকে ঝুঁকে পড়ে পরীক্ষা করতে থাকেন তিনি, দেখেন পেটে কমপক্ষে ছয়টি গুলি লেগেছে। আলেন্দের নাড়ি পরীক্ষা করার পর তিনি সংকেত দেন যে রাষ্ট্রপতি মারা গেছেন। কেউ একজন হঠাৎ করেই চিলির জাতীয় পতাকা নিয়ে এসেছেন ইতিমধ্যে, এনরিকে প্যারিস নিথর দেহটি ঢেকে দেন। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, এই মৃতদেহ নিয়ে চলবে নক্কারজনক মিথ্যের খেলা। সালোন রোজোয় আগুন লেগেছে ইতিমধ্যেই, ভবন পুড়ে ছারখার, নাগরিক বাহিনী তবুও চালিয়ে যান প্রতিরোধ। শেষতক দেখে ছাড়বেন। চার পাঁচজনে করে দলে ভাগ হয়ে চলে মোকাবিলা। একতলা এবং দোতলার মধ্যে সংঘর্ষ তখনও তুঙ্গে। তখনও যে তারা জানেন না যে রাষ্ট্রপতী আলেন্দেকে প্রতিবিপ্লবী সেনাবাহিনী ইতিমধ্যেই খুন করেছে। বিকেল সাড়ে তিনটের মধ্যে সেনাবাহিনী নাগরিক রক্ষীদের পরাজিত করেন,৪২ জন রক্ষী পাঁচ ঘন্টা প্রাণপণ লড়াই করেছিলেন লা মনেদা রক্ষা করার জন্য। কিন্তু পারেন নি। ভবনের দ্বিতীয় তলা সেনাবাহিনী দখল করে নেয়। লা মোনেদায় আক্রমণের আসল কাণ্ডারী ও কমান্ডার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাভিয়ের পালাসিওস রুহমান সালোন রোজোতে প্রবেশ করেন, তাঁকে অনুসরণ করেন ক্যাপ্টেন গারিডো এবং তাঁর পেট্রোল। আলেন্দের দেহের উপর ঝুঁকে রক্তাক্ত চিলির পতাকাটি সরিয়ে দেন। গারিডোর দিকে ফিরে, জেনারেল পালাসিওস আদেশ দেন: "আমাদের এই ঘরটি পুরোপুরি সিল করে দিতে হবে, কাউকে ভিতরে আসতে দেবেন না, কেউ যেন রাষ্ট্রপতির দেহ না দেখে। আমাকে হেডকোয়ার্টারে ব্যক্তিগতভাবে জেনারেল পিনোচেটের সাথে কথা বলার ব্যবস্থা করুন।" পালাসিওস রেডিওর মাইক্রোফোনটি নিয়ে শুষ্ক ও স্পষ্ট কণ্ঠে রিপোর্ট করেন “জেনারেল পিনোচেট-এর উদ্দেশ্যে জেনারেল পালাসিওস। মিশন সম্পন্ন। লা মোনেদা দখল করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মৃত।“ সেনাবাহিনীর প্রধান জিজ্ঞাসা করলেন, ‘দেহের অবস্থা কী?’ পালাসিওস উত্তর দিলেন, ‘ডেস্ট্রয়েড’। অভ্যুত্থানকারী জেনারেলরা পরিকল্পনা করেছিলেন আলেন্দেকে জীবিত ধরে নিয়ে গিয়ে এক অপমানজনক "আত্মহত্যার" ঘটনা সাজাবেন। এদিকে অপ্রত্যাশিতভাবে তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে তাদের এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। এরপর তারা কয়েক ঘন্টার মধ্যেই একটি নতুন গল্প ফাঁদেন, নতুন দৃশ্য সাজিয়ে দাবি করেন যে আলেন্দে আত্মহত্যা করেছেন, একটি এমন গল্প যা পরস্পরবিরোধী তথ্যে ভরা, সযত্নে নির্মিত একটি মিথ্যা কথা। । ইতিমধ্যে সেদিন ভোর ৬টা থেকেই চিলির সশস্ত্র বাহিনীর হাইকমান্ড দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলিতে পূর্ণ-দৈর্ঘ্যের আক্রমণ চালাতে থাকে। প্রায় এক লাখ সৈন্য জড়ো করে এই প্রতিবিপ্লবী ষড়যন্ত্রের সব যোগসাজশ ইতিমধ্যেই প্রস্তুত করা ছিলো। কমপক্ষে ৩,০০০ শ্রমিক, কৃষক, আমলা ও রাজনৈতিক কর্মী-নেতাদের হত্যা করা হয়। ১৫ তারিখের মধ্যে প্রাণ হারায় আরও ৫,৫০০ জন। ৩০শে সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রায় ৬,৩০০ জনকে কারারূদ্ধ করা হয়, গুলি করে বা অন্য কোনও ভাবে হত্যা করা হয়, গালভারি নাম দেওয়া হয়, সামারি ট্রায়াল ইন টাইম অফ ওয়ার। এই অভ্যত্থানের আসল উদ্দেশ্য? শহরের প্রধাণ দুটি শিল্পাঞ্চল দখল: দক্ষিণ-পূর্বের লস সেরিলোস এবং মধ্য-পূর্বাঞ্চলের ভিক্যুনা ম্যাকেনা। সামরিকবাহিনীর সাথে বেসামরিক ফ্যাসিস্ট লুম্পেনদের নিয়ে গঠিত কমান্ডো ইউনিট ‘পিন্সার অপারেশন’-এ যোগ দেয়। ১১ তারিখ সকাল ৬ থেকে ৮টার মধ্যে সারা দেশ জুড়ে প্রায় ৬,০০০ জনকে গ্রেপ্তার করে, সামরিক সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়, সংক্ষিপ্ত ও সুনির্দিষ্ট জেরার পরপরই তাদের হত্যা করা হয়। সামরিকবাহিনীর কথায় "মার্ক্সবাদের ইঞ্জিন পরিষ্কার করা"। চিলির সামরিক বাহিনী, নৌবাহিনী । চিলির মিলিটারি বাহিনীর সাথে গভীর আঁতাত ছিলো, ব্রাজিলের দূতাবাস এবং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ কম্যান্ডের গোয়েন্দা বিভাগের। প্রতিবিপ্লবী জেনারেলদের আশা ছিলো ১১ তারিখ দুপুরের মধ্যেই এই অপারেশান সম্পূর্ণ করা, তেমনই পরিকল্পনা করেছিলেন তাঁরা, কিন্তু বিপাক বাঁধালো ভিক্যুনা ম্যাকেনা এবং লস রেরিলোসের জনপ্রতিরোধ – ১১তারিখ রাত অবধি চলে এই মিলিটারী-মানুষ সংঘাত। ১২ তারিখ দুপুরের মধ্যে শ্রমিক-জনতার অপ্রতুল গোলাবারুদের সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়, এবং সান্তিয়াগোর শ্রমিক বাসাগার লা লেগুয়া ও লো হোমিদাতে গণহত্যালীলা সম্পন্ন করে সেনাবাহিনী শেষমেশ জনপ্রতিরোধে ইতি টানে। এই ছিল সালভাদোর আলেন্দে গোসেনস-এর "আত্মহত্যা"। ১৯৭৩ সালের চিলির অভ্যুত্থানের পিছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দিয়ে উত্তর আমেরিকার বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এবং চিলির একটি ক্ষুদ্র শিল্পপতি গোষ্ঠীর (oligopoly) স্বার্থ রক্ষা করা। এই নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে জেনারেলরা এক নৃশংস একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। কারখানা, অফিস, কৃষি খামার, রাস্তাঘাট এবং ব্যক্তিগত আবাস সবকিছুই প্রায় একেকটি সামরিক ব্যারাকে পরিণত হয়। এই দমন-পীড়নমূলক ব্যবস্থার ভিত গড়ে উঠেছিল বিগত বিশ বছরে। ১৯৫২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি Mutual Aid Pact স্বাক্ষরের পরপরই শুরু মার্কিন সামরিক বাহিনীর চিলীর রাষ্ট্রব্যবস্থায় অযাচিত অনুপ্রবেশ। মার্কিন সামরিক বাহিনী চিলির সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষন দেয়, অর্থায়ন করা হয় তাদের। অভ্যুত্থানের প্রস্তুতিতে প্রায় ৮৫,০০০ সৈন্যের পাশাপাশি ফ্যাসিস্ট বেসামরিক গোষ্ঠীগুলির (যেমন 'ফাদারল্যান্ড অ্যান্ড লিবার্টি') ১০,০০০ সদস্যকে অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করা হয়। অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র শুরু হয় ১৯৭২ সালের শেষের দিকে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলি সম্ভবত জড়িত ছিল। আলেন্দের সরকারকে উৎখাতের পরবর্তী ধাপ হিসেবে, পরিকল্পনাটি দুটি পর্যায়ে বিভক্ত হয়: প্রথমে গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে জনমত 'প্রস্তুত' করা, এবং পরে, সরকার দুর্বল পয়ে পড়লে, আক্রমণ করা। কিন্তু কি এই নক্কারজনক এবং নৃশংস অভ্যুত্থানের আসল উদ্দেশ্য কী ছিলো?
আলেন্দের দেহ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা, ইতিহাসের সাথে বেইমানি করা, মানুষকে প্রতারণা করা, এই হলো এগারোই সেপ্টেম্বর ১৯৭৩-এর মার্কিনী ঐতিহ্য। সেদিন সকাল ৯টায় প্রেসিডেন্ট আলেন্দে চিলিবাসীদের তাঁর শেষ বার্তাটি পাঠান রেডিওতে, "…তাদের ক্ষমতা আছে, তারা আমাদের চূর্ণ করতে পারে, কিন্তু সামাজিক প্রক্রিয়াকে অপরাধ বা বলপ্রয়োগ দ্বারা আটকানো যায় না। ইতিহাস আমাদের, আর মানুষই তা গড়ে তুলবে।" (সালভাদোর আলেন্দে, ১১ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৩, সকাল ৯:১৫, চিলির সান্তিয়াগোর প্যালাসিও দে লা মোনেদায় প্রদত্ত ভাষণ।) বিদ্রোহী জেনারেলদের হামলা চলাকালীন এটি টেপ করা হয়েছিল এবং রেডিও মাগালানেস দ্বারা সম্প্রচারিত হয়েছিল। প্রকাশের তারিখ: ১১-সেপ্টেম্বর-২০২৫ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|