|
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্টদের ভূমিকা (২য় পর্ব)B T Ranadive |
ভারতীয় জনসাধারণের সমস্ত অংশের সমস্যাবলী সম্পর্কে সরাসরি উল্লেখ করে এবং ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদ করতে বিপ্লবী সংগ্রামের সমূহ প্রয়োজনের কথা তুলে ধরে এরকম কোনও বিপ্লবী দলিল ভারতবর্ষ ইতোপূর্বে কখনও দেখেনি। |
২য় পর্ব পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি একথা আজ শুনতে অদ্ভুত ঠেকলেও বলা যায় যে, প্রায় সবগুলি আধুনিক ধ্যান-ধারণা যা আজকাল চালু এবং জাতীয় আন্দোলন কর্তৃক ক্রমশই যা গ্রহণ করা শুরু হয়েছিল, সেই সবগুলিরই পুরোধা ছিল কমিউনিস্টরা এবং তাঁরাই এগুলির প্রবর্তক। এটা অবশ্যই সুপরিচিত যে, সমাজতন্ত্রের কথাটা কমিউনিস্টরাই সব থেকে আগে বলেছিল এবং তার সপক্ষে প্রচার করতে গিয়ে তাদের দীর্ঘ কারাদণ্ডও ভোগ করতে হয়েছিল। কিন্তু যে কথাটা অজানা রয়ে যাচ্ছে, তা এই যে, পূর্ণ স্বাধীনতার প্রথম প্রবক্তা ছিল কমিউনিস্টরাই এবং জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে তারাই এই দাবি তুলে ধরেছিল। ১৯২২ সালে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের গয়া অধিবেশন উপলক্ষে এম এন রায় কর্তৃক পেশ করা ইশতেহারে পূর্ণ স্বাধীনতাকেই লক্ষ্য হিসাবে গ্রহণের জন্য কংগ্রেসের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছিল। তাতে লেখা হয়েছিল, জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের নেতা হিসাবে কংগ্রেসকেই সাহস করে এই পদক্ষেপ গ্রহণের সপক্ষে দাঁড়াতে হবে এবং সন্দেহাতীত স্পষ্টতায় ঘোষণা করতে হবে যে, সর্বজনীন ভোটাধিকারের গণতান্ত্রিক নীতির ভিত্তিতে সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন এক জাতীয় সরকার গঠনের দাবি থেকে এতটুকুও কম নয় তাদের ঈপ্সিত লক্ষ্যবস্তু। কিন্তু এই লক্ষ্য থেকে কংগ্রেসের অবস্থান ছিল বহুদূরে 'স্বরাজ'-এর দাবির বেশি তারা এতটুকুও এগোতে চায়নি এবং এই পর্যায়ে; ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে তাদের কোন ইচ্ছাই ছিল না। বস্তুত, জাতীয় কংগ্রেসের আহমেদাবাদ অধিবেশনে (১৯২১ সালে) হজরত মোহানি যখন তার উত্থাপিত এক প্রস্তাবে 'স্বরাজ'-কে 'সমস্তরকম বৈদেশিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত এক পূর্ণ স্বাধীনতা' বলে ব্যাখ্যা করলেন, তখন গান্ধীজী এই কথা বলে তার বিরোধিতা করছিলেন যে, “আমি এজন্য আহত বোধ করছি এই প্রস্তাব দায়িত্বজ্ঞানের অভাব সূচিত করছে।” সমান অংশীদারির যে তত্ত্ব থেকে বুর্জোয়া নেতৃত্ব এতটুকুও বেশি এগোতে সাহস করত না, সেই তত্ত্ব-সম্পর্কীয় মোহ থেকে কংগ্রেস নেতৃত্বকে মুক্ত করার প্রয়াসে কমিউনিস্টরা গয়া অধিবেশনে ইস্তেহার উত্থাপন করে ছিল। সেই ইশতেহারে বলা হয়েছিল, ব্রিটিশ কমনওয়েলথের অন্তর্ভুক্ত থেকে সমান অংশীদারির তত্ত্বটি সাম্রাজ্যবাদেরই একটি গিল্টিকরা সংস্করণ ছাড়া আর কিছু নয়। এই তত্ত্বের আড়ালে যে মতলব সেটা হচ্ছে কিছু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধাদানের মাধ্যমে দেশীয় জমিদারদের সমর্থন আদায় করা এবং দেশের শোষণে তাদের ছোট শরিক হিসাবে ঠাঁই দেওয়া। এর দ্বারা আমাদের সমাজের উচ্চতর শ্রেণিভুক্তরা কিছুটা সান্ত্বনা খুঁজে পেতে পারে মাত্র। গান্ধীজীর একদা অতি প্রিয় ‘হৃদয়ের পরিবর্তন’-এর সেই প্রবঞ্চনা ও আত্মসমর্পণমূলক তত্ত্বটির মুখোশ ঐ ইস্তেহারটিতে খুলে দেওয়া হয়েছিল; সেখানে বলা হয়েছিল, ব্রিটিশ শাসকদের ‘হৃদয়ের পরিবর্তন’ সম্পর্কীয় তত্ত্বটির প্রচারে যারা রত, তারা এই সমস্ত আধাখেঁচড়া ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারগুলি থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। ভারতীয় জনসাধারণের স্বার্থের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থের একটা আপস সম্ভব বলে এই তত্ত্বটিতে তার স্বীকৃতি আছে। সুতরাং, তত্ত্বটি বিপজ্জনক এবং কংগ্রেসকে এর কবল থেকে মুক্ত করা অবশ্য কর্তব্য। এই যে দ্ব্যর্থবোধক অবস্থান এবং লক্ষ্য সম্পর্কীয় অস্পষ্টতা, তা কংগ্রেসের বিগত বারো মাসের কার্যকলাপের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা ও দোদুল্যমানতার বৈশিষ্ট্যকেই পুষ্ট করেছে। জাতীয় স্বাধীনতা অর্জন করে নিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনীয় ভারতীয় জনগণের যে সংকল্পদৃঢ় সংগ্রাম তা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত একটা কর্মসূচির উপরই নির্ভরশীল। কেবলমাত্র এরকম একটা কর্মসূচিই জনগণকে ব্যাপক আকারে জাতীয় সংগ্রামের মধ্যে টেনে আনতে পারে। তার কারণ, জনসাধারণের জীবনকে প্রভাবিত করে এমন সকল অত্যাবশ্যক বিষয়গুলি এতে বিবেচ্য বলে গণ্য হয়। ১৯২১ সালে জাতীয় কংগ্রেসের আহমেদাবাদ অধিবেশনকালে প্রচারিত কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারে বলা হয়েছিল, ভারতবর্ষকে তার মূল ভিত্তি সমেত কাঁপিয়ে দিতে পারে। এই রকম বিপ্লবে যদি কংগ্রেস নেতৃত্ব দিতে চায় তবে শুধুমাত্র বিক্ষোভ প্রদর্শন বা উন্মাদনাপূর্ণ সাময়িক উদ্দীপনার উপরই যেন তারা নির্ভর না করে। ট্রেড ইউনিয়নসমূহের এই মুহূর্তের দাবিগুলিকে তারা নিজেদের দাবি হিসেবে তুলে ধরুক, কিসান সভার কর্মসূচিকে তাদের নিজেদের কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করুক। সেটা করা হলে এমন সময় আসবে যখন কোন বাধার সম্মুখেই কংগ্রেসকে থেমে যেতে হবে না। নিজেদের বৈষয়িক স্বার্থের জন্য সচেতনভাবে সংগ্রাম করছে এমন একটা বিপুলায়তন জনসমষ্টির অপ্রতিরোধ্য শক্তির সমর্থন তারা পাবে। এটা দেখা যায় যে, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য সবচেয়ে অগ্রগামী ও বৈপ্লবিক ধ্যান-ধারণা ও কর্মসূচি কমিউনিস্টদের ছিল এবং তারাই জাতীয় আন্দোলনের মধ্যকার দুর্বলতা ও বৈজ্ঞানিক উপলব্ধির অভাবকে কাটিয়ে তুলতে সচেষ্ট ছিল। তবে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জাতীয় বুর্জোয়া নেতৃত্ব তাদের এই সমস্ত সমালোচনা ও পরামর্শগুলিকে প্রত্যাহত এবং প্রত্যাখ্যাত, দুটোই করত। স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সম্পূর্ণ কর্মসূচিসহ সংগ্রামের একটা নিজস্ব কর্মপন্থা ১৯৩০ সাল নাগাদ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি উপস্থিত করেছিল। পরবর্তীকালে ১৯৩৪ সালের এক পার্টি প্লেনামে এটাকেই আরও বিশদ করে তুলে ধরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। সংগ্রামের কর্মপন্থায় এই দলিলের বিষয়বস্তু এটাই তুলে ধরেছিল যে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ভারতীয় সমাজের সমস্ত প্রাণবন্ত উপাদানগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি প্রবল শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার বৈপ্লবিক কর্মসূচি একমাত্র কমিউনিস্ট পার্টিরই ছিল। সামন্ততান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এটা সুপরিজ্ঞাত যে, জাতীয় বুর্জোয়া নেতৃবৃন্দ জমিদার ও সামন্ততান্ত্রিকদের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতেই কাজ করত এবং কৃষিবিপ্লবের জন্য কৃষক সমাজকে জাগ্রত করে তোলার কথা চিন্তা করত না; মূল ও বৃহৎ একটা অংশকে অসংহত করে রেখেছিল। জাতীয় ঐক্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং অস্পৃশ্যতার অবসান সম্পর্কে অনেকে কথা বলা সত্ত্বেও, জাতপাত বোধ এবং হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে ভেদাভেদকে জিইয়ে রাখে যে সামন্ততান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী নেতারা কিন্তু তা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারেনি। তিলকের মতো কতিপয় কংগ্রেস নেতা তো প্রকাশ্যেই জাতপাতভেদকে সমর্থন করতেন। অস্পৃশ্যতার অবসান যে খুব জরুরি, এ কথা বললেও গো-রক্ষা, অবতারবাদ এবং বর্ণাশ্রম ব্যবস্থায় বিশ্বাসী হিসেবে গান্ধীজী নিজেকে একজন সনাতনী বলে ঘোষণা করেছিলেন। এই সমস্ত বিষয়ে নেহরুর ধ্যান-ধারণা উন্নত ধরনের হওয়া সত্ত্বেও কংগ্রেসে গান্ধীবাদী দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রাধান্য ছিল। গান্ধীজীর একজন পরম বিশ্বস্ত অনুগামী জগজীবন রাম তাঁর ‘কাস্ট চ্যালেঞ্জ ইন ইন্ডিয়া’ নামক পুস্তকে যে উদ্ধৃতি দিয়েছেন তা থেকে নিম্নলিখিত অংশটির উল্লেখ করলে এসব ব্যাপারে গান্ধীজীর দৃষ্টিভঙ্গি কিরূপ সেটা বোঝা যেতে পারে। যদি অস্পৃশ্যতাকে আমরা মুছে না ফেলি, তাহলে পৃথিবী থেকে আমরাই মুছে যাবো।... বর্ণচতুষ্টয় হচ্ছে মৌলিক জিনিস, এছাড়া অসংখ্য যে-সব জাত-উপজাত, সেগুলি বাড়তি আগাছা মাত্র... সত্যকার মিতব্যয়িতা ও মানবীয় শক্তির সংরক্ষণশীলতা সম্পর্কীয় প্রকৃতির নিয়ম বর্ণই পালন করে থাকে... এটা বিভিন্ন পদ্ধতির আত্মোন্নয়ন চর্চারই শ্রেণিবিভাজন। সামাজিক সুস্থিরতা ও প্রগতির এটাই সম্ভাব্য সর্বোৎকৃষ্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। জীবনের বিশুদ্ধতা রক্ষা সম্পর্কীয় একই নির্দিষ্ট উপায়াবলম্বী পরিবারসমূহকে এই ব্যবস্থা তার অন্তর্ভুক্ত করতে সচেষ্ট। এতে কোন পরিবার কোন বর্গের বলে গণ্য হবে, সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারটাই শুধু কতিপয় ব্যক্তির খেয়াল বা স্বার্থ-প্রণোদিত বিচারবুদ্ধির উপর ছেড়ে দেওয়া হয় না। বর্ণ-বংশানুক্রমের নীতিতে বিশ্বাসী এবং কেবলমাত্র উৎকর্ষসাধনই এই ব্যবস্থার ভিত্তি হওয়ায়, কোন ব্যক্তি জীবনযাপনের শ্রেয়তর উপায়ের সপক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সত্ত্বেও যদি তাকে পরিবার বা গোষ্ঠীবিশেষের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকতে হয়, তবে তাকে অবিচার বলে এতে মনে করা হয় না। সামাজিক জীবনে পরিবর্তন আসে খুবই ধীরে এবং জীবনের এই পরিবর্তনের উপযোগী নতুন গোষ্ঠীবন্ধনের প্রক্রিয়াকেও জাতপাত ব্যবস্থা সম্মতি দিয়েছে। মেঘের আকৃতির পরিবর্তনের মতো এই পরিবর্তনগুলিও নিঃশব্দে ও সহজে ঘটে। এর চেয়ে সুসঙ্গতিপূর্ণ সমন্বয় সাধনের কথা কল্পনা করা কঠিন। জাতপাত কোন উন্নাসিকতা বা হীনমন্যতা সূচিত করে না। এটা শুধু বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও তারই অনুরূপ জীবনধারণের পদ্ধতিগুলিকে স্বীকার করে থাকে মাত্র। জাতপাত হচ্ছে বিভিন্ন সংস্কৃতিগত প্রথার একটা শ্রেণি-বিভাজন। এটা পারিবারিক নীতিরই একটা সম্প্রসারণ। এই উভয় বিষয়ই নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে রক্তের সম্পর্ক এবং বংশানুক্রমের দ্বারা অর্থনৈতিক বিচারের দিক থেকে এর মূল্য অতীব উচ্চ। বংশানুক্রমিক দক্ষতা এর দ্বারা সুনিশ্চিত, প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র এর দ্বারা সংকুচিত, নিঃস্বতার প্রতিবিধানের এটা একটা উপায়। ব্যবসাগত গিল্ড গড়ে ওঠার সুযোগ এতে ছিল। ভারতীয় সমাজের গবেষণাগারে মানুষের কাছে এটা ছিল সামাজিক সমন্বয় গড়ে তোলা সম্পর্কীয় একটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এর সাফল্য যদি আমরা প্রমাণ করতে পারি, তাহলে হৃদয়হীন প্রতিযোগিতার একটা সর্বোৎকৃষ্ট প্রতিবিধান হিসেবে এবং ব্যাপক পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম এমন একট শক্তি হিসাবে বিশ্বের হাতে একে আমরা তুলে দিতে পারি... বর্ণ মনুষ্য-প্রকৃতিরই অন্তর্নিহিত। হিন্দুধর্ম তাকে একটা বিজ্ঞানে পরিণত করেছিল... বর্তমানে জাতপাত একটা বিকৃতিতে পর্যবসিত। এর অবসান ঘটানোর আগ্রহে মূল বিষয়টিকেই যেন আমরা বিসর্জন দিয়ে না বসি... কারণ এটা মানুষের কোন উদ্ভাবন নয়, প্রকৃতিরই এটা পরিবর্তনাতীত নিয়মমাত্র। এটা সেই প্রবণতারই একটা ঘোষণা যা সবসময়েই বিরাজ করছে এবং নিউটনের অভিকর্ষ-সম্পর্কিত নিয়মের মতোই কাজ করে চলেছে। জাতপাত ও বর্ণাশ্রমের সমর্থনে খোলাখুলি ও গোঁড়ামিপূর্ণ এর চেয়ে আর কিছু থাকতে পারে না। জাতপাতের পক্ষপাতী জাতীয় বুর্জোয়া নেতৃত্বের এই যে দৃষ্টিভঙ্গি, হিন্দু গোঁড়ামির এই যে তুষ্টিসাধন, সেটা সামন্ততান্ত্রিক স্বার্থের সঙ্গে বুর্জোয়া নেতৃত্বের আপসরফারই একটা অঙ্গস্বরূপ। এজন্যই শেষ পর্যন্ত এই দৃষ্টিভঙ্গিই কাজ করে গেছে ও অবশেষে হিন্দু-মুসলমান সমস্যার সমাধানে ব্যর্থতা ডেকে নিয়ে এসেছে, যার পরিণতি ঘটেছে দেশ-বিভাগে। কমিউনিস্ট কর্মপন্থা মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ভিত্তিতে রচিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কর্মপন্থা এই বুর্জোয়া সামন্ততান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছেদ ঘটাল এবং জাতীয় সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামের সাফল্যের প্রশ্নটিকে সংযুক্ত করল কৃষিবিপ্লবের সঙ্গে এবং পুরনো সামাজিক ধর্মীয় ব্যবস্থা কর্তৃক আরোপিত সমস্ত বৈষম্যের অবসানের সঙ্গে। সমস্ত বংশপরম্পরাজাত বৈষম্যের বিরুদ্ধে এই কর্মপন্থা সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করল এবং জনগণের সমস্ত অংশের প্রতি মুক্তির জন্য সংগ্রামে যোগদানের আহ্বান জানিয়ে সেই বৈষম্য-বিরোধী সংগ্রামকে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করল। ভারতীয় জনসাধারণের সমস্ত অংশের সমস্যাবলী সম্পর্কে সরাসরি উল্লেখ করে এবং ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদ করতে বিপ্লবী সংগ্রামের সমূহ প্রয়োজনের কথা তুলে ধরে এরকম কোনও বিপ্লবী দলিল ভারতবর্ষ ইতোপূর্বে কখনও দেখেনি। ঐ কর্মপন্থায় ঘোষণা করা হয়েছিল, ভারতীয় জনসাধারণের দাসত্ব বন্ধনের উচ্ছেদ ঘটাতে হলে এবং যে দারিদ্র্যের কবলে শ্রমিকশ্রেণি ও কৃষকেরা নিষ্পেষিত তা থেকে তাদের মুক্ত করতে হলে দেশের স্বাধীনতা অর্জন জরুরি, এবং মধ্যযুগ থেকে এ যাবৎ জিইয়ে রাখা সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থাকে চূর্ণ করে দিতে ও সমগ্র ভূখণ্ডকে যাবতীয় মধ্যযুগীয় আবর্জনা থেকে উদ্ধার করতে যা সমর্থ, সেই কৃষিবিপ্লবের পতাকা জমিদারি ব্যবস্থার ঊর্ধ্বে তুলে ধরা একান্তভাবে আবশ্যক। ব্রিটিশ পুঁজি ও জমিদারি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কৃষিবিপ্লবকেই হতে হবে ভারতে সেই বৈপ্লবিক মুক্তি অর্জনের ভিত্তি। কংগ্রেস বা অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলি যে সমস্ত বক্তব্য উপস্থিত করেছিল তা থেকে এটা ছিল সম্পূর্ণভাবেই ভিন্ন প্রকৃতির। ব্রিটিশ অধিকৃত সমস্ত কলকারখানা, ব্যাঙ্ক, রেলওয়ে, সমুদ্র ও নদী পরিবহণ ব্যবস্থা এবং বাগিচা শিল্পের বাজেয়াপ্ত ও জাতীয়করণের দাবি ঐ কর্মপন্থায় ঘোষণা করা হয়েছিল। এতে দেশীয় রাজ্যসমূহের অবসান এবং বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদার, রাজন্যবর্গ, গির্জা ও ব্রিটিশ সরকারি কর্মচারীদের অধিকৃত সমস্ত জমি, বনভূমি ও অন্যান্য সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার দাবি জানানো হয়েছিল। এতে দাসখত এবং ব্যাঙ্ক ও মহাজনী ঋণসমূহ নাকচ করে দেওয়ার দাবি রাখা হয়েছিল। এই কর্মপন্থায় আট ঘণ্টার শ্রমদিবস এবং শ্রমিকদের অবস্থার আমূল উন্নয়নমূলক পরিবর্তনের দাবিও করা হয়েছিল। এই দাবিগুলি, বিশেষ করে জমিদারি প্রথার উচ্ছেদের দাবিটি কখনই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটা অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়নি। একইভাবে ব্রিটিশ সংস্থাগুলি জাতীয়করণের দাবি উত্থাপনেও কংগ্রেস নেতারা সাহস করেনি। ১৯৩০ সালের সংগ্রামকালে গান্ধীজীর যে এগারো দফা কর্মসূচি ছিল তাতেও এই দাবিগুলির একটিকেও খুঁজে পাওয়া যায় না। কৃষক সমাজ সম্পর্কে যে দাবিটি এতে করা হয়েছিল, তা-ও ছিল জমির রাজস্ব ও খাজনা শতকরা পঞ্চাশ ভাগ হ্রাস করা সংক্রান্ত। গান্ধীজীর এগারো দফা কর্মসূচির সঙ্গে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির দ্ব্যর্থহীন কর্মসূচির তুলনা যদি আমরা করি, তাহলে অধিকার সমর্পণ ও আপসরফার উদ্দেশ্যে রচিত এক কর্মসূচি এবং একটি বিপ্লবী সংগ্রামের কর্মসূচির মধ্যে পার্থক্য কোথায় তা আমরা দেখতে পাই। শ্রেণি-সংগ্রাম বনাম সমাজ-সংস্কার “ভিন্ন ভিন্ন জাতির ও ভিন্ন ভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী শ্রমিকদের একে অপরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে তাদের মধ্যে সংঘর্ষের প্ররোচনা যারা দেয়, সেই ব্রিটিশ সরকার ও দেশীয় শোষকদের ধূর্ততাপূর্ণ প্ররোচনামূলক পদ্ধতি দ্বারা প্রতারিত না হওয়ার” জন্য হিন্দু ও মুসলিম শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ঐ কর্মপন্থা অস্পৃশ্যতা ও জাতপাত প্রথার প্রকাশ্য নিন্দা করেছিল এবং এই সমস্ত প্রথার উচ্ছেদকে সংযুক্ত করেছিল ভারতের সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার উচ্ছেদের সঙ্গে। এই প্রশ্নগুলিকে কংগ্রেস নেতারা বড় জোর হিন্দুদের সামাজিক সংস্কারের প্রশ্ন হিসেবে দেখত। অস্পৃশ্যদের মধ্য থেকে আগত জঙ্গি নেতারাও তাদের সংগ্রামকে সামন্ততন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং এইভাবে তারাও সমস্যাটিকে প্রকৃতপক্ষে একটা সমাজসংস্কারের প্রশ্নে পর্যবসিত করেছিল। কমিউনিস্ট পার্টি এই সংস্কারপন্থী ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং তাদের কর্মপন্থা ঘোষণা করেছিল, আমাদের দেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অবস্থানহেতু এখনও সমস্ত রকম অধিকার থেকে বঞ্চিত লক্ষ লক্ষ ক্রীতদাস এবং সমাজে অপাঙক্তেয় কোটি কোটি কর্মরত পারিয়ার অস্তিত্ব রয়ে গেছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা, প্রতিক্রিয়াশীল জাতপাত-প্রথা, ধর্মীয় প্রবঞ্চনা এবং অতীতের সমস্ত দাস ও ভূমিদাস-সুলভ রীতিনীতি ভারতীয় জনসাধারণের টুটি চেপে ধরে রেখে তাদের মুক্তির পথ অবরোধ করে রেখেছে। এ সমস্তের পরিণতি এইখানে এসে ঠেকেছে যে, এই বিংশ শতাব্দীতেও ভারতবর্ষে এখনও এমন পারিয়া রয়েছে যাদের সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করা, একই কুয়ো থেকে জলপান করা বা একই স্কুলে পড়াশুনা করা, ইত্যাদি কোনও অধিকার নেই। ভারতীয় জনসাধারণের জীবন থেকে এই লজ্জাজনক কলঙ্ক চিরদিনের জন্য ঘুচিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে গান্ধীজী ও অন্যান্য কংগ্রেস নেতারা সামাজিকভাবে অপাঙক্তেয় পারিয়াদের অস্তিত্বের সপক্ষে যুক্তি ও ভিত্তিস্বরূপ এই যে জাতপাত প্রথা, তাকেই বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন। একমাত্র জাতপাত প্রথার নির্মম উচ্ছেদসাধন, কৃষিবিপ্লব এবং বলপূর্বক ব্রিটিশ শাসনের উৎখাতই কর্মরত পারিয়াদের ও দাসদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আইনগতভাবে মুক্তি এনে দিতে পারে। ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট পার্টি ব্রিটিশ শাসন এবং জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে দেশের সমস্ত শ্রমিকদের সঙ্গে এক হয়ে বৈপ্লবিক যুক্তফ্রন্টে যোগদানের জন্য সকল পারিয়াদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে। ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট পার্টি দাসত্ব, জাতপাত-প্রথা এবং সমস্ত ধরনের (সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি) বর্ণ বৈষম্যের সম্পূর্ণ অবসানের জন্য সংগ্রাম করেছে। দেশের সমস্ত মেহনতী মানুষ ও কর্মরত পারিয়াদের জন্য নির্ভেজাল কমিউনিস্ট পার্টিই সংগ্রাম করে। এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই ঐ কর্মপন্থা দাবি করেছিল; পদমর্যাদা, বর্ণ, জাতি ও সম্প্রদায়গত সুবিধাভোগের বিলোপ এবং নারী-পুরুষ, ধর্ম ও গোত্র নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান অধিকার রাষ্ট্র থেকে ধর্মের সম্পূর্ণ পৃথকীকরণ এবং সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ দালাল হিসেবে কাজ করা মিশনারিদের সম্পত্তির বাজেয়াপ্তকরণ-সহ বিতাড়নও দাবি করেছিল। ভারতবর্ষে এই কমিউনিস্ট কর্মপন্থাই সর্বপ্রথম শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিক সংগ্রামের সঙ্গে ভারতের সংগ্রামকে যুক্ত করেছিল; মানুষকে অবহিত করেছিল যে, কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত আন্তর্জাতিক আন্দোলন সমস্ত মানুষের এক সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামরত আছে এবং মহান অক্টোবর বিপ্লব জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ সত্য কথাটি জনগণের মধ্যে প্রচার করায় শুধুমাত্র ব্রিটিশ শাসক নয়, কতিপয় কংগ্রেস নেতাও মস্কোর দালাল বলে কমিউনিস্টদের আখ্যায়িত করেছিল। কয়েক বছরের মধ্যেই অবশ্য নেহরুর প্রভাবে জাতীয় কংগ্রেসকেও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অগ্রগতিকে হিসেবের মধ্যে গণনা করতে হয়েছিল এবং ১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে গৃহীত এক প্রস্তাবে চিন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের জনসাধারণের জন্য তারাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। ঐ কর্মপন্থায় লেখা হয়েছে, ভারতীয় জনগণের সংগ্রামে ভারতীয় জনগণ একলা নয়। তাদের মিত্র রয়েছে বিশ্বের সমস্ত দেশের বিপ্লবী শ্রমিকদের মধ্যে। আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদের উচ্ছেদসাধনের জন্য এবং গভীর সংকটের মধ্যে দিয়ে চলা পুঁজিবাদের শোষণব্যবস্থার অবসান ঘটানোর জন্য সমগ্র বিশ্বের শ্রমিকরা সংগ্রাম করে চলেছে। যে বিশ্বসংকট সমস্ত রকম সংঘাতকে ব্যাপকমাত্রায় তীব্র করছে ও যুদ্ধকে আসন্ন করেছে এবং বিপ্লবী সংগ্রামের নতুন এক তরঙ্গে অভ্যুত্থানের সম্ভাবনাকে বৃদ্ধি করছে, সেই সংকটের সঙ্গে ভারতে সামন্ততান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী শোষণব্যবস্থার সংকটও বর্তমানে জড়িত হয়ে পড়েছে... বিশ্বের একটি দেশ সোভিয়েত রাশিয়ায় বহুদিন পূর্বেই শ্রমিকশ্রেণি শোষকদের ক্ষমতার উচ্ছেদসাধন করেছে এবং সেখানে সাফল্যের সঙ্গে এক সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে। ভারতবর্ষের মেহনতী মানুষসহ বিশ্বের সমস্ত ঔপনিবেশিক দেশের জনগণের এক নির্ভরযোগ্য মিত্র হচ্ছে এই সোভিয়েত ইউনিয়ন। সমস্ত দেশের বিপ্লবী শ্রমিকবৃন্দের কাছ থেকে, বিশেষ করে অগ্রসরমান চিন বিপ্লবের কাছ থেকে ভারতের মেহনতী জনগণ সমর্থন লাভ করবে। ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত গ্রেট বৃটেনের বিপ্লবী শ্রমিকবৃন্দও ভারতবর্ষের মেহনতী জনগণকে সমর্থন করবে। একথাটাও অবশ্যই একই সঙ্গে স্বীকার করতে হবে যে, ঐ কর্মপন্থায় ভারতীয় বুর্জোয়াদের ভূমিকা সম্পর্কে একটা বেঠিক ও ভুল ধারণা থেকে গিয়েছিল। চিনের চিয়াং কাইশেক-এর বিশ্বাসঘাতকতা আন্তর্জাতিক চিন্তাভাবনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তার ফলে ষষ্ঠ কংগ্রেসের (কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল) দলিলে সতর্ক করে দেওয়া সত্ত্বেও, একথাটা বস্তুত ঘোষণা করে দেওয়া হলো যে, বুর্জোয়ারা ইতোমধ্যেই সংগ্রামের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ১৯৩০ সালে এটা আমাদের সংকীর্ণতাবাদী মনোভাবের দিকে ঠেলে নিয়ে গেল এবং পার্টির বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মসূচি সম্পর্কে এক ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে জনগণের মধ্যে তার ভাবমূর্তির প্রচণ্ড ক্ষতি করল। পার্টি অবশ্য এই ভুলগুলির সংশোধন করে এবং ১৯৩৪ সালে যখন কর্মসূচি সম্পর্কীয় দলিল গ্রহণ করা হয় তখন এইসব ভুলের আর পুনরাবৃত্তি ঘটেনি। ঐ কর্মপন্থার দ্বিতীয় ভুলটি ছিল যেটা তাতে গণপরিষদভিত্তিক উৎক্রান্তিকালীন কোন রাষ্ট্রীয় অবয়বের ঠাঁই ছিল না। এতে শুধুমাত্র এক সোভিয়েত রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কথাই বলা হয়েছিল। কিন্তু এই সমস্ত ভুল সত্ত্বেও জাতীয় মুক্তি সংক্রান্ত এমন একটা বৈপ্লবিক উপলব্ধি ও কর্মসূচির অস্ত্রে কমিউনিস্ট পার্টি সুসজ্জিত ছিল যা ভারতীয় সমাজের শ্রেণিভিত্তিক বাস্তবতার উপরই ছিল প্রতিষ্ঠিত। প্রকাশের তারিখ: ০১-আগস্ট-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|