ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্টদের ভূমিকা (১ম পর্ব)

B T Ranadive
স্বাধীনতা সংগ্রামকে বিপ্লব-অভিমুখী করে তুলতে কমিউনিস্টদের যে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল, সে সব কথা খুব কম লোকেরই জানা। ১৯২০ সাল থেকে শুরু করে ১৯২৯ সালের মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা পর্যন্ত পর পর যে সমস্ত ষড়যন্ত্র মামলায় কারাবাসের গুরুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছিল। সেইগুলি ছাড়াও ক্রিয়াকলাপের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই কমিউনিস্টদের কারাদণ্ড, আটক, নির্বাসন এবং জীবনধারণের সুস্পষ্ট কোন উপায় না থাকার অভিযোগে ও গুণ্ডা দমন আইনের কবলে গ্রেপ্তার বরণ করতে হয়েছিল।

১ম পর্ব

আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্টদের ভূমিকা সাধারণভাবে অস্বীকৃত। তবে এটাই একমাত্র নয়; ভাড়াটে লেখক ও স্বার্থান্বেষী বুর্জোয়া ঐতিহাসিকরা স্বাধীনতা সংগ্রামের-বিপক্ষে বলে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে কিছুকাল পর পরই অপবাদ এবং কলঙ্কও রটিয়ে থাকে।

এটা ঠিকই যে, স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্ট পার্টির কোন নির্ধারক ভূমিকা ছিল না। তা যদি থাকত, তবে ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য ও বেকারি এবং সমস্ত রকম বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির শিকার কলহ-জর্জরিত এক জাতির চেহারা নিয়ে আজকের যে শোচনীয় পরিস্থিতি, ভারতীয় জনসাধারণকে তার সম্মুখীন হতে হতো না। স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বের যে রাশ, তা বেশ শক্তভাবেই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বুর্জোয়া নেতৃত্বের হাতেই ধরা ছিল। এমনকি কোন গণসংগ্রাম যখন কংগ্রেস-নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে যেত, জনসাধারণ সশস্ত্র প্রতিরোধেও প্রবৃত্ত হতো, তখনও কিন্তু এই নেতৃত্বের অনুগামী জনগণের চেতনায় কোন পরিবর্তন ঘটত না। এ কারণে সেই সংগ্রামও সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়তে পারত না।

বুর্জোয়া নেতৃত্ব এবং তাদের প্রচারিত শ্রেণি-দৃষ্টিবিহীন জাতীয়তাবাদী মতাদর্শই সুসঙ্গত ও সংহতি-সৃষ্টিকারী উপাদান হিসেবে প্রতিভাত হতো। অভ্যন্তরীণ শ্রেণি-সংঘর্ষ থেকে মুক্ত একটা সুষম প্রকৃতির সমাজ-সম্পর্কীয় মোহ নিপীড়িত জনগণের মধ্যে তখন একটা সাধারণ প্রবণতা ছিল। বৈদেশিক প্রভুত্বের বিরুদ্ধে যখন কোন জনসমষ্টিকে সংগ্রাম করতে হয় তখন তাদের মধ্যে একটা মোহ সহজেই সৃষ্টি করা যায় যে, তারা সম্পূর্ণ সুষম-প্রকৃতির। বিরাজমান সামাজিক ব্যবস্থায় দেশের পরাধীনতা কেমনভাবে জটিল এই প্রশ্ন খুব কম লোকই উত্থাপন করে। প্রশ্নটি যদি আদপে কখনও তোলা হয় তাহলে এই কথা বলে তাকে চেপে দেওয়া হয় যে, স্বাধীনতা আমরা একবার পেয়ে গেলেই এ সমস্ত প্রশ্নের মীমাংসা হয়ে যাবে। বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলের ক্রিয়াকলাপ এবং বিদেশি শাসকদের সম্পর্কে তাদের ভিন্ন ভিন্ন মনোভাব প্রসঙ্গে কোন রকম চিন্তা ভাবনা করা হয় না। যাদের স্বার্থ জনগণের চূড়ান্ত লক্ষ্যের বিরুদ্ধে যায় ও যারা জনগণের সংগ্রামের মধ্যে নিজেদের সংকীর্ণ শ্রেণি-লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট থাকে তাদের চিহ্নিত করার জন্য, স্বাধীনতা-সংগ্রামকে শেষ পর্যন্ত পরিচালিত করে নিয়ে যাওয়ার কাজকে তারা যাতে প্রতিহত করতে না পারে তা সুনিশ্চিত করার জন্য কোনও প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয় না।

কংগ্রেস নেতৃত্বের শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতা ভারতের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামের ব্যাপকতাকে কার্যকরভাবে খর্ব করেছিল; আর জাতীয় বুর্জোয়াদের সেই আপসপন্থী স্বার্থের সঙ্গে গান্ধীজী ছিলেন এবং কংগ্রেসের সাংগঠনিক কর্মসূচি, কৌশল ও দৃষ্টিভঙ্গিকে তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বর্ণনা করেছিলেন। কংগ্রেস নেতৃত্বের এই সীমাবদ্ধতার প্রতি কমিউনিস্টরা যখনই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তখনই তাদের স্বাধীনতা-সংগ্রামের প্রতি অন্তর্ঘাতী বলে তীব্রভাবে গালাগালি করা হয়েছে। কমিউনিস্ট আন্দোলনে অগ্রগতির প্রতিটি পদক্ষেপকে যে জাতীয় বুর্জোয়াদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হতে হয়েছে এবং ব্রিটিশ সরকারের দমননীতির দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হতে হয়েছে, সেটা ভারতের শ্রেণি-সংগ্রামেরই একটা অংশ ছিল। নিজেদের ভূমিকার তাৎপর্য বুঝতে সক্ষম করে তোলার প্রয়োজনে জন-সাধারণের চেতনার মান উন্নয়নের চেষ্টা হিসেবে সমকালীন জাতীয় নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতার প্রশ্নটিকে খোলসা করে দিয়ে ভারতের জাতীয় সংগ্রাম সম্পর্কে একটা বিপ্লবী উপলব্ধি প্রবর্তন করার উদ্যোগের খেসারত রূপে কমিউনিস্টদের এই মূল্য দিতে হয়েছিল।

ব্রিটিশ বড়লাট থেকে শুরু করে জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্র ও জাতীয় নেতারা পর্যন্ত সবাই কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করেছিল। ৫৫ বৎসর আগে, ১৯২৯ সালের জানুয়ারি মাসে ব্রিটিশ বড়লাট লর্ড আরউইন আইনসভায় প্রদত্ত তাঁর ভাষণে ঘোষণা করেছিলেন, “কমিউনিস্ট মতবাদের উদ্বেগজনক প্রসারলাভ দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে”; সরকার যে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, সে কথাও তিনি ঘোষণা করেছিলেন। ইংল্যাণ্ডের ম্যাঞ্চেস্টার গার্ডিয়ান পত্রিকায় (১৯২৯ সালের আগস্টে) তিনি লিখেছিলেন, “বিগত দুই বৎসরের ঘটনা এটাই প্রমাণ করেছে যে, বিবেকবর্জিত কমিউনিস্ট সংগঠকদের হাতে শিল্প শ্রমিকরা এক অদ্ভুত নমনীয় উপাদান।” দক্ষিণপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ তখন তো ঘোষণা করেছিল যে, “সেই সময়টা এখন এসে গিয়েছে, যখন ভারতের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সংগঠন থেকে দুষ্কৃতকারীদের উৎপাটিত করে দূর করে দিতে হবে। এই হুঁশিয়ারির প্রয়োজন হয়ে পড়েছে আরও এই কারণে যে, এমন কতিপয় ব্যক্তি আছে যারা স্ট্রাইকের বাণী প্রচার করে বেড়াচ্ছে।” অবশেষে জাতীয় কংগ্রেসের মুখপত্র বম্বে ক্রনিক্যাল পত্রিকা এই হৈ-হল্লায় যোগ দিয়ে লিখেছিল, “আকাশে বাতাসে এখন সমাজতন্ত্রের কথা। বিগত মাসগুলিতে ভারতে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সম্মেলনে, বিশেষ করে শ্রমিক ও কৃষকদের সম্মেলনগুলিতে এই সমাজতন্ত্রের মূল নীতিগুলি প্রচার করা হয়েছে।”

আতঙ্কপূর্ণ এই সংকেতগুলির পরিণতি ঘটল মিরাট ষড়যন্ত্র মামলায় ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ এবং কমিউনিস্টদের ধরপাকড়। অত্যন্ত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে কাজ করতে গিয়ে কমিউনিস্টদের নিকৃষ্টতম দমনপীড়নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামকে বিপ্লব-অভিমুখী করে তুলতে কমিউনিস্টদের যে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল, সে সব কথা খুব কম লোকেরই জানা। ১৯২০ সাল থেকে শুরু করে ১৯২৯ সালের মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা পর্যন্ত পর পর যে সমস্ত ষড়যন্ত্র মামলায় কারাবাসের গুরুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছিল। সেইগুলি ছাড়াও ক্রিয়াকলাপের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই কমিউনিস্টদের কারাদণ্ড, আটক, নির্বাসন এবং জীবনধারণের সুস্পষ্ট কোন উপায় না থাকার অভিযোগে ও গুণ্ডা দমন আইনের কবলে গ্রেপ্তার বরণ করতে হয়েছিল। প্রতিটি ধর্মঘট সংগ্রামের কালেই কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে রাজদ্রোহ বা হিংসাত্মক কার্যকলাপের অভিযোগ এবং ধর্মঘটী শ্রমিকদের দমন করা হয়েছে লাঠি ও গুলির জোরে এবং কয়েদখানায় পাঠিয়ে। প্রত্যেকটি বছর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সংখ্যক নেতৃবৃন্দকে জেলখানাতেই থাকতে হতো।

ব্রিটিশ আমলের সমস্তটা কাল জুড়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি একটা বে-আইনি পার্টি ছিল। ১৯৩৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টি নেতৃত্বাধীন ইয়ং ওয়ার্কার্স লিগের মতো বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন ও সংগঠনকে বে-আইনি বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। ১৯৩৭ সালে, যখন কতিপয় রাজ্যে কংগ্রেস-মন্ত্রিত্ব ক্ষমতাসীন হলো, কেবলমাত্র তখনই এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবার পরে ১৯৪০ সালে পার্টিকে আবার আত্মগোপন করতে হয় এবং সেই সময়ে পার্টির বহুসংখ্যক জনপ্রিয় নেতাকে আটক করা হয়েছিল। ১৯৪২ সালে ফ্যাসিস্ট-বিরোধী যুদ্ধের প্রতি সমর্থন জানানোর পরেই একমাত্র পার্টি প্রকাশ্যভাবে কাজ করার সুযোগ পায়।

মহারাষ্ট্র, বাংলা, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, কেরালা, তামিলনাডু ও অন্ধ্রপ্রদেশ ভারতের প্রায় সর্বত্র অসংখ্য কমিউনিস্টকে বছরের পর বছর ধরে কারাগারে বা বন্দি শিবিরে আটক থাকতে হয়েছে। বাংলা ও পাঞ্জাবে বহুজনকে অত্যাচার ভোগ করতে হয়েছে। বর্বরতায় পোক্ত 'মালাবার স্পেশাল পুলিস'কে অত্যাচার, গুলিবর্ষণ ও হত্যার কাজে নিয়োগ করা হলে মালাবারে একটা ব্যাপক সন্ত্রাসের অভিজ্ঞতা কমিউনিস্টদের হয়েছিল। তামিলনাডুর অভিজ্ঞতাও ঐ একই রকম। অনেককেই যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর, মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছিল। একটা হত্যার মামলায় মিথ্যাভাবে অভিযুক্তও হয়ে কাইয়ুর বীর কমরেডরা হৃদয়ে কমিউনিজমের আদর্শের প্রতি সুদৃঢ় নিষ্ঠা নিয়ে মাথা উঁচু করে এগিয়ে গিয়েছিলেন ফাঁসির মঞ্চের দিকে।

একটা নজিরবিহীন দমন-পীড়নের মুখোমুখি হয়ে বাংলার কৃষকেরা ভয়াবহ এক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিল। আর, নিজামশাহির শেষ দিনগুলির এবং নেহরু সরকারের প্রথম দিকের দিনগুলিতে তেলেঙ্গানার কৃষকদের উপর যে বর্বর অত্যাচার চালানো হয়েছিল তার সঙ্গে তুলনা করার মতো কিছুই পাওয়া যাবে না।

পি সুন্দরাইয়া তাঁর ‘তেলেঙ্গানার গণসংগ্রাম ও তার শিক্ষা’ শীর্ষক বইতে লিখেছেন, এ গণবিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়ার ভূমিকা যাদের ওপরে ন্যস্ত, কমিউনিস্ট পার্টির সেই বিশাল-অন্ধ্র রাজ্য ইউনিট এবং তেলেঙ্গানার সংগ্রামী কৃষকদের এই বিপুল সংগ্রাম তাদের আত্মত্যাগে উৎসাহিত করে তুলেছে। তিন থেকে চার বছর কালব্যাপী প্রায় চার হাজার কমিউনিস্ট কর্মী ও সংগ্রামীকে বন্দি-শিবিরে অথবা জেলখানায় আটক করে হয়েছিল। মারধর ও অত্যাচার করার জন্য এবং সন্ত্রাস সৃষ্টির লক্ষ্যে সাধারণ মানুষকে মাঝে মাঝেই টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হতো পুলিশি হেফাজতে বা সেনাশিবিরে সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস ধরে এটাই চলেছিল; কমপক্ষে ৫০ হাজার মানুষ এভাবেই আক্রান্ত হয়েছিল। হাজার হাজার গ্রামের লক্ষ লক্ষ মানুষ পুলিশ ও সেনাবাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়ে নিষ্ঠুর লাঠি-চালনার যন্ত্রণা ভোগ করেছে। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর এইসব হানার ফলে লুঠ ও ধ্বংসের দরুন মানুষ লক্ষ লক্ষ টাকার সহায় সম্পদ হারিয়েছে, হাজার হাজার নারীর শ্লীলতাহানি ঘটেছে ও তাদের নানা রকমের অপমান লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়েছে। এক কথায়, পুরো পাঁচ বছর ধরে সমগ্র এলাকাটি প্রথম দিকে নিজাম ও রাজাকার এবং তাদের সশস্ত্র বাহিনীর, আর পরবর্তীকালে কেন্দ্রীয় সরকার এবং হায়দ্রাবাদ রাজ্য সরকারের যুগ্ম সশস্ত্রশক্তির পুলিশি ও সামরিক শাসনের বর্বরতার শিকার হয়েছিল।

স্বাধীনতা সংগ্রামের বিজ্ঞানসম্মত উপলব্ধি

এই সমস্ত দমনপীড়ন ও জাতীয় বুর্জোয়াদের আক্রমণ এবং জাতীয় সংবাদপত্রগুলির সহানুভূতিহীন মনোভাবের মোকাবিলা করেই কমিউনিস্টরা প্রবলভাবে টিকে ছিল। এর কারণ, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের আধেয় বিষয় ও তার তাৎপর্য সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত উপলব্ধিতে পরিপুষ্ট ছিল তাদের দেশপ্রেম। তাদের এই সংগ্রাম যে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অন্যান্য বিশ্বব্যাপী সংগ্রামেরই একটা অংশ এবং এই সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে অন্যান্য দেশেও শক্তিশালী সংগ্রাম চলছে এই বোধ এবং সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা সম্পর্কে উপলব্ধি ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের সেই আত্মবিশ্বাসকে বাড়িয়ে দিয়েছিল।

লেনিন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক-এর প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে কমিউনিস্টরা একথাটা বুঝেছিল যে, ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ধাপে ধাপে মঞ্জুরীকৃত কতকগুলি সংস্কারের মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতা অর্জিত হবে না; অথবা, কংগ্রেস যেমন চিন্তা করে থাকে, সেই রকম শান্তিপূর্ণ পথেও তা লাভ করা যাবে না। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক তাদের একথাই শিখিয়েছিল যে, স্বাধীনতা কেবলমাত্র গণ-সংগ্রামের মাধ্যমেই আসতে পারে এবং ভারতবর্ষের যা পরিস্থিতি তাতে সামন্ততান্ত্রিক ও আধা-সামন্ততান্ত্রিক কৃষি সম্পর্কের অবসান ঘটাতে পারে যে কৃষিবিপ্লব, সেই কৃষিবিপ্লবই হবে এই গণ-সংগ্রামের অক্ষ। কমিউনিস্টরা এই কথাটা বুঝেছিল যে, সমাজতন্ত্রে পৌঁছানোর পথকে যদি উন্মুক্ত করা না যায় তবে সাম্রাজ্যবাদী শাসন থেকে মুক্তি জনগণকে দারিদ্র ও নিঃস্বতার কবল থেকে আপনা হতেই মুক্ত করতে পারবে না। কমিউনিস্টরা বুঝতে পেরেছিল যে, ভারতবর্ষে সমস্ত শ্রেণিগুলিই বিপ্লবে সমানভাবে আগ্রহী নয়। কেউ কেউ আপসেই আগ্রহী বা কেউ কেউ ছিল যারা জনগণকে জাগ্রত করে তুলতে ভয় পায়। স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পর্কে বিভিন্ন শ্রেণিগুলি কে কোন অবস্থান গ্রহণ করছে, তার ভিত্তিতেই তারা নিজেদের কৌশল ও দৃষ্টিভঙ্গি স্থির করত।

শিল্পাঞ্চলীয় শহরগুলিতে নিজেদের জনবলজনিত শক্তির ব্যবহার এবং সাম্রাজ্যবাদী যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার ক্ষমতা থাকার কারণে জাতীয় সংগ্রামে বিপ্লবী ও ফলপ্রসূ ভূমিকা গ্রহণের যোগ্যতা যে শ্রমিকশ্রেণির রয়েছে, একথাটা কমিউনিস্টরা উপলব্ধি করেছিল।

কিন্তু জাতীয় আন্দোলন ও তার নেতৃবৃন্দের কাছে এ বিষয়গুলি ছিল একেবারেই অজানা ও ধারণাবহির্ভূত। ভারতের স্বাধীনতা সম্পর্কে সকলেই একইরকম আগ্রহী এবং ভারতীয় জনগণ যে পারস্পরিক সংঘর্ষ থেকে একেবারে মুক্ত ও সুষম প্রকৃতি-বিশিষ্ট-তাদের এই ধারণার সঙ্গে ঐ বিষয়গুলি মোটেই খাপ খায়নি। শ্রমিক ও পুঁজিপতি, জমিদার ও কৃষক এবং সুবিধাভোগী ও নিপীড়িত জাত-বর্ণের মধ্যকার বিরোধ সম্পর্কিত কোন প্রশ্নের উল্লেখ করলেই প্রশ্নকারীকে জাতীয় সংগ্রামের সাধারণ লক্ষ্য থেকে বিপথগামী বলে বিবেচিত করা হতো। তারা হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের প্রচার করত। পরবর্তীকালে, অস্পৃশ্যতা দূরীকরণের আওয়াজও তাদের ছিল। কিন্তু এই সমস্ত সমস্যার শ্রেণিগত উৎস কোথায় তা অনুসন্ধান করে দেখতে এবং সমস্যাগুলির সমাধানের ভিত্তি গড়ে তুলতে তারা প্রস্তুত ছিল না।


প্রকাশের তারিখ: ০১-আগস্ট-২০২৬

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org