রাধানাথ শিকদার পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আবিস্কার করলেন

Dr. Shankar Kumar Nath
রাধানাথকে সার্ভের অফিসে আটকে রাখতে জর্জ এভারেষ্ট সরকারকে একান্ত অনুরোধ করলেন। সরকার যেন এমন একটা ব্যবস্থা নেন, যাতে এইরকম ক্ষেত্রে বিভাগীয় প্রধানের অনুমতি ব্যতীত কোন দেশীয় কর্মচারী অন্য কোন বিভাগে বদলি হতে না পারে। সরকার এভারেষ্টের কথা রেখেছিলেন। কোর্ট অফ ডিরেক্টরস্ এর অনুমতি নিয়ে কর্তৃপক্ষ একটি আইনী সার্কুলার জারি করে দিলেন, যাতে রাধানাথ অন্য কোন বিভাগে যেতে না পারেন।
 
রাধানাথ শিকদার পড়তেন হিন্দু কলেজে আর সেখান থেকেই তাঁর প্রতিভার উন্মেষ হয়েছিল, বিশেষ করে গণিতশাস্ত্রে। তিনি ছাত্র জীবনেই ভারতবিখ্যাাত গণিতবিদ হয়ে উঠেছিলেন আর সেই স্বীকৃতি দিয়েছিলেন তাঁর শিক্ষক ডা: জন টাইটলার, জর্জ এভারেষ্ট প্রমুখ পন্ডিতগণ। তাঁর আর এক প্রিয় শিক্ষক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও-র সান্নিধ্যে এসে রাধানাথ সম্পূর্ণ অন্য মানুষ হতে পেরেছিলেন, যেখানে কুসংস্কারের কোন স্থান নেই, যেখানে সমাজকে স্থবির করে রাখার কোন জয়গা নেই, যেখানে জন্মভূমিকে ভালোবাসাই মূল কথা, অগ্রগতিই মূল কথা।

প্রসঙ্গত, ডিরোজিও প্রতিষ্ঠিত ‘ইয়ং বেঙ্গল’ সংগঠনের অন্যতম সদস্য ছিলেন রাধানাথ শিকদার; অন্যদের মধ্যে ছিলেন রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দোপাধ্যায়, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, হরচন্দ্র ঘোষ, রামতনু লাহিড়ি প্রমুখ।
রাধানাথ শিকদারের জন্ম ১৮১৩ সালের অক্টোবর মাসে, কলকাতার জোড়াসাঁকো এলাকার শিকদার পাড়ায়। তাঁর বাবার নাম তিতুরাম শিকদার। তিতুরামের দুই ছেলে, তিন মেয়ে। রাধানাথ জ্যেষ্ঠ, অন্যপুত্রের নাম শ্রীনাথ। তিনিও অঙ্কশাস্ত্রে পন্ডিত ছিলেন, ভারতীয় সার্ভে অফিসেই চাকরি করতেন।

কলেজে পড়াকালীনই শিক্ষক ডা: জন টাইটলারের কাছে রাধানাথ এবং রাজনারায়ন বসাক নিউটনের প্রিন্সিপিয়া পাঠ করেছিলেন, অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। বলা বাহুল্য, সমগ্র ভারতে এরা দুজনেই প্রথম যারা প্রিন্সিপিয়া পাঠ করেছিলেন।
রাধানাথ তখনও হিন্দু কলেজের ছাত্র, তিনি জ্যামিতির একটি সম্পাদ্যের সমাধান করে ফেলেন নিজের উদ্ভাবন পদ্ধতির দ্বারা। এটি প্রকাশিত হয়েছিল Gleanings in Science পত্রিকায় ১৮৩১ সালে।

রাধানাথ যোগ দিলেন দি গ্রেট ট্রিগোনোমেট্রিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়াতে - 
এই সময় দি গ্রেট ট্রগোনোমেট্রিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার সার্ভেয়ার জেনারেল ছিলেন জর্জ এভারেষ্ট (১৭৯০-১৮৬৬)। সার্ভের ইতিহাসে তাঁর মত পন্ডিত ব্যক্তি খুব কমই এসেছিলেন। ঐ সময় তিনি তাঁর জরিপের কাজের জন্য একজন মেধাসম্পন্ন গণিতবিদ খুঁজেছিলেন। একথা জানতে পেরে তাঁর বন্ধু হিন্দু কলেজের শিক্ষক ডা: জন টাইটলার (১৯৭০-১৮৩৭) তাঁর ছাত্র রাধানাথের নাম প্রস্তাব করলেন এভারেষ্টের কাছে। সুতরাং প্রিয় শিক্ষক মশাইয়ের সুপারিশে রাধানাথ যোগ দিলেন ভারতের সার্ভেঘর জেনারেলের অফিসে ১৮৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর, বেতন প্রতি মাসে ৩০টাকা।

এই টাকাটা রাধানাথের অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল সেই সময়। তিতুরামের পরিবার খুবই দরিদ্র অবস্থায় দিন কাটাতো, এতটাই যে হিন্দু কলেজে পুত্র রাধানাথের জন্য কলেজের টুইশন ফি দিতে পারতেন না - তাতে অবশ্য রাধানাথের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়নি, কারণ কলেজে তাঁর বেতন লাগতো না, সে ব্যবস্থায় করা হয়েছিল। তাহলেও বই কেনা, পড়াশোনার সরঞ্জম কেনা ইত্যাদির জন্য বেশ খানিকটা খরচ হত। 

দারিদ্র্যের কথা বলতে গিয়ে স্মৃতিকথায় রাধানাথ একস্থানে লিছেন :
“কলেজে একমনে পড়িতে পাইতাম না, একবার পড়ার কথা মনে পড়িত, পরক্ষণেই বাটীতে ফিরিয়া যাইয়া কি খাইব, মা বুঝি এখনও কিছুই খান নাই, এই সকল ভাবনা মনে উদিত হইয়া পড়ার ব্যাঘাত ঘটিত।” 
তাই কলেজ ত্যাগ করে রাধানাথ সার্ভেয়র - জেনারেল জর্জ এভারেষ্টের অধীনে কাজ পাবার সুযোগটা হাতছাড়া করলেন না, যদি পরিবারের করুন অবস্থা থেকে খানিকটা উদ্ধার পাওয়া যায়।
রাধানাথকে পেয়ে এভারেষ্ট বুঝলেন, তিনি রত্ন পেয়েছেন, চেয়েছিলেন একজন দক্ষ গণতিবিদকে, পেয়ে গেলেন একজন প্রতিভাবান গণিতবিদকে। সার্ভেয়র জেনারেলের অফিসে তাঁর পদটির নাম ছিল ‘কম্পিউটর’, অর্থাৎ ‘গণনাকারী’ বা ‘গনক’।
২০ ডিসেম্বর, ১৮৩১ সালে মাসিক ৩০ টাকা বেতনে রাধানাথ সার্ভের কলকাতা অফিসেই যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে হিন্দু কলেজের আরও ৬জন ছাত্র এই অফিসে যোগদান করেন। ৬ মাসে পরে রধানাথ যোগ দেন গ্রেট ট্রিগোনোমেট্রিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়াতে (এঞঝ) ১৮৩২ সালের ৭মে ; তখন তাঁর বেতন বেড়ে দাঁড়ায় ১০৭ টাকা প্রতি মাসে। এরপর ১৮৩২ সালের ১৫ অক্টোবর কলকাতা ছেড়ে মুসৌরীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। তাঁর সঙ্গে কলকাতা থেকে একই উদ্দেশ্যে গেছিলেন তাঁর সিনিয়র দুই অফিসার ওয়া সাহেব এবং রেনী সাহেব। উদ্দেশ্য - বিখ্যাত ‘দি গ্রেট আর্ক’ - এর কাজের জন্য নিখুঁত জরিপের কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করা।

হঠাৎ অঘটন - 
কিন্তু হঠাৎ-ই এক অঘটন ঘটলো ১৮৩৭ সালে। এই বছর হিন্দু কলেজের বেশ কিছু মেধা সম্পন্ন ছাত্র ডেপুটি কালেক্টরের পদের জন্য দরখাস্ত করলেন। খবর পেয়ে রাধানাথও কোন একটি স্কুলের শিক্ষক পদের জন্য দরখাস্ত করে বসলেন। উদ্দেশ্য: সাংসারিক টানাটানিতে খানিকটা যদি বেতন বেশি পেয়ে আর্থিক অনটনকে লাঘব করা যায়। সকলেই জানতেন শিক্ষকের পদ পেতে প্রতিভাবান রাধানাথকে বিশেষ বেগ পেতে হবে না - কিন্তু ঐ পদে তিনি যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপমৃত্যু ঘটে যাবে একজন ভারতশ্রেষ্ট গণিতবিদ এবং জরিপবিদের। হ্যাঁ প্রমাদ গুনলেন এভারেষ্ট। রাধানাথ কিন্তু ইতিমধ্যে এভারেষ্টের কাছে দরখাস্ত করে তাঁকে ছেড়ে দেবার আবেদন জানালেন। জর্জ এবারেষ্ট কিংকর্তব্যবিমূঢ়, সার্ভে বিভাগের পরম সম্পদ রাধানাথকে কেমনভাবে আটকানো যায়, তা খুঁজতে লাগলেন তিনি।

রাধানাথকে সার্ভের অফিসে আটকে রাখতে জর্জ এভারেষ্ট সরকারকে একান্ত অনুরোধ করলেন। সরকার যেন এমন একটা ব্যবস্থা নেন, যাতে এইরকম ক্ষেত্রে বিভাগীয় প্রধানের অনুমতি ব্যতীত কোন দেশীয় কর্মচারী অন্য কোন বিভাগে বদলি হতে না পারে। সরকার এভারেষ্টের কথা রেখেছিলেন। কোর্ট অফ ডিরেক্টরস্ এর অনুমতি নিয়ে কর্তৃপক্ষ একটি আইনী সার্কুলার জারি করে দিলেন, যাতে রাধানাথ অন্য কোন বিভাগে যেতে না পারেন। হ্যাঁ, এই সার্কুলারটি কিন্তু রাধানাথকে আটকাবার জন্যই করা হয়েছিল। আর ঠিক, রাধানাথ রয়ে গেলেন সার্ভে অফিসে। নইলে একটি প্রতিভার সেদিনই মৃত্যু ঘটে যেত।

দি গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্ক -
ভারতে সার্ভে বা জরিপের কাজ বিজ্ঞানসম্মতভাবে শুরু করেছিলেন মেজর জেমস্ রেনেল (১৭৪২-১৮৩০) ১৭৬৪ সালে। তাঁকে এই দায়িত্ব দিয়েছিলেন লর্ড ক্লাইভ। পরে ১৭৬৭ সালে যখন সার্ভেয়র - জেনারেলের পদ সৃষ্টি হল, তখন রেনেলই প্রথম এই পদে অভিষিক্ত হলেন। তখন অবশ্য বলা হত সার্ভেয়র জেনারেল অফ বেঙ্গল। সার্ভেয়র জেনারেল অফ ইন্ডিয়া পদটি শুরু হয় ১৮১৫ থেকে। অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে আমরা পেলাম অসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন ব্যক্তি কর্নেল উইলিয়াম ল্যাম্বটনকে (১৭৫৩-১৮২৩)। ইনি ছিলেন ভূগোলবিদ এবং Geodetic বা ভূগোলের আকার এবং পরিমাপ সংক্রান্ত গণিতবিদ্যা বিশারদ। তিনি বুঝলেন, এই  Geodetic পদ্ধতির মাধ্যমেই একমাত্র নিখুঁত মানচিত্র প্রস্তুত করা সম্ভব। এই কারণে তিনি এবিষয়ে এক পরিকল্পনাসহ নক্শা এবং প্রোজেক্ট জমা করলেন কর্তৃপক্ষের কাছে ১৭৯৯ সালে; অনুমোদন পাওয়া গেল ১৮০০ সালে; কাজ শুরু হল ১৮০২ সালের ১০ এপ্রিল। আর ঐ দিন থেকেই শুরু হয়ে গেল ট্রিগোনোমেট্রিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া, যদিও এই নামটি সরকারিভাবে স্বীকৃতি পায় ১৮১৮ সালে। উল্লেখ্য, বর্তমানে ১০ এপ্রিল দিনটিকে আমরা জাতীয় সার্ভে দিবস হিসেবে প্রতি বছর পালন করছি।
এই দিন থেকেই শুরু হল পৃথিবীর অন্যতম এক বিষ্ময়কর কর্মকান্ড - ‘দি গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্ক’-এর কাজ, মূল কারিগর, পবিকল্পক উইলিয়াম ল্যাম্পটর। আজও এই কর্মকান্ডটি সম্পর্কে বলা হয়, - One of the most stupendous works in the whole histroy of science’ Ges as near perfect of thing of its kind as has ever been undertaken.

১৮২৩ সালে ল্যাম্বটনের মৃত্যু হলে এই কাজের প্রধান দায়িত্ব অর্পিত হয় জর্জ এভারেষ্টের উপর। যদিও ল্যাম্বটনের সঙ্গে ১৮১৮ সাল থেকে সহকারি হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করে ফেলেছিলেন এভারেষ্ট। প্রায় ১৬০০ মাইল (২৫৬০ কিলোমিটার) দীর্ঘ এই গ্রেট আর্কের কাজ (দক্ষিণে কন্যাকুমারী থেকে উত্তরে হিমালয় পর্যন্ত)  প্রায় প্রতিটি ইঞ্চি নিখুঁত করে জরিপ করা সম্পূর্ণ হয় ১৮৪৩ সালে। ঐ বছরেই এভারেষ্ট অবসর নিয়ে লন্ডনে ফিরে যান। এই কাজে সার্ভেয়র জেনারেল জর্জ এভারেষ্ট বেশ কয়েকজন তরুণ মেধাসম্পন্ন প্রতিভা পেয়েছিলেন। এঁদের মধ্যেই ছিলেন রাধানাথ শিকদার, সৈয়দ মীর মহসীন, অ্যান্ড্রু স্কট ওয়া প্রমুখ।

হিমালয় পর্বতমালার শৃঙ্গ পর্যবেক্ষণ ও জরিপ -
১৮৪৫ সালে শুরু হল হিমালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ৭৯টি পর্বতশৃঙ্গের উচ্চতা পর্যবেক্ষণ করা, উচ্চতা নিরূপনের কাজ। এই কাজে ব্যস্ত ছিলেন বেশ কয়েকজন জরিপবিদ। কাজটি শেষ হয় ১৮৫০ সালে। এই ৭৯টি শৃঙ্গের মধ্যে ৩১টি শৃঙ্গের স্থানীয় নাম ছিল সেই সময় আর বাকিগুলিকে রোমান অক্ষরের সংখ্যা দ্বারা চিহ্নিত করা হত। আর সেই নিরিখেই ভবিষ্যতের এভারেষ্ট শৃঙ্গটির নম্বর ছিলো পনেরো। তাকে বলা হত PeakXV |

রাধানাথ কলকাতায় বদলি হলেন -
ইত্যবসরে ১৮৪৯ সালে রাধানাথ দেরাদুন থেকে বদলি হয়ে চলে এলেন কলকাতায় সার্ভে অফিসে। যেহেতু রাধানাথ তখন ভারতের প্রধান কম্পিউটার (Chif Computer) পদে বৃত, সেই কারণেই সার্ভেয়র জেনারেল অ্যান্ড্রু ওয়া সাহেব দেরাদুন থেকে রাধানাথের কলকাতায় বদলির সাথে সাথেই প্রধান গণনা বিভাগটিও কলকাতায় স্থানান্তরিত করে দিলেন।
রাধানাথ পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আবিস্কার করলেন -
সুতরাং ভারতে যেখানে যত জরিপকার্য হচ্ছিল, সেই সময়, সব তথ্য, হিসাবপত্তর, গাণিতক সাপ, ডায়াগ্রাম ইত্যাদি সবই এনে জমা করা হতো কলকাতায় রাধানাথের কাছে। এরপর রাধানাথ সেই হাজার হাজার তথ্যগুলি নিয়ে জটিল আংকিক গণনার মাধ্যমে জরিপের চূড়ান্ত নির্যাসটুকু হিসেব করে বার করে নিখুঁতভাবে নথিভুক্ত করতেন আর সেটাই সরকারিভাবে স্বীকৃতি পেত সার্ভেয়র জেনারেলের অনুমোদনের পর।
১৫ নম্বর শৃঙ্গটি জে.ও.নিকলসন বিভিন্ন স্থান থেকে ১০০ মাইলেরও অধিক দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন ২৭ নভেম্বর ১৮৪৯ থেকে ১৭ জানুয়ারি ১৮৫০ পর্যন্ত। তাঁর সঙ্গে ছিল একটি ১২ ইঞ্চি থিওডোলাইট যন্ত্র। তিনি গড় উচ্চতা পেয়েছিলেন ২৯০০২.৩ ফুট।

এইরকম হাজার হাজার তথ্য নিয়ে রাধানাথকে কলকাতার অফিসে বসে উচ্চতা নিরূপনের জটিল এবং কঠিন সব হিসেব করতে হয়েছিল প্রতিদিন।
সময়টা ১৮৫২ সাল। রাধানাথ শিকদার এই সমস্ত গাণিতিক হিসেবগুলি চূড়ান্ত করে যখন নিশ্চিত হলেন যে, পনেরো নম্বর শৃঙ্গটিই (PeakXV)) পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ, তৎক্ষণাৎ তিনি তাঁর হিসাবপত্তর, ডকুমেন্টস্, ডায়াগ্রাম ফাইলবন্দি করে দেরাদুনে সার্ভেয়র জেনারেল অ্যান্ড্রু ওয়া-কে পাঠিয়ে দিলেন আর ওরই মধ্যে তিনি তাঁর আবিস্কারের কথা সবিস্তারে লিখে পাঠালেন। ওয়া সাহেব রাধানাথের কাগজপত্র পেয়ে বিষ্মিত হলেন, চোখ বুরিয়ে বুঝলেন, পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আবিস্কারের হিসেবে রাধানাথের কোথাও কোন ভুল নেই। তবুও তিনি আরও নিশ্চিত হবার জন্য দেরাদুনে কর্মরত গণক জন হেনেসি-কে দায়িত্ব দিলেন পুনর্গণনা করে দেখতে।
চারবছর পর নিশ্চিত হয়ে ১৮৫৬ সালে ওয়া সাহেব জনসমক্ষে ঘোষণা করলেন যে, PeakXV বা পনেরো নম্বর শৃঙ্গটি হল বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। এই ঘোষণাটি করা হয়েছিল কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে ১৮৫৬ সালের ৬ আগষ্টের এক সভা থেকে। ওয়া সাহেব ছিলেন না, তাঁর হয়ে ঘোষণাটি করেছিলেন তাঁর ডেপুটি, মেজর থুইলিয়ার। সেখানে রাধানাথের নাম উচ্চারণ করা হল না।

রয়েল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটিতে সভা -
এরপর সভা বসলো লন্ডনের রয়েল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটিতে, ১১ এবং ২৪ মে, ১৮৫৭। সেইখানেই ওয়া সাহেবের প্রস্তাব অনুযায়ী জর্জ এভারেষ্টের নামে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গের নামকরণ অনুমোদিত হয়ে গেল - মাউন্ট এভারেষ্ট। এভারেষ্ট সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন। হ্যাঁ, এবারেও রাধানাথ শিকদারের নাম উচ্চারণ হল না।
রাধানাথের আবিস্কার প্রকাশ্যে এল -
সিডনী জেরাল্ড বুরার্ড (১৮৬০-১৯৪৩) ১৯০৪ সালে বিশ্বখ্যাত Nature পত্রিকায় পাঁচপৃষ্ঠাব্যাপী Mount Everest : The Story of a Long Controversy’ শীর্ষক এক গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করেন। সেখানেই তিনি সত্য প্রকাশ করে দিয়ে লিখলেন :

About 1852 the Chief Computer of the office at Calcutta informed Sir Andrew Waugh that a peak designated XV had been found to be higher than any other hither to measured in the world. This peak was discovered by the Computers to have been observed from six different stations; on no occasion had the observer suspected that he was viewing through his telescope the highest point of the earth.”

অর্থাৎ কলকাতা থেকে ১৮৫২ সালে প্রধাণ গণক জানালেন অ্যান্ড্রু ওয়াকে যে পনেরো নম্বর শৃঙ্গটিই হল পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। বুরার্ড সাহেব রাধানাথের নাম না করেও, বুঝতে কোন অসুবিধা হয় না, যে প্রধাণ গণক সেই সময় ছিলেন রাধানাথ শিকদার।

রাধানাথের জীবনাবসান -
চন্দননগরের গঙ্গার ধারে গেন্দেলপাড়ায় তাঁর নিজস্ব বাড়িতে রাধানাথ শিকদারের জীবনাবসান ঘটে যায় ১৮৭০ সালের ১৭ মে।
আবেদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে -
রাধানাথকে আমরা তাঁর প্রাপ্য সম্মান আজও দিতে পারেনি। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের একান্ত আবেদন, Mount Everst’ নামটি পরিবর্তন নামকরণ করা হোক Mount Everst-Radhanath’ অথবা Mount Everst-Sikdar’ পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়ায় একসঙ্গে বাঁধা হয়ে থাক শিক্ষক ও ছাত্র চিরকাল।

প্রকাশের তারিখ: ১৭-মে-২০২৬

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org