|
রবীন্দ্রনাথ, ফ্যাসিবাদ ও লাল পার্টিMayukh Biswas |
সোমেন ঠাকুর লিখেছেন, "রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে ‘লাঙলের’ জন্য আশীর্বচন জোগাড়ের ভার পড়ল আমার উপর। একদিন সকালবেলা রবীন্দ্রনাথের কাছে পেশ করলুম আমাদের আর্জি। তিনি তৎক্ষণাৎ লিখে দিলেন- 'জাগো, জাগো বলরাম, ধরো তব মরুভাঙ্গা হল / প্রাণ দাও, শক্তি দাও, স্তব্ধ করো ব্যর্থ কোলাহল।' 'লাঙলে'র প্রচ্ছদপটে তাঁর ঐ আশীর্বচন থাকত।" |
| আজ ২৫শে বৈশাখ - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৬ তম জন্মদিবস। আজ আবার ৯ই মে ও বটে। যেদিন ফ্যাসিস্ট তান্ডবের হাত থেকে বিশ্ব মানবতার মুক্তির দিন। এ প্রসঙ্গে বাংলার ফ্যাসিস্ট বিরোধী ঐতিহ্য ভীষণভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। এই ঐতিহ্যের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত আছেন আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর ইতিহাসের পরিহাস এটাই, মুসোলিনির শিষ্যরা আজ বাংলায় শপথ নিচ্ছে। এই প্রথম সরকারি উদ্যোগে ২৫ শে বৈশাখ রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উদযাপন হচ্ছে না। পরের বছর থেকে স্বাভাবিক ভাবেই দিনটি বিজেপি সরকারের প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবে উদযাপিত হবে। জেনে-বুঝেই এই দিন বাছা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথকে বাংলার সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার এ এক পরিকল্পিত উদ্যোগ। এই আবহে স্মরণ করা যাক সেই ঠাকুর বাড়ি থেকেই একটু উল্টো স্রোতের কাহিনী। আজ প্রথমে আসি, কবিগুরুর ভাইপো ছিলেন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথায়। প্রেসিডেন্সির এই ছাত্র দুনিয়া জুড়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রচারক এক কমিউনিস্ট। তাঁর সূত্রেই কমিউনিস্টদের আনাগোনা শুরু হয় ঠাকুর বাড়ির চৌহদ্দিতে। সৌমেনের ঠাকুরদা ছিলেন দার্শনিক, কবি ও গণিতবিদ দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় দাদা। কমিউনিস্ট পার্টির কমরেড শামসুদ্দিন হোসেইনের মাধ্যমে সৌমেনের যোগাযোগ ঘটে কমরেড মানবেন্দ্রনাথ রায়ের সাথে। কমরেড রায়ের অনুপ্রেরণায় কমরেড কাকাবাবু মুজফফর আহমেদের তত্ত্বাবধানে শুরু হয় কমিউনিস্ট কর্মী হিসেবে সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর যাত্রা। প্রথম প্রজেক্ট- "লাঙল", তখন কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরই সর্বপ্রথম কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর বাংলা অনুবাদ করেন। কাজী নজরুল ইসলাম সেই অনুবাদ "লাঙল" পত্রিকায় ছাপান। কমিউনিস্ট আন্দোলনকে উৎসাহ দিতে "লাঙল" পত্রিকাকে আশীর্বাদ স্বরূপ সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও নিজের একটি দুই লাইনের কবিতা লাঙল-এ ছাপাতে দেন। সোমেন ঠাকুর লিখেছেন, "রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে ‘লাঙলের’ জন্য আশীর্বচন জোগাড়ের ভার পড়ল আমার উপর। একদিন সকালবেলা রবীন্দ্রনাথের কাছে পেশ করলুম আমাদের আর্জি। তিনি তৎক্ষণাৎ লিখে দিলেন- 'জাগো, জাগো বলরাম, ধরো তব মরুভাঙ্গা হল / প্রাণ দাও, শক্তি দাও, স্তব্ধ করো ব্যর্থ কোলাহল।' 'লাঙলে'র প্রচ্ছদপটে তাঁর ঐ আশীর্বচন থাকত।" ১৯৩১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর থেকে ২৫শে সেপ্টেম্বর অবধি রবীন্দ্রনাথ রাশিয়া ভ্রমণ করেন। এই রাশিয়া যাওয়ার আগে সোভিয়েত সম্পর্কে নানা খারাপ কথা শোনেন তিনি। ওখানে গণতন্ত্র নেই, স্টালিনের স্বৈরাচার চলছে ইত্যাদি। কিন্তু কবিগুরু নিজের অভিজ্ঞতায় 'রাশিয়ার চিঠি'তে দেখালেন ওদেশকে খেটে খাওয়া মানুষ স্বর্গরাজ্য বলে মনে করেছেন। সোভিয়েতে কিভাবে পিছিয়ে পরা সমাজকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে এক নতুন সমাজ গড়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। সোভিয়েত শিক্ষা ব্যবস্থা দেখে তিনি অনুভব করেছিলেন সমাজতান্ত্রিক শিক্ষার উৎকর্ষতা। কারণ এই শিক্ষা ব্যবস্থা দেশ কালের গন্ডি পেরিয়ে সারা দুনিয়ার শোষিত মানুষকে বাচার অনুপ্রেরণা যোগায়। সোভিয়েতের কমিউনিস্টরা সেই কাজটাই করছে শত বাধা অতিক্রম করেও। বুর্জোয়াদের কথা অনুযায়ী সোভিয়েত শিক্ষা ব্যবস্থা ছাঁচে ফেলা কমিউনিস্ট বুদ্ধিজীবী তৈরি করে সর্বহারার একনায়কতন্ত্র চালাচ্ছে না। বরং সেই শিক্ষা ব্যবস্থা বুর্জেয়া দের 'গণতন্ত্রের' চেয়ে অনেক বেশি গণতান্ত্রিক। সেই শিক্ষা ব্যবস্থা মানুষের জীবনের সাথে শ্রম, স্বাস্থ্য, মানবিক মূল্যবোধের এক মেলবন্ধন। শেষের কদিনে কবি যখন বারবার হিটলারের দখলদারী নিয়ে উদ্বিগ্ন-বিমর্ষ, একদিন তাঁকে ভালো খবর শোনান প্রশান্ত চন্দ্র মহালনবিশ ও ওনার স্ত্রী। প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবীশ লিখেছিলেন - অমর্ত্য সেনের ঠাকুরদা ক্ষিতিমোহন সেনের উপস্থিতিতে কবি তার হাত জড়িয়ে আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, রাশিয়াই পারবে হিটলারকে ঠেকাতে। এটাই ছিল মৃত্যুর প্রাক মুহুর্তে তাঁর শেষ কথা। উনি দেখে যেতে পারেননি সেদিন। কিন্তু 'ওরা' অর্থাৎ লাল ফৌজ আড়াই কোটি প্রাণের বিনিময়ে পেরেছিলো। এতো ছিলো গত শতাব্দীর উত্তাল চল্লিশ। একদিকে যুদ্ধ চলছে দুনিয়া জুড়ে, তেমনই বাংলায় চার্চিলের চাপানো ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। রবীন্দ্রনাথ তখন নেই। তবু তাঁর অনুপ্রেরণা তো ছিলো। নবীন প্রাণে গড়ে ওঠা ভারতে ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রামে ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ (IPTA) এবং প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯৩০-৪০ এর দশকে বিশ্বজুড়ে ফ্যাসিবাদের উত্থানের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আইপিটিএ এবং ভারতের লেখক, শিল্পী, নাট্যকাররা সে সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। দেশেও ১৯৩০-৪০ এর দশকে ভারতবর্ষে ফ্যাসিবাদ, সাম্প্রদায়িকতাবাদের প্রভাব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। উইলিয়াম রেখের 'ফ্যাসিবাদের গণ মনস্তত্ত্ব' বইতে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক হতাশা থেকে মানুষ "শক্তিশালী রাষ্ট্র, শক্তিশালী নেতৃত্ব"-এর ধারণার দিকে ঝুঁকছিল। অবিভক্ত ভারতে এই প্রবণতা ধর্মীয় মৌলবাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদের রূপ নেয়। যা আরএসএস, মুসলিম লিগের মতো সংগঠনের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। তখন বিকল্পের পাঠ পড়াচ্ছিলেন বাংলার বুদ্ধিজীবীরা। পঞ্চাশের মন্বন্তর সম্পর্কে সেদিন উপন্যাস, কবিতা, গল্প লিখেছিলেন ফ্যাসিস্ট বিরোধী লেখক সঙ্ঘের বিখ্যাত লেখক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, গোপাল হালদার প্রমুখ সাহিত্যিকেরা এবং গান বেঁধেছিলেন বিখ্যাত সুরকার জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, বিনয় রায়, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, হরিপদ কুশারী প্রমুখ। হেমাঙ্গ বিশ্বাস যেমন বলেছেন, "স্বদেশিকতার ধারা যেখানে সর্বহারার আন্তর্জাতিকতার মহাসাগরে গিয়ে মিলেছে, সেই মোহনায় গণসঙ্গীতের জন্ম।" তেমনি আবার ছবি এঁকেছিলেন জয়নুল আবেদিন, চিত্তপ্রসাদ, গোপাল ঘোষ, সোমনাথ হোড়, প্রমুখ এবং ফটো তুলেছিলেন সুনীল জানার মতো শিল্পী। এঁরা সকলেই যুক্ত ছিলেন ফ্যাসিস্ট বিরোধী ঐ সঙ্ঘের সঙ্গে। ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ (IPTA) গঠিত হয়েছিল ১৯৪৩ সালে বোম্বাইতে। আবার ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষের সময় আইপিটিএ সক্রিয়ভাবে ত্রাণকার্যে অংশ নিয়েছিল। তারা লঙ্গরখানা, দুধ বিতরণ কেন্দ্র, শিশুসেবা কেন্দ্র স্থাপন করেছিল। মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির মতো সংগঠন আইপিটিএর সাথে যুক্ত হয়ে 'ভুখা মিছিল' সংগঠিত করেছিল, যেখানে ১৯৪৩ সালের ১৭ মার্চ প্রায় পাঁচ হাজার ক্ষুধার্ত নারী অংশগ্রহণ করেছিলেন। সে যুগে আইপিটিএর সাথে যুক্ত ছিলেন ঋত্বিক ঘটক, বলরাজ সাহনি, পৃথ্বীরাজ কাপুর,খাজা আহমেদ আব্বাসের মতো শিল্পীরা। এই সংগঠন তৈরি হওয়ার পিছনে অনুপ্রেরণা ছিল রবীন্দ্রনাথ। এর সূত্রপাত ১৯৩৫ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত 'World Congress of Writers for Defence of Culture'-এর মতো আন্তর্জাতিক সম্মেলন, যেখানে ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শিল্পী-সাহিত্যিকদের সংহতি প্রকাশ পেয়েছিল। তখন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ফ্যাসিবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন যাঁরা- সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত হয় সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ফ্যাসিজম্' - বইটি বাংলা ভাষায় ফ্যাসিবাদ বিরোধী প্রথম বই। বিংশ শতাব্দীর তিনের দশকে যখন ফ্যাসিবাদের বিপদের মেঘ ইউরোপের আকাশে দানা বাঁধছে- সেই সময়ে তিনি ছিলেন জার্মানিতে। সেখানে ফ্যাসিবিরোধী আন্দোলনে সামিল হন তিনি। প্রত্যক্ষ করেন ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শন চর্চার কেন্দ্র জার্মানিতে "শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা সমাজ স্রোতে কচুরিপানার মত ভেসে যাচ্ছিল নাৎসিবাদের বেনো জলের টানে।" ঠিক যেমনটা পৃথিবীর অন্যত্রও আজ হচ্ছে। প্রগতিশীল সমাজও অতিদক্ষিণপন্থায় ভেসে যাচ্ছে! ভাবতে শিহরণ জাগে যে, 'হিটলারকে হত্যার চক্রান্তে যুক্ত'- এই অপরাধে বাংলার সৌম্যেন্দ্রনাথ গ্রেপ্তারও করা হয়। কিন্তু ঠিকঠাক প্রমাণা না থাকায় মুক্তিও পান। তবে জার্মানি থেকে বিতাড়িত হন। সেই সময়ে তাঁর অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ বই 'Hitlarism or the Aryan Rule in Germany।' ফ্রান্সের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা অঁরি বারবুসের গভীর প্রভাব ছিল তাঁর ওপর। বারবুসের সরাসরি অনুরোধ সৌম্যেন্দ্রনাথ পরবর্তী সময়ে স্বদেশে ফেরেন ফ্যাসিবিরোধী-যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন গড়তে। ১৯৩৭ সালে এ দেশে প্রতিষ্ঠিত হয় 'League against Fascism and War'- যার সভাপতি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সৌম্যেন্দ্রনাথ। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা উল্লেখ্য, ১৯২৫ সালে ফিলসফিকাল সোসাইটি অব মিলানের আমন্ত্রণে ইতালি গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেখানে সংস্কৃত ভাষা ও ভার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ফরমিচির সাথে পরিচয়। তার মাধ্যমেই ১৯২৬ সালের ৩০ মে রোমে গিয়ে ৩১ মে মুসোলিনির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন রবীন্দ্রনাথ। মুসোলিনির কথায় আপ্লুত হয়ে কবি বলেন, ‘উনি অসাধারণ’। পরে এক সভায় মুসোলিনি উপস্থিত থাকায় কবি মন্তব্য করেন, মুসোলিনি যতদিন আছেন ইতালি নিরাপদ। ফেরার আগের দিন (১৩ জুন) কবি মুসোলিনিকে বলেন, ‘আপনাকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি কুৎসা রটে’। উত্তরে মুসোলিনি মুচকি হেসে বলেছিলেন - আমি জানি, কিন্তু আমি কি করতে পারি! মুসোলিনিকে তিনি উপহার দেন তাঁর স্বাক্ষরিত ছবি, যা ফ্যাসিস্ট মিডিয়ায় প্রচারিত হয়। এরপর বন্ধু রোমা রঁলারের কাছে ফ্যাসিস্ট অত্যাচারের বিবরণ শুনেও কবির মত বদলায়নি।ফ্যাসিস্ট শাসনে ম্যাত্তিত্তি হত্যার বিচারের প্রহসনের সত্যতা যাচাইয়ে জুরিখে ওই আইনজীবীর স্ত্রী ও মদগিয়ালনির সঙ্গে দেখা করেন কবিগুরু। এরমধ্যে কবিগুরুর মতপরিবর্তনে কমিউনিস্ট সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। তিনিই কবিগুরুকে চিঠি লিখে জানান যে ফ্যাসিস্টদের সম্পর্কে তাঁর উচ্ছ্বাস ইউরোপীয় কবি সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীদের ক্ষুব্ধ করেছে। ভিয়েনায় অ্যাঞ্জেলা বালবানাফের কাছেও ফ্যাসিস্ট অত্যাচারের কাহিনি শুনে ৫ অগস্ট ১৯২৬ ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ানে চিঠি লিখে ফ্যাসিবাদ নিয়ে মোহভঙ্গ প্রকাশ করেন রবীন্দ্রনাথ। জবাবে মুসোলিনির ভাই পত্রিকায় কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করেন, কিন্তু কবি বিচলিত হননি। এই ঘটনা আরেকটা শিক্ষা দেয়। তা হলো, প্রচারযন্ত্রের জালিয়াতি ও বাক্পটুতায় বহু পণ্ডিত ব্যক্তিও মাঝে মাঝে সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত হন। কিন্তু সময়ের সাথে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসে। আমাদের দেশ-রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতিও ঠিক তেমনই। শিগগিরই বিবেকের জাগরণ ঘটবেই। আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আজীবন যুদ্ধ, হিংসা, রক্তক্ষয়ের বিরুদ্ধে কথা বলে এসেছেন। শুধু বক্তৃতায় নয়, বিভিন্ন কবিতা, নিবন্ধ, চিঠিপত্রেও যুদ্ধবিরোধী, ফ্যাসিবাদ–বিরোধী গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তিনি নিয়েছিলেন। যুদ্ধবাজ স্পেন, ইতালি, জাপান ও জার্মানির প্রায় প্রতিটি ফ্যাসিস্ট আগ্রাসনকে ধিক্কার ও ক্ষোভ জানিয়ে তিনি কবিতা লিখেছেন, কলম ধরেছেন। রবীন্দ্রনাথের ‘আফ্রিকা’ কবিতা লেখার পটভূমি ইতালির আবিসিনিয়া (বর্তমানে ইথিওপিয়া) আক্রমণকে কেন্দ্র করেই। আর কবি যখন কলম ধরছেন মুসোলিনিদের বিরুদ্ধে ঠিক তার আগেই ইতালিতে গিয়ে মানুষ বিভাজনের কৌশল শিখতে গিয়েছিলেন আরএসএসের নেতা ডাঃ মুঞ্জে। সেখানে গিয়ে দেখা করে এসেছেন বেনিতোর সাথে। আবিসিনিয়াতে যুদ্ধ চলাকালীনই জেনারেল ফ্ল্যাঙ্কোর নেতৃত্বে স্পেনে নেমে আসে ফ্যাসিস্ট অত্যাচার (জুলাই, ১৯৩৬)। তারপরেই চীন আক্রমণ করে বসে জাপান (জুলাই, ১৯৩৭)। স্পেনের ঘটনার পরপরই ‘লিগ এগেইনস্ট ফ্যাসিজম অ্যান্ড ওয়ার’–এর ভারতীয় শাখা তৈরি হয়। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ সেই সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হন। শুধুমাত্র সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়েই নিজের ফ্যাসিজম–বিরোধী সত্ত্বাকে গুটিয়ে নেননি রবি ঠাকুর। গর্জে উঠেছিলেন সাম্রাজ্যবাদী, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। জাপানের হাতে ১৫ ডিসেম্বর (১৯৩৮) নানকিং শহরের পতন হয়। প্রায় ৩ লক্ষ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে জাপানি সৈন্য। ২৫ ডিসেম্বর রবীন্দ্রনাথ এই ঘটনায় বিচলিত হয়ে দুটি চিরস্মরণীয় কবিতা (প্রান্তিক–এর ১৭ এবং ১৮ নম্বর কবিতা) লেখেন— "নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস, শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস। বিদায় নেবার আগে তাই ডাক দিয়ে যাই দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে।" হ্যাঁ, ওরা প্রস্তুত ছিলো৷ খেটে খাওয়ারা'ই পেরেছিলো। আদর্শের জন্যে। যার ভিত্তি ছিলো- মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ। শেষ করি গোলাম কুদ্দুসের কথায়। তখন ১৯৩৮ সাল, রানীগঞ্জের কাছে বল্লভপুর পেপার মিলে শ্রমিক ধর্মঘটে পিকেটিং জোরদার করতে হবে। কর্মীরা সব জড়ো হয়েছে। ইউনিয়নের তরুণ নেতা কমিউনিস্ট কর্মী সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়কে একজন বললেন, "সুকুমার, আজ একটা গান করো।" চায়ের পেয়ালা এক চুমুকে শেষ করে গান গাইলেন, 'যাও,যাও,যাও গো এবার যাবার আগে রাঙিয়ে দিয়ে যাও।' কয়েকদিন পরেই পিকেটার , সুকুমার বন্দোপাধ্যায়ের দেহ নিষ্পিষ্ট হয়ে গেল মালিকের লড়ির চাকার তলায় ........ প্রকাশের তারিখ: ০৯-মে-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|