বিপর্যস্ত জনস্বাস্থ্য ও বিপন্ন নাগরিক: পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যব্যবস্থার এক ময়নাতদন্ত

Dr. Fuad Halim
একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রে স্বাস্থ্য পরিষেবা কোনো করুণা নয়, বরং নাগরিকের মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার। ভারতের সংবিধানে প্রত্যক্ষভাবে স্বাস্থ্যের অধিকার উল্লেখ না থাকলেও, অনুচ্ছেদ ২১-এর অধীনে 'জীবনের অধিকার'-এর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে সুস্বাস্থ্যের অধিকারকে মান্যতা দেওয়া হয়েছে।

ভূমিকা: অধিকার থেকে পণ্যে রূপান্তর

একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রে স্বাস্থ্য পরিষেবা কোনো করুণা নয়, বরং নাগরিকের মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার। ভারতের সংবিধানে প্রত্যক্ষভাবে স্বাস্থ্যের অধিকার উল্লেখ না থাকলেও, অনুচ্ছেদ ২১-এর অধীনে 'জীবনের অধিকার'-এর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে সুস্বাস্থ্যের অধিকারকে মান্যতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যে ছবি গত কয়েক বছরে ফুটে উঠেছে, তা কেবল উদ্বেগজনক নয়, বরং শিউরে ওঠার মতো। পরিসংখ্যান বলছে, জনস্বাস্থ্যের প্রতিটি সূচক—তা সে প্রসূতি মৃত্যু হোক, শিশু মৃত্যু হোক, কিংবা জীবনদায়ী ওষুধের গুণমান—সবক্ষেত্রেই রাজ্য এক ভয়াবহ অন্ধকার গহ্বরের দিকে তলিয়ে যাচ্ছে। সরকারি উদাসীনতা, তথ্যের কারচুপি, পরিকাঠামোগত শূন্যতা এবং সর্বোপরি দুর্নীতির এক অশুভ আঁতাত আজ সাধারণ মানুষের জীবনকে পণ্যে রূপান্তরিত করেছে।

১. মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ: এক পিছু হটার ইতিহাস

পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবনতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো প্রসূতি ও শিশু মৃত্যুর হার বৃদ্ধি। একটা সময় ছিল যখন জাতীয় গড়ের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ এই দুই ক্ষেত্রে অনেকটা এগিয়ে ছিল। কিন্তু গত এক দশকে সেই সাফল্য ধুলোয় মিশে গেছে।

মাতৃমৃত্যুর পরিসংখ্যানগত বিপর্যয় (MMR)

কেন্দ্রীয় সরকারের 'হেলথ অন মার্চ' এবং স্যাম্পেল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (SRS)-এর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০৭-০৯ সালে যেখানে ভারতে প্রতি এক লক্ষে প্রসূতি মৃত্যুর হার ছিল ২১২, পশ্চিমবঙ্গে তা ছিল ১৪৫। অর্থাৎ, রাজ্য জাতীয় গড়ের চেয়ে ভালো অবস্থানে ছিল। কিন্তু বর্তমান চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত। ২০১৭-১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি লক্ষে প্রসূতি মৃত্যুর হার যখন ১০৩, পশ্চিমবঙ্গে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৯। ২০১৮-২০ সালের পরিসংখ্যানেও দেখা যাচ্ছে জাতীয় গড় ৯৭-এ নামলেও রাজ্যে তা ১০৩-এ আটকে আছে। অর্থাৎ, দেশ যখন এগোচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ তখন পিছিয়ে যাচ্ছে।

শিশুমৃত্যুর করুণ দশা (IMR)

শিশুমৃত্যু রোধে পশ্চিমবঙ্গের ব্যর্থতা আরও প্রকট। ভারত সরকারের রেজিস্ট্রার জেনারেল অব ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে ৩৬টি রাজ্যের মধ্যে শিশুমৃত্যু রোধে পশ্চিমবঙ্গের স্থান ছিল ১৫তম। ২০২০ সালে পশ্চিমবঙ্গ সেই জায়গা থেকে পিছিয়ে ২১ নম্বরে চলে গেছে। অথচ মিজোরাম, হিমাচল প্রদেশ বা জম্মু-কাশ্মীরের মতো রাজ্যগুলি গত ১০ বছরে অভাবনীয় উন্নতি করেছে। এর প্রধান কারণ হলো গ্রামীণ এলাকায় এএনএম (ANM) বা সহায়ক নার্সের অভাব এবং নবজাতক পরিচর্যা কেন্দ্রের (SNCU) বেহাল দশা।

২. রক্তাল্পতা: এক নীরব মহামারি

পশ্চিমবঙ্গের জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় কাঁটা হলো মহিলা ও শিশুদের মধ্যে ব্যাপক রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া। এটি কেবল একটি শারীরিক সমস্যা নয়, এটি সরাসরি দারিদ্র্য এবং পুষ্টির অভাবের সাথে যুক্ত। ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে (NFHS-৬) এবং তার আগের রিপোর্টগুলো তুলনা করলে একটি ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে।

  • মহিলাদের অবস্থা: ২০০৫-০৬ সালে রাজ্যে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মহিলাদের মধ্যে রক্তাল্পতার হার ছিল ৬৩.২%। ২০১৯-২১ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১.৮%। অর্থাৎ, রাজ্যের প্রতি ১০ জন মহিলার মধ্যে ৭ জনের বেশি রক্তাল্পতায় ভুগছেন।
  • শিশুদের অবস্থা: ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে রক্তাল্পতার হার অবিশ্বাস্যভাবে বেড়েছে। ২০১৫-১৬ সালে যা ছিল ৫৯%, ২০১৯-২১ সালে তা হয়েছে ৬৭%।

এই রক্তাল্পতাই প্রসূতি মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। রক্তে হিমোগ্লোবিনের অভাব প্রসবের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ (PPH) ডেকে আনে, যা গ্রামীণ বাংলায় মায়েদের মৃত্যুর মিছিলকে দীর্ঘায়িত করছে। রাজ্য সরকার এই অপুষ্টি দূরীকরণের বদলে কেবল বিজ্ঞাপনে মগ্ন থাকছে।

৩. ওষুধের নামে বিষ: জাল স্যালাইন ও দুর্নীতির চক্র

সাম্প্রতিক সময়ে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে জাল স্যালাইন প্রয়োগে প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনাটি হিমশৈলের চূড়া মাত্র। এটি প্রমাণ করে যে, সরকারি ড্রাগ কন্ট্রোল ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের কবজায়।

মেদিনীপুর ও কর্নাটকের যোগসূত্র

তদন্তে দেখা গেছে, উত্তর দিনাজপুরের একটি সংস্থা থেকে সরবরাহ করা 'রিঙ্গার ল্যাকটেট' স্যালাইনটি ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এই একই সংস্থা থেকে নেওয়া স্যালাইন প্রয়োগ করে ২০২৩ সালে কর্নাটকের বিল্লারিতে ৬ জন প্রসূতির মৃত্যু হয়েছিল। কর্নাটক সরকার সাথে সাথে ওই সংস্থাকে কালো তালিকাভুক্ত (Blacklist) করতে চেয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকার কোনো রহস্যময় কারণে তাদের উৎপাদন চালিয়ে যেতে দেয়।

উৎপাদনের ভয়াবহ ত্রুটি

কেন্দ্রীয় ও রাজ্যের যৌথ তদন্তকারী দলের (CDSCO) রিপোর্টে দেখা গেছে:

ক) কাঁচামালের জালিয়াতি: নথিতে সোডিয়াম ল্যাকটেট ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে ল্যাকটিক অ্যাসিড ব্যবহার করা হয়েছে।
খ) জীবাণুমুক্তকরণে ব্যর্থতা: স্টেরিলাইজেশন জোন বা জীবাণুমুক্ত করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি (Double Door System) সেখানে বিকল ছিল।
গ) ছত্রাক সংক্রমণ: সংস্থাটি ব্যাকটেরিয়া পরীক্ষা করলেও কোনো 'ফাঙ্গাল কাউন্ট' বা ছত্রাক পরীক্ষার রেকর্ড রাখেনি।

এই বিষাক্ত স্যালাইন মেদিনীপুরের প্রসূতিদের শরীরে প্রবেশ করে তাঁদের জীবন কেড়ে নিয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দুর্নীতির জন্য দায়ী ব্যবসায়ীদের আড়াল করে সরকার দায় চাপিয়েছে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের ওপর।

৪. প্রশাসনিক অরাজকতা ও শূন্যপদের পাহাড়

রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আজ পরিকাঠামো নয়, বরং 'শূন্যপদের' ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি বিভাগেই কর্মী ও চিকিৎসকের অভাব এতটাই তীব্র যে ন্যূনতম পরিষেবা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

শূন্যপদের খতিয়ান

  • নার্স: প্রায় ১১ হাজার বা ২০.১১% পদ শূন্য।
  • স্পেশালিস্ট চিকিৎসক: ১২০০-র বেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ খালি (প্রায় ৩৫%)।
  • চতুর্থ শ্রেণীর কর্মী (GDA/ডোম): প্রায় ৭০% পদ শূন্য।

এই বিশাল শূন্যপদের কারণেই মেদিনীপুর, মালদহ বা বাঁকুড়ার মতো বড় মেডিক্যাল কলেজগুলোতেও পরিষেবা ভেঙে পড়ছে। চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর কাজের অতিরিক্ত চাপ একদিকে যেমন পরিষেবার মান নামিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে তাঁদের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। ৬০০-র বেশি চিকিৎসকের পদত্যাগপত্র জমা দেওয়া এর জ্বলন্ত প্রমাণ।

৫. সুপার স্পেশালিটি না কি রেফারেন্স সেন্টার?

রাজ্য জুড়ে কয়েকশো কোটি টাকা খরচ করে 'সুপার স্পেশালিটি' হাসপাতাল গড়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এগুলো হয়ে দাঁড়িয়েছে কেবল একটি খোলস।

  • রেফারেল ভোগান্তি: হাসপাতালগুলোতে ইমারজেন্সি বা অপারেশন থিয়েটার থাকলেও সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা অ্যানেস্থেটিস্ট নেই। ফলে সামান্য সমস্যাতেই রোগীকে কলকাতা বা জেলা সদরে রেফার করে দেওয়া হচ্ছে। পথের মধ্যেই বহু রোগীর মৃত্যু ঘটছে।
  • অ্যানালগ পদ্ধতি: আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে যেখানে ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ার কথা, সেখানে সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে ২০১০-১১ সালের তুলনায় ২০১৭-১৮ সালে আধুনিক টিউবেকটোমি বা ছানি অপারেশনের সংখ্যা কয়েক গুণ কমে গেছে। সাধারণ মানুষকে বাধ্য করা হচ্ছে বেসরকারি নার্সিংহোমে যেতে।

৬. স্বাস্থ্যসাথী: সরকারি টাকার বেসরকারি লুঠ

রাজ্য সরকারের ড্রিম প্রজেক্ট 'স্বাস্থ্যসাথী' আজ এক বড় অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা একে 'মুনাফার ছাঁকনি' হিসেবে দেখছেন।

  • বরাদ্দের অপচয়: গত কয়েক বছরে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে। এই টাকার ৮৫% এর বেশি চলে গেছে বেসরকারি হাসপাতাল ও বিমা কোম্পানিগুলোর পকেটে।
  • পরিষেবার অভাব: বহু বেসরকারি হাসপাতাল এখন স্বাস্থ্যসাথী কার্ডে রোগী নিতে অস্বীকার করছে। অন্যদিকে, এই কার্ডের অজুহাতে সরকারি হাসপাতালের সাধারণ পরিকাঠামো উন্নয়নের বাজেট কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
  • পকেট থেকে খরচ: বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এ রাজ্যে মানুষকে চিকিৎসার ৬৯.৮% খরচ নিজের পকেট থেকে করতে হয়, যা জাতীয় গড়ের (৪৮.৮%) চেয়ে অনেক বেশি। অর্থাৎ, স্বাস্থ্যসাথী কার্ড হাতে থাকলেও মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।

৭. তথ্যের অস্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক কণ্ঠরোধ

একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তথ্য পাওয়া মানুষের অধিকার। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০১৮ সালের পর থেকে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কোনো বিস্তারিত বার্ষিক রিপোর্ট (Health on March) প্রকাশ করছে না।

  • ডেঙ্গু ও অজানা জ্বর: রাজ্যে ডেঙ্গুর আক্রান্তের সংখ্যা গত ১০ বছরে জ্যামিতিক হারে বেড়েছে (২০০৮ সালে ১০২০ থেকে ২০২২ সালে ৬৭২৭৪)। কিন্তু সরকার ডেঙ্গুকে 'অজানা জ্বর' হিসেবে চালানোর চেষ্টা করে এবং সঠিক তথ্য গোপন করে।
  • প্রতিবাদে বাধা: যখনই সাধারণ মানুষ বা চিকিৎসকরা এই অব্যবস্থার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছেন, তখনই নামিয়ে আনা হচ্ছে পুলিশি দমন-পীড়ন। মেদিনীপুর বা কলকাতায় জাল স্যালাইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে পুলিশের লাঠি চালনা প্রমাণ করে যে সরকার ভয় পেয়েছে।

৮. রাজনৈতিক-কর্পোরেট আঁতাত: ইলেক্টোরাল বন্ডের কালো ছায়া

স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় দুর্নীতির একটি বড় দিক হলো রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে ওষুধ কোম্পানিগুলোর যোগসাজশ। ইলেক্টোরাল বন্ডের তথ্য অনুযায়ী, ৩৭টি ওষুধ ও স্বাস্থ্য সংস্থা প্রায় ১০০০ কোটি টাকা রাজনৈতিক দলগুলোকে দিয়েছে।সমগ্র ইলেক্টোরাল বন্ডের টাকার এক বড় অংশ তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এই বিপুল টাকার বিনিময়েই কি নিম্নমানের ওষুধ সরবরাহকারী সংস্থাগুলোকে 'ছাড়পত্র' দেওয়া হচ্ছে? মেদিনীপুরের জাল স্যালাইনের কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া কি সেই অর্থনৈতিক স্বার্থেরই বহিঃপ্রকাশ?

৯. গ্রামীণ স্বাস্থ্যের অবহেলা ও অর্থনৈতিক প্রভাব

রাজ্যের ৭০% মানুষ গ্রামে বাস করলেও গ্রামীণ হাসপাতালে মাত্র ২৩.৯৮% বেড রয়েছে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো আজ 'হাঁস-মুরগির খোঁয়াড়' বা 'জঙ্গলাকীর্ণ' ভূতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে।

  • অ্যাম্বুল্যান্স সংকট: রাজ্যে ১০২ টাইপ সরকারি অ্যাম্বুল্যান্সের সংখ্যা মাত্র ৮৫৫টি। প্রয়োজনে অ্যাম্বুল্যান্স না পেয়ে বাইকে বা খাটিয়ায় করে রোগী নিয়ে যাওয়ার অমানবিক দৃশ্য আজও বাংলার গ্রামগুলোতে নিয়মিত।
  • দারিদ্র্যের জাল: চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে প্রান্তিক মানুষ জমি-বাড়ি-ঘটিবাটি বিক্রি করে দিচ্ছেন। কন্যা সন্তানের বিবাহ আটকে যাচ্ছে, পরিবারের বাকি সদস্যরা অপুষ্টির শিকার হচ্ছে। স্বাস্থ্য পরিষেবা আজ আর জীবনদায়ী নয়, বরং দারিদ্র্য তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে।

১০. উত্তরণের পথ: কী করণীয়?

এই গভীর সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কেবল চটকদার বিজ্ঞাপন দিলে চলবে না, প্রয়োজন আমূল নীতিগত পরিবর্তন।

ক) বাজেট বৃদ্ধি: স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু সরকারি বরাদ্দ জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক বাড়াতে হবে (বর্তমানে যা মাত্র ১০৮৮ টাকা)।
খ) দ্রুত নিয়োগ: স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সমস্ত শূন্যপদে স্বচ্ছভাবে নিয়োগ করতে হবে। 'থ্রেট কালচার' বন্ধ করে চিকিৎসকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে।
গ) ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ: ড্রাগ কন্ট্রোল বিভাগকে শক্তিশালী করতে হবে এবং জাল ওষুধের কারবারিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
ঘ)
GST প্রত্যাহার: ওষুধের ওপর থেকে অমানবিক জিএসটি তুলে দিতে হবে।
ঙ) পরিকাঠামো সংস্কার: রেফারেল সিস্টেম বন্ধ করে ব্লক লেভেলের হাসপাতালগুলোতেই ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি ও আধুনিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
চ) তথ্যের স্বচ্ছতা: নিয়মিত স্বাস্থ্য বুলেটিন ও রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে যাতে মানুষ প্রকৃত অবস্থা জানতে পারে।

উপসংহার

পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আজ এক আইসিইউ-তে থাকা রোগীর মতো। চটকদার সাজসজ্জা বা নীল-সাদা রঙ দিয়ে এই অভ্যন্তরীণ পচন ঢাকা সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষের করের টাকা কর্পোরেট বিমার হাতে তুলে না দিয়ে যদি সরাসরি সরকারি হাসপাতালের বেড, অক্সিজেন এবং ওষুধের পেছনে খরচ করা হতো, তবে আজ বাংলাকে প্রসূতি মৃত্যু বা শিশুমৃত্যুর হারে লজ্জিত হতে হতো না। স্বাস্থ্য কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। আর এই সংগ্রামে রাষ্ট্র যখন ব্যর্থ হয়, তখন সেই সরকার তার নৈতিক অধিকার হারায়। বাংলার জনস্বাস্থ্যকে বাঁচাতে হলে আজ সাধারণ মানুষকে সোচ্চার হতে হবে। অন্যথায়, "সুস্থভাবে বাঁচার অঙ্গীকার" কেবল শ্মশানের নিস্তব্ধতায় পরিণত হবে।


প্রকাশের তারিখ: ১৯-এপ্রিল-২০২৬

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org