|
নভেম্বর বিপ্লবঃ স্বপ্নকে বাস্তব করে তোলার সংগ্রামSatyaki Bhattacharya |
যদি হান্টার গ্যাদারার মানুষ তাদের শ্রমের একটা অংশকে স্রেফ শিকার এবং খাদ্য সংগ্রহের বাইরে পশুপালনের চেষ্টায় না নিয়োগ করতে পারত, তাহলে আজও আমরা হান্টার গ্যাদারার থেকে যেতাম। |
রাশিয়া ঘোরার সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন দেখছেন তুর্কমেনদের জন্য আলাদা ইস্কুল তৈরী হয়েছে, যেখানে তাদের প্রদেশ থেকে মানুষকে নিয়ে এসে প্রশিক্ষিত করে ফেরত পাঠানো হচ্ছে যাতে তারা তুর্কমেনিস্তানের উন্নয়নে নিজেদের শিক্ষাকে কাজে লাগাতে পারে, তিনি স্বাভাবিকভাবেই তুর্কমেন ও বাঙালির তুলনা করে প্রশ্ন রেখেছেন, বিশ বছর আগেও শিক্ষা, সংস্কৃতি, আত্মমর্যাদা, সবদিকে কারা বেশি এগিয়ে ছিল? এখানে কী এমন হল যাতে এরকম অদ্ভুত পরিবর্তন? অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশন। জারের আমলে বিশেষভাবে নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর মানুষকে তুলে আনার জন্য গৃহীত এই পদ্ধতি বিশ্বের প্রথম কোনও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর কল্যাণে তৈরী প্রকল্প। রাশিয়ায় তখন গৃহযুদ্ধ শেষ হয়েছে। জারের স্যাঙাতদের দল, বিদেশী মদতপুষ্ট শ্বেতবাহিনী, পোলিশ জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়াদের বাহিনী সবকিছুর বিরুদ্ধে ব্যাপক যুদ্ধ করে কমিউনিস্টরা বিপ্লবকে রক্ষা করলেন। কিন্তু বিপ্লবে নিহত লক্ষ লক্ষ মানুষের শিশু সন্তানদের কী হবে? এই ব্যবস্থা নিল কমরেড ফেলিক্স জেরঝিনস্কির নেতৃত্বাধীন গুপ্ত পুলিশ, চেকা! এই জিনিস ভাবা বেশ দুষ্কর। বুর্জোয়া নেতৃত্বাধীন দেশে পুলিশ, সামরিক বাহিনীর মূল ভূমিকা হল শৃঙ্খলা বজায় রাখা, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে যে ব্যবস্থাটি বলবৎ আছে, তাকেই রক্ষা করা। সাধারণত সশস্ত্র বাহিনীর উদ্যোগে জনহিতকর প্রকল্প (ব্যতিক্রম থাকলেও) দেখা যায় না। জনহিতকর প্রকল্প তৈরী করার জন্য সরকারের অন্যান্য বিভাগ থাকে। কিন্তু চেকার নেতৃত্বে প্রথম অনাথ আশ্রম ও শিশু সুরক্ষার প্রকল্প গড়ে ওঠা আমাদের কাছে যে জিনিসটা স্পষ্ট করে, সেটা হল এই বিপ্লবীদের পরিচয়। এরা এক হাতে যেকোনও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে দমন করেন। তখন এঁরা নির্দয়। অন্য হাতে এঁরা শিশুদের ফুলের মত যত্নে লালন করেন। মাইকেল প্যারেন্তি একটি বক্তৃতায় অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে বলেছিলেন – “A revolution, that feeds children, gets my support.” আসলে মজদুর শ্রেণীর নেতৃত্বে, শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বিপ্লবের পক্ষে এটাই স্বাভাবিক। অন্যান্য প্রাণীর চেয়ে মানুষ সহস্র গুণ বেশি এগিয়ে, কারণ মানুষ পরিকল্পিতভাবে অতিরিক্ত শ্রমকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদনের পদ্ধতির ক্রমোন্নয়ন ঘটাতে পারে। যদি হান্টার গ্যাদারার মানুষ তাদের শ্রমের একটা অংশকে স্রেফ শিকার এবং খাদ্য সংগ্রহের বাইরে পশুপালনের চেষ্টায় না নিয়োগ করতে পারত, তাহলে আজও আমরা হান্টার গ্যাদারার থেকে যেতাম। পুঁজিবাদের যুগে এই অতিরিক্ত শ্রম নিয়ন্ত্রিত হয় মালিক শ্রেণীর দ্বারা। সংখ্যায় তাদের চেয়ে লক্ষ কোটিগুণ বড় মজদুরের ইচ্ছে অনুযায়ী সেই শ্রম ব্যবহৃত হয় না। অতএব, পুঁজিবাদ মূলগতভাবেই গণতন্ত্র বিরোধী। এর পরিবর্তন ঘটানো যে সম্ভব, অতিরিক্ত শ্রম কোন ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হবে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এর নির্ধারণ করা যে সম্ভব, এবং তার ফল যে কী অসামান্য অগ্রগতি নিয়ে আসতে পারে, তার প্রথম প্রমাণ বলশেভিক বিপ্লব। কীরকম প্রমাণ? ৫০ বছরে শিল্প উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রের ১২ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশে পৌঁছনো। যুক্তরাষ্ট্রের মত ওখানে রিয়াল এস্টেটের ওপর স্পেকুলেশন, স্টক এক্সচেঞ্জে জুয়া খেলার মাধ্যমে জিডিপি বাড়ানোর কৌশল ছিল না। কিন্তু এখানেই শেষ হয়ে গেলে আর সোভিয়েত ইউনিয়ন কেন। ১৯১৭ সালে বিপ্লবের পর থেকে ১৫ টি সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের আক্রমণ, গৃহযুদ্ধ, অন্তর্ঘাত এবং তার ফলস্বরূপ শিল্পক্ষেত্রে বিধ্বংসী কার্যকলাপ, কৃষিতে প্রাচীন সম্পর্কগুলো ঘুচিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টায় বড় জমির মালিকদের সাথে যুদ্ধ, তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, এত কিছু পেরোনোর পর মোটামুটি ৩৫ বছর পরে দেশটির গড় আয়ু দ্বিগুণ! এছাড়া বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি একেবারে নির্মূল করা। প্রত্যেকের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরিষেবা। প্রতিটি কোণায়। শিক্ষার বিস্তার এমন জায়গায় পৌঁছলো যে কিরগিজস্তানের মত অঞ্চল, যেখানে ১৯১৭ সালে শিক্ষার হার ছিল মোটামুটি ০.২ শতাংশ, সেটা ৫০ বছর পরে প্রায় ১০০ শতাংশে পৌঁছল। অসুস্থ শ্রমিকের জন্য চাকরির সুরক্ষা, বছরে গড়ে ২১ এর ওপর বেতনসহ ছুটি, মাতৃত্বকালীন ছুটি, ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে ম্যানেজারকে বহিষ্কার করার অধিকার। আজকের বোম্বাই, নিউ ইয়র্কে দাঁড়িয়ে কেউ ভাবতে পারে, মাসিক আয়ের মাত্র ২-৩ শতাংশ বাড়ি ভাড়ায় বরাদ্দ থাকার কথা? ১৯৮৩ সালে বিভিন্ন পশ্চিমা গবেষণার ভিত্তিতে পর্যালোচনা করে মার্কিন সমাজ বিজ্ঞানী আলবার্ট সিমানস্কি জানান যে সোভিয়েত ইউনিয়নে উচ্চতম আয় ছিল নিম্নতম আয়ের ১০ গুণের মত। যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ওই একই সময়ে সংখ্যাটা ১১৫ গুণ। এছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যক্তিগত মালিকানা থাকায় বাণিজ্যিক লাভ ব্যক্তিগত, এবং সেই অঙ্কটা বিশাল। সাম্রাজ্যবাদী শোষণ চালিয়ে, অসম বাণিজ্যের মাধ্যমে ধনী হয়ে পাশ্চাত্যের বহু রাষ্ট্র এখন নানা রকম ওয়েলফেয়ার আনতে পারে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে, উপনিবেশ মুক্তির লড়াইয়ে সাহায্য করে তারপরেও যে সামাজিক সুরক্ষা অর্জন করা যায় সেটা পৃথিবী প্রথম দেখল। সাংস্কৃতিক অগ্রগতি তাক লাগিয়ে দিল বিশ্বকে। যেমনটা অবাক হয়েছিলেন রবি ঠাকুর। নারীমুক্তি, শিশুরা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে পরিগণিত হল। যখন মার্কিন মুলুকে মহিলাদের পুরুষের পায়ের তলায় রাখার প্রোপাগান্ডা হয়, সেই ৫০/৬০ এর দশকে, এবং তার পরেও বুর্জোয়া নারীবাদের যুগে নারীত্বের পণ্যায়ন চলাকালীন, মেয়েরা ছেলেদের সাথে একই সাথে যাবতীয় উৎপাদনের কাজে যোগ দেন সোভিয়েত ইউনিয়নে। ভর্তুকি মূল্যে বই, পত্রিকা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের টিকিট। ইউনেস্কো’র একটি সমীক্ষা বলে, গড়পড়তা সোভিয়েত নাগরিক পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বই পড়েন ও সিনেমা দেখেন। এগুলো বিপ্লবের প্রথম দুনিয়া কাঁপানো দশ দিনে হয়ে যায়নি। সময় লেগেছিল। কিন্তু সে সময়ও ছিল বিপ্লবের সংগ্রামী সময়। বিপ্লব, অর্থাৎ প্রাচীন উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদন সম্পর্কগুলোর আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে সঙ্গতি স্থাপন করা এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, অর্থাৎ উৎপাদন ব্যবস্থার চরম উন্নতির পর্যায়ে ব্যক্তি মালিকানার অবসান ঘটিয়ে যৌথ মালিকানা স্থাপন করে ক্রমশ, ‘প্রত্যেকের থেকে তার সাধ্যমত নেওয়া ও প্রত্যেককে জন্য তার প্রয়োজন মত দেওয়া’র স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটানো। সদ্য প্রকাশিত সিআইএ রিপোর্টে দেখা যায়, যেখানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আশঙ্কা প্রকাশ করছে যে সোভিয়েত ইউনিয়ন অটোমেশন আনতে আনতে ক্রমশ মানুষের কাজের সময় কমানোর দিকে গিয়ে শেষে কমিউনিজমে পৌঁছে যেতে পারে। এই পুরো পর্বটা জূড়েই বিপ্লব। বলা চলে সোভিয়েত দেশে বিপ্লবের সংগ্রামী পর্ব অন্তত ১৯৩৭ সালের আগে শেষ হয়নি। কমরেড স্টালিন তাঁর সোভিয়েত দেশে সমাজতন্ত্র তৈরীর পথে বাধা সম্পর্কিত লেখায় আলোচনা করেছিলেন, কৃষক অধ্যুষিত দেশে, যেখানে পুঁজিবাদের পূর্ণ বিকাশ ঘটেনি, সেখানে সমাজতন্ত্র নির্মাণের বন্ধুর পথ সম্পর্কে। এখানে স্রেফ মজদুর শ্রেণী শিল্পের মালিকানা দখল করলেই হয় না। মজদুর শ্রেণীর মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষককে সমাজতন্ত্রী স্বপ্ন দেখতে শিখিয়ে দলে আনতে হয়। নানা প্রলোভন থাকে। প্রাচীন ব্যক্তি মালিকানাভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থায় যুক্ত কৃষকদের একাংশ প্রথমেই যৌথ মালিকানা উপযোগিতা সম্পর্কে নিশ্চিত থাকেন না। আর সোভিয়েতের নিউ ইকনমিক প্ল্যান ধরণের তাৎক্ষণিক ব্যক্তি মালিকানা বজায় রাখার নীতি থাকলেও তা নতুন শ্রেণী বিন্যাস নিয়ে আসতে পারে। ভোগ্য পণ্যের অভাব বহুদিন পর্যন্ত প্রতীয়মান থাকে। কারণ সমাজতন্ত্রকে সুরক্ষিত করতে গেলে, এবং দীর্ঘস্থায়ী করতে গেলে ভারী শিল্পে অতিরিক্ত শ্রম দিতে হয়। এই বাধাগুলো থাকার কারণেই সমবায়ীকরণ বা কালেকটিভাইজেশন হয়ে ওঠে বিপ্লবের আর একটি সংগ্রামী পর্ব। এর মধ্যে বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী মদত, পেতি বুর্জোয়া মানসিকতা, তাৎক্ষণিক লাভের আশা কিছু লোককে প্রতিবিপ্লবী কার্যকলাপে নিয়ে যায়। আবারও চলে সশস্ত্র সংগ্রাম। তাই, বলা যায়, মোটামুটি ১৯৩৭ সালের আগে সোভিয়েত বিপ্লবের সশস্ত্র পর্ব শেষ হয়নি। আর তার চরম অগ্নিপরীক্ষা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এবং তার পরে। কী বীভৎসতা সহ্য করে সোভিয়েত ইউনিয়ন ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছিল, সমাজতন্ত্রী রণকৌশল মুনাফার আগে মানুষকে রাখায় সমগ্র দেশ একটি বিন্দুতে ফোকাস লোর কীভাবে ওই যুদ্ধে যেতে তা রূপকথার মত কাহিনী। তাই নভেম্বরের কথা বলতে গেলে শুধু ঐ ১০ দিন দিয়ে শেষ করা যায় না। তেমনটি সম্ভবত উচিতও নয়। ঐ ১০ দিনে মজদুর কৃষক মৈত্রী রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করেন। তারপর চলে তাকে টিকিয়ে রাখার লড়াই। বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম সত্যিকারের গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য সংগ্রাম। আজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী প্ররোচনায় নানা দেশে নানা অভ্যুত্থান হয়ে থাকে। কোথাও অরগ্যানিকালিও হয়ে থাকে। কিন্তু সেক্ষেত্রেও তার ঘোষিত উদ্দেশ্য সাধিত হয় না। সব অভ্যুত্থান বিপ্লব হয় না। বিপ্লবের জন্য বিপ্লবী তত্ত্ব এবং বিপ্লবী পার্টির প্রয়োজন হয়। বিপ্লবী চেতনার প্রয়োজন হয়। বিপ্লব একটি গড়ার কাজ। প্রাচীন জীর্ণ বাধাকে চূর্ণ করা নতুন ব্যবস্থা গড়ার পথে একটি পদক্ষেপ মাত্র। অনিয়ন্ত্রিত, উচ্ছৃঙ্খলতাকে বিপ্লব বলে না। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৭ ই নভেম্বর, কমরেড লেনিনের আহ্বানে, বলশেভিক পার্টির উদ্যোগে যে অভ্যুত্থান আরম্ভ হল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ফেরত কৃষক সন্তানেরা অরোরা জাহাজ থেকে তোপধ্বনি যার সূচনা করল, সেটা ছিল সত্যিকারের বিপ্লব। মহান নভেম্বর বিপ্লব লাল সেলাম। প্রকাশের তারিখ: ১২-নভেম্বর-২০২৫ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|