|
নভেম্বরের শিক্ষা পথ চেনার আলোকবর্তিকা - সোমনাথ ভট্টাচার্যSomnath Bhattacharya |
|
১৷ শোষণহীন সমাজ গড়ার দর্শন মার্কসবাদ। এর রচয়িতা কার্ল মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩) এবং ফ্রেডরিক এঙ্গেলস (১৮২০-১৮৯৫)। শোষণহীন সমাজ গড়া যে সম্ভব তন্নিষ্ঠ গবেষণা করে তা তারা দেখিয়েছেন। কিন্তু দুঃখের হলেও সত্য বাস্তবের মাটিতে তারা সেই সমাজ প্রতিষ্ঠা করে যেতে পারেননি। তাদের সেই অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করলেন কমরেড লেনিন (১৮৭০-১৯২৪)। রাশিয়ায় ১৯১৭-য় অক্টোবর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করলো পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশ। গড়ে উঠলো সোভিয়েত ইউনিয়ন। গোটা জগতের সামনে লেনিন দেখিয়ে দিলেন মার্কস এঙ্গেলস বর্ণিত শোষণহীন সমাজ গড়া সম্ভব। সমাজের একদম নিচু তলার মানুষ, যারা যুগ যুগ ধরে শোষিত-বঞ্চিত লাঞ্ছিত তারাও দেশ চালাতে পারে। এ এমন এক ব্যবস্থা যেখানে দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার দায়িত্ব নেবে রাষ্ট্র। এর নাম সমাজতন্ত্র। যেখানে থাকবে না বুভুক্ষের হাহাকার, নিরন্নের কান্না। থাকবে শীতে উষ্ণ পোশাক আর মাথার ওপর এক চিলতে ছাদ। মুছে যাবে অজ্ঞানের অন্ধকার, চিকিৎসাহীন মৃত্যু। এই ব্যবস্থা বলল সমাজকে তুমি তোমার সাধ্যমত দেবে, সমাজ তোমার কাজের হিসেব অনুপাতে তোমাকে প্রতিদান দেবে। সেখানে কোনো বেশি কম হবার জো নেই। ![]() ২৷ কমরেড লেনিন যখন রাশিয়ায় বিপ্লবের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তখন প্রথমেই তাকে একটি বড় প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হল। মার্কস এঙ্গেলস বলে গেছেন উন্নত পুঁজিবাদ দেশে আগে বিপ্লব হবে। সে সব দেশ হল ফ্রান্স, জার্মানি, ইংল্যান্ড প্রভৃতি। আর রাশিয়া তো পিছিয়ে পড়া দেশ। ইউরোপের উঠোন। সেখানে কি করে বিপ্লব সম্ভব? লেনিন বললেন আমরা তো রাশিয়ার মানুষ আমরা অন্য দেশে কি করে বিপ্লবের কাজে নেতৃত্ব দেব? আমরা বরং সেই চেষ্টাই করবো নিজেদের দেশের জন্য। সেটাই আমাদের সামনে বাস্তব। অন্য ভাবনা অবাস্তব। দ্বিতীয় প্রশ্ন বেশিরভাগ মানুষ চাইলেই শাসক তো আপনি আপনি ক্ষমতা থেকে সরে যাবে না। তার জন্য সচেতন, সুপরিকল্পিত, কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তাই প্রয়োজন এ কাজে নিঃস্বার্থভাবে নেতৃত্ব দিতে পারার মতো বলিষ্ঠ সংগঠন যা বিপ্লবী চেতনায় শাণিত। যার থাকবে মানুষের স্বার্থকে সব সবার উপরে স্থান দেবার ক্ষমতা। যে প্রতিহত করবে শত্রুর ছুড়ে দেওয়া উদ্যত বর্ষার ফলক কিংবা উত্তপ্ত শিসের বুলেট। যে লক্ষ্য রাখবে এসব যাতে সাধারণ মানুষকে স্পর্শ করতে না পারে। প্রয়োজনে এই সংগঠনের সদস্যরা নিজেরা শহীদ হয়েও জীবনের শেষ প্রাণের স্পন্দন পর্যন্ত মোকাবিলা করে যাবে সাধারণ মানুষের ওপর নেমে আসা শাসকের নির্মম আঘাতগুলিকে। কিন্তু এরকম সংগঠন পাওয়া যাবে কোথায়? কাদের নিয়ে গড়ে উঠবে এই সংগঠন? লেনিন বললেন মার্কসবাদের মতাদর্শে শাণিত কমিউনিস্ট পার্টিই হবে সেই ব্যাতিক্রমী সংগঠন। আর এক একজন খাঁটি সাচ্চা কমিউনিস্টদের নিয়ে সেই সংগঠন গড়ে উঠবে। লেনিন সেভাবেই গড়ে তুলেছিলেন বলশেভিক পার্টিকে। যেখানে পার্টির চরিত্র হবে বিপ্লবী। রাস্তা হবে গণলাইন। অর্থাৎ জনগণের জীবন যন্ত্রণার ইস্যু গুলোই হবে পার্টির লড়াইয়ের মূল প্রতিপাদ্য। ৩৷ সঠিক সময়ে সঠিক স্লোগান : শান্তি চাই, রুটি চাই ও জমি চাই। ![]() কেন রুটি চাই? যুদ্ধবিধ্বস্ত রাশিয়ায় খাদ্যের জন্য হাহাকার। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জোর করে সংগ্রহ করা হচ্ছে যুদ্ধের খরচ, অতিরিক্ত কর। এই খরচ মেটাতে গিয়ে অনাহারে, অর্ধাহারে দিন কাটছে অসংখ্য মানুষের। তাই রুটি চাই। কেন জমি চাই? লেনিন উপলব্ধি করেছিলেন রাশিয়াতে বছরের পর বছর রাজতন্ত্র এবং জমিদারতন্ত্রের অত্যাচারে দেশের সাধারন কৃষকরা জমিহারা হয়েছে। ইতিহাসের পাতায় পাতায় সেই অত্যাচারের ৪৷ ১৯৮৮ থেকে ১৯৯১ সাল। ক্রেমলিনের ওপর থেকে লাল পতাকা নেমে যেতেই আহ্লাদে আটখানা বিশ্ব পুঁজিবাদ। আর শুধুতো সোভিয়েত ইউনিয়ন নয়! পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, যুগোস্লাভিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, পূর্ব জার্মানি…. একের পর এক দেশ। তাই না দেখে আনন্দে আত্মহারা মার্গারেট থ্যাচার সোল্লাসে ঘোষণা করলেন 'টিনা'। TINA = There is no alternative অর্থাৎ পুঁজিবাদের কোনো বিকল্প নেই। ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা বই লিখলেন, The End of History and the Last Man । মার্কস এঙ্গেলসের ভাবনার মধ্যে দিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন রাস্তায় পথ চলা শুরু হয়েছিল। লেনিন থেকে মাও সে তুং, হো চি মিন থেকে ফিদেল কাস্ত্রো যে পথ ধরে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষকে সমাজতন্ত্রের ছত্রছায়ায় এনে তাদের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-চিকিৎসা-শিক্ষা সুরক্ষিত করে নিশ্চিন্ত রাত্রিযাপন নিশ্চিত করেছিলেন - সেই ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটলো। একইসঙ্গে পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির দুনিয়া ঘোষণা করল, 'মার্কসবাদ মৃত'! সমাজতন্ত্র বাতিল! আচ্ছা একটা মৃত জিনিসকে কতবার মৃত বলতে হয়? কেন বারংবার মৃত বলতে হয়? বেড়ায় বলেই দু'দিন অন্তর ঘোষণা করতে হয়, মার্কসবাদ মৃত। ওরা ভীষণ ভয় পায় লন্ডনের হাইগেট সমাধিতে প্রায় ১৪০ বছর ধরে চিরনিদ্রায় শুয়ে থাকা মানুষটিকে আর তার মতবাদকে। কারণ এই মতবাদই কমিউনিস্ট ইস্তেহারের পাতায় প্রথম তুলে ধরেছিল সেই সত্য, "ইউরোপ আজ ভূত দেখছে, কমিউনিজমের ভূত।" আর এই মতবাদই শাসকের চোখে চোখ রেখে বলেছিল, "কমিউনিস্ট বিপ্লবের আতঙ্কে কাঁপুক শাসকশ্রেণী।…… সর্বহারার শৃংখল ছাড়া হারাবার কিছু নেই, জয় করবার জন্য আছে গোটা দুনিয়া।" এ হেন বলিষ্ঠ উচ্চারণ পুঁজিবাদের বুকে প্রতিনিয়ত হাতুড়ি পেটা করে। পুঁজিবাদ যে তার ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত গলদের কারণে নিজেই নিজের কবর খনন করে চলেছে সেকথাও মার্কসবাদই প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয় পুঁজিবাদকে; একই সঙ্গে সমগ্র বিশ্বকেও। কারণ পুঁজিবাদের নিজেকে 'অপরাজেয়' বলে দাবী করার ঘোষণা যে ডাহা মিথ্যা একথাও সবচেয়ে বলিষ্ঠভাবে মার্কসবাদ-ই দুনিয়ার সামনে উপস্থিত করে। টেরি ঈগলটন এই বিতর্কে অংশ নিয়ে অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য একটি কথা তুলে ধরেন "Why Marx Was Right" গ্রন্থে। তিনি বললেন, "পুঁজিবাদের এই দাবির একটিমাত্র সমস্যা আছে। মার্কসবাদ হল পুঁজিবাদের সমালোচনা। পুঁজিবাদ সম্পর্কে আজও পর্যন্ত যা যা বলা হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে অনুসন্ধানী, সর্বাধিক কঠোর এবং সর্বাপেক্ষা ব্যাপক সমালোচনা। এটিই একমাত্র সমালোচনা যা পৃথিবীর বড় বড় ক্ষেত্রকে বদলে দিয়েছে। অতএব যতক্ষণ পুঁজিবাদের কারবার থাকবে ততক্ষণ মার্কসবাদকেও থাকতে হবে। শুধুমাত্র তার প্রতিপক্ষকে রিটায়ার করিয়ে তবেই এই মতাদর্শ রিটায়ার করতে পারে।" হেগেলের শব্দবন্ধ ধার করে নিজের বইয়ের নাম দিয়েছিলেন 'এন্ড অফ হিস্টরি'। লেখক ফুকুয়ামা এখনও মার্কসবাদকে অপছন্দ করেন।কিন্তু তাকেও লিখতে হল ১৯৯২ সালে আমার লেখা বইয়ে দেখিয়েছিলাম মার্কসবাদী প্রস্তাবনাটি স্পষ্টতই ভুল এবং উদারবাদী গণতন্ত্রের উচ্চতর বিকল্প কিছু আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু আমরা বিগত ১৫ বছরে উদারবাদী গণতন্ত্রের ভয়ঙ্কর অধোগামিতা দেখেছি। অবশ্য এর পরেও তিনি পুঁজিবাদের পক্ষ নিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে বলেছিলেন, "অবশ্য কোন বিপর্যয় মানেই এই নয় যে তার ভিত্তিভূমি ভুল।" এরপর আরও এগারোটা শীত বসন্ত পেরিয়ে গেল। ২০১৮-য় জর্জ ইটনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেই ফুকুয়ামা আবারও তার মত বদলালেন। বিশিষ্ট মার্কসবাদী চিন্তক ঐতিহাসিক হবসবম 'হাউ টু চেঞ্জ দ্য ওয়ার্ল্ড' গ্রন্থে, ২০০৯ সালে লিখিত একটি প্রবন্ধে ২০০৮-র আর্থিক মন্দা প্রসঙ্গে লিখলেন, "প্রচলিত (পুঁজিবাদী) ব্যবস্থাদির পশ্চিমী সংবাদমাধ্যম আমাদের মনে করিয়ে দেয় মার্কসবাদের বাজার এখন খুব খারাপ। আর এই খারাপ বাজারে ১৫৪ কোটি মানুষ (চীন, ভিয়েতনাম, কিউবা লাওস ও উত্তর কোরিয়ার সম্মিলিত জনসংখ্যা) সমাজতন্ত্রের ছত্রছায়ায় বসবাস করে। এই পাঁচটি দেশের সবাই কি সমাজতন্ত্রের সমর্থক? নিশ্চয়ই নয়। আবার এর বাইরে পৃথিবীতে আরো ১৯০ টি দেশ আছে। যেখানে কোটি কোটি মানুষ মার্কসবাদ-লেনিনবাদ, সমাজতন্ত্র ও বামপন্থায় আস্থা রাখেন। তার মানে, খুব খারাপ বাজারেও পৃথিবীর প্রায় ২০০ কোটি মানুষ যে মতবাদে বিশ্বাস করে তার নাম মার্কসবাদ। তাই তাকে যে মানবতার শত্রুরা ভয় পাবে, সেটা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না! ![]() বিশ্ববরেণ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক প্রভাত পট্টনায়েক বললেন, "আমি মনে করি মার্কসবাদ যেভাবে সমসাময়িক বিশ্বকে বিশ্লেষণ করেছে সেভাবে আর কেউ করে নি। লেনিন বলতেন : মার্কসবাদ সত্য, সেটাই তার শক্তি। আসল কথা হলো এটা যথার্থ বিজ্ঞানসম্মত আবিষ্কার।" এই যুক্তি বোধ, সত্য ও বিজ্ঞানের পথ ধরেই মার্কসবাদ, নভেম্বর বিপ্লবের শিক্ষা ও সমাজতন্ত্রের পথ ধরে শোষণহীন সমাজ গড়ার সংগ্রাম এগিয়ে যাবে। আমরা সেই পথেরই অভিযাত্রী। প্রকাশের তারিখ: ১৬-নভেম্বর-২০২৩ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|