জীবনানন্দের কবিতায় নজরুলের প্রভাব ও সম্প্রীতির চেতনা

Dr. Nurul Islam
নরমপন্থী ও চরমপন্থী দুই ধারার রাজনৈতিক আন্দোলন তীব্রতর হওয়ায় ব্রিটিশ সরকার তাদের শোষণ লুটপাটের  ক্ষমতা ধরে রাখতে ভারতবাসীর মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের নতুন নতুন পদ্ধতিতে চক্রান্ত করতে থাকে। সাম্প্রদায়িক নেতাদের দিয়ে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে বিদ্বেষের পরিণত করার কাজে  মদত যোগায় ব্রিটিশ সরকার।
 'মহামৈত্রীর-বরদ-তীর্থে-পুণ্য ভারতপুরে,
পূজার ঘন্টা মিশিছে হরষে, নামাজের সুরে-সুরে।'
    এই অংশটি রূপসী বাংলার রূপমুগ্ধ কবি জীবনানন্দ দাশের  'হিন্দু-মুসলমান' কবিতার অংশ। স্মরণীয় 'বঙ্গবাণী'  পত্রিকার জৈষ্ঠ ১৩৩৩ সাল (১৯২৬) যে সংখ্যায় নজরুল ইসলামের 'কান্ডারী হুশিয়ার' কবিতাটি প্রকাশ পায় ওই সংখ্যাতেই জীবনানন্দ দাশগুপ্ত নামে 'হিন্দু-মুসলমান'
 কবিতাটি  প্রকাশিত হয়।  পরে এই কবিতাটি 'ঝরা পালক' নামে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হয়। কবি এই কবিতায় পুরান ইতিহাস লোকাচারের নানা প্রতীক চিত্রকল্প রূপকল্পের মধ্য দিয়ে  এক সুন্দর সম্প্রীতির বাতাবরণ তৈরিতে প্রয়াসী হয়েছেন। এটাকে বলা যায় কবি নজরুলের ভাষায় পারস্পরিক গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার শুভ প্রয়াস।

     কাজী নজরুল ইসলাম ও জীবনানন্দ দাশ বাংলা সাহিত্যের দুই বিখ্যাত কবির জন্ম ১৮৯৯ সালে। কবি জীবনানন্দ দাশ কাজী নজরুল ইসলামের  চেয়ে মাত্র তিন মাস সাত দিনের বড়। কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ২৪ শে মে, ১৮৯৯ (১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) এবং কবি জীবনানন্দ দাশ জন্মগ্রহণ করেন ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৯( ৬ ফাল্গুন, ১৩০৫ বঙ্গাব্দ)। এই দুই কবিরই ১২৫ বছর পূর্ণ হল এই বছর ২০২৫ । নজরুল ছিলেন বিদ্রোহ ও গণজাগরণের কবি,গণ মানুষের দুঃখ দুর্দশা ও জাতীয়তাবাদের কথা তাঁর  কবিতা গানে ব্যক্ত হয়েছে। তাঁর সৃষ্টির মূল সুর বিদ্রোহ-সাম্য-মানবপ্রেম। অন্যদিকে রূপসী বাংলার রূপমগ্ধ কবি  জীবনানন্দ দাশের কবিতায় একাকীত্ব-নিঃসঙ্গতা, আধুনিক জীবনের যন্ত্রণা, ব্যক্তি মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব  ও প্রকৃতির সাথে মানুষের গভীরতা কাব্যরূপ লাভ করেছে।
  জীবনানন্দের প্রথম দিকের 'ঝরা পালক', 'মহাপৃথিবী' কাব্যের কিছু কবিতা পাঠ করলে দেখা যায় সেখানে নজরুলের প্রভাব রয়েছে বেশ।
নজরুলেরভাষা,ছন্দ,গঠন-কাঠামো,সাম্যবাদ,অসাম্প্রদায়িকতা,  প্রেম এবং বিদ্রোহ সবই তাঁকে আকৃষ্ট করে।
   কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর 'নব নবীনের লাগি' কবিতায় বলেন,
 'গাহি মানবের জয়!
 কোটি কোটি বুকে কটি ভগবান আঁখি মেলে জেগে রয়!'
  শুধু বিষয় নয় শব্দ উঠে আসে নজরুলের কবিতা থেকে। একজন নিভৃতচারী,প্রচার বিমুখ মানুষ হয়েও প্রথম জীবনে ছিলেন প্রতিবাদী,বিপ্লবী। তিনি পরাধীন দেশের কিশোর দলের উদ্দেশ্যে 'কিশোরের প্রতি' কবিতায় বলেন,
   'দ্বাদশ সূর্যের বহ্নি ওঠেনি কো জ্বলি,
 কক্ষচ্যুত  উল্কাসম পড়েনিকো স্খলি
 সব বিভিন্ন সকল আগল,
  ভাঙিয়া জাগোনি তুমি স্পন্দন-পাগল?'
   এখানেই থেমে যাননি জীবনানন্দ দাশ, নজরুলের কবিতা যে তার মনে বিদ্রোহের আগুন জ্বেলে দেয় তারও  দৃষ্টান্ত প্রোজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তিনি 'জীবন মরণ দুয়ারে আমার' কবিতায় লেখেন,
     'ঘরদোর ভাঙা তুমুল প্রলয়ধ্বনি,
 নিত্য গগনে এই যে উঠেছে রণি,
যুবানবীনের নটনর্তন তালে,
 ভাঙনের গান এই যে বাজিছে, দেশে-দেশে,কালে-কালে।'
  কবি নজরুলের প্রেম ভাবনাও জীবনানন্দকে প্রভাবিত করে, দূর দ্বীপবাসিনীর কথা দীর্ঘ 'নাবিক' কবিতায় তার ছায়াপাত ঘটায়,
  'কোথা দূরে মায়াবনে পরীদল মেতেছে উৎসবে,
 স্তম্ভিত নয়নে, নীল বাতায়নে।'
   আবার 'সিন্ধু' কবিতায় তিনি লেখেন,
 'তুমি শিখিয়েছো বন্ধু দুর্মদ দুরাশা,
 আমাদের বুকে তুমি জাগালে পিপাসা।'
  'ঝরা পালক' কাব্যের
 'হিন্দু-মুসলমান' কবিতাতেও নজরুলের প্রভাব অসাধারণ।
    গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যময় নিসর্গ, রূপকথা,পুরাণের জগৎ তাঁর কাব্যে  হয়ে উঠেছে চিত্ররূপময়, সেখানে আবহমান বাংলার চিত্ররূপ ও সৌন্দর্য ধরা পড়ে নিজস্ব শৈলীতে। প্রকৃতির পাশাপাশি জীবনানন্দের শিল্প জগতে মূর্ত হয়েছে আধুনিক নগর জীবনের অবক্ষয়, হতাশা, নিঃসঙ্গতা ও সংশয়বোধ। কাল সচেতন ও ইতিহাস সচেতন কবি অতীত ও বর্তমানকে  বাঁধতে চেয়েছেন অচ্ছেদ্য  সম্পর্ক সূত্রে। কবিতার উপমা প্রয়োগে তাঁর স্বকীয়তা নিজস্বতা চোখে পড়ার মতো। কবিতাকে তিনি মুক্ত আঙ্গিকে উত্তীর্ণ করে গদ্যের স্পন্দন যুক্ত করেন  প্রবলভাবে প্রভাবিত করে পরবর্তী বহু কবিকে।বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর  কবিতার ভূমিকা ঐতিহাসিক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লব, শ্রমিক শ্রেণীর বিজয় ও রাষ্ট্র ক্ষমতা অর্জন সারা বিশ্বের রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক পরিবেশ পরিস্থিতিকে বদলে দেয়।  দেড় শতাধিক বছরের পরাধীন ভারতবাসীর মনে মুক্তির বাসনাকে তীব্র করে তোলে। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে মহাত্মা গান্ধীর ফিরে এসে ভারতের রাজনীতিতে যোগদান এবং নানা ঘটনা প্রবাহ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে নানা মাত্রা এনে দেয়।  নরমপন্থী ও চরমপন্থী দুই ধারার রাজনৈতিক আন্দোলন তীব্রতর হওয়ায় ব্রিটিশ সরকার তাদের শোষণ লুটপাটের  ক্ষমতা ধরে রাখতে ভারতবাসীর মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের নতুন নতুন পদ্ধতিতে চক্রান্ত করতে থাকে। সাম্প্রদায়িক নেতাদের দিয়ে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে বিদ্বেষের পরিণত করার কাজে  মদত যোগায় ব্রিটিশ সরকার। বিগত শতাব্দীর কুড়ির দশকের মাঝামাঝি নানা সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল তাদের মদতে তৈরী হয়,বিভিন্ন সম্প্রদায়িক শক্তি মানুষের মধ্যে ভ্রান্ত উগ্র ধর্মান্ধতা তৈরি করে স্বাধীনতা আন্দোলনের শক্তিকে দুর্বল করার অপচেষ্টা চালাতে থাকে। সাম্প্রদায়িক দলগুলো রাজনৈতিক কার্যকলাপ পরিবেশকে বড় বিষাক্ত করে তোলে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ প্রতিষ্ঠিত স্বরাজ দল হিন্দু মুসলমানের মিলন ও সম্প্রীতিবোধ ও  ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনকে শক্তিশালী করতে জোর চেষ্টা চালায়। কিন্তু প্রাদেশিক কংগ্রেসের  কৃষ্ণনগর অধিবেশন
 সফল হয়নি, ১৯২৫ সালের ১৬ জুন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের আকস্মিক প্রয়াণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার চেষ্টায় বড় সংকট তৈরি হয়। কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর মৃত্যুতে 'বঙ্গবাণী' শ্রাবণ ১৩৩২(১৯২৫) সংখ্যায় 'দেশবন্ধু' কবিতাটি রচনা করেন। পরে কবিতাটি 'ঝরাপালক' প্রথম কাব্যগ্রন্থে  প্রকাশিত হয় ১৯২৭ সালে।
 'বাংলার অঙ্গনেতে বাজায়েছো নটেশের রঙ্গমল্লী গাঁথা,
 অশান্ত সন্তান ওগো, বিপ্লবিনী পদ্মা ছিল তব নদী মাতা।'
   তাঁর প্রয়াণের দিন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  শোক প্রকাশ করে লেখেন,
 'এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ,
 মরণে তাহাই তুমি  কর গেলে দান।'
    এই সময় কবি নজরুল ইসলাম তাঁর 'ইন্দ্রপতন' কবিতায় লেখেন,
   'হিন্দুর ছেলে আকবর, মুসলিমের আরঙ্গজীব,
 যেখানে দেখেছ জীবের বেদনা, সেখানে দেখেছ শিব।
 নিন্দা-গ্লানির পঙ্ক মাখিয়া, পাগল মিলন-হেতু,
 হিন্দু-মুসলমানের পরাণে তুমিই বাঁধিলে সেতু।'
 ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতা এক নয়, ধর্ম মানুষের মধ্যে পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ভালোবাসা আর সাম্প্রদায়িকতা পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ।পৃথিবীর কোনো ধর্মই হিংসা-বিদ্বেষকে সমর্থন করেনা ধর্মের মূল কথাই হলো মানুষকে ভালোবাসা। পৃথিবীর যেকোনো দেশেই ধান্দাবাজ রাজনৈতিক নেতারাই ধর্মকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেয় রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে।মানুষের মনের ধর্মীয় বিশ্বাসকে হিংসা-বিদ্বেষে পরিণত করে নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থচরিতার্থ করতে তাঁরা ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি করে।এই সাম্প্রদায়িক বিভেদ-বিদ্বেষের পটভূমিতেই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিখ্যাত 'কান্ডারী হুশিয়ার' কবিতা বা গান রচনা করেন। স্বাধীনতা আন্দোলনের সাধারণ জাতীয় মঞ্চ কংগ্রেসের ভেতরের সাম্প্রদায়িক নেতাদের তিনি সতর্ক করে কৃষ্ণনগর অধিবেশনে উদ্বোধনী সংগীতে এই গানটি গিয়েছিলেন।
  'হিন্দু না ওরা মুসলিম, ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
 বলো কান্ডারী ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।'
  জীবনানন্দের জীবদ্দশায় দুবার বড় ধরনের হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা হয় ১৯২৬ ও ১৯৪৬ সালে এবং তিনি দুবারই  তাঁর অভিমত ব্যক্ত করেন ঘৃণ্য আত্মঘাতী ভ্রাতৃঘাতী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা  ও হিংসা-বিদ্বেষের বিরুদ্ধে।  ১৯২৬ সালের ২ এপ্রিল কলকাতায় দাঙ্গা শুরু হয় এবং তা পূর্ব বাংলার ঢাকা পাবনা সহ নানা জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। তার জের ছিল বেশ কিছুদিন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তিনজন কবি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল,জীবনানন্দ এই দাঙ্গায় বিচলিত হয়ে কলম ধরেন।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লেখেন  'ধর্মমোহ' নামে কবিতা এবং 'ধর্ম জড়তা' নামে একটি প্রবন্ধ। নজরুল লিখলেন 'কান্ডারী হুশিয়ার',' যা শত্রু পরে পরে' ইত্যাদি কবিতা এবং 'মন্দির মসজিদ', 'হিন্দু মুসলমান' ইত্যাদি প্রবন্ধ।কবি জীবনানন্দ দাশ লিখলেন 'হিন্দু-মুসলমান' নামক কবিতাটি।
  নজরুলের প্রভাব
    'হিন্দু-মুসলমান' কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশ ভারত ভূমিকে মহামৈত্রীর বরদতীর্থভূমি বলে অভিহিত করেন। এখানে পূজার ঘন্টা আর নামাজের সুর, আহ্নিকের গায়ত্রী মন্ত্র ও মসজিদের মুয়াজ্জিনের আজান মহামিলনের মানব মৈত্রীর বাণী বহন করে আনে।ঈদগাহ মাজারে ফকির সুফি সাধকের তসবিমালা জপ আর সন্ধ্যা ঊষায় পূজারীর বেদবাণী মন্দির মসজিদকে একই সূত্রে আবদ্ধ করে।
   'মিশে গেছে হেথা,মিশে গেছে হেথা মসজিদ-মন্দির।'
   আরব মিশর তাতার তুর্কি ইরানের চেয়েও যে মুসলিম মানুষের কাছে ভারত ভূমি বড় আপন সেই বার্তা দিতে চেয়েছেন কবি এই কবিতায়,
              'হে ভাই মুসলমান,
 তোমাদের তরে কোল পেতে আছে ভারতের ভগবান।'
   ভারত ভূমি রীতিনীতি সংস্কৃতি সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া মুসলিম শাসকদের সম্পর্কে কবি এই কবিতায় অকপটে বলেন,
' এই ভারতের তখতে চড়িয়া শাহানশাহার দল,
 স্বপ্নের মণি-প্রদীপে গিয়েছে উজলি আকাশ তল!'
  কবিতার শেষ দিকে ইতিহাস সচেতন কবি ভারতবর্ষের ইতিহাসের বিভিন্ন যুগে পদচারণা করে সিদ্ধান্তে এসেছেন,
 'কাফের','যবন' টুটিয়া গিয়াছে, ছুটিয়া গিয়াছে ঘৃণা,
 মোসলেম বিনা ভারত বিফল, বিফল হিন্দু বিনা।
         মহামৈত্রীর গান,
 বাজিছে আকাশে নব ভারতের গরিমায়  গরীয়ান!'
 এই কবিতার কথাগুলি আমাদের অনেকেরই জানা। কবির  বক্তব্য মহা মনীষীদের মিলন মন্ত্র আমাদের সব সময় মননে জীবনচর্যায় অনুশীলনে  আনতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে সাধারণ মানুষের উন্নতির  প্রধান সোপানই হল  ধর্ম বর্ণ ভাষা নির্বিশেষে সকল মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বোধ, ঐক্যবোধকে গভীর-প্রশস্ত করা।  বিভিন্ন রঙের সুগন্ধের ফুলের মালা যেমন বেশ মনোমুগ্ধকর ও আকর্ষণীয় ঠিক তেমনি মানব সভ্যতা সংস্কৃতি ঐতিহ্যের প্রধান কথাই হল Unity In Diversity বা বিবিধের মধ্যে ঐক্য।
    বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে পৃথিবী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তার প্রভাব সারা বাংলাতেই দেখা যায়। তেরোশো পঞ্চাশের মন্বন্তরে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যান। তার করুণ চিত্র ফুটে ওঠে বিজন ভট্টাচার্যের 'নবান্ন', *'আগুন' নাটকে, প্রেমেন্দ্র মিত্রের 'ফ্যান', সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের 'স্বাগত' কবিতায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'অসহযোগী' সহ নানা গল্পে। দুর্ভিক্ষের পরবর্তীকালেই বাংলার নানা এলাকায় তেভাগা আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনে বহু কৃষক ভাগ চাষী নিহত হন। ব্রিটিশ বিরোধী ও জমিদার জোরদার মহাজন বিরোধী আন্দোলনে সমাজের সুবিধা ভোগী অংশ বড় ভয় পেয়ে যান। তার পরিণতি স্বরূপ বাংলার ভাগ্যাকাশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটে যায় ১৯৪৬ সালের আগস্ট মাসে। বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক দল তারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িক হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ায়,যার পরিণতি হয়েছিল ১৯৪৭ এর ভারত ভাগ, লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন হানি ও বাস্তবচ্যুত হবার চরম জীবন যন্ত্রণা। ধর্মের সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলে স্বার্থ যখন জড়িত হয় তার যে কি ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রূপ লাভ করে তার করুণ পরিণতি মর্মান্তিক বাস্তবতা আমরা লক্ষ্য করলাম এই দেশভাগে করুন যন্ত্রণার মাধ্যমে। এই পটভূমিতে লেখা জীবনানন্দের বিখ্যাত কবিতা 'এই সব দিনরাত্রি'।
   'মন্বন্তর শেষ হলে পুনরায় নব মন্বন্তর,
 যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে নতুন যুদ্ধের নান্দীরোল,
 মানুষের লালসার শেষ নাই। উত্তেজনা ছাড়া কোনোদিন ঋতুক্ষনণ,অবৈধ সংগ্রাম ছাড়া সুখ,
 অপরের মুখ ম্লান করে দেওয়া ছাড়া  প্রিয় সাধ নেই।'     চরম যন্ত্রনা দগ্ধ বিপর্যয়ের, হতশ্রী বীভৎস জীবনের,  ন্নার চিত্র পাশাপাশি তুলে ধরে আসল স্বরূপ চিনিয়ে দেওয়া জরুরী বীভৎস্যতার স্বরূপকে না চিনলে তার থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। 'এইসব দিনরাত্রি' কবিতায় তিনি বলেন,
   'যাদের আস্তানা ঘর তল্পিতল্পা নেই,
 হাসপাতালের বেড হয়তো তাদের তরে নয়।'
 এই চিত্রকল্প চরম বৈষম্যপূর্ণ সমাজের চিরন্তন বাস্তব ছবি।
   ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট শহর কলকাতায় হিন্দু-মুসলমানের এক ভয়াবহ দাঙ্গা হয় এবং তার আগুন পূর্ব বাংলার ঢাকা বরিশাল নোয়াখালী সহ বহু জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময় তিনি বরিশাল বিএম কলেজ থেকে ছুটি নিয়ে সপরিবারে কলকাতায় চলে আসেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়াবহতার নির্ধারণ বাস্তব ছবি ফুটে উঠেছে  তাঁর বিখ্যাত  '১৯৪৬- ৪৭' কবিতায়,কবিতাটি প্রথম প্রকাশ পায় 'পূর্বাশা' পত্রিকায়, পরে তা 'বেলা অবেলা কালবেলা' কাব্যে সংকলিত হয়। এই কবিতায়  নানা চিত্রকল্প- রূপকল্প- ভাব ব্যঞ্জনার  মাধমে দাঙ্গার ভয়াবহতার চিত্র ফুটে ওঠে।
 'বাংলার লক্ষ গ্রাম নিরাশার আলো ক্ষীনতায় ডুবে নিস্তব্ধ নিস্তেল।'
...........
 হাত নেই, কোথাও মানুষ নেই বাংলার লক্ষ গ্রামরাত্রি একদিন।'
 দাঙ্গা ও দেশ বিভাগের ভয়াবহ পরিণাম দেখে কবি বলেন,
 'সৃষ্টির মনের কথা মনে হয় দ্বেষ।'
                বা
 'জীবনের ইতর শ্রেণীর,
 মানুষ তো এরা সব ছেঁড়া জুতো পায়ে।
 বাজারের পোকা কাটা জিনিসের কেনাকাটা করে।'
   বহুকাল ধরে হিন্দু মুসলমান দুই সম্প্রদায় পাশাপাশি সহাবস্থান করেছে।কখনোই তাদের মনে হয়নি একজনকে উৎখাত করে বা হত্যা করে অন্যের পরমপ্রাপ্তি ঘটবে। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের ধর্মান্ধতা দুই সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষকে একেবারে হিংস্র উন্মত্ত করে তোলে, পারস্পরিক বিশ্বাস ভালোবাসা চরম হিংসা-বিদ্বেষের রূপ নেয়।
  'অখন্ড অনন্তে অন্তর্হিত হয়ে গেছে,
 কেউ নেই, কিছু নেই ---সূর্য নিভে গেছে।'
 ভ্রাতৃঘাতী, আত্মঘাতী দাঙ্গায় এক ভাই আরেক ভাইয়ের বুকে অসত্য আক্রোশের ছুরি বিদ্ধ করে,
 ' সকলেই সকলকে আড় চোখে দেখে।'
ইয়াসিন মকবুল শশী সাধারণ মানুষের অমূল্য প্রাণ বিসর্জন হয় সাম্প্রদায়িক নেতাদের লোভ লালসা।
   'মানুষ মেরেছি আমি তার রক্তে আমার শরীর।
  ভরে গেছে পৃথিবীর পথে এই নিহত ভ্রাতার।'
  পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আমাদের লেখনিকে  সব সময় সচল সজাগ রাখতে হবে। শুধু লেখনীর মাধ্যমে নয় কথায় ও কাজে, প্রতিমুহূর্তে জীবন চর্যায় গভীর ভাবে তা পালন করতে হবে।
     ২০১৮ সালে বিখ্যাত পোলিশ উপন্যাসিক ওলগা তোকারচুক  তাঁর রচিত 'ফ্লাইটস' উপন্যাসের জন্য আন্তর্জাতিক 'ম্যান বুকার' পুরস্কার লাভ করেন এবং একই বছরে 'নোবেল' পুরস্কার পান। তাঁর উপন্যাস গল্পের অন্যতম প্রধান বিষয় অতীতের ইতিহাস সংস্কৃতি, ভাবধারাকে তুলে আনা। সমাজের উচ্চকোটির অর্থ লোলুপ ভোগবাদী সমাজের মানুষ অতীত জীবন সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক ভাবধারাকে  ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দিতে চায়। কারণ তারা মনে করে অতীতের গৌরব জনক অধ্যায়  লড়াই সংগ্রামকে মুছে দিতে না পারলে নবাগত সমাজকে কিছুতেই তাদের সংকীর্ণ স্বার্থে পরিবর্তন করা যাবে না।  দক্ষিণপন্থী মৌলবাদী শক্তি মানুষের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ,আদর্শবোধকে ধূলিস্যাৎ করতে চায় তারা। জীবাণু রাসায়নিক মারণাস্ত্র রাখার অজুহাত খাড়া করে ইরাকে শুধু সাদ্দাম হোসেনকে হত্যা করা হয়নি,সেখানকার সমস্ত নৃতাত্ত্বিক পুরাতাত্বিক নিদর্শন মহামূল্যবান সম্পদ লুণ্ঠন করে নিয়ে চলে যায় তারা।
 ইজরায়েল প্যালেস্টাইনের বুকে গাজা ভূখণ্ডকে শুধু ধ্বংস করছে না সেখানকার বহু প্রাচীন সভ্যতা সংস্কৃতি,একটা পুরো জনগোষ্ঠীকে চিরতরে বিনষ্ট করতে চলেছে মার্কিন মদতে।
 যাদের নিজেদের সভ্যতার সংস্কৃতি কিছুই থাকে না তারা অন্যদের সভ্যতা সংস্কৃতিকে সহ্য করতে পারে না। মানুষকে ভুলিয়ে দেয় তার প্রাচীন ঐতিহ্য সংস্কৃতির কথা ইতিহাসের কথা। আমাদের দেশে যারা শাসন চালাচ্ছে তারা আমাদের প্রাচীন ইতিহাসকে মুছে ফেলতে চাইছে। তার কারণ তারা জানে যে তারা স্বাধীনতা সংগ্রামী ব্রিটিশদের দালালি করেছে তারা। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে ভুলিয়ে দিতে চায় তারা।কারণ তারা সেই সময় ব্রিটিশদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছে। সাভারকরকে বীর সাজাতে হলে গান্ধীজী, নেতাজি সুভাষ, ভগৎ সিং এর কৃতিত্বকে মুছে ফেলতে হয়। এই জঘন্য কর্মকাণ্ডই চলছে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন পাঠন সিলেবাস এর মধ্যে। তারা পাঠ্য বইয়ে বিদ্বেষ ঘৃণা ছড়াচ্ছেন।
 ইজরায়েলের জাতীয় পতাকার নীল সাদার প্রলেপ আসলে ১৯০ বছরের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী বিরোধী সংগ্রামী চেতনার  ইতিহাসকে ম্লান করে দেওয়ার একটা চক্রান্ত। সেই আন্দোলনে শ্রমিক কৃষকসহ আদিবাসী দলিত পশ্চাদপদ অংশের খানসামা, গাড়োয়ান, ধাঙড় তারাও ছিলেন। আজকের মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তি সেটাকে পুরোপুরি মুছে দিতে চাইছে। এই ইতিহাসকে রক্ষা করা আমাদের প্রধান কর্তব্য। এইসব ইতিহাস আমাদের স্মরণে, মননে,চর্চায়, ভাবনায় আনতে হবে।
   নদীর গতিধারা কে যদি কৃত্রিমভাবে রুদ্ধ করে দেওয়া হয় বা অন্য পথে চালিত করার অপচেষ্টা হয় তাদের কিরূপ ভয়াবহ পরিণাম হতে পারে তা আমরা উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, কাশ্মীরের বিভিন্ন প্রান্তে নিষ্ঠুর হড়পা বানের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে দেখেছি। তেমনি জোর করে ইতিহাস ঐতিহ্যকে সংস্কৃতিকে রুদ্ধ করতে চাইলে তার পাল্টা প্রত্যাঘাত রাজনৈতিক সামাজিকভাবে আসবেই এটাই ইতিহাসের চিরন্তন সত্য।
     বিভিন্ন ধর্ম বর্ণের ভাষার মানুষের ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে ভয় পায় দক্ষিণপন্থী মৌলবাদী শক্তি। তাই তারা মানুষের ঐক্যকে ধর্ম,ভাষা, বর্ণের ভিত্তিতে ভাগ করে তাদের  দুর্বল করতে।  এই উদ্দেশ্যেই পারস্পরিক ঘৃণা বিদ্বেষ ছাড়ানো হচ্ছে।
 বামপন্থী, প্রগতিশীল মানুষের বড় কর্তব্য মিলনের সম্প্রীতির ঐক্যের পক্ষে হিন্দী ভাষায় প্রচলিত প্রবাদ বাক্য বা বাগধারা অনুসারে জোরালো কন্ঠে বলতেই হবে,
"দুনিয়াকা জো তর হ্যায়, উসি তারাহ  বোলো,
 জাহাঁ বহরাকা এলাকা হ্যায়, উঁহা জোরসে বোলো।" অর্থাৎ 'যেখানকার যেমন ভাষা সেই ভাষায় বলতে হবে, যেখানে  মানুষ 'বোহরা বা 'কানে খাটো', সেখানে জোর আওয়াজ করতে হবে।

প্রকাশের তারিখ: ২২-সেপ্টেম্বর-২০২৫

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org