|
||||||||||||
কম খাও, দেশ বাঁচাওSamik Lahiri |
||||||||||||
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়তেই সাধারণ মানুষকে বলা হচ্ছে - কম গাড়ি চালান, বাড়ি থেকে কাজ করুন, খরচ কমান, তেল বাঁচান। অর্থাৎ লাভ হলে তা সরকারের, কিন্তু সংকটের দায়ভার জনগণের। |
||||||||||||
যখন কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রী নাগরিকদের উদ্দেশে বলেন —“তেল কম ব্যবহার করুন”, “অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ এড়িয়ে চলুন”, “এক বছর সোনা কিনবেন না”, “সারের ব্যবহার অর্ধেক করুন”, “বাড়ি থেকে কাজ করুন”— তখন তা আর নিছক নৈতিক উপদেশ থাকে না। এটা আসলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার গভীর সঙ্কটকেই তুলে ধরে। কারণ কোনও শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী অর্থনীতি জনগণকে খরচ কমাতে বলে না; বরং খরচ বাড়াতে উৎসাহিত করে, যাতে বাজার সচল থাকে, উৎপাদন বাড়ে, কর্মসংস্থান তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর ‘স্বেচ্ছায় কৃচ্ছ্রসাধন’-এর আহ্বানকে শুধুমাত্র দেশপ্রেমের আবেদন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, জ্বালানির আমদানি নির্ভরতা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, অত্যন্ত দুর্বল কর্মসংস্থান, নীতিগত দীর্ঘমেয়াদি ব্যর্থতাজনিত সংকট ইত্যাদি। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো — এই সংকট মোকাবিলার দায় মূলত সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, অথচ কর্পোরেট মুনাফা, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় বা নীতিগত ভুল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখে কুলুপ। তেলের ওপর নির্ভরশীলতা ভারত পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ, অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৮-৯০ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ভারতের দৈনিক তেল চাহিদা ৫৫ লক্ষ ব্যারেল (১ ব্যারেল = ১৫৯ লিটার) ছাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যদি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৭০ মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ১০৫-১১০ মার্কিন ডলারে পৌঁছে যায়, তবে ভারতের আমদানি বাবদ খরচ কয়েক হাজার কোটি ডলার বেড়ে যায়। মূল সমস্যা হলো তেল কিনতে হয় ডলারে। ফলে তেলের দাম বাড়া মানে শুধু পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়া নয়; এর অর্থ হলো দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরেও সরাসরি চাপ তৈরি হওয়া। ভারতের বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার যদিও বর্তমানে প্রায় ৬৫০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, কিন্তু বিশাল আমদানি ব্যয়, টাকার মুল্যের ব্যাপক অবমূল্যায়ন এবং বৈদেশিক ঋণের চাপ এই ভাণ্ডারকে দ্রুত কমিয়ে দিতে পারে। অথচ রাশিয়ার থেকে ভারত তেলের দাম মেটানোর জন্য সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর দিরহাম (AED), চীনা ইউয়ান (CNY) এবং ক্ষেত্রবিশেষে ভারতীয় টাকাও ব্যবহার করছে। ২০১২ সাল থেকে ভারত ও ইরান একটি বিশেষ ব্যবস্থা চালু করে তেলের দামের প্রায় ৪৫% ভারতীয় মুদ্রায় আমদানি করত। মোদিজী ‘বিশেষ চুক্তি’ করে সেই সব সুবিধা ট্রাম্প সাহেবের বুটের তলায় সমর্পন করে এসেছেন। ভারতের পরিবহণ ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হলো ডিজেল চালিত ট্রাক এবং ট্রেন। ডিজেলের দাম বাড়লে চাল, ডাল, সবজি, দুধ, ওষুধ — সব কিছুর পরিবহণ খরচ বাড়ে। অর্থাৎ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে আগুন লাগায়। একজন মধ্যবিত্ত নাগরিক হয়তো নিজের মোটরবাইক কম চালাতে পারেন। কিন্তু তিনি কি বাজারে কম দামে চাল কিনতে পারবেন? পারবেন না, কারণ মূল্যস্ফীতি তার নিয়ন্ত্রণে নেই। এখানে সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো — আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও সরকার আবগারি শুল্ক (Excise duty) বাড়িয়ে তেলের দাম দেশে কমতে দেয়নি। সরকার সাধারণ মানুষকে তেল কম ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো — আন্তর্জাতিক বাজারে যখন তেলের দাম কমেছিল, তখন কি সেই সুবিধা জনগণ পেয়েছিল? ২০১৪ সালের পর বিশ্ববাজারে তেলের দামে ঐতিহাসিক পতন আসে। ২০২০ সালে কোভিড মহামারির সময় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম নেমে গিয়েছিল প্রায় ২০-৪০ মার্কিন ডলার প্রতি ব্যারেল। কিন্তু তখনও ভারতের জনগণ কম দামে পেট্রোল-ডিজেল পায়নি। কারণ কেন্দ্রীয় সরকার বারবার আবগারি শুল্ক বাড়িয়ে নিজেদের ভাঁড়ার ভরেছে। পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা শুরুর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ৭০-৭৮ ডলার প্রতি ব্যারেল। কিন্তু তখন ভারতের বাজারে পেট্রোল ছিল ৯৪-১০৫ টাকা প্রতি লিটার এবং ডিজেল ৮৭-৯৫ টাকা প্রতি লিটার। অর্থাৎ ২০১৪ সালের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ কম ছিল, কিন্তু ভারতের সাধারণ মানুষকে পেট্রোল-ডিজেলের জন্য অনেক বেশি টাকা দিতে হয়েছে। ২০১৪ সালে কেন্দ্রীয় আবগারি শুল্ক ছিল পেট্রোলে ৯-১০ টাকা এবং ডিজেল ৩-৪ টাকা প্রতি লিটার। পরবর্তী বছরগুলোতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২০২০-২১ সালে পেট্রোলে প্রায় ৩২-৩৩ টাকা আর ডিজেলে প্রায় ৩১-৩২ টাকা প্রতি লিটার।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার বড় অংশ জনগণের হাতে না গিয়ে সরকারের ভাঁড়ারে গেছে, আর বেশিরভাগটাই গেছে রিলায়েন্সের পকেটে। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার জ্বালানির ওপর কর থেকে প্রায় ৩০ লক্ষ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব সংগ্রহ করেছে। তাহলে এখন জনগণকে ‘কম তেল ব্যবহার’করতে বলা হচ্ছে কেন? এখানেই মূল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্ন। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়তেই সাধারণ মানুষকে বলা হচ্ছে - কম গাড়ি চালান, বাড়ি থেকে কাজ করুন, খরচ কমান, তেল বাঁচান। অর্থাৎ লাভ হলে তা সরকারের, কিন্তু সংকটের দায়ভার জনগণের। সামাজিক প্রভাব ভারতে পেট্রোল-ডিজেল শুধু যানবাহনের জ্বালানি নয়; এটি পুরো অর্থনীতির ‘রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা’। ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষকের সেচ খরচ বাড়ে, ট্রাক ভাড়া বাড়ে, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ে, বাসভাড়া বাড়ে, নির্মাণ খরচ বাড়ে, ছোট ব্যবসার খরচ বাড়ে। অর্থাৎ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার মান কমিয়ে দেয়। এই পরিস্থিতিতে জনগণকে ‘স্বেচ্ছায় কৃচ্ছ্রসাধন’শেখানো আসলে অর্থনৈতিক প্রয়োজনে নয়, সরকারের দায় এড়ানোর প্রচেষ্টা মাত্র। ‘সোনা কিনবেন না’ ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্বর্ণ আমদানিকারক দেশ, প্রতি বছর ৭০০ থেকে ৮০০ টন সোনা আমদানি করে। ফলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়। সরকার তাই সোনা কেনায় নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু ভারতের বাস্তবতায় সোনা শুধুমাত্র বিলাসবস্তু নয়। এটা বহু পরিবারের কাছে ‘শেষ সম্বল’। ভারতের গ্রামীণ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে সোনা হলো ‘অপ্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক নিরাপত্তা’। ব্যাংকে টাকা রাখলে মুদ্রাস্ফীতির কারণে তার প্রকৃত মূল্য কমে যায়। কিন্তু সোনার দাম সাধারণত দীর্ঘমেয়াদে বাড়ে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়েই মানুষ বেশি সোনা কেনে কারণ তারা দেশের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে পারে না। সরকারের প্রতি এই অনাস্থার কারণেই গত ১২ বছরে সোনার দাম প্রায় ১৮০ থেকে ১৯০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদের (World Gold Council) তথ্য অনুযায়ী, ভারতে প্রায় ২৫ হাজার টনেরও বেশি সোনা ব্যক্তিগত হাতে রয়েছে। এই সোনা বহু পরিবারকে চিকিৎসা, বিয়ে, ফসল নষ্ট হওয়া বা চাকরি হারানোর সময়ে বাঁচিয়েছে। প্রশ্ন হলো — যদি সরকার চায় মানুষ সোনা না কিনুক, তাহলে বিকল্প নিরাপত্তা কী? ব্যাংকে জমানো টাকায় সুদের হার কমছে, শেয়ার বাজার অস্থির, কর্মসংস্থান অনিশ্চিত — তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? অর্থাৎ ‘সোনা কিনবেন না’বলা মানে শুধু আমদানি কমানোর আহ্বান নয়; এটি মানুষের আর্থিক আত্মরক্ষার একটি দীর্ঘ লালিত পদ্ধতিকেও দুর্বল করার প্রচেষ্টা। কৃষিতে ‘প্রাকৃতিক চাষ’ ভারত প্রতি বছর প্রায় ১.৫ থেকে ২ লক্ষ কোটি টাকা ভর্তুকি সারে দেয়। রাসায়নিক সারের কাঁচামালের একটি বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি হয়। এর বড় কারণ বিগত তিন দশক ধরেই দেশের সার কারখানাগুলো বন্ধ করে আমদানী নির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে সরকার চায় সারের ব্যবহার কমুক। কিন্তু ‘৫০ শতাংশ সার কমিয়ে প্রাকৃতিক চাষে ফিরুন’— এই ধরনের বক্তব্য কি আদৌ বাস্তবসম্মত! ভারত পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম খাদ্য উৎপাদক দেশ। প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে উচ্চ ফলন অত্যন্ত জরুরি। সবুজ বিপ্লবের পর রাসায়নিক সার ও সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমেই ভারতের খাদ্য উৎপাদন বহুগুণ বেড়েছে। শ্রীলঙ্কার উদাহরণ এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ২০২১ সালে শ্রীলঙ্কা হঠাৎ রাসায়নিক সার নিষিদ্ধ করে সম্পূর্ণ জৈব চাষে যাওয়ার চেষ্টা করে। ফলাফল ভয়াবহ হয়। ধান উৎপাদন তীব্রভাবে কমে যায়, খাদ্য আমদানি বাড়ে, মূল্যস্ফীতি বিস্ফোরিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট তীব্র হয়ে ওঠে। ভারতের মতো দেশে যদি খাদ্য উৎপাদন এমনকি ২০-২৫ শতাংশও কমে যায়, তাহলে চাল-গম-ডাল-সব্জির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রবল রাজনৈতিক অস্থিরতাও তৈরি করতে পারে। অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি কৃষিতে জৈব সার ব্যবহার দরকার। রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার মাটি ও পরিবেশের ক্ষতি করে। কিন্তু ধাপে ধাপে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ছাড়া ‘প্রাকৃতিক চাষ’চাপিয়ে দেওয়া হবে বিপজ্জনক। খরচ কমান - আত্মঘাতী প্রবণতা অর্থনীতির একটি মৌলিক সত্য হলো — ‘একজনের খরচ অন্যজনের আয়’। কেউ যখন দোকান থেকে জামা কিনছেন, তখন একজন কারখানার শ্রমিকের মজুরি নিশ্চিত হচ্ছে। কেউ যখন রেস্টুরেন্টে খাচ্ছেন, তখন একজন রাঁধুনি বা ওয়েটারের চাকরি টিকে থাকছে। কেউ যখন ভ্রমণ করছেন, তখন পর্যটন শিল্প সচল থাকছে। এ কারণেই অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইন্স ‘Paradox of Thrift’-এর ধারণা দিয়েছিলেন। সবাই যদি একসাথে সঞ্চয় বাড়াতে ও খরচ কমাতে শুরু করে, তাহলে বাজারে চাহিদা কমে যায়। চাহিদা কমলে উৎপাদন কমে, উৎপাদন কমলে চাকরি কমে, আর চাকরি কমলে অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়। ভারতে ইতিমধ্যেই বেকারত্ব একটি বড় সমস্যা। সিএমআইই (CMIE)-এর তথ্য অনুযায়ী বেকারত্ব ২০ শতাংশের ওপরে। শহুরে মধ্যবিত্তের প্রকৃত আয়ও বাড়ছে না। এই পরিস্থিতিতে যদি সরকার নিজেই জনগণকে খরচ কমাতে বলে, তাহলে বাজারে চাহিদা আরও সংকুচিত হবে। এটি বিশেষভাবে ক্ষতিকর ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার জন্য। ভারতের প্রায় ১১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান এই ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত। চাহিদা কমে গেলে সবচেয়ে আগে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ছোট দোকানদার, ক্ষুদ্র কারখানা, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিকরা। ‘ভোকাল ফর লোকাল’ ‘ভোকাল ফর লোকাল’ স্লোগান শুনতে ভালো, কিন্তু আজকের বিশ্ব অর্থনীতি জটিল বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের ব্যবহৃত ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ স্মার্টফোনের চিপ তাইওয়ান থেকে আসে, ডিসপ্লে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আসে, অধিকাংশ যন্ত্রাংশ চীন থেকে আসে, ব্যাটারির কাঁচামাল আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকা থেকে আসে। এমনই ‘আত্মনির্ভরতা’ মোদিজীর ভারতের! ভারত যদি আমদানি কমাতে অতিরিক্ত সুরক্ষাবাদী নীতি নেয়, তাহলে অন্য দেশও ভারতের পণ্যের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে। এতে ভারতের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বর্তমানে ভারতের আইটি পরিষেবা, ওষুধ, বস্ত্র ও ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য রপ্তানির ওপর কোটি কোটি মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি যে ‘বিশেষ চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছেন, সেটা তো সম্পূর্ণ ভাবেই এই বক্তব্যের বিরোধী। দায়ভার শুধু জনগণের কেন? যদি আজ এত বড় সংকট তৈরি হয়ে থাকে, তবে গত এক দশকে বিকল্প জ্বালানি, গণপরিবহণ, শক্তি দক্ষতা (Energy efficiency) ও স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কেন নেওয়া হয়নি? ভারত ইথানল ব্লেন্ডিং, সৌরশক্তি ও গ্রিন হাইড্রোজেন নিয়ে কথা বলেছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে অগ্রগতি এখনও সীমিত। শহরগুলোতে নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন ব্যবস্থা এখনও অপর্যাপ্ত। রেলপথ ও গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত হলে ব্যক্তিগত জ্বালানির ব্যবহার অনেক কমানো যেত। কিন্তু সেটা না করে উলটে সরকারি বাস-ট্রেন সব বেসরকারি এবং ব্যয়বহুল করা হচ্ছে। অন্যদিকে কর্পোরেট কর কমানো, নিজের ব্যয়বহুল জীবনযাত্রা এবং বিপুল খরচ করে থেকে বিশ্বগুরু হওয়ার বাসনায় পৃথিবী ভ্রমণ, রাজনৈতিক প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয় — এসব নিয়ে কখনও ‘কৃচ্ছ্রসাধন’-এর কথা তো মোদিজী বলেন না! কিন্তু সংকট এলেই বলা হয় সাধারণ মানুষ খরচ কমান, কম ভ্রমণ করুন, কম কিনুন। অথচ ২০১৫ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরে সরকারি কোষাগার থেকে মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৭৬২ কোটি টাকা। এটি আসলে ‘অর্থনৈতিক দেশপ্রেম’-এর নামে সংকটের বোঝা জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। কৃচ্ছ্রসাধন নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার স্বল্পমেয়াদে কিছু ডলার বাঁচাতে জনগণকে খরচ কমাতে বলা হয়তো প্রশাসনিকভাবে সহজ। কিন্তু এটি কোনো অর্থনৈতিক সমাধান নয়। একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে ওঠে — স্বনির্ভর ও শক্তিশালী উৎপাদন ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, নির্ভরযোগ্য গণপরিবহণ, শক্তি বৈচিত্র্য, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, নীতিগত স্বচ্ছতা ইত্যাদি গড়ে তোলার মাধ্যমে। নাগরিকদের ক্রমাগত ত্যাগ স্বীকার করতে বলা, আবার একই সঙ্গে কর্পোরেট মুনাফা, বৈষম্য ও নীতিগত ব্যর্থতাকে ধামাচাপা দিয়ে রাখা — এটি কোনো টেকসই অর্থনৈতিক মডেল হতে পারে না। সবশেষে, প্রশ্নটি অর্থনৈতিক যতটা, রাজনৈতিকও ততটাই। সরকারের কাজ কী? জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা, নাকি ক্রমাগত কমে যাওয়া জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখানো? প্রকাশের তারিখ: ১৩-মে-২০২৬ |
||||||||||||
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|