|
লেনিন— বিপ্লবী সংগ্রামের ধারাতেই সৃষ্টি করলেন ‘বস্তুবাদ ও প্রত্যক্ষ-বিচারবাদ’Sridip Bhattacharya |
তৃতীয় আন্তর্জাতিকের ভূমিকা কে অস্বীকার করতে পারে? |
|
শ্রীদীপ ভট্টাচার্য
এবছর কমরেড লেনিনের ১৫৬তম জন্মদিবস। একইসাথে কমরেড লেনিনের শততম মৃত্যুবার্ষিকীও সম্পন্ন হচ্ছে এই বছর অর্থাৎ ২০২৪ থেকে ২০২৫ সাল। কমরেড ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন এমন একটি নাম যা বিগত প্রায় ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে বিশ্বের সমস্ত দেশের সমাজবিপ্লবীদের অনুরণিত, অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করে চলেছে।
রুশ দেশের মাটিতে শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবী পার্টি অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টি (বলশেভিক পার্টি) গড়ে তোলা, মার্কসবাদ বিরোধী সমস্ত মতাদর্শ ও প্রবণতাগুলিকে পরাস্ত ও কোণঠাসা করা, রুশ দেশের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মার্কসবাদের প্রয়োগের মাধ্যমে নভেম্বর বিপ্লবের সফল রূপায়ণ এই সমস্ত কিছুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে কমরেড লেনিনের নাম। শুধু কি তাই, নভেম্বর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন গড়ে ওঠার পর বিশ্বজুড়ে কমিউনিস্ট আন্দোলনকে সংগঠিত ও প্রসারিত করার লক্ষ্যে ‘তৃতীয় আন্তর্জাতিক’গড়ে তোলার ঐতিহাসিক কাজে কমরেড লেনিনই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। ভারতের মতো দেশগুলিতেও মার্কসীয় মতবাদের প্রসার ঘটানো ও কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তৃতীয় আন্তর্জাতিকের ভূমিকা কে অস্বীকার করতে পারে?
![]()
অতুলনীয় সংগঠক ও মার্কসবাদী তাত্ত্বিক
শ্রমিকশ্রেণির নিজস্ব সংগঠন কমিউনিস্ট পার্টি ব্যতিরেকে পুঁজিবাদের অবসান ঘটিয়ে শোষণহীন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে মানব সমাজকে সাম্যবাদের দিকে অগ্রসর করা সম্ভব নয়। সেই কমিউনিস্ট পার্টি সংগঠন সম্পর্কিত ধারণাকে সমৃদ্ধতর করলেন লেনিন। কমিউনিস্ট পার্টি সংগঠন ও তার বৈজ্ঞানিক প্রণালীকে সূত্রবদ্ধ করে তিনি উপস্থিত করলেন। রুশ কমিউনিস্ট পার্টিকে নভেম্বর বিপ্লবের লক্ষ্যে পরিচালনা লেনিনই করলেন। সমগ্র বিশ্বের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে সংগঠনের গুরুত্ব ও রূপ সম্পর্কে শিক্ষিত করেছিলেন তিনি। রুশ কমিউনিস্ট পার্টি অর্থাৎ বলশেভিক পার্টিই ছিল বিশ্বের প্রথম সর্বহারার বিপ্লব অর্থাৎ নভেম্বর বিপ্লব সফল করার মূল হাতিয়ার।
মহান বিপ্লবী নেতা ও অতুলনীয় সংগঠক হওয়ার সাথে সাথে ভ্লাদিমির ছিলেন অতি উচ্চমানের দার্শনিক ও তাত্ত্বিক নেতা। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য মহান বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানের ইতিহাসকার স্যার জন ডেসমন্ড বার্নালের বক্তব্য— ‘লেনিন যদি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে অন্যতম নাও হতেন, তাহলেও নিছক অর্থনীতি ও দর্শনের ক্ষেত্রে তাঁর বুদ্ধিবিদ্যার গৌরব অবশ্যই স্বীকৃত হতো।’’
মার্কসীয় দর্শনে লেনিনের অবদান
কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী দর্শন (মার্কসীয় দর্শন) প্রতিষ্ঠা করলেন। বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও দ্বান্দ্বিক (Dialectical) পদ্ধতির সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠিত হলো এই দর্শন। মার্কস ও এঙ্গেলস যখন দর্শনের ক্ষেত্রে সংগ্রাম করছিলেন সেই সময়ে বস্তুবাদী দর্শনের যথেষ্ট শক্তিশালী অস্তিত্ব ছিল। বস্তুবাদকে চ্যালেঞ্জ করার শক্তি অর্থাৎ ভাববাদী দর্শন যথেষ্ট দুর্বল ছিল। সেইজন্য মার্কস-এঙ্গেলসকে বস্তুবাদের স্বপক্ষে খুব বেশি সংগ্রাম করার প্রয়োজন হয়নি। তবে বস্তুবাদকে স্থূল রূপ থেকে মুক্ত করার দায়িত্ব তাদের পালন করতে হয়েছিল। যান্ত্রিক বস্তুবাদ, অধিবিদ্যক (Metaphysical) বস্তুবাদী রূপের থেকে মুক্ত করে বস্তুবাদকে দ্বান্দ্বিকতার সাথে যুক্ত করার জন্য কঠিন সংগ্রাম তাদের করতে হয়েছিল। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী দর্শন তাঁরা প্রতিষ্ঠা করলেন। এটা ছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগের ঘটনা।
দ্বন্দ্বমূলক বস্তবাদের স্বপক্ষে এক ভিন্নতর পরিস্থিতিতে লেনিনকে দর্শনের ক্ষেত্রে সংগ্রাম করতে হয়েছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশক থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্ত সময়ে প্রকৃতি বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার সম্ভব হয়। এই আবিষ্কারগুলির বিকৃত ব্যাখ্যা বস্তুবাদী দর্শনকে অর্থাৎ বস্তুর মুখ্যতাকে (Primacy of matter) নস্যাৎ করে চেতনার মুখ্যতা অর্থাৎ ভাববাদী দর্শনকে (চেতনাই মুখ্য, চেতনার ইচ্ছা অনুসারে বস্তু গড়ে উঠেছে) তুলে ধরার এক শক্তিশালী প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। বস্তুবাদকে নস্যাৎ করার প্রবল শক্তিশালী প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। এই সময়ে বস্তুবাদী দর্শনকে নস্যাৎ করার লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি দর্শন গ্রন্থও প্রকাশিত হয়। বস্তুবাদকে নস্যাৎ করতে পারলে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী দর্শন অর্থাৎ শ্রমিকশ্রেণির দর্শনের ভিতও দুর্বল করে দেওয়া সম্ভব হবে, এই শ্রেণিগত ভাবনার ভিত্তিতেই আক্রমণ পরিচালিত হয়েছিল।
মার্কসীয় দর্শনই হলো দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ— একথা পূর্বেই বলা হয়েছে। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদকে রক্ষা করার দায়িত্ব পালনে এগিয়ে এলেন কমরেড লেনিন। ১৯০৯ সালে প্রকাশিত হলো ‘বস্তুবাদ ও প্রত্যক্ষ বিচারবাদ’ (‘মেটেরিয়ালিজম অ্যান্ড এমিলরিও ক্রিটিসিজম’) নামক গ্রন্থ। একটি বিষয় উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে যে, সর্বহারার বিপ্লব ও বিপ্লবী সংগঠন সম্পর্কে চরম ব্যস্ততার মধ্যেও সময় বার করে তৎকালীন সময়ের অসংখ্য দর্শন ও প্রকৃতি বিজ্ঞানের গ্রন্থ তিনি অনুশীলন করেছিলেন। তত্ত্ব ও কর্মের সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে যে একজন প্রকৃত মার্কসবাদী গড়ে ওঠে, তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন কমরেড লেনিন।
‘বস্তুবাদ ও প্রত্যক্ষ বিচারবাদ’গ্রন্থটি লেনিনের শ্রেষ্ঠ দর্শন সম্পর্কিত রচনা। ‘প্রত্যক্ষ বিচারবাদ’ (এম্পিরিও ক্রিটিসিজম) একটি দার্শনিক মত। এই দার্শনিক মতটি বস্তুবাদকে নস্যাৎ করছিল। প্রকৃতি বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে বিকৃতভাবে উপস্থিত করে এই কাজ করা হয়েছিল। নতুন রূপে ভাববাদকে তুলে ধরছিল।
অস্ট্রিয়ার পদার্থ বিজ্ঞানী ও দার্শনিক আর্নস্ট মাখ (Mach) ছিলেন প্রত্যক্ষ বিচারবাদী ধারার অন্যতম দার্শনিক। মাখের দার্শনিক সহযোগী ছিলেন এক জার্মান দার্শনিক রিচার্ড আভেনারিউস (Avenarius)।
‘বস্তুবাদ ও প্রত্যক্ষ বিচারবাদ’গ্রন্থটি রুশ ভাষায় রচিত হয়েছিল। ইংরেজি তর্জমায় ৩৫০ পৃষ্ঠার পুস্তকটি প্রকাশিত হয়। লেনিন দেখান, মাখ ও তার অনুসারীরা ‘পজিটিভিজম’বা ‘দৃষ্টবাদ’-এর প্রসার ঘটাতে উদগ্রীব। প্লেটো ও বার্কলির ভাববাদে প্রত্যক্ষ বিচারবাদের প্রত্যাবর্তন ঘটবে — লেনিন এটাও দেখালেন। স্মরণে রাখা প্রয়োজন, বুদ্ধি তথা প্রতিভার ঐশ্বর্য প্রকাশের জন্য এই পুস্তকটি রচিত হয়নি। রুশ দেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে ভয়ঙ্কর বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে এই পুস্তকটি লেনিন রচনা করেন। ‘প্রত্যক্ষ বিচারবাদ’বা ‘পজিটিভিজম’-এর মধ্যে অভিনবত্ব কিছু ছিল না। এটা ছিল ভাববাদী দর্শন। তবে প্রচ্ছন্ন ভাববাদ।
এই গ্রন্থে লেনিন দেখালেন, বিশপ বার্কলে, ভেভিড হিউম, জে জি ফিক্তে এই সমস্ত ভাববাদী দার্শনিকদের অনুসরণ করে মাখও একই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চান। পার্থক্য হলো নতুন ধরনের পরিভাষার বিন্যাস। মাখের ভাববাদ হলো আত্মকেন্দ্রিক ভাববাদ (Subjective Idealism)। মাখের দার্শনিক মত হলো ‘‘সংবেদন (Sensation) অতিরিক্ত বা সংবেদনের অন্তরালে বর্তমানে অজ্ঞাত কোন বস্তুর অস্তিত্ব মানবার প্রশ্ন ওঠে না।” মাখের দার্শনিক মত অর্থাৎ পজিটিভিজম-এর ব্যাপক প্রভাব যখন বিশ্বের দার্শনিক মহলে, তখন লেনিনই এই গ্রন্থে দেখালেন মাখের পজিটিভিজম পুরানো কালের ভাববাদ ছাড়া কিছু নয়।
এই গ্রন্থে লেনিন মহান দার্শনিক হেগেলের সঠিক মূল্যায়ন করেছেন। মার্কস-এঙ্গেলসকে অনুসরণ করেই তিনি একাজ করেছেন। হেগেলের দ্বন্দ্বতত্ত্ব বা ডায়ালেকটিক্স ভাববাদী চিন্তার সাধারণ কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ থাকলেও ‘দ্বন্দ্বতত্ত্ব’হলো জার্মান দর্শনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি। দ্বন্দ্বতত্ত্বর সাথে ভাববাদী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গতি হয় না— লেনিন এই গ্রন্থে একথা দৃঢ়তার সাথে তুলে ধরলেন।
‘বস্তুবাদ ও প্রত্যক্ষ বিচারবাদ’গ্রন্থটি বস্তুবাদ ও ভাববাদের পুরাতন বিতর্কের মধ্য দিয়ে বস্তুবাদকে প্রতিষ্ঠা করার দলিল। তৎকালীন সময়ে দর্শনের ক্ষেত্রে এটাই ছিল মূল বিতর্ক। এখানে লেনিন দেখালেন, দার্শনিক ফিক্তের পরিভাষায়, ‘আত্মা থেকেই অনাত্মার উৎপত্তি’, আভেনারিউসের পরিভাষায়, ‘আত্মার সঙ্গে পারিপাশ্বিকের অবিচ্ছেদ্য সহযোগিতা’, এইগুলি আসলে একই কথা। একই পুরানো আবর্জনার কিছুটা মেরামত করা নতুন রং চড়ানো সাইনবোর্ড মাত্র। এই গ্রন্থে লেনিন উল্লেখ করেছেন, ‘‘এরা (ভাববাদীরা) ঘোষণা করেন যে ইতিপূর্বে হাজারবার বস্তুবাদের খণ্ডন সমাধা হয়েছে। তবুও কিন্তু এরা হাজার এক দফায় বস্তুবাদ খণ্ডন চালিয়ে যেতে চান।’’
বস্তুবাদ বনাম ভাববাদের মৌলিক সমস্যাটি নিয়ে আলোচনায় লেনিন যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন তাহলো, বিজ্ঞানের অত্যন্ত প্রাথমিক কয়েকটি সিদ্ধান্তের নজির থেকেই ভাববাদের দেউলিয়াপনা এবং বস্তুবাদের যাথার্থ প্রমাণিত হয়।
দার্শনিক ভাববাদকে যতরকম অভিনব কৌশলেই পেশ করবার চেষ্টা চলুক না কেন, তার মূল কথা হলো চেতনা— কারণবাদ। আত্মা, মন, ধারণা, সংবেদন, ‘এলিমেন্ট’প্রভৃতি নানা নামে প্রচারিত চৈতন্যমাত্রই ভাববাদীর মতে পরম সত্য। সাধারণ মানুষ যাকে বস্তুজগৎ বা প্রকৃতি বলে মনে করে আসলে তা চৈতন্য-নির্ভর— ভাববাদীদের এটাই বক্তব্য।
কোন মতটা ঠিক? এই প্রশ্নের বিচারে লেনিন দুটি অত্যন্ত সহজ ও সরল প্রশ্ন তুলেছেন। এক, মানুষের আগে কি প্রকৃতি বলে কিছু ছিল? দুই, মানুষ কি মস্তিষ্কের সাহায্যে চিন্তা করে? আধুনিক বিজ্ঞানের সাহায্যে আমরা জেনেছি, বিশ্বে কোটি কোটি বছর ধরে বিকাশের ধারায় প্রাণের আবির্ভাব ঘটেছে, প্রাণের বিবর্তনের ধারায় মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে। চৈতন্য আগে ও পৃথিবী পরে— ভাববাদের এই মূল দাবি স্বীকৃতি পায় না। বস্তুই প্রাথমিক এবং চিন্তা চেতনা বা সংবেদন আসলে উন্নত পর্যায়ের পরিণাম মাত্র। এটাই তো বস্তুবাদী জ্ঞানতত্ত্বের কথা এবং প্রকৃতি বিজ্ঞানে এই কথারই সহজাত সমর্থন। বিজ্ঞান সহজাতভাবেই বস্তুবাদকে গ্রহণ করে। মস্তিষ্ক তো বস্তুরই একটা রূপ। তাহলে চেতনাই বস্তুর উপর নির্ভরশীল।
‘বস্তুবাদ ও প্রত্যক্ষ বিচারবাদ’গ্রন্থে ৬টি পরিচ্ছেদ। প্রথম ৩টি পরিচ্ছেদে প্রত্যক্ষ বিচারবাদ ও বস্তুবাদের জ্ঞানতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। চতুর্থ পরিচ্ছেদে প্রকৃতি বিজ্ঞান ও দার্শনিক ভাববাদীদের নিয়ে আলোচনা। পঞ্চম পরিচ্ছেদে প্রকৃতি বিজ্ঞানে সাম্প্রতিক বিপ্লব ও দার্শনিক ভাববাদী নিয়ে আলোচনা। ষষ্ঠ পরিচ্ছেদে, প্রত্যক্ষ বিচারবাদ ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ নিয়ে আলোচনা।
এই গ্রন্থে ‘জ্ঞান’-এর উৎস প্রসঙ্গ তথা জ্ঞানতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন লেনিন। বস্তুবাদী জ্ঞানতত্ত্বর সঠিকতা জোরের সাথে উপস্থিত করেছেন। বস্তু ব্যতিরেকে কোন ওসংবেদন সম্ভব নয়।
সাধারণের মধ্যে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস প্রবল হলে তাদের তাঁবে রাখার কাজটা তুলনায় সহজ হয় এবং ধর্মবিশ্বাসকে বাঁচিয়ে রাখার প্রধান শর্ত হলো অভিজ্ঞতালব্ধ বাস্তব জগতের অস্তিত্ব বিলোপ। এই কারণে কায়েমি স্বার্থের পক্ষ থেকে বস্তুবাদী দর্শনের বিরুদ্ধে প্রবল অভিযান চালানো হয়।
বস্তুবাদ ও প্রত্যক্ষ বিচারবাদ গ্রন্থের আসল উদ্দেশ্য
লেনিনের বিচারে ভাববাদী দর্শনের নব্য সংস্করণটি অর্থাৎ ‘প্রত্যক্ষ-বিচারবাদ’ যে উদ্দেশ্য সাধনের বিশেষ উপযোগী তাহলো, সংস্কারমুক্ত শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রাম প্রতিরোধে ধর্মবিশ্বাসের পুনরুজ্জীবন। এই সত্যটি তুলে ধরল বস্তুবাদ ও প্রত্যক্ষ বিচারবাদ।
ভাববাদের মুখোশটি খুলে দিয়ে তার প্রকৃত সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকাটি অনাবৃত করা তথা ভাববাদী দর্শনের অন্তঃসারশূন্যতা তুলে ধরা, এটাও এই গ্রন্থ তুলে ধরল।
দু’হাজার বছর আগেকার মতো সাম্প্রতিক দর্শন ও সমান শ্রেণিস্বার্থপ্রণোদিত। একদিকে বস্তুবাদ শোষিত শ্রেণির দর্শন, অপরদিকে ভাববাদ, শোষকশ্রেণির দর্শন।
ফিডিজম (Fideism) অর্থাৎ বিশ্বাসবাদ ভাববাদের এক সূক্ষ্ম রূপ। বিশ্বাসবাদকে পুনর্সজ্জিত করে জনগণের উপর অবিচল প্রভাব বিস্তারের আয়োজন চতুর্দিকে। প্রত্যক্ষ-বিচারবাদ বিশ্বাসবাদীদের বস্তুবাদের তথা ঐতিহাসিক বস্তুবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে শামিল করতে চায়।
‘বস্তুবাদ ও প্রত্যক্ষ বিচারবাদ’গ্রন্থের মধ্য দিয়ে আপাত-অভিনব রূপে ভাববাদী দর্শন ধর্মবিশ্বাসকে ব্যবহার করে নতুনতরভাবে প্রচারের যে কৌশল গ্রহণ করেছে, তা তুলে ধরা হলো। এই মুহুর্তে আমাদের ভারতের বুকেও এই কৌশল আমরা প্রত্যক্ষ করছি।
লেনিনের ‘বস্তুবাদ ও প্রত্যক্ষ বিচারবাদ’গ্রন্থ আজও বিশ্বের সর্বহারা বিপ্লবী সংগ্রামের এক শক্তিশালী মতাদর্শগত হাতিয়ার।
সুত্রঃ গনশক্তি পত্রিকা, ২২ এপ্রিল-২০২৫
ব্যবহৃত ছবিঃ সোশ্যাল মিডিয়া সুত্রে সংগৃহীত প্রকাশের তারিখ: ২২-এপ্রিল-২০২৫ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|