|
কাজী নজরুল: সম্প্রীতির সুরসাধক ও ঐক্য-তূর্যDr. Nurul Islam |
কবি নজরুল শুধু বাঙালির কবি নন, তিনি সমগ্র ভারতবাসী তথা বিশ্ববাসীর। নজরুল বক্তব্যে বলেন, 'আমি এই দেশে এই সমাজে জন্মেছি বলেই শুধু এই দেশেরই এই সমাজেরই নই, আমি সকল দেশের, সকল মানুষের।' |
"কেউ বলেন আমার বাণী যবন, কেউ বলেন কাফের। আমি বলি ও দুটোর কিছুই নয়। আমি মাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।" সাম্যবাদী, সম্প্রীতি-সমন্বয়কামী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৯ সালে ১৫ ডিসেম্বর কলকাতার এলবার্ট হলে (বর্তমান কফি হাউস) হিন্দু-মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে সম্বর্ধনা গ্রহণকালে এই উক্তিটি করেন। তাঁর এই উক্তির প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল হিন্দু মুসলমানের মধ্যে ভেদাভেদ হিংসা বিদ্বেষ দূর করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাতাবরণ গড়ে তোলা। এই সংবর্ধনা সভায় সভাপতিত্ব করেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। তিনি বলেন, 'নজরুল ইসলাম শুধু মুসলমানের কবি নন, তিনি বাংলার কবি, বাঙালির কবি।' এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত সুভাষচন্দ্র বসু শুভেচ্ছা ভাষণে নজরুলের স্বপ্নকে সমগ্র বাঙালি জাতির স্বপ্ন বলে ঘোষণা করেন। অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি এস ওয়াজেদ আলী তাঁর পঠিত অভিনন্দন পত্রে বলেন, 'তুমি বাঙালির ক্ষীণকন্ঠে তেজ দিয়েছো। মূর্ছাতুর প্রাণে অমৃতধারা সিঞ্চন করিয়াছো।' কবি নজরুল শুধু বাঙালির কবি নন, তিনি সমগ্র ভারতবাসী তথা বিশ্ববাসীর। নজরুল বক্তব্যে বলেন, 'আমি এই দেশে এই সমাজে জন্মেছি বলেই শুধু এই দেশেরই এই সমাজেরই নই, আমি সকল দেশের, সকল মানুষের।' কবিতা, গান, প্রবন্ধ সাহিত্যেই নয়, কাজী নজরুল ইসলামের অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষতার মূল্যবোধ, রীতিনীতির পরিচয় মেলে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও। হিন্দু বাড়ির কন্যা আশালতা সেনগুপ্তের সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন তিনি, পরে আশলতা সেনগুপ্তের তিনি নাম দেন প্রমিলা। কোনোদিন প্রমিলা সেনগুপ্তকে ধর্মান্তরিত হতে হয়নি বা ইসলাম ধর্মের রীতিনীতি পালন করতে হয়নি। কাজী নজরুল এবং ইসলাম প্রমীলা সেনগুপ্তের চার সন্তান। তাঁদের নামকরণের মধ্যেও হিন্দু মুসলিম ঐতিহ্যের মিলন ভাবনার পরিচয় মিলে। যেমন কৃষ্ণ মোহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ, কাজী সব্যসাচী ইসলাম ও কাজী অনিরুদ্ধ ইসলাম। ধর্মনিরপেক্ষতার এই অমলিন ভাবমূর্তি আজও কাজী নজরুল ইসলামের পরিবারে বহমান। জাতি ধর্মের পারস্পরিক সম্প্রীতি নজরুল সাহিত্য সংস্কৃতি ভাবনার উজ্জ্বল আলোক শিখা। তিনি এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখতেন যেখানে মানুষের বড় পরিচয় হবে ‘মানুষ’। মানুষের মধ্যে কৃত্রিম ভেদাভেদকে দূরে সরিয়ে কবি মানবতার জয়গান গেয়ে বলেন, "গাহি সাম্যের গান -/ যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান, / যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান। ... একদল বলছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হিন্দুর কবি আর নজরুল ইসলাম মুসলমানের কবি। এ দুনিয়া একসঙ্গে অনুষ্ঠান করা জাতীয়তা বিরোধী, ঐতিহ্য বিরোধী । মানুষের কানে এই যে বিষ ঢালা শুরু হয়েছে এর থেকে আমরা কেউই রক্ষা পাবো না। দুই বাংলারই প্রাণের মানুষ চোখের মণি রবীন্দ্রনাথ নজরুল উভয়ই। নজরুল ঘন্টা পর ঘন্টা রবীন্দ্র সংগীত গেয়ে যেতে পারতেন। তাই বন্ধু মুজাফফর আহমেদ কাকাবাবু নজরুলকে বলতেন রবীন্দ্রসঙ্গীতের 'হাফেজ' অর্থাৎ সমগ্র রবীন্দ্র সংগীত আয়ত্ত। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে ডিসেম্বর (১৩২৮সন,পৌষ) মাসে বোলপুর শান্তিনিকেতনে। এই সাক্ষাৎ নজরুলকে যেমন মুগ্ধ অভিভূত করে তেমনি ৩৮ বছরের ছোট নজরুলের প্রতি কবিগুরুর গভীর স্নেহ ভালোবাসা ও তাকে নানান ভাবে উদ্দীপ্ত উৎফুল্ল করে। দুজনে দুজনকে 'জী' বলে ডাকতেন। রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে বলতেন 'কাজী' আর নজরুল কবিগুরুকে সম্বোধন করতেন 'গুরুজি' বলে। ৭ জানুয়ারি ১৯২২ নজরুলের কালজয়ী অমর সৃষ্টি 'বিদ্রোহী' কবিতা প্রকাশ পায় 'বিজলী' পত্রিকায়। আবেগ আপ্লুত হয়ে পরদিন সকালে নজরুল হাজির হন সেই পত্রিকা নিয়ে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে। কবিগুরু তখন দোতালায়, পরম আবেগে 'গুরুজী গুরুজী' বলে উচ্চ স্বরে ডাকতে থাকেন নজরুল। কবিগুরু সস্নেহে নজরুলকে ডেকে বসালেন তার দোলতলার ঘরে। গভীর আগ্রহ নিয়ে শুনলেন নজরুলের কন্ঠে সদ্য প্রকাশিত সেই 'বিদ্রোহী' কবিতা। মুগ্ধ হয়ে গেলেন কবিগুরু এবং বললেন, ১৩২৯,১০ ফাল্গুন (১৯২৩ খ্রি) কবিগুরু 'বসন্ত' নাটক উৎসর্গ করলেন স্নেহভাজন নজরুলকে। গুঞ্জন শুরু হল নিজেদের মধ্যে, এর আগে রবীন্দ্রনাথ বাইরের কাউকে কোন বই উৎসর্গ করেননি। কেউ কেউ বলে ফেললেন নজরুল হুজুগের কবি, সুযোগ মিটে গেলে তাঁর লেখার কোন মর্যাদা থাকবে না। রবীন্দ্রনাথ সমস্ত গুঞ্জন বন্ধ করতে বললেন, " যুগের মনকে যা প্রতিফলিত করে তা শুধু কাব্য নয়, মহাকাব্য। আমি যদি আজ তরুণ হতাম আমার কলমেও ওই সুর বাজতো।" নজরুল 'লাঙ্গল' পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ করলেন। প্রচ্ছদপটে লেখার জন্য অনুরোধ জানালেন কবিগুরুকে। তিনি লেখেন, সাহিত্য সঙ্গীত যে অত্যাচারী শোষক নিপীড়কের গায়ে চরম আঘাত হানতে পারে চাবুকের মতো, তার অসংখ্য নিদর্শন যুগেযুগে কালে কালে ইতিহাসের পাতায় নানা লেখকের নানা কবিতা গানে নাটকে আছে। ১৯২২ সাল ২৬ সেপ্টেম্বর 'ধূমকেতু' পত্রিকায় প্রকাশিত হয় স্বদেশপ্রেম মূলক 'আনন্দময়ীর আগমনী' কবিতা। তার জন্য ব্রিটিশ সরকার নজরুলকে এক বছরের কারাদণ্ড দেন এবং সমস্ত পত্রিকা বাজেয়াপ্ত করা হয়। পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে মুজাফফর আহমেদ ও আব্দুল হালিমকেও চরম হেনস্তার শিকার হতে হয়। ধুমকেতুর প্রকাশক মুদ্রক আফজালুল হক বন্দী হন। কয়েকদিন প্রেসিডেন্সি জেলে হাজতবাস হয় তাঁর। নজরুলকে প্রথমে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে, তারপর ১৪ এপ্রিল ১৯২৩ তাঁকে স্থানান্তর করা হয় হুগলি জেলে।বন্দীদের উপর জেল সুপারের নিপীড়নের বিরুদ্ধে নজরুল অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। অনশন ভঙ্গ করার জন্য চিত্তরঞ্জন দাস,শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়সহ অনেকেই তাঁকে অনুরোধ করেন। সব চেষ্টা ব্যর্থ হবার পর তাঁরা অনুরোধ জানান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। তিনি বলেন, 'আদর্শবাদীকে আদর্শ ত্যাগ করতে বলা তার মৃত্যুসম। অনশনে যদি তাঁর মৃত্যু ঘটে, তবে তাঁর অন্তরের সত্য বিজয়ী হবে।' শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলং থেকে নজরুলকে টেলিগ্রাম করলেন, একবার এক পত্রিকার সম্পাদক নজরুলের কাছে লেখা নিতে আসেন। সেই সময় নজরুল ব্যস্ত ছিলেন গানের রিহার্সালে। । নজরুলের অন্ধ তোষামুদি করতে গিয়ে পত্রিকা সম্পাদক রবীন্দ্রসংগীত সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করে ফেলেন। নজরুল তখন চরম ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, "আমরা যদি কেউ না জন্মাতাম,কিছু ক্ষতি হতো না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গান,কবিতা বেদ মন্ত্র। লেখা নিতে এসেছেন নিয়ে যান, কিন্তু দয়া করে আর কোনোদিন আমড়াগাছি করবেন না।" 'গোরা' উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ন ঘটে ১৯৩৮ সালে এবং তা মুক্তি পায় সেই বছর ৩০ জুলাই। পরিচালক নরেশচন্দ্র মিত্র সংগীত পরিচালক রূপে বেছে নেন নজরুল ইসলামকে। রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর নিয়ে অভিযোগ তোলেন বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ, ফলে চলচ্চিত্রের মুক্তি লাভে বাধা পড়ে। রবীন্দ্রনাথ তখন শান্তিনিকেতনে। নজরুল প্রজেক্টর,ফিল্ম এবং পরিচালককে সঙ্গে নিয়ে চলে যান সেখানে। রবীন্দ্রনাথ সব শুনে বললেন, রবীন্দ্রনাথ সম্মতিপত্রে সই করে দেন, সঙ্গে সঙ্গে মুক্তি পায় 'গোরা' সিনেমা। নজরুল তাঁর সেরা কবিতাগুলির সংকলন প্রকাশ করলেন 'সঞ্চিতা' নামে এবং সেই গ্রন্থ উৎসর্গ করলেন কবি গুরু রবীন্দ্রনাথকে। তারপর লিখলেন, ১৩৪৮ সাল ২২শে শ্রাবণ কবিগুরু প্রয়াত হলেন। কবি নজরুল কবিগুরুকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করলেন সংগীতের মাধ্যমে, "ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে জাগাইও না,জাগাইও না।" " বিশ্বকবি কে আমি শুধু শ্রদ্ধা নয়, পুজো করে এসেছি সকল হৃদয় মন দিয়ে, যেমন করে ভক্ত তাঁর ইষ্ট দেবতাকে পূজা করে।" আজ আমাদের দেশ রাজ্য সমাজ পরিবেশ সম্প্রদায়িক বিশ্ব বাস্পে ভয়ানক কলুষিত। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা আজ একে অপরকে চরম সন্দেহের বিদ্বেষের চোখে দেখছে। কবি জীবনানন্দের ভাষায়, সাম্প্রদায়িক ঘৃনা বিদ্বেষের মত মানবতার চরম শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক লড়াই সংঘর্ষ করতে হয়। এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এই আন্দোলন শুধুমাত্র কবিতা গান নাটক ইত্যাদি রচনার মধ্যে হবে না, তার জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক জীবন ও যাপনের মধ্যে সম্প্রীতি ভাবনাকে উজ্জীবিত করা। নানাভাবে সাম্প্রদায়িক, সামাজিক সমস্যায় জর্জরিত সাধারণ নিম্নবিত্ত মানুষ প্রগতিশীল বামপন্থী বুদ্ধিজীবী সহ নানা মানুষের কাছে এই প্রত্যাশা বেশি রাখে। পরাধীন ভারতবর্ষের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথ নজরুল শরৎচন্দ্র সহ অগণিত লেখক বুদ্ধিজীবী যে সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়তে চেয়েছিলেন এবং নিজেদের জীবন বোধ ও জীবন চর্যার মধ্য দিয়ে তার প্রতিফলন ঘটাতে চেয়েছিলেন সেটার বড়ই অভাব। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা প্রত্যেকেই নিজেদের জীবন ও যাপনের মধ্য দিয়ে দৈনন্দিন কর্মধারার মধ্য দিয়ে এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভাব ও ঘৃণা বিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই না করতে পারছি ততক্ষণ পর্যন্ত কিছুতেই এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সাংস্কৃতিক আন্দোলন অগ্রসর হবে না। প্রকাশের তারিখ: ২৯-আগস্ট-২০২৫ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|