|
চিলিতে বাম জোটের প্রার্থী কমিউনিস্ট পার্টির য়ানেত হারা: একটি সম্ভাবনাRabikar Gupta |
সব কিছু খুব সুন্দর ভাবে চলছিল, এমন একেবারেই নয়। মাপুচে অঞ্চলে রাষ্ট্র ও আদিবাসীদের সংঘাতে বোরিচ পূর্বের নীতির খুব বেশি বদলের পক্ষপাতি ছিলেন না। এই প্রশ্নে সরকার তৈরি হওয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই তাঁর সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির গুরুতর মতবিরোধ দেখা যায়। |
সালটা ২০২১। ষাটের দশকের চিলিতে সোশ্যালিস্ট পার্টির অন্যতম নেতা হিসেবে রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে যিনি প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, তিনি হলেন সালভাদোর আয়ান্দে। আয়ান্দের আমলে বাম রাজনীতির আপ্তবাক্য ছিল ‘ঐক্য’। এই ঐক্যর ধারণার ভিত্তিতেই সোশ্যালিস্ট-কমিউনিস্ট বাম জোট দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। আয়ান্দের এমনই ক্ষমতা ছিল, যে তিনি ঐ সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম বিরোধী কমিউনিস্ট ও খ্রিস্টান সোশ্যালিস্টদের এক ছাতার নিচে টেনে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট বাম ঐক্যের ফলেই ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আয়ান্দে জয়লাভ করেন। চিলিতে বামপন্থী ‘পপুলার ইউনিটি’ সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। বহু অভূতপূর্ব পদক্ষেপ ও বৈপ্লবিক নীতি নিলেও এই সরকার কিন্তু বেশিদিন চলতে সক্ষম হয় নি। কিউবার পর ল্যাটিন আমেরিকায় দ্বিতীয় একটি সমাজতান্ত্রিক সরকারকে মেনে নিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিছুতেই রাজি ছিল না। CIA-এর সহায়তায় একটি সামরিক ক্যু-এর মাধ্যমে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দের ১১ই সেপ্টেম্বর সালভাদোর আয়ান্দের সরকারকে ফেলে দেওয়া হয়। গণতন্ত্রের স্ব-নির্বাচিত রক্ষাকর্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চিলির গণতন্ত্রকে ভুল সিদ্ধান্তের জন্য চরম শাস্তি দেয়। চিলিতে প্রতিষ্ঠিত হয় মার্কিন সমর্থিত জেনারেল পিনোচের সামরিক শাসন। জেনারেল আগুস্তো পিনোচের সামরিক শাসনে বামপন্থীদের চূড়ান্ত অত্যাচারের ও রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের সম্মুখীন হতে হয়। রাস্তার দখন নেয় জেনারেলের ডেথ স্কোয়াড। স্তব্ধ করে দেওয়া হয় ভিক্টর হারার কন্ঠ। চিলি পরিণত হয় শিকাগো বয়েজদের নব্য উদারনৈতিক অর্থনীতির পরীক্ষা নিরীক্ষার গিনিপিগে। ১৯৯০-এর দশকে দীর্ঘ দুই দশকের অতি-দক্ষিণ সমরশাসনের দুঃস্বপ্নের শেষে চিলিতে যখন আবার সংসদীয় রাজনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হল, তখন অনেকেই মনে করেছিলেন ধীরে ধীরে দেশ আবার ছন্দে ফিরবে। কিন্তু তা হয়নি। পিনোচে সরে গেলেও থেকে গেছিল পিনোচে নির্মিত রাষ্ট্র। শাসন কাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে তখনও রয়ে গেছিল পিনোচিস্তারা। সবথেকে বড়ো কথা, দেশের সংবিধানও ছিল পিনোচে আমলে প্রণীত, এই সংবিধানের গায়ে লেগেছিল আয়ান্দের ও চিলির গণতন্ত্রের রক্ত। তাই সংসদীয় রাজনীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঠিক পর পরেই তাই চিলির জনগণের এমন কখনও মনে হয়নি বিশাল কিছু পরিবর্তন হয়ে গেছে। মধ্য-বাম সোশ্যালিস্ট পার্টি, যারা আয়ান্দের আদর্শের ও র্যাডিক্যালিজমের অনেকটাই ডাস্টবিন ফেলে ভোটে লড়তে এসেছিলেন, তাঁরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হলেও পিনোচের কাঠামোকে আমূল পাল্টাতে আগ্রহী ছিলেন না। যে রাজনৈতিক দল এই পরিস্থিতিতে বদলের প্রক্রিয়া শুরু করে, তা হল চিলির কমিউনিস্ট পার্টি। নব্বই-এর দশকে কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থা ছিল শোচনীয়। কিন্তু তাঁদের নেতৃত্বর সামনে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল। সেই লক্ষ্য হল ১৯৮০ সালের পিনোচে সংবিধানকে কবরে পাঠানো। এই লক্ষ্যে তাঁরা দেশের সকল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাম শক্তিকে একছাতার তলায় আনার প্রচেষ্টা করে যান। এই পর্যায়ে পার্লামেন্টে অস্তিত্ব না থাকলেও চিলির খনি শ্রমিক আন্দোলন থেকে শুরু করে ছাত্র আন্দোলন, সর্বত্র কমিউনিস্টরা তাঁদের উপস্থিতি জানান দিতে থাকে। স্বাধীন বামপন্থী গোষ্ঠীগুলির প্রতি তাঁদের প্রশংসনীয় ভাবে কোনো বড়দা সুলভ আচরণ ছিল না, বরং বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে গড়ে ওঠা এই গোষ্ঠীগুলির আলাদা অস্তিত্ব রাখার ইচ্ছেকে তাঁরা সম্মান করতেন। অপর দিকে খনি আন্দোলন থেকে পেনশনের বেসরকারীকরণ, গণ-পরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি থেকে পানীয় জলের বেসরকারীকরণ, যে একের পর এক আন্দোলনের ঢেউ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাম শক্তির জন্ম দিয়েছে, আদিবাসী অধিকার থেকে নারী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যে সব সংগঠন উঠে এসেছে – তাঁরাও কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে একত্রে কাজ করতে আগ্রহী ছিলেন। প্রথমে সোশ্যালিস্ট পার্টির সার্বিক নেতৃত্বেই কমিউনিস্ট পার্টি সহ এই দলগুলি সংগঠিত হয়েছিল। তাঁরা জানতেন তাঁদের যে মূল লক্ষ্য, তা সোশ্যালিস্ট সরকারের অধীনে কখনোই পুরো হবে না। কিন্তু মধ্য-বাম সরকারে অংশগ্রহণ ও তার মধ্যে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ পলিসির আংশিক বাস্তবায়ন জনতার সামনে তাঁদেরও যে গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করবে এ সম্পর্কেও তাঁদের কাছে কোনো ধোঁয়াশা ছিল না। রাস্তা-পার্লামেন্ট-রাস্তা এই ফরমুলাতে চিলির বাম রাজনীতির রথের চাকা গড়িয়েছে। ২০০৬, ২০১১-১৩ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে সুযোগ কাছে এসেও দূরে থেকে গেছে, কিন্তু আশাভঙ্গর দুঃখ ভুলে আবার দ্বিগুণ উৎসাহে গণআন্দোলনে ঝাঁপ দিয়েছেন বামপন্থীরা। যে ঐতিহাসিক সুযোগের সন্ধান তাঁরা করছিলেন, তা অবশেষে এল ২০১৯ সালে। মেট্রো ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা অচিরেই রূপান্তরিত হল সামগ্রিক নব্য-উদারনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক সংগ্রামে। এইরকম স্বতঃস্ফুর্ত আন্দোলন অনেক দেশেই হয়ে থাকে। মার্কিন দেশে অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট বা ফ্রান্সে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন এই একইরকম স্বতঃস্ফুর্ত আন্দোলন ছিল। কিন্তু এই দুটির মধ্যে কোনোটাই কোনো স্থায়ী রূপ লাভ করতে সক্ষম হয়নি, কারণ এর পেছনে কোনো সংগঠন ছিল না। সৌভাগ্যের বিষয়, কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এই গণ-বিক্ষোভকে একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে চালনা করা সক্ষম হয়েছিল চিলিতে। লক্ষ্য হল সংবিধানের পরিবর্তন। প্রবল গণ-আন্দোলনের চাপে ক্ষমতাসীন দক্ষিণপন্থী ‘চিলি ভামোস’ জোটের রাষ্ট্রপতি পিনেরা সরকার বাধ্য হল আন্দোলনকারীদের দাবী মেনে গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান বিষয়ে মতামত নিতে। ২০২০-এর গণভোটে প্রায় ৭৮% চিলির জনতা মতপ্রদান করলেন সংবিধান পরিবর্তনের পক্ষে।
এরপর কমিউনিস্ট পার্টির উদ্দেশ্য দাঁড়ালো দ্বি-মুখী। নবগঠিত সংবিধান সভায় বাম সদস্যদের সংখ্যা বৃদ্ধি ও একই সঙ্গে দক্ষিণপন্থীরা যাতে এক-তৃতীয়াংশ আসনও না পায় তা সুনিশ্চিত করা, কারণ তাহলেই তাদের কাছে ভেটো প্রদানের ক্ষমতা চলে আসবে। এই সময়েই সোশ্যালিস্ট পার্টির ‘নিউ মেজরিটি’ জোট এবং ন্যাশনাল রিনিউয়াল পার্টির ‘চিলি ভামোস’-এর বাইরেও কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সকল ক্ষুদ্র র্যাডিক্যাল বামপন্থী দলের ঐক্য ও তৃতীয় একটি বিকল্প ‘ব্রড ফ্রন্ট’ নামক জোটের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। গত দু-দশক ধরে কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক প্রচেষ্টার ফসল ছিল এই জোট। এই নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের অগ্নিপরীক্ষা ২০২১-এর ১৫ ও ১৬-ই মে-এর সংবিধান সভার নির্বাচন। ফলাফল প্রকাশিত হতেই দেখা যায় এই পরীক্ষা তাঁরা সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছেন। কমিউনিস্টরা ব্রড ফ্রন্টের সঙ্গে মিলিত হয়ে গড়ে তুলেছিলেন ‘অ্যাপ্রুভ ডিগনিটি’ জোট। এই জোট সংবিধান সভায় পেয়েছে প্রায় ১৮% ভোট এবং ২৮ জন প্রতিনিধি। এ ব্যতীত আরও ছোট ছোটো বাম দলের প্রাপ্ত আসন নিয়ে তাঁরা খুব সহজেই দক্ষিণপন্থী তো বটেই, এমনকি মধ্যবামপন্থী সোশ্যালিস্ট পার্টিকে বাদ দিয়েও অতি সহজে অর্জন করলেন সংখ্যাগরিষ্ঠতা। সংবিধান সভায় ঐতিহাসিক জয়ের পর দেশের রাজনৈতিক পালাবদলের শেষ হার্ডেল ছিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এই নির্বাচনে নব্য পিনোচিস্তা অতি-দক্ষিণপন্থী হোসে আন্তনিও কাস্তকে পরাজিত করেন বাম জোটের প্রার্থী গ্যাব্রিয়েল বোরিচ। ২০২১ সালের ১৯-শে ডিসেম্বর চিলির রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দ্বিতীয় রাউন্ডের ভোটে প্রায় ৫৫% ভোট লাভ করেন তিনি। বাম ঐক্য একদা আয়ান্দেকে চিলির মসনদে বসিয়েছিল। একই পথে এল ঐতিহাসিক জয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই জয় থেকে যে সরকার সান্তিয়াগো-র মসনদে আসীন হল, তা সার্বিক ভাবে সফল হল না। রাষ্ট্রপতি হিসেবে বোরিচের প্রথম দিনগুলি ছিল অত্যন্ত ইতিবাচক। তিনি চিলির দ্রব্যমূল্য সাফল্যের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করেন। যখন বোরিচ ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখন চিলির মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল বিগত তিন দশকে সর্বোচ্চ। বোরিচের প্রচেষ্টায় এই হার প্রায় অর্ধেক করা সম্ভব হয়। নতুন সরকার সপ্তাহে কাজের সময় ৪০ ঘন্টা বেঁধে দেয়, ন্যূনতম মজুরির হার বৃদ্ধি করে ৫০০ ডলারের কাছে, বিভিন্ন পৌরসভাগুলির আর্থিক ঘাটতি কমাতে এক নতুন খনি ট্যাক্স বসানো হয় চিলির বিরাট খনি কোম্পানিগুলির উপর। এছাড়া আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা নাগরিকদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরিষেবার নীতিও গ্রহণ করা হয়।
কিন্তু সব কিছু খুব সুন্দর ভাবে চলছিল, এমন একেবারেই নয়। মাপুচে অঞ্চলে রাষ্ট্র ও আদিবাসীদের সংঘাতে বোরিচ পূর্বের নীতির খুব বেশি বদলের পক্ষপাতি ছিলেন না। এই প্রশ্নে সরকার তৈরি হওয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই তাঁর সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির গুরুতর মতবিরোধ দেখা যায়। নতুন সংবিধান ২০২২ সালের গণভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়। এর মূল কারণ ছিল বাম শিবিরের মধ্যে থাকা অনৈক্য। ২০২৩ সালের সংবিধান সভার নতুন নির্বাচনে দক্ষিণপন্থীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ২০২২ থেকেই বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বোরিচ পূর্বের তুলনায় অনেকটা রক্ষণশীল অবস্থান নিতে শুরু করেন। এই পরিস্থিতিতে বাম শিবিরের মধ্যেও রাষ্ট্রপতির নানা পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হতে থাকে। বোরিচ যে এই দিকে চলতে পারেন, তা নিয়ে পূর্বেও শঙ্কা ছিল। এর জন্য একবার ফিরে তাকাতে হবে ২০২১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে বাম জোটের পদপ্রার্থী কে হবেন তা নিয়ে উত্থাপিত বিতর্কের দিকে। প্রাথমিক ভাবে মনে করা হয়েছিল বাম জোটের যোগ্য পদপ্রার্থী হবেন চিলির কমিউনিস্ট পার্টির ড্যানিয়েল হাউয়ে। রিকোলেতা শহরের মেয়র হাউয়ে গণ আন্দোলনে (বিশেষ করে গণ স্বাস্থ্য আন্দোলনে) পুরনো মুখ। তাঁর অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক দক্ষতাও প্রচুর। কিন্তু তাঁকে বাম জোটের অনেক দলই বড্ড বেশি র্যাডিক্যাল বলে মনে করেছিলেন। তাঁদের পছন্দ ছিল বোরিচ। সাধারণ মানুষের মধ্যে হাউয়ে-ই কিন্তু বেশি জনপ্রিয় ছিলেন। বিশেষ করে বাম ভোটারদের মধ্যে নানা সমীক্ষায় এই আশঙ্কা উঠে আসে বোরিচ, যিনি রাজনীতিতে এসেছিলেন ২০১১-১৩-এর ছাত্র আন্দোলনের সূত্রে, তিনি তরুণ, অনভিজ্ঞ ও তাঁর কোনো প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও নেই। এছাড়া রাজনীতিতে চাপের মুখে তাঁর পশ্চাদপসারণের প্রবণতা রয়েছে। তবুও কাস্তের মত নব্য-পিনোচিস্তা যেখানে বিকল্প, সেখানে বাম জোট ভাঙার প্রশ্নই ছিল না। কমিউনিস্ট পার্টিও সেই পথে হাঁটেনি। বাম সমর্থকরাও বোরিচ সম্পর্কিত আশঙ্কা মাথায় রেখেও তাঁকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর দেখা যায় এই আশঙ্কাগুলি ভিত্তিহীন ছিল না। বোরিচের ভাষণ যতটা বৈপ্লবিক, তাঁর কাজ কর্ম একেবারেই তেমন নয়। বিশেষ করে শ্রমিক শ্রেণির অনেক দাবি দাওয়া সম্পর্কে তাঁর সম্যক ধারণা নেই। এটি অবশ্য সামগ্রিক ভাবে বোরিচের দোষও নয়। বোরিচ ‘সোশ্যাল কনভার্জেন্স’ নামক বাম উদারপন্থী দলের সদস্য ছিলেন। তারা শ্রেণি প্রসঙ্গ খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে, এমন ভাবা উচিৎ নয়। এই সূত্রেই ২০১১-১৩-এর ছাত্র আন্দোলনে বোরিচের পুরনো বন্ধু, বর্তমানে কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম নেত্রী ক্যামেলিয়া ভালেহো নাম না করে মন্তব্য করেছিলেন, চিলির দক্ষিণপন্থী দলগুলি যতটা শ্রেণি সচেতন, চিলির বাম জোটের বহু দলের নেতাই তেমন শ্রেণি সচেতনতা দেখাতে পারছেন না। সব মিলিয়ে ২০২৫-এ এসে বর্তমানে শাসক বাম শিবিরের পরিস্থিতি তেমন ইতিবাচক এমন বলা চলে না। মন্দের ভালো, যে দক্ষিণপন্থী শিবিরের মধ্যেও বিভাজন বর্তমান। এই বিভাজনের কারণেই ২০২৩ সালের দক্ষিণপন্থীদের তৈরি সংবিধানটিও গণভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। কিন্তু সামগ্রিক ভাবে যে উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে চিলির মানুষ ২০১৯-এর গণ-আন্দোলনে সামিল হয়েছিল এবং বৈপ্লবিক পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল তা বর্তমানে নেই। এই পরিস্থিতিতেই একটি অ-প্রত্যাশিত নির্বাচনী বিজয় চিলির রাজনীতিতে আবার আশার সঞ্চার করেছে। বোরিচ তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ক্যারোলিনা টোহা-কে। টোহা বোরিচ সরকারের গৃহমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই পদ সাধারন্তঃ রাষ্ট্রপতির পরে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী পদ বলে গণ্য করা হয়। টোহা-ও বোরিচের মত মধ্য-বাম উদারপন্থী একটি রাজনৈতিক ঘরানা থেকেই এসেছেন। এই কারণে যখন বাম-জোট ‘ইউনিদাদ পর চিলি’ বা ‘ইউনিটি ফর চিলি’-এর নেতৃত্ব কে দেবেন তার অভ্যন্তরীণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল, অনেকেই ধরে রেখেছিলেন টোহা-ই বাম জোটের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী রূপে নির্বাচিত হবেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে, ২৯ জুন যখন নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হল, তখন দেখা গেল টোহা ২৮.০৭% ভোট পেয়ে রয়েছেন দ্বিতীয় স্থানে। ৬০.১৬% ভোট পেয়ে বাম জোটের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন চিলির কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী য়ানেত হারা। য়ানেত হারার জন্ম উত্তর সান্তিয়াগোর কাছে এল কর্তিহো অঞ্চলে এক শিল্প শ্রমিক পরিবারে। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে হারা জ্যেষ্ঠ। দারিদ্র্যের মধ্যেই প্রথম জীবন কাটিয়েছেন। পরিযায়ী কৃষি শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন কখনও রাস্তায় খাবার বিক্রি করেছেন। পড়াশোনায় মেধাবী ছিলেন হারা। মেয়ে পড়াশোনা করুক, এটা বাড়িরও চাহিদা ছিল। তাই অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা উচ্চশিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। যখন হারার বয়স চোদ্দ, তখন থেকেই তিনি কমিউনিস্ট রাজনীতিতে যুক্ত। দীর্ঘদিন কমিউনিস্ট যুব সংগঠনের সদস্য ছিলেন। সান্তিয়াগো বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ হলে সেখানেও হারা কমিউনিস্ট রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ছাত্র নেত্রী হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল প্রবল। ১৯৯৭ সালে সান্তিয়াগো ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি হিসেবে তিনি নির্বাচিত হন। সরকারের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করার পর হারা চিলির রাজস্ব দপ্তরে দীর্ঘ সময় কর্মরত ছিলেন। রাজস্ব দপ্তরে কর্মচারীদের সংগঠিত করা এবং তাদের সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তবে এই চাকরি পরবর্তীকালে তিনি ছেড়ে দেন। এরপর স্বল্প সময়ের জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করার পর হারা আবার প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে ফেরত আসেন। ২০১৯-এর গণ আন্দোলনে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা ছিল। ২০২২ সালে বোরিচ সরকারের শ্রম ও সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে তিনি শপথ নেন। প্রায় ছয় দশক পরে চিলিতে এটাই কমিউনিস্টদের প্রথম পূর্ণ মন্ত্রিত্ব ছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আয়ান্দে আমলেও শ্রম ও সমাজ কল্যাণ দপ্তর ছিল প্রবাদ প্রতিম কমিউনিস্ট মহিলা নেত্রীর মিরেয়া মরেনোর হাতেই। সুতরাং সেই দিক থেকে এক বিপুল ঐতিহাসিক প্রত্যাশা ছিল য়ানেতের উপর। সহজাত দক্ষতার সঙ্গে তিনি সেই প্রত্যাশার মান রেখেছেন। বোরিচ জমানার যে মূল সাফল্য - ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, সাপ্তাহিক কাজের সময় হ্রাস, সমাজ কল্যাণমূলক নানা কর্মসূচী – সবই এসেছে তাঁর হাত ধরেই। তুলনায় ক্যারোলিনা টোহা গৃহমন্ত্রী হলেও অভ্যন্তরীণ আইন শৃঙ্খলার অবনতি রোধে প্রায় কিছুই করতে পারেননি। এই বিষয়টি বাম জোটের মধ্যে থাকা বিভিন্ন দলের চোখ এড়ায়নি। তাই বোরিচ টোহা-কে সমর্থন করলেও সামগ্রিক স্কোর কার্ডের ভিত্তিতে অধিকাংশ বাম জোটের সমর্থক ও সদস্য মনে করেছেন আগামী নির্বাচনে যদি এই জোটের জয় লাভ করতে হয়, তাহলে হারা-কেই পদপ্রার্থী হিসেবে সামনে রাখতে হবে। হারা-কে সামনে পেয়ে আট বাম দলের ‘ইউনিদাদ পর চিলি’ বা ‘ইউনাইটেড ফর চিলি’ জোট লড়াই করার অনেকটাই জায়গা পেয়ে গেল। কিন্তু তাঁদের সামনে বর্তমানে লড়াই কঠিন। একদিকে ‘চিলি ভামোস’ জোট এভলীন মাথেই-কে সামনে রেখে দেশের সমস্ত দক্ষিণপন্থী শক্তিকে সংগঠিত করছে। অন্যদিকে হোসে আন্তনিও কাস্তের নেতৃত্বে অতি-দক্ষিণপন্থী পিনোচিস্তা শক্তি রিপাব্লিকান পার্টির নেতৃত্বে সংহত হচ্ছে। হারার কাজ দ্বি-মুখী। একদিকে, বোরিচের শাসনকালে বামপন্থীদের যা কিছু অর্জন তা তাঁকে নির্বাচকমন্ডলীর সামনে তুলে ধরতে হবে। অন্যদিকে, এই আমলে যে প্রতিশ্রুতি বামপন্থীরা পূরণ করতে পারেনি, তা নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতে হবে। বোরিচ ঘোষণা করে দিয়েছেন, তিনি আর সংবিধান পাল্টানোর প্রচেষ্টা করবেন না। কিন্তু হারা এবং কমিউনিস্ট পার্টি এত সহজে এই বিষয়ে হাল ছাড়বে না। তাঁরা দীর্ঘদিন এই সংবিধানকে প্রশান্ত মহাসাগরে ছুঁড়ে ফেলার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সাময়িক কিছু পরাজয়ে তাঁরা কমিউনিস্টসুলভ ভাবেই ভেঙে পড়েননি। এই নিয়েও হারা নির্বাচকদের সংগঠিত করতে পারেন। এখনও অবধি নানা সমীক্ষা অনুযায়ী হারা-ই জনপ্রিয়তম প্রার্থী। কিন্তু এতে আত্মতুষ্টির কিছুই নেই, তিনি জানেন। সামনে লম্বা নির্বাচনী লড়াই যার প্রথম রাউন্ড অনুষ্ঠিত হবে নভেম্বরে ও খুব অঘটন না ঘটলে (অর্থাৎ কোনও প্রার্থী সরাসরি ৫০%-এর অধিক ভোট না পেয়ে গেলে) দ্বিতীয় রাউন্ডের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ডিসেম্বরে। ততদিন অবধি দম ধরে রাখতে হবে হারার নেতৃত্ব ‘ইউনিদাদ পর চিলি’-কে । তাহলেই একমাত্র খেলা ঘুরবে।
ব্যবহৃত ছবির সুত্র সোশ্যাল মিডিয়া প্রকাশের তারিখ: ০৪-আগস্ট-২০২৫ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|