আন্তর্জাতিক শান্তি ও সংহতি দিবস : বিশ্ব রাজনীতি, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠায় ভবিষ্যতের সংগ্রাম

Gargi Chatterjee
ইজরায়েলকে টিকিয়ে রাখার মূল ভরসা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।প্রতিবছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সামরিক সাহায্য দেয় ইজরায়েলকে। জাতিসংঘে ফিলিস্তিনপন্থী প্রস্তাব বারবার যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দেয়। ইজরায়েলকে কূটনৈতিক রক্ষাকবচ দেওয়া হয় পশ্চিমা শক্তির তরফে, যাতে তারা নির্বিঘ্নে আগ্রাসন চালিয়ে যেতে পারে।

মানব সভ্যতার বিকাশ মূলত সহযোগিতা, সম্পর্ক ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের উপর দাঁড়িয়ে থাকলেও, দুর্ভাগ্যজনকভাবে যুদ্ধ, দখলদারিত্ব ও রক্তপাতও এর অঙ্গ। ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে দেখা যায়—শাসকশ্রেণী ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য, নতুন বাজার দখল করার জন্য, অথবা কেবলমাত্র জাতিগত অহংকারের জন্য যুদ্ধের পথ বেছে নিয়েছে। ফলস্বরূপ কোটি কোটি নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে, আর মানবতার উপর নেমে এসেছে ভয়াবহ অন্ধকার।

১৯৩৯ সালের ১লা সেপ্টেম্বর নাৎসি জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করে। এদিন থেকেই শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ—মানবসভ্যতার ইতিহাসে ভয়াবহতম ধ্বংসযজ্ঞের সূচনা। প্রায় ছয় বছরব্যাপী এই যুদ্ধে প্রাণ হারায় আনুমানিক ছ’কোটি মানুষ। শুধু সৈনিক নয়, সাধারণ মানুষ, নারী, শিশু, বৃদ্ধ কেউই রেহাই পাননি।

ইউরোপ জুড়ে বিমান হামলা, শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। নাৎসিদের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে লক্ষ লক্ষ ইহুদি, কমিউনিস্ট, জিপসি জনগোষ্ঠী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়।

এশিয়ায় জাপানি সাম্রাজ্যবাদ চীনে, কোরিয়ায় এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভয়াবহ দমননীতি চালায়। শেষ পর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা ফেলল, যা মুহূর্তে কয়েক লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটাল এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বিকলাঙ্গ করে দিল।

এই দিন অর্থাৎ ১লা সেপ্টেম্বর তাই মানব ইতিহাসে এক কালো দিন। যুদ্ধ কীভাবে সভ্যতাকে ধ্বংস করে দিতে পারে, তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত এই দিনটি।

যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে শান্তির প্রয়োজনীয়তা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে বিশ্বের মানুষ উপলব্ধি করল—যদি যুদ্ধ বন্ধ না হয়, তবে মানবসভ্যতা টিকবে না। সেই সময় দুটি প্রধান প্রবণতা দেখা দিল:

রাষ্ট্রগুলির মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত মেটানোর উদ্যোগ নেওয়ার জন্য ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ গঠন  করা হয়। অন্যদিকে বিশ্ব শান্তি আন্দোলনের উত্থান ঘটে শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, নারী—সব শ্রেণির মানুষ যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিলেন।  ১৯৪৯ সালে World Peace Council গঠিত হয়, যা আন্তর্জাতিক স্তরে শান্তি রক্ষার জন্য নিরলস কাজ করে আসছে। এই পরিষদের উদ্যোগেই ১লা সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক শান্তি সংহতি দিবস হিসেবে পালনের প্রচলন শুরু হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে পৃথিবী দুটি শক্তিধর শিবিরে বিভক্ত হয়—একদিকে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি (সোভিয়েত ইউনিয়ন, পূর্ব ইউরোপের দেশ, পরে চীন, কিউবা ইত্যাদি)। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী ব্লক। এই সময় শুরু হয় “শীতল বা ঠাণ্ডা যুদ্ধ”, যেখানে সরাসরি সামরিক সংঘাত সীমিত হলেও অস্ত্র প্রতিযোগিতা, পরমাণু অস্ত্র বিস্তার, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকায় প্রক্সি যুদ্ধ চলতে থাকে।

এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতেই ১লা সেপ্টেম্বর শান্তি দিবসের তাৎপর্য নতুনভাবে সামনে আসে। ছাত্র-যুব-শ্রমিকদের আন্দোলন, সাংস্কৃতিক কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক সংহতি—সবকিছু মিলিয়ে এই দিন বিশ্ব শান্তির প্রতীক হয়ে ওঠে। ভারত প্রাচীনকাল থেকেই অহিংসা ও শান্তির দর্শনের বাহক। বুদ্ধ, অশোক, মহাত্মা গান্ধী—সবাই শান্তির বাণী দিয়েছেন। স্বাধীনতার পর পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু “পঞ্চশীল নীতি” ও “জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন”-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শান্তি ও নিরপেক্ষতার পক্ষে অবস্থান নেন।

ভারতে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও বামপন্থী সংগঠন ১লা সেপ্টেম্বরকে শান্তি দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। বাংলার ছাত্র, যুব, শ্রমিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে এদিন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। শান্তি দিবস উপলক্ষে মিছিল, সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রতিজ্ঞা গ্রহণ—সবই যুদ্ধবিরোধী চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শিক্ষা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। আজও বিশ্বে যুদ্ধ ও সংঘাত চলছে (ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা)। পরমাণু অস্ত্র আজও পৃথিবী ধ্বংসের জন্য প্রস্তুত।সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নতুন নতুন রূপে যুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছে।

তাই ১লা সেপ্টেম্বর কেবল ইতিহাসের স্মরণ নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা এবং শান্তি সংগ্রামের পুনঃপ্রতিজ্ঞার দিন।

সমকালীন বিশ্ব রাজনীতি: ইজরায়েলপ্যালেস্টাইন প্রসঙ্গ

১৯৪৮ সালে ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পশ্চিম এশিয়ার ইতিহাসে নতুন সংঘাতের সূচনা হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রত্যক্ষ ভূমিকা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তির সমর্থনে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে এক “ইহুদি রাষ্ট্র” গড়ে তোলা হয়। এই প্রক্রিয়ায় লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়। ইতিহাসে এই ঘটনাকে বলা হয় নাকবা” (Nakba)—অর্থাৎ বিপর্যয়। ইজরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ফিলিস্তিনিদের উপর চলতে থাকে নির্যাতন, ভূমি দখল ও দমননীতি। পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা ও জেরুজালেম—এই তিন অঞ্চল ফিলিস্তিনিদের মূল আবাসভূমি হলেও ধাপে ধাপে জায়নবাদী শক্তি এগুলি দখল করতে থাকে।

গত সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে ইজরায়েল ফিলিস্তিনিদের উপর যে দমননীতি চালাচ্ছে তা মানবসভ্যতার কাছে লজ্জাজনক। ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকা দখল করে। প্রতিদিনই গাজায় বিমান হামলা, পশ্চিম তীরে সেনাদের অভিযান, ঘরবাড়ি ভাঙা, কৃষিজমি দখল চলতে থাকে। গাজা উপত্যকায় একাধিকবার ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়ে হাজার হাজার মানুষ, বিশেষত নারী ও শিশু নিহত হয়েছে। জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী নিহতদের অর্ধেকই শিশু।গাজাকে ২০০৭ সাল থেকে স্থল, নৌ ও আকাশপথে অবরোধ করে রেখেছে ইজরায়েল। ফলস্বরূপ সেখানকার মানুষ বিদ্যুৎ, ওষুধ, খাদ্য ও পানির সংকটে দিনযাপন করছে।

ইজরায়েলকে টিকিয়ে রাখার মূল ভরসা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।প্রতিবছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সামরিক সাহায্য দেয় ইজরায়েলকে। জাতিসংঘে ফিলিস্তিনপন্থী প্রস্তাব বারবার যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দেয়। ইজরায়েলকে কূটনৈতিক রক্ষাকবচ দেওয়া হয় পশ্চিমা শক্তির তরফে, যাতে তারা নির্বিঘ্নে আগ্রাসন চালিয়ে যেতে পারে।

প্রশ্ন জাগে—যদি কোনো দেশ অন্য দেশে এভাবে হামলা চালায়, তাহলে তাকে “সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র” বলা হয়, অথচ ইজরায়েলের ক্ষেত্রে উল্টোটা হয়। এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির দ্বিচারিতা ছাড়া কি বলা যেতে পারে ?

ফিলিস্তিনি সমাজের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অংশ হলো নারী ও শিশু। জাতিসংঘ শিশু তহবিল (UNICEF)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, গাজার প্রত্যেক হামলায় শিশুদের প্রাণহানি সবচেয়ে বেশি। ইজরায়েলি সেনাদের অভিযানে গর্ভবতী নারী, বৃদ্ধা, এমনকি হাসপাতাল পর্যন্ত টার্গেট করা হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্কুল, মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছে বহুবার। সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইজরায়েলী আগ্রাসন ৩০শে আগস্ট পর্যন্ত ১ বছর ১০ মাস বা ৬৬০ দিন অতিক্রান্ত হয়েছে । ইতিমধ্যে আনুমানিক প্রায় ৮৪ হাজার প্যালেস্তাইনী জনগণের মৃত্যু ঘটেছে যার অধিকাংশই নারী, শিশু । ধংস হয়েছে প্রায় সে দেশের ৯২% ঘর বাড়ি, আবাসন হাসপাতাল, স্কুল সহ নানা স্থপনা । এভাবে ইজরায়েলের দমননীতি কেবল একটি রাষ্ট্রের উপর আগ্রাসন নয়, এটি মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষ ইজরায়েলের এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছেন। ইউরোপ ও আমেরিকায় ছাত্র-যুব সংগঠনগুলো বয়কট আন্দোলন চালাচ্ছে— অর্থাৎ ইজরায়েলি পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাণিজ্য বর্জন। লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার বহু দেশ প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়িয়েছে। ভারতে প্রগতিশীল সংগঠন, বামপন্থী শক্তি ও গণতান্ত্রিক মানুষ প্রতিবছর ফিলিস্তিন সংহতির কর্মসূচি পালন করেন। শান্তি দিবসের প্রাসঙ্গিকতা এখানেই— ইজরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মানেই সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবাজ শক্তির বিরুদ্ধে বিশ্বজনতার ঐক্য গড়ে তোলা।

ইজরায়েল-প্যালেস্টাইন প্রসঙ্গ কেন শান্তি দিবসে গুরুত্বপূর্ণ

১লা সেপ্টেম্বর আমরা স্মরণ করি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ। কিন্তু আজকের দিনে সেই যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি ঘটছে গাজা ও পশ্চিম তীরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেমন নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে ঐক্য গড়ে উঠেছিল, আজও তেমনি জায়নবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ঐক্য অপরিহার্য। শান্তি দিবস তাই কেবল অতীতের শিক্ষা নয়, এটি ফিলিস্তিনের মানুষের মুক্তির সংগ্রামের সঙ্গে আজকের বাস্তব সংহতি।

প্যালেস্টাইনের উপর ইজরায়েলের দমননীতি বিশ্ব শান্তির অন্যতম বড় বাধা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সমর্থন ছাড়া এই দমননীতি সম্ভব নয়। ফলে, শান্তি দিবসে আমাদের কণ্ঠ একসাথে উচ্চারিত হতে হবে—

গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষ যখন ১লা সেপ্টেম্বর রাস্তায় নামে, তখন সেই আওয়াজ শুধু যুদ্ধবিরোধী শপথ নয়; এটি ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি দৃঢ় সংহতি প্রকাশ করার জন্য প্যালেস্তাইনের মুক্তির জন্য।

ভারতের উপর মার্কিন ট্যারিফ নীতি: শ্রমজীবী মানুষের ওপর এক অর্থনৈতিক যুদ্ধ

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কেবল সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমেই নয়, অর্থনৈতিক অস্ত্র ব্যবহার করেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তার আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের উপর আরোপিত মার্কিন ট্যারিফ তারই একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বাইরের দৃষ্টিতে এটি এক ধরনের “বাণিজ্যিক দ্বন্দ্ব” বা “ট্রেড ওয়ার” বলে মনে হলেও বাস্তবে এর গভীরতম অভিঘাত এসে পড়ে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে। শিল্প উৎপাদনের গতি, কর্মসংস্থান, কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্প—সব ক্ষেত্রেই এর বিপর্যয়কর প্রভাব প্রতিফলিত হয়। এই প্রেক্ষিতে ভারতের শ্রমিক শ্রেণীর দৃষ্টিকোণ থেকে মার্কিন ট্যারিফ নীতির সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে তাদের বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করছে। মার্কিন শাসকগোষ্ঠী বারবার অভিযোগ তুলেছে যে ভারত তথাকথিত “অন্যায্য বাণিজ্যিক সুবিধা” ভোগ করছে, অথচ বাস্তবে ভারতের শ্রমিকদের ঘাম-রক্তে গড়া সস্তা উৎপাদন ও রপ্তানি নীতিই আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতকে টিকিয়ে রেখেছে। মার্কিন যুক্তি হল—ভারত মার্কিন পণ্যের জন্য যথেষ্ট বাজার উন্মুক্ত রাখছে না। সেই অজুহাতেই তারা ভারতীয় ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, টেক্সটাইল, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র শিল্পজাত পণ্যের উপর অতিরিক্ত শুল্ক চাপিয়েছে। এর অর্থ দাঁড়াল—ভারতের রপ্তানি কমে আসবে এবং মার্কিন বাজারে ভারতীয় শ্রমিকের ঘামঝরা পরিশ্রমের পণ্য ক্রমশ অপ্রতিযোগিতামূলক হয়ে পড়বে।

শিল্পক্ষেত্রে প্রভাব

ভারতের বহু শিল্প মার্কিন বাজারের উপর নির্ভরশীল। বিশেষত টেক্সটাইল, তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা, ওষুধ শিল্প ও কিছু প্রাথমিক ধাতব উৎপাদন ক্ষেত্র। ট্যারিফ বাড়ার ফলে মার্কিন বাজারে এইসব পণ্যের দাম বেড়ে যাবে, ক্রেতারা বিকল্প উৎস খুঁজবে এবং ভারতীয় রপ্তানিকারক সংস্থাগুলি ধাক্কা খাবে। কিন্তু এর সরাসরি অভিঘাত পড়বে শ্রমিকদের উপর—কারখানা বন্ধ হবে বা উৎপাদন কমে আসবে, ফলে ছাঁটাই ও বেকারত্ব বাড়বে। এর প্রভাবে চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের প্রথমেই কাজ থেকে ছাঁটাই করা হবে। এরপর আঘাত আসবে স্থায়ী কর্মীদের উপর । কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি মজুরি হ্রাস পাবে।

অর্থাৎ একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে শ্রমিকরা তাদের প্রাপ্য বেতন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এটি নিছক বাণিজ্যিক দ্বন্দ্ব নয়, বরং শ্রমজীবী মানুষের উপর এক অর্থনৈতিক যুদ্ধ।

কৃষি ক্ষুদ্র শিল্পে ধাক্কা

ভারতের কৃষি উৎপাদনের অনেকটাই পরোক্ষভাবে রপ্তানি নির্ভর। যেমন—চাল, ডাল, মসলা, তুলা প্রভৃতি মার্কিন বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ট্যারিফের কারণে এইসব পণ্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, যারা মূলত কৃষিজাত কাঁচামাল প্রক্রিয়াকরণ করে বিদেশে রপ্তানি করে, তারাও ভেঙে পড়ে। এর ফলশ্রুতিতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়।

ট্যারিফের আসল উদ্দেশ্য: সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য

এখানে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নিছক ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য নয়। তারা চায় ভারতীয় অর্থনীতিকে দুর্বল করে রাখা, যাতে ভারতের শ্রমিকশ্রেণী আরও সস্তায় তাদের শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হয়। ট্যারিফকে কেন্দ্র করে এক অদৃশ্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে—ভারত সরকারকে তার অভ্যন্তরীণ নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করা। বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থে শ্রম আইনের শিথিলকরণ ঘটানো। দেশীয় শিল্পকে ধ্বংস করে বিদেশি পুঁজিকে প্রাধান্য দেওয়া। এভাবে অর্থনৈতিক অস্ত্র ব্যবহার করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ভারতের উপর একধরনের যুদ্ধ চালাচ্ছে। এটি বন্দুকবিহীন যুদ্ধ হলেও এর শিকার হচ্ছে কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষ।

এই পরিস্থিতিতে শ্রমিক শ্রেণীর প্রতিক্রিয়া একেবারেই ন্যায্য ও অপরিহার্য। ভারতের বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ইতিমধ্যেই ট্যারিফ ও অর্থনৈতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছে। দাবি উঠছে—ট্যারিফ মোকাবিলায় বিকল্প বাজার খোঁজা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া। শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ রাখা ও কর্মসংস্থান সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

মার্কিন ট্যারিফ নীতি যেমন সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের নগ্ন রূপ প্রকাশ করছে, তেমনি ভারতের শ্রমিক শ্রেণীর ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামও ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে।

আধুনিক বিশ্বে শান্তি, সংহতি গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা

আধুনিক বিশ্বে শান্তি ও সংহতির প্রশ্ন আজ বহুমাত্রিক। কেবলমাত্র যুদ্ধবিরোধিতা নয়, বরং অর্থনৈতিক শোষণ, পরিবেশ সংকট, দমন-পীড়ন ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের লড়াইকেও এর অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বহুজাতিক সামরিক জোট ন্যাটো আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া প্রভৃতি দেশে সামরিক হস্তক্ষেপ করে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে উদ্বাস্তুতে পরিণত করেছে। অন্যদিকে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধও বিশ্বশান্তির জন্য একটি গভীর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক শান্তি ও সংহতি দিবস কেবলমাত্র একটি প্রতীকী কর্মসূচি নয়; এটি মানব সভ্যতার টিকে থাকার সংগ্রামের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।

ভারত দীর্ঘকাল থেকেই অঙ্গীকারবদ্ধ একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির প্রতি, যা জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (Non-Aligned Movement – NAM)-এর ঐতিহ্য বহন করে। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় ভারত শান্তি, নিরস্ত্রীকরণ ও উপনিবেশমুক্তির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুন এক ভারসাম্যের সন্ধান করছে। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে “চীন প্রতিরোধী মিত্র” হিসেবে দেখতে চাইছে, বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশেষত সেদেশের রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পকে প্রাধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পরম মিত্র হিসাবে বিবেচনা করে নরম মনোভাব গ্রহণ করছে, সে অন্য প্রসঙ্গ-অন্যদিকে ভারত এখনও রাশিয়ার সাথে ঐতিহাসিক কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় এই দ্বন্দ্ব তীব্র হয়ে ওঠে। মার্কিন সরকার ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে যাতে ভারত রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি বন্ধ করে। যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি ছিল, এই তেল আমদানি রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্রকে শক্তিশালী করছে। কিন্তু ভারত এ ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে জানায় যে, তাদের প্রধান স্বার্থ হলো দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জনগণের জন্য সাশ্রয়ী দামে জ্বালানি সরবরাহ করা। ভারত সরকার জোর দিয়ে বলে যে, এই আমদানি আন্তর্জাতিক আইনের বিরুদ্ধে নয় এবং এর সঙ্গে কোনো যুদ্ধোন্মাদনা যুক্ত নয়।

এখানেই আন্তর্জাতিক শান্তি ও সংহতির এক বাস্তব চ্যালেঞ্জ ধরা দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য অন্য দেশগুলিকে একপাক্ষিক শর্ত মানতে বাধ্য করতে চাইছে, অথচ ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজেদের জনগণের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিচ্ছে। এটি আসলে সাম্রাজ্যবাদী চাপ ও স্বাধীন রাষ্ট্রগুলির সার্বভৌম সিদ্ধান্তগ্রহণের মধ্যে এক দ্বন্দ্ব।

গণতন্ত্র ছাড়া শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। যেখানে দমননীতি, একচেটিয়া শাসন ও জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন করা হয়, সেখানে সর্বদাই যুদ্ধ ও সহিংসতার সম্ভাবনা থাকে। ফ্যাসিবাদী শক্তি ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে, তারা শান্তি চায় না; তারা চায় কেবল নিজেদের আধিপত্য বিস্তার। তাই আন্তর্জাতিক শান্তি ও সংহতি দিবস গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের জন্য এক নতুন অঙ্গীকারের দিন—স্বাধীন মতপ্রকাশ, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, নারী-পুরুষ সমতা, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মর্যাদা রক্ষা ছাড়া শান্তির কোনো অর্থ নেই।

আন্তর্জাতিক শান্তি আন্দোলনের মূল শক্তি শ্রমজীবী মানুষ, কৃষক, ছাত্র-যুব ও সাধারণ জনগণ। রাষ্ট্রশক্তি বা শাসকশ্রেণি প্রায়শই ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত থাকে, কিন্তু জনগণের মৌলিক চাহিদা—খাদ্য, আশ্রয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান—সেই লড়াইয়ের কেন্দ্রে থাকে। যখন সামরিক ব্যয়ে কোটি কোটি ডলার খরচ হয়, তখন স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা থেকে সেই অর্থ কেড়ে নেওয়া হয়। তাই শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম ও শান্তি আন্দোলন একে অপরের পরিপূরক।

বর্তমান বিশ্বে শান্তি ও সংহতির প্রশ্ন কেবল যুদ্ধবিরোধিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক সম্পদের লুটপাট এবং পরিবেশ ধ্বংসও মানব সভ্যতার জন্য মহা হুমকি। সামরিক শিল্প বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দূষণকারী ক্ষেত্র । একদিকে অস্ত্র উৎপাদনে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ খরচ হয়, অন্যদিকে যুদ্ধের ফলে প্রকৃতি ধ্বংস হয়। তাই শান্তি আন্দোলন এখন পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনের সাথেও অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।

আন্তর্জাতিক শান্তি ও সংহতি দিবসের তাৎপর্য এখানেই যে, এটি নতুন প্রজন্মকে শিখিয়ে দেয় যে যুদ্ধ কোনো সমাধান নয়, সমাধান হলো আলোচনার মাধ্যমে, পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার মাধ্যমে। বিশ্বব্যাপী জনগণকে সংগঠিত করে গণআন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও যুদ্ধোন্মাদ শক্তিকে প্রতিহত করা সম্ভব নয়।


প্রকাশের তারিখ: ০১-সেপ্টেম্বর-২০২৫

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org