|
ইন্দোনেশিয়াঃ সাম্প্রতিক ঘটনাবলীSatyaki Bhattacharya |
দেশে জায়গায় জায়গায় পুলিশের সঙ্গে মিলিটারি মোতায়েন হয়। এ পর্যন্ত অন্তত পাঁচ জন প্রতিবাদীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। শান্তিপূর্ণ ভাবে শুরু হওয়া এই আন্দোলনকে উস্কে দিয়েছে পুলিশ নিজেই। |
ইন্দোনেশিয়ার দক্ষিণপন্থী সরকারের নানা বৈষম্যমূলক নীতি নিয়ে বহুদিন ধরেই মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছিল। অক্সফ্যামের হিসেব অনুযায়ী ইন্দোনেশিয়ার প্রথম চারজন ধনী ব্যক্তির মোট সম্পত্তির পরিমাণ দরিদ্রতম ১০ কোটি মানুষের মোট সম্পত্তির চেয়ে বেশি। কিন্তু বারুদে অগ্নিসংযোগ করে আইন প্রণয়নকারীদের আবাসন জনিত ভাতা হঠাৎ ৫ কোটি রুপিয়া (২ লাখ ৬৭ হাজার টাকা আন্দাজ) করে দেওয়া হলে। দেশের ন্যূনতম মজুরির ১০ গুণের বেশি এই অর্থ। প্রতিবাদ, বিক্ষোভ শুরু হলে ২৮ শে অগাষ্ট, জাকার্তা শহরে পুলিশ গাড়ির ধাক্কায় এক রাইড শেয়ার কর্মীকে হত্যা করে। ফলে সপ্তাহান্তে আরও নানা বড় শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। প্রসঙ্গত, ইন্দোনেশিয়ার শ্রমিক সংগঠন KASBI এতে যুক্ত আছে। প্রতিবাদী জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে মন্ত্রী আমলাদের বাড়ি ঘর আক্রমণ করার চেষ্টা করেন। অর্থমন্ত্রী মুলিয়ানি ইন্দ্রাবতীর একটি বাড়ি আক্রান্ত হয়। দেশে জায়গায় জায়গায় পুলিশের সঙ্গে মিলিটারি মোতায়েন হয়। এ পর্যন্ত অন্তত পাঁচ জন প্রতিবাদীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। শান্তিপূর্ণ ভাবে শুরু হওয়া এই আন্দোলনকে উস্কে দিয়েছে পুলিশ নিজেই। তবে এই আবহে রাষ্ট্রপতি প্রাবোয়ো সুবিয়ানতো সাংবাদিক সম্মেলন করে জানিয়েছেন, আইন প্রণয়নকারীদের ওই ভাতা কমিয়ে দেওয়া হবে। তবে সেই সঙ্গে এ কথাও বলেছেন মিলিটারি এবং পুলিশ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে। লুঠপাট বা দাঙ্গার অভিযোগকে সন্ত্রাসবাদ এবং রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে দেখা হবে। KASBI এই কথার প্রতিবাদ জানিয়েছে। এই নিয়ে প্রাক্তন সেনানায়ক প্রাবোয়োর নানা নীতির বিরুদ্ধে এক বছরের কম সময়ে তিনটি বড় প্রতিবাদের ঘটনা দেখা গেল। তবে এর মধ্যে একটা নীতি ছিল বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়ার নীতি, যেটা খাবারে বিষক্রিয়ার অভিযোগে ব্যাপক বিক্ষোভ তৈরি করে। ব্যাপারটা কিছুটা আশ্চর্য বটে। ইন্দোনেশিয়া ব্রিকসের পার্টনার রাষ্ট্র এবং বড় অর্থনীতি। স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের অবকাশ থাকে যে নানা সত্যিকারের কারণে শুরু হওয়া প্রতিবাদকে দখল করে নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের NED এর সাহায্যপ্রাপ্ত NGO গুলি। এই প্রেসক্রিপশন আমাদের চেনা। এবং ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতার নায়ক সুকারনোর নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথমে নেদারল্যান্ডস, পরে যুক্তরাষ্ট্র তাদের শেষ করার কম চেষ্টা করেনি। যুক্তরাষ্ট্র সফল হয়েছিল শেষমেষ। তবে অসাম্য, দারিদ্র্য, দুর্নীতির অভিযোগও মিথ্যে নয়। একদিকে ইন্দোনেশিয়ার সরকারি বন্ডের বিদেশী মালিকানার অংশ (সোজা কথায় বন্ডের বিনিময়ে বিদেশী ঋণের ভগ্নাংশ) ২০২০ সালে ৩৯ শতাংশ থেকে এখন নেমে ১৫ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে ব্ল্যাকরক বলেছে তারা এই গণ্ডগোলের পরিস্থিতিতে মোটেই বন্ড বেচে দেওয়ার কথা ভাবছে না। সন্দেহ একেবারে অমূলক নাও হতে পারে। কারণ পৃথিবীর বৃহত্তম নিকেল সমৃদ্ধ ইন্দোনেশিয়া কিছুদিন আগে কাঁচামাল হিসেবে নিকেল রপ্তানি বন্ধ করেছে। নিকেল ব্যাটারি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ। এবং এই পদক্ষেপকে কড়া সমালোচনা করেছে আইএমএফ। ইন্দোনেশিয়ার নিকেল শিল্পে ব্যাপক সাহায্য করেছে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন। এবং কার্নেগী এন্ডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস আক্ষেপ করে একটি প্রবন্ধ লেখে, যার বিষয়বস্তু, ইন্দোনেশিয়া চীনের সাহায্য নিয়ে কীকরে নিকেলকে সোনা বানিয়ে ছাড়ছে। ইন্দোনেশিয়া নিকেল রপ্তানি বন্ধ করলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন অফিসিয়ালি ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশনকে অভিযোগ জানায়। সেসময়ে ইন্দোনেশিয়ার দাবী ছিল, বিশ্বের বাণিজ্য অত্যন্ত অসম ভিত্তিতে হয়। আমরা নিজেদের দেশে হাই ভ্যালু সামগ্রী বানিয়ে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব অর্জন করতে চাই। ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত এই শিল্পগুলির দিকে মনোযোগ দেওয়া ২০১৪ সাল থেকেই আরম্ভ হয়েছে। আইএমএফ ইন্দোনেশিয়াতে আকরিক রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা তুলে দিতে বললে ইন্দোনেশিয়া একে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ বলে অভিহিত করে। আর ঠিক সেই সময়েই ইন্দোনেশিয়াকে শিল্পায়িত করতে, বাজারের চেয়ে কম সুদের হারে ঋণ দেয় চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক। উল্টোদিকে ইন্দোনেশিয়া চীনের নানা প্রযুক্তির কোম্পানিকে নিজের দেশে উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ে আসতে দেয়। দুই দেশেরই লাভ। এর ফল? ২০১৩ সালে যেখানে কাঁচা নিকেল রপ্তানি করে ইন্দোনেশিয়ার সরকার ৬০০ কোটি ডলার উপার্জন করেছিল, ২০২২ সালে প্রক্রিয়াজাত নিকেল রপ্তানি করে তারা ৩০০০ কোটি ডলার উপার্জন করে। এছাড়া ‘ইন্দোনেশিয়ার সরকার পেন্টাগনের সাথে জয়েন্ট স্টেটমেন্ট দিয়েছে’ ধরণের একটা ভুয়ো দাবী করে প্রেসিডেন্ট প্রাবোয়োর কাছে ভর্ৎসিত হয় যুক্তরাষ্ট্র। আপাতত চোখ খোলা রাখাই দস্তুর। এবং ইন্দোনেশিয়ার মানুষের আর্থ সামাজিক আন্দোলন যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফাঁদে না পড়ে সেই বিষয়ে আন্দোলনকারীদের সতর্ক থাকা অবশ্য কর্তব্য। এ বিষয়ে 'ফুটন্ত তেল থেকে জ্বলন্ত আগুন' এর উপমাটিই সম্ভবত স্মর্তব্য। প্রকাশের তারিখ: ০২-সেপ্টেম্বর-২০২৫ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|