|
ভারতের ক্রীড়ানীতি: একটি ধারাবাহিক ইতিহাস (প্রথম পর্ব)Sumit Gangopadhyay |
খেলা সামাজিক কাজ। বস্তুতঃ এর জন্ম শ্রমজীবি মানুষের সময় কাটানো বিনোদনের জন্য। খেলা দু’দলের খেলোয়াড়দের ও কর্মকর্তাদের মিলিত প্রয়াস। কিন্তু যুগ যুগ ধরে তার পৃষ্ঠপোষক হয়ে এসেছে সমাজের উঁচুতলার মানুষেরা। লক্ষ্য করলো দেখা যাবে সব খেলার মধ্যেই ব্যক্তি স্বাতন্ত্রের ব্যাপক প্রভাব আছে। |
| খেলা শুধু খেলা নয়। বরং সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক কর্মকান্ড। যুগে যুগে তার চরিত্র বদলায়। অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তা বদলে যায়। যুগের সঙ্গে তালমিলিয়ে ধারণা গুলো বদলায়, শ্রেণিচরিত্র বদলায়। সমস্ত খেলাই একটি সামাজিক কাজ, ফলতঃ তা জন্মেছে শ্রমজীবি মানুষের সময় কাটানো বিনোদনের জন্য। ভারতের খেলাধুলার নীতি সংক্রান্ত ইতিহাস জানতে গেলে আমাদের আগে দেখতে হবে ঔপনিবেশিক যুগের ক্রীড়া নীতিকে। সেই সময় শাসক ইংল্যান্ড। তারই প্রতিবিম্ব তৈরি করার একটা চেষ্টা হয়েছিল। ফলে তৎকালীন ইংল্যান্ডের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি দেখতে হবে। তবেই পাওয়া যাবে ধারাবাহিক ইতিহাস। সময়টা ছিল শিল্প বিপ্লবের প্রথম পর্বের। এমন সময় একটা কান্ড হয়। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ইংল্যান্ডের হাতছাড়া হয়। এতবড় উপনিবেশ হাতছাড়া হওয়া খুব একটা সুখকর ছিল না ইংল্যান্ডের কাছে। এই যুগের নাম হলো হ্যানোভারীয় যুগ। শিল্প বিপ্লবের প্রথম পর্বের শেষে যখন উৎপাদন অনেক বেড়ে গেছে অথচ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র হাতছাড়া, এদিকে দেশে চার্টিস্ট আন্দোলন শুরু হয়, কারণ শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। ফলে শ্রমিক ক্ষোভ প্রশমিত করতে তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী হয়ে পড়ে। এর জন্য উপনিবেশিক গুলোয় উৎপাদিত পণ্য আরও রপ্তানী করতে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষমতা কমিয়ে তাকে সরকারী নিয়ন্ত্রণে আনতে দরকার ছিল উপনিবেশগুলির শাসক শ্রেণির মধ্যে নিজেদের জনপ্রিয় করা। উপনিবেশের শাসকেরাও বুঝেছিল নিজেদের টিকিয়ে রাখতে গেলে ব্রিটিশদের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে হবে। ফলে খেলাকে সাম্রাজ্যবাদ/ঔপনিবেশিক নীতির একটি অঙ্গ করা হয় ও উপনিবেশ গুলিতে ছড়ানো হিয়। খেলা হয়ে ওঠে উপনিবেশের দেশীয় শাসক ও ব্রিটিশদের মধ্যে সুসম্পর্ক তৈরীর মাধ্যম। এই কারণে দরকার ছিল খেলায় ‘ভদ্রতার’ প্রলেপ লাগানো। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে চার্টিস্ট আন্দোলন (১৮৩৮), শিল্প বিপ্লবের প্রথম পর্ব শেষ (১৮৩০-৪০), বাষ্পীয় ইঞ্জিনের ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি ও রেল গাড়ির সূত্রপাত (১৮২৫-৩০), জর্জিয় যুগের শেষে ভিক্টোরীয় যুগের শুরু (১৮৩৫-৩৭) এবং জেন্টলম্যান বনাম প্লেয়ার্সের নিয়মিত ক্রিকেট খেলা শুরু হওয়া এই সময়ে। আরও গুরুত্বপূর্ণ, শিল্প বিপ্লবের দ্বিতীয় পর্যায়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষমতার অবসান, উপনিবেশ গুলোয় প্রথম জাতীয় মুক্তি আন্দোলন (ভারতের মহাবিদ্রোহ বা চীনের বিভিন্ন বিদ্রোহ), আধুনিক পৃথিবীর প্রথম অর্থনৈতিক ধ্বস এবং ঔপনিবেশিক জনগণের ক্রিকেট ও অন্যান্য পাশ্চাত্য খেলার অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রায় একই যুগে (১৮৫৯-১৮৬০)। এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে পেশাদাররাই ভিক্টোরীয়দের খেলা শেখায় এবং খেলাটিতে বিপণন যুক্ত করে। পেশাদাররা না থাকলে কোনও খেলাই জনপ্রিয় হত না। অথচ পেশাদারদের চাকরের চোখে দেখা হত, শ্রেণি বৈষম্য এই কারনে সাঙ্ঘাতিক ভাবে চোখে পড়ে এই যুগের খেলাকে ঘিরে। অ্যামেচার শব্দটি ফরাসি শব্দ যা ইংরেজি ভাষায় খেলাধুলা সংক্রান্ত বিষয়ের সাথে যুক্ত হয় ১৮০৪ সাল থেকে। বহু বছর আগে থেকেই ক্রিকেট সংক্রান্ত ক্লাব গুলোর খরচ-পাতির তালিকায় “ খেলোয়াড়দের পেমেন্ট” নামে আলাদা হিসাব থাকত। যদিও “পেশাদার” বলতে বিশ শতকের প্রথমে বা উনিশ শতকে যা বলত তা এটা নয়। এমনকি আজকের দিনেও “পেশাদার ক্রিকেটার” ব্যাপারটা অনেক ভিন্ন। বিগত এক শতাব্দী যাবৎ কোনও একটি বিষয় বা ঘটনাপ্রবাহ যদি সম্পূর্ণ রূপে কুক্ষিগত হয়ে যায় শাসকশ্রেণীর দ্বারা, তাহলেই কি সেটি শ্রমজীবীদের আয়ত্তের বাইরে চলে যায় ? যদি বহু শতাব্দী যাবৎ পৃষ্ঠপোষকতায় থাকে সমাজের শাসকশ্রেণী তাহলেও কি বিষয়টি তাদের হস্তগত হয়? আমাদের অভিজ্ঞতা বলে উল্টোকথা। উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন হলো সমাজের চালিকাশক্তি। যা সম্পূর্ণভাবে যৌথ। ব্যক্তিমালিকানার কারণে তা যৌথ সম্পত্তি হয়ে উঠতে পারে না। তাই শ্রমজীবীরা- যাঁরা মূল উৎপাদিকাশক্তি তাঁরা সংঘবদ্ধ ভাবে লড়াইয়ের মাধ্যমে ব্যক্তিমালিকানার অবসান ঘটানোর চেষ্টা করে। খেলা সামাজিক কাজ। বস্তুতঃ এর জন্ম শ্রমজীবি মানুষের সময় কাটানো বিনোদনের জন্য। খেলা দু’দলের খেলোয়াড়দের ও কর্মকর্তাদের মিলিত প্রয়াস। কিন্তু যুগ যুগ ধরে তার পৃষ্ঠপোষক হয়ে এসেছে সমাজের উঁচুতলার মানুষেরা। লক্ষ্য করলো দেখা যাবে সব খেলার মধ্যেই ব্যক্তি স্বাতন্ত্রের ব্যাপক প্রভাব আছে। এর কারণ সম্ভবতঃ সেই যুগের ‘নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের’ বিপক্ষে ইউরোপ জোড়া লড়াই। যার ফলে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ উন্নত হয়। রুশোর তত্বে স্পষ্ট তাঁর প্রভাব দেখা যায় (ঠিক ‘রবিনসন ক্রুশো’র মতো)। কিন্তু যাবতীয় ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ যেমন যৌথ জীবনের মাধ্যমে উন্নতি করে, তেমনি শক্তিশালী দলের দ্বারাই সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়। ইংল্যান্ডে প্রটেস্ট্যান্ট ধর্ম প্রচলিত হওয়ায় এই খেলার প্রভূত উন্নতি ঘটে, কারণ সারা সপ্তাহ কাজ করার পরে ছুটির দিন গুলো গির্জায় যাওয়ার বাধ্যতামূলক নিয়ম থেকে কিছুটা হলেও ছাড় পাওয়া যায়, এই সময়টা খেলার জন্যই ব্যয় হওয়া শুরু হয়। ‘গোলাপের ‘, সামন্ত বংশ গুলিকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছিল কারণ তাঁরা সকলেই হয় ল্যাঙ্কাস্ট্রিয়ান বা ইয়র্কশায়রিয়ান বংশের হয়ে যুদ্ধ করে। এদের পরে যাঁরা এঁদের শূন্যস্থান পূরণ করে তাঁরা এঁদের বংশধর হলেও মানসিকতায় অনেক আলাদা ছিল। বলা ভালো এঁরা বুর্জোয়া মানসিকতা নিয়ে চলতো। এই নব্য জেন্ট্রি সম্প্রদায় নিশ্চিত ভাবেই গ্রামের ছোট চাষীদের জমি ও জমিদারী কিনে সেগুলিকে আকারে বাড়িয়ে নেয়। প্রাথমিকভাবে এরা ছিল বহুবিধ খেলার প্রথম পৃষ্ঠপোষক। এর পরেই তথাকথিত ‘গৌরবময় বিপ্লব’ ঘটে। শহুরে রাজতন্ত্রীদের একাংশ গ্রামে পালায়। অবস্থা উন্নতি হলে আবার যখন শহরে ফেরে ; তখন সঙ্গে করে নিয়ে আসে গ্রামীণ খেলা। এক্ষেত্রে বিষয়টি বিস্তারিত জানতে আমাদের চোখ রাখতে হবে তৎকালীন ইংল্যান্ডের শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থার উপর। সামাজিক চাহিদা মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী উৎপাদনে মানুষ পরস্পরের সঙ্গে যে সম্পর্ক স্থাপন করে; তা নির্ভর করে উৎপাদন শক্তি বিকাশের উপর। এই পারস্পরিক সম্পর্ক দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায় সামাজিক জীবনের যাবতীয় কার্যকলাপের তা সে ঘটনাই হোক বা মানবিক প্রচেষ্টা, ভাবনা, ধারণা ও আইন। উৎপাদন শক্তির বিকাশ থেকে সৃষ্ট হয় ব্যক্তি মালিকানার উপর স্থাপিত সামাজিক সম্পর্ক, কিন্তু উৎপাদন শক্তি বিকাশেই অধিকাংশের সম্পত্তি লোপ পাওয়ার ঘটনাও ঘটে আর তা কেন্দ্রীভূত হয় নগণ্য সংখ্যক ব্যক্তির হাতে। এতে করে যে সংকটের সূত্রপাত ঘটে, তার ফলে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার যা ভিত্তি; সেই মালিকানাই লুপ্ত হওয়ার পথ খুলে যায় তাতে, আর বিকাশ হয় সেই লক্ষ্যের যা গ্রহণ করেছে সমাজতন্ত্রীরা। সমাজতন্ত্রীদের বুঝতে হয় যে কোন সামাজিক শক্তি বর্তমান সমাজে তার নিজের অবস্থানের কারণেই সমাজতন্ত্র স্থাপনে আগ্রহী, এবং আপন স্বার্থ ও ঐতিহাসিক কর্তব্যের চেতনা সেই শক্তিকে দেওয়ার প্রয়োজন হয়। এ শক্তি হল প্রলেতারিয়েত। খেলা প্রসঙ্গে এই কথা উঠছে কেন ? কারণ এই শক্তির পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস যখন লিখছেন ইংল্যান্ডের শ্রমিক শ্রেণির অবস্থার বিষয়ে সেই মহান গ্রন্থ তখন আসলে জেন্টলম্যান বনাম প্লেয়ার্স ম্যাচ প্রবল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, কেমব্রিজ বনাম অক্সফোর্ড, ইটন বনাম হ্যারোও শুরু হয়েছে। ক্রিকেটের পাশাপাশি ফুটবলের (আধুনিক সকার ও রাগবির অবিচ্ছিন্ন ধাঁচ) জনপ্রিয়তা বাড়ছে। এ শক্তির সঙ্গে অর্থাৎ প্রলতারিয়েত শক্তির সঙ্গে (যদিও মার্কস এঙ্গেলস কেউই ইংল্যান্ডের শ্রমিক শ্রেনিকে প্রলতারিয়েত বলতেন না ― ফ্রান্সের শ্রমিকদের বলতেন; ইংল্যান্ডের জন্য অন্য শব্দ ব্যবহার করতেন) এঙ্গেলসের পরিচয় হয় ইংল্যান্ডে, ব্রিটিশ শিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ম্যাঞ্চেস্টারে, ১৮৪২ সালে তিনি এখানে এসে একটি মার্কেন্টাইল কোম্পানীতে কর্মচারী হিসাবে ঢোকেন, তাঁর বাবা ছিলেন কোম্পানীর অন্যতম অংশীদার। এঙ্গেলস এখানে শুধুই কারখানার অফিসে বসে থাকতেননা, শ্রমিকরা যেখানে গাদাগাদি করে থাকতো সেই সব নোংরা বস্তির মধ্যে ঘুরে বেড়াতেন তিনি, নিজের চোখে তাদের নিঃস্বতা ও দারিদ্র্য দেখেন। ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে তৃপ্ত না হয়ে তিনি ইংরেজ শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা সম্পর্কে তখন পর্যন্ত যা কিছু প্রকাশিত হয়ে উঠেছিল সব পড়ে ফেলেন, আওতাধীন সমস্ত সরকারি দলিল তিনি খুঁটিয়ে পড়েন। এই অধ্যায়ন ও পর্যবেক্ষণের ফল হল ১৮৪৫ সালে প্রকাশিত তাঁর বই ‘ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা’। এঙ্গেলসের আগে অনেকেই প্রলেতারিয়েতের সমস্যার বর্ণনা করে তাদের সাহায্য করার প্রয়োজনীয়তা দেখিয়েছিলেন। এঙ্গেলসই প্রথম বলেন যে প্রলেতারিয়েত শুধু একটি অত্যাচারিত শ্রেণী নয়; যে লজ্জার অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে সে রয়েছে, সেই অবস্থাটাই তাকে অপ্রতিরোধ্যরূপে সামনে ঠেলে দিচ্ছে ও নিজেদের চরম মুক্তির জন্য সংগ্রামে বাধ্য করছে। আর সংগ্রামী প্রলেতারিয়েত নিজেই নিজেকে সাহায্য করবে । শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক আন্দোলন অনিবার্যভাবেই শ্রমিকদের এই চেতনায় উপনীত করাবে যে সমাজতন্ত্র ছাড়া তাদের অন্যকোন পথ নেই। অপরপক্ষে, সমাজতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয়ে উঠবে যখন তা শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক সংগ্রামের লক্ষ্য হিসেবে গড়ে উঠবে। ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা সম্পর্কে এঙ্গেলসের বইটির এটাই মূল কথা। বিপ্লবী প্রলেতারিয়েত এই ভাবনা বর্তমানে সম্পূর্ণ মেনে নিলেও তৎকালীন যুগে এই মত ছিল সম্পূর্ণ নতুন। আগামীকাল দ্বিতীয় পর্বঃ বিষয় - ব্রিটিশ ক্রীড়ানীতি। ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক যুগের ব্রিটিশ আমলের ক্রীড়ানীতি এবং তার প্রয়োগ। প্রকাশের তারিখ: ২৫-জানুয়ারি-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|