ভারতের ক্রীড়ানীতি: একটি ধারাবাহিক ইতিহাস (সপ্তম পর্ব)

Sumit Gangopadhyay
নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে ধীরে ধীরে দূরদর্শন সাধারণ ভারতীয়ের ঘরে প্রবেশ করে, যদিও তখন মেট্রো শহর গুলো বাদ দিয়ে কোথাও দুটোর বেশি চ্যানেল ছিল না।


ষাটের দশকে আগমন ঘটলেও মধ্যবিত্ত ভারতীয় ১৯৮০ এর দশকের শেষের দিকে টিভির নাগাল পায় সম্পূর্ন রূপে। অবশ্য সর্বস্তরের মানুষের নাগালে যেতে আরও একদশক লেগেছিল। 

ভারতে ক্রিকেট খেলা দেখানো হতো খুব নিম্ন মানের প্রযুক্তি এবং মাত্র দুটো (বেশিরভাগ সময় একটা) ক্যামেরা দিয়ে। দেশের মাটিতে টেস্ট ও ওয়ানডে সবই দেখালেও পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ছাড়া টেস্ট দেখানো হতো ‘নির্বাচিত অংশ’। ওয়ানডে সবই দেখানো হতো। তখন দূরদর্শন খেলা দেখানোর জন্য বিসিসিআই থেকে টাকা নিতো, কোনোও টাকা দিতো না। উপরন্তু খেলা দেখানোর মাঝখানে অদ্ভুত সব অনুষ্ঠানের সূত্রপাত ঘটানো হতো। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ সহ চিড়িয়াখানা উদ্ভাবন সব দেখানো হতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ চলাকালীন।

নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে ধীরে ধীরে দূরদর্শন সাধারণ ভারতীয়ের ঘরে প্রবেশ করে, যদিও তখন মেট্রো শহর গুলো বাদ দিয়ে কোথাও দুটোর বেশি চ্যানেল ছিল না। এমন সময় ১৯৯১/৯২ বেশ কিছু উল্লেখ করার মতো ঘটনা ঘটে:-

(১) সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন

(২) পূর্ব ইওরোপে কমিউনিস্ট ও ওয়ার্কার্স পার্টি পরিচালিত সরকারগুলোর পতন।

(৩) বার্লিনের প্রাচীরের পতন।

(৪) ভারতের অর্থনৈতিক সংকট।

(৫) ভারতে মুক্তবাজার।

(৬) উপসাগরীয় যুদ্ধ।

এই প্রেক্ষাপটে ভেবে দেখতে হবে যে ভারতে বেসরকারী চ্যানেল গুলির আগমন কোন সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। প্রতিনিয়ত খবরের বন্যায় জনসাধারণ কে আপডেট রাখতে আরও বেশী টিভি চ্যানেলের দরকার ছিল। দরকার ছিল ধুঁকতে থাকা চলচ্চিত্র জগৎ কে বে-আইনি ভিডিও পার্লারের হাত থেকে টিভি চ্যানেলের হাতে আনা, যাতে টেলিকাস্ট থেকে আর্থিক মুনাফা হয় অন্য দিকে চলচ্চিত্র জগৎ লাভবান হয়। উল্লেখ্য, ১৯৮৬-১৯৯২ প্রায় ৭৫% ফিল্ম দুসপ্তাহের বেশি প্রেক্ষাগৃহে চলতই না।

অবশ্যই ১৯৮২/১৯৮৬/১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল, ১৯৮৩/১৯৮৭/১৯৯১-৯২ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেট এবং অলিম্পিক, এশিয়ান গেমস প্রভৃতি বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পাশাপাশি নিয়মিত আন্তর্জাতিক ক্রীড়াকে তুলে ধরার প্রয়োজন হয়েছিল। এর জন্য আরও বেশি টিভি চ্যানেল দরকার ছিল।

এমতাবস্থায় ভারতে প্রবেশ ঘটলো কেবল নেটওয়ার্কের। প্রায় একই সময় অর্থাৎ ১৯৯২/৯৩ নাগাদ ইংল্যাণ্ড ভারত সফরে এলে ‘ ট্রান্স ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল ‘ নামে একটি কোম্পানি চুক্তি করলো বিসিসিআই এর সঙ্গে। দূরদর্শনকে এই চুক্তির জন্য ১০ লক্ষ মার্কিন ডলার দিতে হবে, বিসিসিআই এর ফলে ৬ লক্ষ মার্কিন ডলার মুনাফা করবে।

দূরদর্শনের এবার টনক নড়লো। সিএবি -র ৬৫ বছর উপলক্ষে আয়োজন হওয়া হিরো কাপ দেখানোর জন্য  তাঁরা ১ কোটি ভারতীয় মুদ্রা (৩,২০,০০০ মার্কিন ডলার) দেওয়ার প্রস্তাব দিল বিসিসিআই কে। কিন্তু তখন ‘ট্রান্স ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল’ অফার দিয়েছে ১কোটি ৭৬ লক্ষ এবং সারা বিশ্ব থেকে যে ‘রেভিনিউ’ আসবে তার ৭০%। ফলে বিসিসিআই দূরদর্শন কে পাত্তাই দিলো না। দূরদর্শন কিন্তু হারতে রাজি নয়। তারা এবার এক টাকাও দিতে রাজি হলো না। উল্টে ম্যাচ দেখানোর জন্য ম্যাচ প্রতি ৫ লক্ষ ভারতীয় মুদ্রা দাবি করলো।

হিরো কাপ শুরুর দুইদিন আগে ঘটে গেলো সর্বাধিক বড় দুটো ঘটনা। প্রথমটা হলো, ১৮৮৫ সালের টেলিগ্রাফ আইনের মাধ্যমে ঘোষণা করা হলো ‘ভারতের মাটি থেকে যেকোনো অনুষ্ঠানের আপ- লিংকিং  সিগনাল এর একমাত্র অথরাইজড অধিকারি ভারত সরকার এর সংস্থা।’ এই আপ লিংকিং সিগনাল কে ভারতীয় জনগণের যৌথ সম্পত্তি বলে ঘোষণা করা হলো।

দ্বিতীয় ঘটনা হলো ‘ট্রান্স ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল’ জিনিসপত্র এর দিল্লী, বোম্বে ও কলকাতা বিমানবন্দরে আটক করলো কাস্টমস। তৎক্ষণাৎ সুপ্রিম কোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ জারি করে ছাড়ানো হলো।

এদিকে সমস্যা ঘনীভূত দেখে দক্ষিন আফ্রিকা হুমকি দিলো তাঁদের দলের সঙ্গে জিম্বাবুয়ের খেলা যেন দক্ষিন আফ্রিকার জনগণ দেখতে পায়, নাহলে আগামী বিশ্বকাপের আয়োজনে ভারত কে করা সমর্থন তাঁরা তুলে নেবেন। তাছাড়া ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড নিজেদের ঘরোয়া ক্রিকেট বিদেশ সফরের দোহাই দিয়ে আসেনি। পাকিস্তান শিবসেনার হুমকির ভয়ে আসেনি। ফলে কানপুরে ভারত বনাম শ্রীলঙ্কা ম্যাচে অন ফিল্ড বিজ্ঞাপন প্রায় ছিলই না। বাস্তবিক, ইডেনে দিন রাতের ম্যাচ, প্রথম কৃত্রিম আলোয় কলকাতায় ক্রিকেট, ঐতিহাসিক সেমিফাইনাল – সেই দক্ষিন আফ্রিকার বিরুদ্ধে শচীনের শেষ ওভারে বোলিং বা ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে অনিল কুম্বলের ১২ রানে ৬ উইকেট – এই সব শেষ পর্বের ঘটনা ছাড়া সম্ভব ছিল না হিরো কাপে লাভের মুখ দেখার।

অবশেষে ১৯৯৫ সালের ফেব্রয়ারি মাসে জাস্টিস পি বি সাবন্ত, বি পি জীবন রেড্ডি ও এস মোহন এক ঐতিহাসিক রায়ে স্বীকার করলেন যে ভারতের মাটি থেকে যেকোনো অনুষ্ঠানের আপ- লিংকিং  সিগনাল  ভারতীয় জনগণের যৌথ সম্পত্তি। ফলে ভারতীয় জনগণের অধিকার আছে সবথেকে সেরা মানের অনুষ্ঠান দেখার। ফলে ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদের মত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার রক্ষার জন্য এই ক্ষেত্রে একটি পাবলিক অথরিটি তৈরী হবে, যাঁরা এই বিষয়ে নজর রাখবে কোনো অধিকার ক্ষুন্ন হচ্ছে কিনা। এই ঘটনা ও রায় বেসরকারী চ্যানেলকে এগিয়ে দিলো বহুদূর, নয়া উদারবাদ শক্ত হলো। আজ আই পি এল দেখানোর পঞ্চ – বার্ষিকী সত্ব স্টার স্পোর্টস কিনে নেয় ১,৬৩,৪৭৫ মিলিয়ন ভারতীয় মুদ্রায়।

১৯৮৯  সালে শচীন যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আসেন তখন ভারতে চ্যানেল দুটো। ১৯৯৬ বিশ্বকাপের সময় চ্যানেলের সংখ্যা ৫০ এর বেশি।

বিশ্বকাপ ১৯৯৬ ছিল নয়া উদারবাদী অর্থনীতির সর্বাপেক্ষা বড় লীলা ক্ষেত্র। সম্ভাব্য অসম্ভাব্য সব রকমের জিনিস ক্রিকেট দ্বারা বিজ্ঞাপনের আওতায় পড়লো। ডিকি বার্ড থেকে কোর্টনি ওয়ালশ, সবাই মডেল হলেন, অফিসিয়াল চিউয়িং গাম থেকে অফিসিয়াল ঠাণ্ডা পানীয় সব কিছুই এলো; আবার কোনও কোনও ঠাণ্ডা পানীয় বিজ্ঞাপন দিলো ‘নাথিং অফিসিয়াল এবাউট ইট’। রঙিন পোশাক, সাদা বল আগেই ১৯৯১/৯২ এর বিশ্বকাপে এসেছিল। সেবারই শুরু হয়েছিল দ্রুত গতিতে রান তোলা বা পিঞ্চ হিটিং, যা সফল করলেন শ্রীলঙ্কার সনৎ জয়সূর্য। সঙ্গে নয়া উদারবাদের সর্ববৃহৎ ক্রিকেটীয় হাতিয়ারের জয়যাত্রার সূত্রপাত ঘটলো।

১৯৯৬-২০০১ ভারতে টিভি সম্প্রচারে এলো বিরাট পরিবর্তন। প্রচুর টিভি চ্যানেল, সস্তার কেবল কানেকশন, ঘরে ঘরে কমদামী কালার টিভি এবং ক্রিকেটের সর্বগ্রাসী প্রচার। এই সর্বগ্রাসী প্রচারের মূল ভিত্তি ছিল শচীন তেন্ডুলকরের পারফরম্যান্স। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ এর মধ্যবর্তী পর্বে শচীন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১১,০০০ এর বেশী রান করেন (টেস্ট ও ওডিআই মিলিয়ে)। ৪০ টি শতরান সহ। একবার তাকিয়ে দেখা যাক এই সময়ের কিছু স্মরণীয় পারফরম্যান্স।

১৯৯৬ থেকে তিনটি মহাদেশ জুড়ে ভারত ১০টি টেস্ট, ৪২টি ওডিআই, ১১টি অন্য প্রথম শ্রেণির, তিনটি অন্য লিস্ট এ, চারটি মিসলেনিয়স ম্যাচ খেলে। এক বছরের মধ্যে প্রায় ৩৫% দিন ভারত কে মাঠে নামতে হয়। এই খেলা গুলির মধ্যে আন্তর্জাতিক খেলায় ভারত ১৪টি ওডিআই ও ৩টি টেস্ট জেতে।
একবার মনে রাখা উচিৎ, এই বিপুল সংখ্যক আন্তর্জাতিক ম্যাচ বেসরকারী চ্যানেলে সরাসরি প্রচার হওয়ার ফলে দূরদর্শনের চাহিদা কমে বেসরকারী চ্যানেলের গ্রাহক বাড়ে। এই সেই সময় যখন সরকারী বেসরকারী দপ্তর থেকে পাড়ার ক্লাবঘর উপচে পড়তো খেলা দেখার জন্য। যদিও ২৭টি ওডিআই (প্রায় ৭০%) ও চারটি টেস্ট (৪০%) ম্যাচ ভারত হেরে যায় কিন্তু একটি ত্রিদেশীয় কাপ জয়, দুটিতে রানার্স, বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে যাওয়ার কারণে দর্শকদের উৎসাহ মোটেই কমেনি।
তাছাড়া এই সময়ে শচীন ৮৪৫ রান (গড় ৪৫, শতরান- ৩) করেন টেস্টে ও ১৮৬৭ রান ( গড় ৪৬.৬৭, শতরান-৭) করেন ওডিআই খেলায়। এছাড়া আজহারউদ্দিন, সৌরভ গাঙ্গুলী, রাহুল দ্রাবিড়, জাদেজা, কুম্বলে, শ্রীনাথ ও প্রসাদ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বাণিজ্যের হাতিয়ার হয়ে ওঠেন।
ফলত: বেসরকারী চ্যানেল, সীমিত দলীয় সাফল্য ও বিপুল ব্যক্তিগত সাফল্য ভারতে ক্রিকেটের চূড়ান্ত বাণিজ্যিকীকরণ শুরু করে।  প্রতিযোগিতা গুলির নাম দেখলেই বিষয়টি আন্দাজ করা যাবে। সিঙ্গার, উইলস, সাহারা, টেক্সাকো, টাইটান, পেপসি প্রভৃতি কোম্পানি গুলো ছিল মূল স্পন্সর।


অষ্ঠম পর্ব থাকবেঃ ঝাপসা সাদা–কালো পর্দা, এক ক্যামেরার ক্রিকেট, মাঝখানে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ—এই বাস্তবতা থেকেই নব্বইয়ের শুরুতে ভারত ঢুকে পড়ে কেবল, বেসরকারি চ্যানেল আর সম্প্রচারস্বত্বের যুদ্ধে। সোভিয়েত পতন থেকে ভারতের মুক্তবাজার—বিশ্ব রাজনীতির টালমাটাল সময়ে টেলিভিশন আর ক্রিকেট মিলিয়ে তৈরি হয় এক নতুন সাংস্কৃতিক অর্থনীতি। হিরো কাপের সম্প্রচার লড়াই, সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়, আর শচীন তেন্ডুলকরের ব্যাট—সব মিলিয়ে ক্রিকেট হয়ে ওঠে নয়া উদারবাদের সবচেয়ে শক্তিশালী গণমাধ্যম। এই অংশটি সেই সন্ধিক্ষণের গল্প, যেখানে টিভি ভারতকে বদলায়, আর ক্রিকেট হয়ে ওঠে বাজারের রাজা

প্রকাশের তারিখ: ০৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org