ভারতের ক্রীড়ানীতি: একটি ধারাবাহিক ইতিহাস (নবম পর্ব)

Sumit Gangopadhyay
ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল এখানে একটি কেন্দ্রীয় কাঠামো হিসেবে আবির্ভূত হয়। শহরভিত্তিক দল, মালিকানা, নিলাম ব্যবস্থা, ব্র্যান্ডিং ও বিনোদনমূলক উপস্থাপনা—এই সব মিলিয়ে ক্রীড়া একধরনের প্যাকেজড ভোক্তা-পণ্যে রূপান্তরিত হয়।


২০০৭ থেকে ২০২৩—এই প্রায় দেড় দশক ভারতীয় ক্রীড়া ইতিহাসে এক গভীর গঠনগত রূপান্তরের সময়কাল। এই পর্বে ক্রীড়া আর কেবল এই পর্যায়ে ক্রীড়া আর নিছক শারীরিক দক্ষতার প্রতিযোগিতা বা রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত জাতীয় গৌরবের ক্ষেত্র নয়, বরং কর্পোরেট পুঁজি, ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল, মিডিয়া-নির্ভর বিনোদন অর্থনীতি এবং সমকালীন রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি সামাজিক–রাজনৈতিক ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। ১৯৯০-এর দশকে উদারীকরণের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, ২০০৭-এর পর তা ক্রীড়া জগতে পূর্ণাঙ্গ আধিপত্যমূলক রূপ লাভ করে। এই সময়ে ক্রীড়ার সংগঠন, প্রতিযোগিতা কাঠামো, দর্শক সংস্কৃতি এবং এমনকি জাতীয়তাবাদের ভাষাও মৌলিকভাবে পুনর্গঠিত হয়।

 
এই সময়ে কর্পোরেট আগ্রাসনের চরিত্র গুণগতভাবে বদলে যায়। আগের দশকে কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতা মূলত বিজ্ঞাপন, টুর্নামেন্ট স্পনসরশিপ বা ব্র্যান্ড এনডোর্সমেন্টে সীমাবদ্ধ থাকলেও, ২০০৭–এর পর কর্পোরেট পুঁজি সরাসরি ক্রীড়ার মালিকানা, পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে। ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল এখানে একটি কেন্দ্রীয় কাঠামো হিসেবে আবির্ভূত হয়। শহরভিত্তিক দল, মালিকানা, নিলাম ব্যবস্থা, ব্র্যান্ডিং ও বিনোদনমূলক উপস্থাপনা—এই সব মিলিয়ে ক্রীড়া একধরনের প্যাকেজড ভোক্তা-পণ্যে রূপান্তরিত হয়। এই ব্যবস্থায় খেলোয়াড়দের পেশাদার নিরাপত্তা ও আয়ের সুযোগ বৃদ্ধি পেলেও, ক্রীড়ার ঐতিহাসিক সামাজিক ভিত্তি—স্থানীয় ক্লাব, শ্রমজীবী সমর্থক সংস্কৃতি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতার স্মৃতি—ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
 

ক্রিকেট এই রূপান্তরের সবচেয়ে তীব্র ও সর্বব্যাপী ক্ষেত্র। ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের মাধ্যমে ক্রিকেট এক বৈশ্বিক বিনোদন শিল্পে পরিণত হয়, যেখানে ম্যাচ সূচি, দল গঠন ও খেলোয়াড় ব্যবহারের সিদ্ধান্ত প্রায়ই ক্রীড়াগত যুক্তির চেয়ে বেশি বাজার, সম্প্রচার ও বিজ্ঞাপন চাহিদার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারতের আধিপত্য এই সময়ে কেবল মাঠের পারফরম্যান্সের ফল নয়; বরং তা আর্থিক ক্ষমতা, সম্প্রচার বাজারের কেন্দ্রীভবন এবং প্রশাসনিক প্রভাবের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এর ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যায় এবং খেলাটির বৈশ্বিক শাসন কাঠামোতে ভারত একটি নির্ধারক শক্তিতে পরিণত হয়। এই আধিপত্য একদিকে ভারতের ক্রিকেটারদের সুযোগ ও দৃশ্যমানতা বাড়ালেও, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ন্যায় ও প্রতিযোগিতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

ফুটবল জগতে এই সময়ের রূপান্তর ছিল আরও সংঘাতপূর্ণ। ঐতিহ্যবাহী লিগ, ক্লাব সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গায় কর্পোরেট-নিয়ন্ত্রিত ফ্র্যাঞ্চাইজি কাঠামো চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা ফুটবল সমাজে তীব্র মতবিরোধ সৃষ্টি করে। পুরোনো ক্লাবগুলির সামাজিক শিকড়, শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত সমর্থক সংস্কৃতি এবং বহু দশকের স্মৃতিবাহী প্রতিযোগিতা ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়ে। ফুটবল এখানে আর সামাজিক পরিচয় ও স্থানীয় ইতিহাসের ধারক থাকে না; বরং শহুরে মধ্যবিত্ত বিনোদনের পণ্য হয়ে ওঠে। Indian Super League ও I-League–এর দ্বন্দ্ব তাই কেবল প্রশাসনিক নয়, বরং ক্রীড়ার রাজনৈতিক অর্থনীতির সংঘাতের প্রতীক—যেখানে বাজারের যুক্তি ঐতিহ্যের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে।

এই পর্বে টেবল টেনিস ও ব্যাডমিন্টনের আন্তর্জাতিক সাফল্য একটি ভিন্ন ধারা নির্দেশ করে। এই খেলাগুলিতে রাষ্ট্র, কর্পোরেট ও ব্যক্তিগত উদ্যোগের এক সীমিত কিন্তু কার্যকর সমন্বয় দেখা যায়। পেশাদার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আন্তর্জাতিক কোচিং, বিদেশি লিগে অংশগ্রহণ এবং কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতার ফলে ভারতীয় খেলোয়াড়রা বৈশ্বিক মঞ্চে দৃশ্যমানতা অর্জন করে। তবে এই সাফল্য মূলত শহরভিত্তিক, মধ্যবিত্ত শ্রেণিনির্ভর এবং নির্বাচিত অ্যাথলিটকেন্দ্রিক ছিল। গ্রাসরুট স্তরে ব্যাপক সামাজিক অংশগ্রহণ বা গণতান্ত্রিক বিস্তারের মাধ্যমে নয়, বরং ‘তারকা উৎপাদন’-এর মাধ্যমে এই সাফল্য গড়ে ওঠে—যা দীর্ঘমেয়াদে কাঠামোগত দুর্বলতা বহন করে।

২০০৭–২০২৩ সময়ে ক্রীড়া জগতে বড় বুর্জোয়ার দখলদারি ক্রমশ সুসংহত হয়। লিগ মালিকানা, সম্প্রচার সংস্থা, স্পনসরশিপ নেটওয়ার্ক এবং ক্রীড়া প্রশাসনের উচ্চস্তরে সীমিত সংখ্যক কর্পোরেট গোষ্ঠীর প্রভাব কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। এই কেন্দ্রীভবন ক্রীড়াকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করলেও, একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা ও সামাজিক জবাবদিহির ক্ষেত্র সংকুচিত করে। ছোট ক্লাব, স্থানীয় প্রতিযোগিতা ও সমর্থক সংগঠনের ভূমিকা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে যায়।

এই সময়কালকে সম্পূর্ণভাবে বোঝার জন্য রাজনৈতিক মতাদর্শের ভূমিকা উপেক্ষা করা যায় না। ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ক্রীড়া জগতে দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদ ও হিন্দুত্ববাদী ভাষ্যের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ক্রীড়া সাফল্যকে জাতীয় গৌরবের সরলীকৃত প্রতীকে রূপান্তর করা হয়, যেখানে বহুত্ববাদী সমাজ ও শ্রেণিগত বৈষম্যের প্রশ্ন আড়ালে চলে যায়। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ক্রীড়া ক্রমশ ‘আমরা বনাম তারা’ দ্বন্দ্বে পরিণত হয়। দর্শক সংস্কৃতিতেও এই প্রবণতা প্রতিফলিত হয়—স্টেডিয়াম ও ডিজিটাল মাধ্যমে সমর্থন রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে মিশে যায় এবং উগ্র আবেগ প্রাধান্য পায়।

ক্রিকেটের ক্ষেত্রে এই জাতীয়তাবাদী প্রবণতা সবচেয়ে তীব্র। আন্তর্জাতিক ম্যাচে খেলোয়াড়রা কেবল ক্রীড়াবিদ নয়, জাতীয় প্রতীকে রূপান্তরিত হন। ভিন্নমত, সমালোচনা বা ক্রীড়াগত ব্যর্থতার বিশ্লেষণ প্রায়ই দেশদ্রোহের অভিযোগে পর্যবসিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় ক্রীড়া নাগরিক সংলাপের ক্ষেত্র না থেকে আবেগনির্ভর রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত হয়।

ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটেও বিতর্ক কম ছিল না। Indian Premier League একদিকে পেশাদারিত্ব, আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতা ও বিপুল আর্থিক প্রবাহ এনেছে, অন্যদিকে ম্যাচের অতিবাণিজ্যিকীকরণ, সময়সূচির চাপ, নৈতিক প্রশ্ন ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার সংকট উন্মোচন করেছে। আইপিএল–সংক্রান্ত বিতর্কগুলি ক্রীড়া ও পুঁজির সম্পর্কের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।

সব মিলিয়ে ২০০৭–২০২৩ সময়কাল ভারতীয় ক্রীড়া ইতিহাসে এক দ্বন্দ্বপূর্ণ ও ভবিষ্যৎ-নির্ধারক অধ্যায়। এই পর্বে ক্রীড়া অভূতপূর্ব আর্থিক বিস্তার, পেশাদারিত্ব ও আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতা অর্জন করলেও, একই সঙ্গে তার সামাজিক ভিত্তি, গণতান্ত্রিক চরিত্র ও বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক ভূমিকা সংকুচিত হয়েছে। কর্পোরেট আগ্রাসন, ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রতিযোগিতা এবং দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদের সংযোগ ক্রীড়াকে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় স্থাপন করেছে—যেখানে খেলা আর কেবল আনন্দ বা সামাজিক সংহতির ক্ষেত্র নয়, বরং ক্ষমতা, পরিচয় ও মতাদর্শের লড়াইয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।

এই কারণে ২০০৭–২০২৩ পর্বকে কেবল ‘সাফল্য ও পেশাদারিত্বের যুগ’ হিসেবে নয়, বরং ভারতীয় ক্রীড়ার রাজনৈতিক অর্থনীতির এক জটিল, বিতর্কিত ও দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাতসম্পন্ন অধ্যায় হিসেবে পাঠ করা প্রয়োজন।


এই সময়কালকে বোঝার জন্য কেবল অর্থনীতি নয়, রাজনৈতিক মতাদর্শের ভূমিকাও বিবেচনা করা জরুরি। ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ক্রীড়া জগতে দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদের প্রভাব ক্রমশ দৃশ্যমান হয়। ক্রীড়া সাফল্যকে জাতীয় গৌরবের সরলীকৃত প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যেখানে জটিল সামাজিক বাস্তবতা ও বহুত্ববাদী পরিচয় আড়াল হয়ে যায়। উগ্র জাতীয়তাবাদী ভাষ্য ক্রীড়াকে ‘আমরা বনাম তারা’ দ্বন্দ্বে রূপান্তরিত করে, বিশেষত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায়। দর্শক সংস্কৃতিতেও এই ঝোঁক প্রতিফলিত হয়—স্টেডিয়াম ও ডিজিটাল মাধ্যমে ক্রীড়া সমর্থন ক্রমশ রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে মিশে যায়।

ক্রিকেটের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা সবচেয়ে তীব্র। আন্তর্জাতিক ম্যাচে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা প্রায়ই জাতীয়তাবাদী আবেগের বহিঃপ্রকাশে পরিণত হয়, যেখানে খেলোয়াড়রা কেবল ক্রীড়াবিদ নয়, জাতীয় প্রতীকে রূপান্তরিত হন। এই প্রক্রিয়ায় ভিন্নমত, সমালোচনা বা বহুস্বরিক আলোচনা প্রায়ই ‘দেশবিরোধী’ আখ্যা পায়। ক্রীড়া এখানে নাগরিক সংলাপের ক্ষেত্র না থেকে একধরনের আবেগনির্ভর রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত হয়।

এই পর্বকে তাই কেবল ‘সাফল্যের যুগ’ বা ‘পেশাদারিত্বের যুগ’ হিসেবে নয়, বরং ভারতীয় ক্রীড়ার রাজনৈতিক অর্থনীতির এক জটিল, বিতর্কিত ও ভবিষ্যৎ-নির্ধারক অধ্যায় হিসেবে দেখা প্রয়োজন।



দশম পর্বে থাকবেঃ ২০০৭–২০২৩ সময়ে ভারতীয় ক্রীড়া কর্পোরেট পুঁজি, ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ ও উগ্র জাতীয়তাবাদের সংযোগে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করে—যেখানে সাফল্য ও পেশাদারিত্বের আড়ালে ক্রীড়ার সামাজিক ভিত্তি, গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ে।


প্রকাশের তারিখ: ০৭-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org