|
ভারত,নয়া ফ্যাসিবাদ ও নভেম্বর বিপ্লব (দ্বিতীয় পর্ব)Samik Lahiri |
রিলায়েন্স ইন্ড্রাটিজ (জ্বালানি, শোধনাগার এবং রিটেল সহ একাধিক ক্ষেত্রে) এবং আদানি গ্রুপ (পোর্ট, বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিমানবন্দর, কয়লা এবং সিমেন্ট ক্ষেত্রে) বহু গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো এবং শিল্পে নিজেদের ক্ষমতা ও বাজারের অংশীদারি দ্রুত বৃদ্ধি করেছে। |
রিলায়েন্স ইন্ড্রাটিজ (জ্বালানি, শোধনাগার এবং রিটেল সহ একাধিক ক্ষেত্রে) এবং আদানি গ্রুপ (পোর্ট, বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিমানবন্দর, কয়লা এবং সিমেন্ট ক্ষেত্রে) বহু গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো এবং শিল্পে নিজেদের ক্ষমতা ও বাজারের অংশীদারি দ্রুত বৃদ্ধি করেছে। এদের হাতে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলির নিয়ন্ত্রণ ঘনীভূত হয়েছে। দ্রুত ক্রমবর্ধমান ই-কমার্স এবং সংগঠিত খুচরো বাজার দখলের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা। ই-কমার্স বাজারের প্রায় ৮০% মাত্র দুটি প্রধান প্ল্যাটফর্ম ভিত্তিক কোম্পানি আমাজন এবং ফ্লিপকার্ট-এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। রিলায়েন্স রিটেল তার বিপণী এবং অনলাইন-এর মাধ্যমে (আজিও এবং জিওমার্ট) সংগঠিত খুচরো পণ্য বিক্রির বাজারের বড় অংশ দখল করছে। ফলে ছোট স্থানীয় দোকানদার ও বিক্রেতাদের সামনে অস্তিত্ব রক্ষার কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে কর্পোরেটদের দর কষাকষির ক্ষমতা বেড়ে গেছে। এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে, ভারতের অর্থনীতিতে পুঁজির কেন্দ্রীভবন শুধুমাত্র সম্পদের বৈষম্য নয়, বরং এটি কর্পোরেট স্তরেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাজারের নিয়ন্ত্রণকে সীমিত সংখ্যক কর্পোরেট সংস্থার হাতে তুলে দিচ্ছে, যা অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিবেশকে ধ্বংস করছে। আদানি গোষ্ঠী হলো কর্পোরেট ক্ষমতার ঘনীভবনের প্রতীক, বিশেষত মোদি সরকার ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে। আদানি গোষ্ঠীর কৌশল হলো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও পরিকাঠামো খাতে একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। বন্দর এবং লজিস্টিকস - আদানি পোর্টস অ্যান্ড স্পেশাল ইকোনমিক জোন (APSEZ) ভারতের সামুদ্রিক বাণিজ্যের সিংহভাগই নিয়ন্ত্রণ করে। আদানি গোষ্ঠী ভারতের মোট কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের ২৫%-এর বেশি নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের মুন্দ্রা পোর্ট দেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক বন্দর। এছাড়াও তারা পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলের ১৪টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অধিগ্রহণ করেছে। বন্দরের মতো অপরিহার্য জাতীয় পরিকাঠামোর এই একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য এবং সামগ্রিক লজিস্টিকস খরচকে নিয়ন্ত্রণ করছে। শক্তি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন - আদানি পাওয়ার এবং আদানি গ্রিন এনার্জি বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিতরণ এবং রিনিউয়েবল শক্তি ক্ষেত্রে বিশাল প্রভাব বিস্তার করেছে। এদের হাতে বর্তমানে অন্যতম বৃহৎ তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে। এছাড়া, তারা ভারতের বৃহত্তম রিনিউয়েবল শক্তি উৎপাদনকারী সংস্থাগুলির মধ্যে অন্যতম। তাদের প্রকল্পগুলি কয়লা খনি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ বিতরণ (যেমন মুম্বাই, আহমেদাবাদ এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রকল্প) পর্যন্ত পুরো মূল্য শৃঙ্খল (Value Chain) জুড়ে বিস্তৃত। পণ্য বা পরিষেবা উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে যেমন, কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদন, প্যাকেজিং, এবং বিতরণ/বিক্রয় ক্ষেত্রে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করে অন্যান্য প্রতিযোগীদের বাজারে প্রবেশ প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে। বিমানবন্দর – এই ক্ষেত্রে আদানি গোষ্ঠীর দ্রুত বিস্তার কর্পোরেট ঘনীভবনের আর একটি বড় উদাহরণ। ২০১৯ সাল থেকে আদানি গোষ্ঠী দ্রুত ভারতের গুরুত্বপূর্ণ আটটি প্রধান বিমানবন্দর - মুম্বাই, আহমেদাবাদ, জয়পুর, লখনউ, গুয়াহাটি, ম্যাঙ্গালুরু, তিরুবনন্তপুরম, এবং নভি- মুম্বাই পরিচালনা করছে অথবা তার উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত। ভারতের মোট যাত্রী পরিবহনের প্রায় ২৫% এই বিমানবন্দরগুলিতেই হয়। এই নিয়ন্ত্রণ জাতীয় বিমান চলাচল এবং সংশ্লিষ্ট পরিকাঠামোতে তাদের ক্ষমতাকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে। খাদ্য সামগ্রী এবং কৃষিপণ্য - আদানি উইলমার ফরচুন ব্র্যান্ডের অধীনে ভোজ্য তেল এবং অন্যান্য খাদ্য সামগ্রীর ক্ষেত্রে একটি বৃহৎ বাজার অংশীদার। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ, গুদামজাতকরণ এবং বিতরণের ক্ষেত্রে তাদের বিপুল ক্ষমতা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং দাম নিয়ন্ত্রণের ওপরও প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলছে। তাদের হাতে ৩০.১ লক্ষ বর্গফুট গুদাম আছে খাদ্যশস্য মজুত করার জন্য। তারা একাই ৬,০০০-এর বেশি কন্টেনার এবং ১০০টিরও বেশি মালবাহী ট্রেন (ট্রেন অপারেটর লাইসেন্স সহ) পরিচালনা করে, যা তাদের গুদামজাত পণ্যের পরিবহণ ও বিতরণের ক্ষমতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ১১টিরও বেশি মাল্টি-মোডাল লজিস্টিকস পার্ক পরিচালনা করে, যা রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। আদানি গোষ্ঠীর এই বহুমাত্রিক উপস্থিতি অর্থনীতির একাধিক কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তাদের ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করেছে। এই ঘনীভবন বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা নষ্ট করছে, ফলে ছোট প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাজারে প্রবেশ অসম্ভব, এবং শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনৈতিক নীতিগুলিকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। এটাই লগ্নী পুঁজির প্রকাশ, যেখানে কয়েকটি বৃহৎ পুঁজির স্বার্থে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও নীতিগুলি পরিচালিত হয়। আদানি গ্রুপের মোট আনুমানিক সম্পদ ৭০ বিলিয়ন থেকে ৯০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ ১ মার্কিন ডলারের মূল্য ৮৮ টাকা বিনিময় হারে তাঁর মোট সম্পদের মূল্য আনুমানিক ৬ লক্ষ ১৬ হাজার কোটি টাকা থেকে ৭ লক্ষ ৯২ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। একইরকম ভাবে আর এক ধনকুবের মুকেশ আম্বানী গ্রুপের মোট সম্পদের পরিমান ৯০ বিলিয়ন থেকে ১১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ৮৮ টাকা বিনিময় হারে তাঁর মোট সম্পদের মূল্য আনুমানিক ৭ লক্ষ ৯২ হাজার কোটি টাকা থেকে ৯ লক্ষ ৬৮ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। শেয়ার বাজারের ওঠানামা এবং বিনিময় হারের তারতম্যের কারণে এই সংখ্যাটি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের বাৎসরিক মোট আভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (১৫-১৭ লক্ষ কোটি টাকা) প্রায় সমান অথবা বেশি এই দু’জনের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ। লগ্নী পুঁজি ও রাষ্ট্রের ভূমিকা পুঁজির এই কেন্দ্রীভবন লগ্নী পুঁজির চূড়ান্ত প্রকাশ। এখানে রাষ্ট্র সরাসরি অতি বৃহৎ পুঁজির স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে। সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত যেমন কর ছাড়, ঋণদানের সুবিধা, বাণিজ্যের নিয়মাবলী বৃহৎ কর্পোরেটদেরই সুবিধা দেয়, যা ছোট ও মাঝারি সংস্থাগুলির অস্তিত্বের সঙ্কটে ফেলে দিয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সম্পদ বেসরকারীকরণ করে বৃহৎ কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়াও পুঁজির কেন্দ্রীভবনের একটি প্রক্রিয়া, যেখানে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যক্তিগত পুঁজির হাতে ঘনীভূত হয়। এই সমস্ত তথ্য প্রমাণ করে যে, ভারতে পুঁজিবাদের বর্তমান বিকাশ, পুঁজি ও সম্পদকে সমাজের চূড়ায় থাকা ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর হাতে ঘনীভূত করছে, যা লগ্নী পুঁজির একনায়কতন্ত্রের আধুনিক রূপ। এখন এই লগ্নী পুঁজি কার্যত লুটেরা পুঁজি বা ক্রোনি পুঁজিতে পরিণত হয়েছে। এরসাথে যুক্ত হয়েছে উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের মাধ্যমে জনসমর্থন সংগ্রহ করা, যা ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে দুর্বল করছে। কর্পোরেট-সাম্প্রদায়িকতার এই গাঁটছড়া দেশকে নতুনতর বিপদের মুখে ফেলেছে। যুক্তফ্রন্ট ভারতের বামপন্থী ও উদারনৈতিক-গণতান্ত্রিক দলগুলো বর্তমানে 'সংবিধান বাঁচাও' স্লোগানের মাধ্যমে যে ঐক্যবদ্ধ লড়াই ‘ইন্ডিয়া মঞ্চ’ গড়ে তোলার মাধ্যমে চেষ্টা করছে, তা ঐতিহাসিকভাবে ফ্যাসিবাদ-বিরোধী যুক্তফ্রন্টের কৌশলকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। নভেম্বর বিপ্লব শুধু একটি দেশকে সমাজতন্ত্রের পথে নিয়ে যায়নি, এটি বিশ্বকে এমন একটি আদর্শগত ও সামরিক কেন্দ্র দিয়েছিল যা ফ্যাসিবাদ নামক পুঁজিবাদের নগ্নতম হিংস্র রূপকে চূড়ান্তভাবে পরাস্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। এই দুটি ঘটনা প্রমাণ করে যে, পুঁজিবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত মুক্তি কেবল সমাজতান্ত্রিক পথেই সম্ভব। সেই মতাদর্শের অনুপ্রেরণা আজও বিশ্বজুড়ে শোষিত শ্রেণী এবং গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির কাছে ফ্যাসিবাদী প্রবণতা ও পুঁজিবাদের সংকটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পথ দেখায়। প্রকাশের তারিখ: ১৬-নভেম্বর-২০২৫ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|