|
ভারতের মুক্তি সংগ্রাম ও মহান নভেম্বর বিপ্লব ( পর্ব - ২)Arnab Bhattacharyya |
১৯২১ সালে রাশিয়া যান ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত যার আরেকটি পরিচয় স্বামী বিবেকানন্দের ছোট ভাই। এই বিশিষ্ট মার্কসবাদী চিন্তাবিদ লেনিনের কাছে তার ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সংক্রান্ত থিসিস পেশ করেন। লেনিন তাকে ভারতবর্ষে কৃষকদের সংঘটিত করবার জন্য পরামর্শ দেন। |
| ১৯২১ সালে রাশিয়া যান ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত যার আরেকটি পরিচয় স্বামী বিবেকানন্দের ছোট ভাই। এই বিশিষ্ট মার্কসবাদী চিন্তাবিদ লেনিনের কাছে তার ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সংক্রান্ত থিসিস পেশ করেন। লেনিন তাকে ভারতবর্ষে কৃষকদের সংঘটিত করবার জন্য পরামর্শ দেন। পরবর্তীকালে ১৯২৪ সালে দীর্ঘ ১৬ বছর পর দেশে ফিরে তিনি শ্রমিক ও কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার কাজে ব্রতী হন। তিনি বঙ্গীয় কৃষক সভা এবং অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (AITUC)-এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিশিষ্ট ঐতিহাসিক গৌতম চট্টোপাধ্যায় ব্রিটিশ সরকারের গোয়েন্দা দপ্তরের নথি থেকে এই তথ্য উদ্ধার করেছেন যে ১৯২২ সালে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল এর চতুর্থ কংগ্রেসের আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছিল পাঁচজন স্বাধীনতা সংগ্রামী যা ব্রিটিশ পুলিশের হস্তক্ষেপের জন্য তাদের কাছে পৌঁছোতে পারেনি। এই পাঁচজন ছিলেন- মানবেন্দ্রনাথ রায়, এস এ ডাঙ্গে, নলিনী গুপ্ত, সুভাষচন্দ্র বোস ও চিররঞ্জন দাস যিনি ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাসের পুত্র। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের চতুর্থ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন প্রখ্যাত গদর বিপ্লবী ভাই সন্তোখ সিং ও রতন সিং। সন্তোখ সিং রাশিয়ার বিপ্লবের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে এদেশে শ্রমিক- কৃষক মৈত্রী গড়ে তোলার লক্ষ্যে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯২৬ সালে তিনি পাঞ্জাবি ও উর্দু ভাষায় "কীর্তি" পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং কৃষক আন্দোলনের যোগ দেন। বিপ্লবী ভগৎ সিংহ কয়েক মাস এই পত্রিকার সম্পাদনের কাজে যুক্ত ছিলেন। ১৯৩৬ সালে কমিউনিস্টরাই গড়ে তোলেন দেশের সর্ববৃহৎ কৃষক সংগঠন সারা ভারত কৃষক সভা যা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে কৃষক সমাজকে সামিল করার ক্ষেত্রে এবং উপনিবেশিক ও সামন্ততান্ত্রিক শোষণ থেকে দেশকে মুক্ত করার সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সাফল্য ভারতবর্ষের বিপ্লবীদের বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। ভগৎ সিং, আশফাক উল্লাহ খান, চন্দ্রশেখর আজাদের মত প্রাতঃস্মরণীয় বিপ্লবীরা এই সময় সমাজতন্ত্রের আদর্শ উদ্বুদ্ধ হন। ![]() ভগৎ সিংহ
এদের নেতৃত্বে পরিচালিত "হিন্দুস্তান রিপাবলিকান আর্মি"র নাম পরিবর্তন করে "হিন্দুস্তান সোস্যালিস্ট রিপাবলিকান আর্মি" করা হয়। ভগৎ সিং এর সহযোদ্ধা পরবর্তীতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অজয় ঘোষ তার স্মৃতিচারণায় লিখেছেন, ' ( ১৯২২ সালে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার হওয়ার পর) আমাদের মধ্যে দীর্ঘক্ষন আলোচনা হতো যে এই নিস্তরঙ্গ বদ্ধদশা কিভাবে কাটানো যায়। সমাজতান্ত্রিক সাহিত্য তখন একটু একটু করে পাওয়া যাচ্ছিল । অক্টোবর বিপ্লবের বিজয়, রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি বৃদ্ধি এবং সবচেয়ে বড় কথা তুরস্ক ও চীনের মত দেশকে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তা এই নতুন সমাজতান্ত্রিক দেশের প্রতি তারা যে আদর্শের মূর্ত প্রতীক তার প্রতি আকৃষ্ট করে।" দ্বিতীয় লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় বন্দী থাকাকালীন ১৯৩০ সালের একুশে জানুয়ারি লেনিনের মৃত্যু দিবসে ভগৎ সিং আদালত থেকে তার টেলিগ্রাম বার্তা শোনান," এই লেনিন দিবসে আমরা তাদের সকলকে শুভেচ্ছা জানাই যারা মহান লেনিনের ভাবনাকে বাস্তবায়িত করার চেষ্টা করছেন। রাশিয়াতে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে আর সাফল্য আমরা কামনা করি। আমরা আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনকে সমর্থন করি। সর্বহারার জয় হবে পরাস্ত হবে পুঁজিবাদ। সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক!" কারাগারে মার্কসীয় বইপত্র পাঠ করতেন ভগৎ সিং।জানা যায় যে ফাঁসির দিন ভগত সিং জার্মান মার্কসবাদী ক্লারা জেটকিনের লেখা " রেমিনেসেন্সেস অফ লেনিন" নামের বইটি পড়ছিলেন। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামকে নানাভাবে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকতাবাদীরা সমৃদ্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য রজনী পাম দত্ত, বেন ব্র্যাডলির মত শ্রদ্ধেয় মানুষের ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অবিস্মরণীয় অবদান রয়েছে। ভারত ও রাশিয়া উভয়েই ছিল বিশাল কৃষি প্রধান দেশ। সোভিয়েত রাশিয়া যেভাবে দারিদ্র, নিরক্ষরতা ও পশ্চাৎপদতার মোকাবিলা করছিল তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জহরলাল নেহেরু প্রমুখের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মহাত্মা গান্ধী অহিংসার আদর্শে বিশ্বাসী হলেও রুশ বিপ্লবের পর তিনি লেখেন, " বলশেভিকদের আদর্শের পিছনে অসংখ্য নরনারীর পবিত্রতম আত্ম বলিদান আছে যারা তাদের সমস্ত কিছু এই আদর্শের জন্য ত্যাগ করেছেন; এমন এক আদর্শ যা লেনিনের মত মহাত্মার আত্মত্যাগের দ্বারা পরিশুদ্ধ হয়েছে তা কখনো ব্যর্থ হতে পারে না।" রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাশিয়ায় গিয়ে সাধারণ মানুষের যে সামগ্রিক উত্তরণ দেখেছিলেন তাতে তিনি মুগ্ধ হয়ে যান। "রাশিয়ার চিঠি"তে সেই অসামান্য অভিজ্ঞতার কথা তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন।
![]() রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভারত সহ বিশ্বের নানা দেশের মুক্তিকামী মানুষের কাছে সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়ে উঠেছিল ঔপনিবেশিক ও পুঁজিবাদী শোষণের বিকল্প । ১৯২৯ সালের মহামন্দার সময় যখন পুঁজিবাদী দুনিয়া তলিয়ে যাচ্ছিল সংকটের গহবরে তখন সোভিয়েত রাশিয়া ছিল অন্ধকারে জ্বলন্ত মশালের মত উজ্জল। ই এম এস নাম্বুদ্রিপাদ লিখেছেন, " পুঁজিবাদের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর অর্থনৈতিক সংকট চলছে, আর তারই পাশাপাশি অনগ্রসর একটা দেশ রাশিয়া রুদ্ধশ্বাস গতিতে ছুটে চলেছে নিজেকে আধুনিক করে গড়ে তোলার পথে- এই ব্যাপারটা প্রতিটি ভারতবাসীর চোখ খুলে দিচ্ছিল বৈকি।" অক্টোবর বিপ্লব সামাজিক শোষণ থেকে মুক্তির সংগ্রামেও অন্যতম পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে। প্রবাদপ্রতিম সমাজ সংস্কারক ও দ্রাবিড় আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ই ভি রামস্বামী পেরিয়ার রাশিয়ায় তিন মাস কাটান। তাঁর প্রকাশিত পত্রিকা, "কুডি আরাসু"তে ১৯৩১ সালের ৪ অক্টোবর কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো সম্পর্কে সম্পাদকীয় লেখা হয় এবং এই পত্রিকাতেই তামিল ভাষায় কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর অনুবাদ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।এই অনুবাদ করেছিলেন পি. জীবানন্দন। দক্ষিণ ভারতে " Self Respect Movement " সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল। সারা ভারতে কমিউনিস্টদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের পরিপ্রেক্ষিতে আতঙ্কিত হয়ে ১৯৩৪ সালে ব্রিটিশ সরকার কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করে। যদিও তার আগেও কমিউনিস্টদের গোপনেই কার্যকলাপ পরিচালিত করতে হতো। রুশ বিপ্লবের শিক্ষা ভারতবর্ষে স্বাধীনতা সংগ্রামের গণভিত্তিকে প্রসারিত করে এবং এই সংগ্রামকে রাজনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে পর্যবসিত করবার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। স্বাধীনতার পর যে সংবিধান গৃহীত হয়েছিল সেখানেও রুশ বিপ্লবের মহৎ আদর্শের আংশিক প্রতিফলন রয়েছে। অক্টোবর বিপ্লব এক নতুন ঐতিহাসিক যুগের সূচনা করে। আমাদের দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন সেই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের যুগান্তকারী প্রভাবের সাক্ষ্য বহন করছে। প্রকাশের তারিখ: ০৮-নভেম্বর-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|