|
প্রশাসন অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে ?Parthapratim Biswas |
রাজ্যে বাম সরকারের বিদায়ের পর গত পনেরো বছরে উত্তরবঙ্গে বন্যা নিয়ন্ত্রণের পরিকাঠামো হিসাবে নদীবাঁধ, ব্যারেজ, নিকাশি নালা কিংবা খালের সংস্কার কিংবা নতুন সেতু নির্মাণ হয়নি। অথচ এই পনেরো বছরে বিজ্ঞান প্রযুক্তির অগ্রগতির দৌলতে আবহাওয়ার আগাম পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে, নিম্নচাপ থেকে অতিবৃষ্টি কিংবা খরা থেকে বন্যা সবেতেই। |
রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন এই নগরায়ন আর প্রকৃতির বিনাশ আমাদের জীবন আর পরিবেশের ভারসাম্যকে একদা-বিপদে ফেলবে। সেই প্রেক্ষিতে তিনি লিখেছিলেন ‘ প্রকৃতিকে অতিক্রমন কিছুদূর পর্যন্ত সয় , তারপরে আসে বিনাশের পালা ‘ । এই প্রেক্ষিতে জলবায়ু পরিবর্তনে দেশজুড়ে বিনাশের পালা ভাবিয়ে তুলছে আমাদের একের পর এক বিপর্যয়ে, যার সর্বশেষ নজির হল উত্তরবঙ্গের বিধ্বংসী বন্যা । রাজ্যের সরকার পরিচালনায় যখন পরিবেশ উপেক্ষিত হয় , প্রকৃতি ব্রাত্য হয় তখন আধুনিকতার মোড়কে উন্নয়নের ধ্বংসলীলা চলে অবাধে যার খেসারত হিসাবে প্রান দিতে হয় চল্লিশ জন মানুষকে। রেড এলার্ট : উৎসবে মত্ত প্রশাসন রাজ্যে প্রাক পূজার একরাতের অতিবৃষ্টিতে দক্ষিণবঙ্গে প্রাণ হারিয়েছিল বারো জন মানুষ, কলকাতা শহরের জমা জলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে। আর পুজো শেষে এক রাতের বৃষ্টিতে জলের তোড়ে ভেসে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে উত্তরবঙ্গের চল্লিশ জন মানুষ। উৎসবমুখর এই বাংলায় রাজ্যের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী পুজো কার্নিভালে ঢাকের বাদ্যিতে তাল দিয়েছেন এই বিপর্যয়ের আবহেও । ‘ রেড এলার্টে’ জলের তোড়ে উত্তরবঙ্গের পাহাড় থেকে ডুয়ার্স যখন মানুষ কাঁদছে তখন উৎসবের অট্টহাস্যে মশগুল ছিল কোলকাতার রেড রোড জুড়ে রাজ্যের গোটা প্রশাসন ! ইউনেস্কোর বিশেষ সম্মান প্রাপ্তিকে ঢাল বানিয়ে এখন শহরের পুজোয় বিসর্জনের শোভাযাত্রা কার্নিভালে পরিণত হয়েছে। কিন্তু উৎসবের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উদযাপনে রাজ্যে মানুষের নিরাপদ পরিকাঠামোর প্রয়োজন যে সবার আগে সেই বোধটাই হারিয়ে ফেলেছে রাজ্য প্রশাসন। পূজোর আগে কিংবা পুজো শেষে মৃত্যুর যে কার্নিভাল দেখল রাজ্যবাসী তাতে রাজ্যের পরিকাঠামোর বেহাল অবস্থা আর বিপর্যয় মোকাবিলার সরকারি প্রস্তুতির ভয়াবহ খামতি উঠে এসেছে কলকাতা থেকে মিরিক কিংবা সুখিয়াপোখরি থেকে নাগরাকাটা সর্বত্রই । বিপর্যয় মোকাবিলার ক্ষেত্রে বিপর্যয় চলাকালীন বিপন্ন মানুষকে উদ্ধারের প্রশাসনিক পরিকল্পনা যতটা জরুরী তার চেয়েও বেশি জরুরী বিপর্যয়ের আগে বিপর্যয়ের অভিঘাত কমানোর পূর্ব পরিকল্পনা এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি। সন্দেহ নেই অতিবৃষ্টির নিরিখে এবার উত্তরবঙ্গ এই শতাব্দীতে নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। ফলে সেই ভয়াবহ বৃষ্টির ধাক্কায় সড়ক-সেতু থেকে শুরু করে হোটেল-হোমস্টের নির্মাণ কাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো দুঃসাধ্য ছিল। কিন্তু বিপর্যয় মোকাবিলার পূর্ব প্রস্তুতি থাকলে উত্তরবঙ্গ জুড়ে মানুষের এই মৃত্যুমিছিল দেখতে হতো না। প্রাক পূজার বৃষ্টিতে জলমগ্ন কলকাতা শহরের ভয়াবহ চেহারায দেখে রাজ্য সরকার গোটা রাজ্যে পুজোর ছুটি দুদিন এগিয়ে এনেছিলেন যখন উত্তরবঙ্গ ছিল স্বাভাবিক । কিন্তু উত্তরবঙ্গে যখন ভয়াবহ বন্যায় অস্বাভাবিক অবস্থা তখন সরকারের প্রশাসনিক সক্রিয়তা দুদিন পিছিয়ে শুরু হয়েছিল কার্নিভালের ব্যস্ততায় । প্রশাসনের চোখে মৃত্যুর কার্নিভালের শোকের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল উৎসবের কার্নিভাল উদযাপন। কার্যত এমন উদযাপন সরকারের ন্যূনতম সংবেদনশীলতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে জনমানসে। বিপন্ন পাহাড়ের নিকাশি পথ জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় সমতলে অতিবৃষ্টির দাপটে কলকাতা, দিল্লী, মুম্বাইয়ের মত মেগাসিটিগুলি দিনের পর দিন জলরুদ্ধ হয়ে থাকলেও পাহাড়ে অতিবৃষ্টির প্রভাব একেবারেই ভিন্ন। শহরে অতিবৃষ্টির জল যেমন ধেয়ে চলে শহরের নিকাশি ব্যবস্থা দিয়ে ঠিক তেমনই পাহাড়ে বৃষ্টির জলের নিকাশির পথ হল সেই পাহাড়ের গা বেয়ে ছুটে চলা ঝোরা আর পাহাড় সংলগ্ন উপত্যকা দিয়ে বয়ে চলা নদীগুলি । শহরের নিকাশি নালার ধারন ক্ষমতার চেয়ে বেশি বৃষ্টির জলের তোড়ে যেমন নালার আশেপাশের রাস্তাঘাট ভেসে যায় ঠিক তেমনটাই ঘটে বেশি বৃষ্টির সময় পাহাড়ি উপত্যকার নদিগুলিতেও । পাহাড়ের ঢাল জুড়ে অতিবৃষ্টির জল দ্রুত নেমে আসে সেই পাহাড় সংলগ্ন উপত্যকার কাছের নদীখাতে। পাহাড়ি অঞ্চলের নদীগুলির গভীরতা তুলনায় কম। ফলে সেগুলির জলধারণ ক্ষমতাও কম। এমন অবস্থায় অতিবৃষ্টির দাপটে, অতি দ্রুত নদী সংলগ্ন উপত্যকা থেকে বৃষ্টির জল ধেয়ে এসে নদীতে পড়লে আচমকা প্রবল বন্যার চেহারা নেয়। ফলে তখন অগভীর নদীখাতগুলি হয়ে ওঠে অতিবৃষ্টির আবহে বিপদের ভরকেন্দ্র। পাহাড়ি নদী সংলগ্ন উপত্যকার পাহাড়ি ঢাল যত খাড়া হয় কিংবা যত নেড়া হয় ততো দ্রুত সেই নদীখাতে বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হয়। ফলে সেই তীব্র বানের সময় নদীখাত ছাপিয়ে জল নদীর পাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে প্লাবিত করে। আর নদীখাতের ধার ঘেঁষে তৈরি হওয়া জনপদে হোটেল- হোমস্টে থেকে দোকান বাজার সবই বন্যার জলে খড়কুটোর মতো উড়ে যায়। এবারের অতি বৃষ্টির দাপটে উত্তরবঙ্গের পাহাড় এবং ডুয়ার্স জুড়ে এমনটাই ঘটেছে । এবার এই ভয়াবহ বিপর্যয়ে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ১২ ঘণ্টায় ২০০ থেকে ৩০০ মিলিমিটার। সন্দেহ নেই এমন ভয়াবহ বৃষ্টির পূর্বাভাস ছিল আবহাওয়া দপ্তর থেকেই। কিন্তু অতিবৃষ্টির দাপট যে কি ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে পাহাড়ি অঞ্চল জুড়ে সেই সম্পর্কে সঠিক এবং সম্যক ধারনা করতে ব্যর্থ স্থানীয় প্রশাসন। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অভিঘাত অনুমানে ভুল হলে বিপর্যয় মোকাবিলা করাটাও ততোধিক কঠিন হয়। আর তখনই রাস্তাঘাট , সড়ক-সেতু, বাড়ি-ঘর ধ্বংসের পাশাপাশি মানুষের জীবনের ঝুঁকিও বেড়ে চলে। বেড়ে চলে মানুষের মৃত্যু মিছিল লাফিয়ে লাফিয়ে। ভাবমূর্তির ক্ষতিপূরণ এই বেনজির প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সাথে নজিরবিহীন প্রশাসনিক গাফিলতি এবারের বিপর্যয়কে কার্যত ‘ম্যান মেড ডিজাস্টার’ বানিয়ে ছেড়েছে । পুজোর আগে কলকাতা ভেসে যাওয়ায় প্রেক্ষিতে রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান মন্তব্য করেছিলেন যে ঝাড়খন্ড, উত্তরপ্রদেশের জলে কলকাতা ভেসেছে। এবার উত্তরবঙ্গের ভয়াবহ প্লাবনের পরও সেই অভিনব আঙ্গিকে পড়শী রাজ্য সিকিম কিংবা পড়শি দেশ ভুটানের ছাড়া জলকেই তিনি দায়ী করেছেন। ফলে এত বড় বিপর্যয়ের পর আত্মসমীক্ষার পরিবর্তে সেই চেনা ছকের দায় চাপানোর রাজনীতির পথ ধরেছে রাজ্যের শাসক। আর সেখানেই লুকিয়ে রয়েছে বিপদের গভীরতা। রাজ্যের বন্যা নিয়ন্ত্রণ কিংবা নাগরিক সুরক্ষার বেহাল পরিকাঠামোর দিক থেকে নজর ঘোরাতে উদ্যত এখন রাজ্যের শাসক । মানুষের মৃত্যুর কার্যকারণ সম্পর্ক খোঁজার চেয়ে রাজ্যের প্রশাসন এখন অনেক বেশি সক্রিয় মৃতদেহ পিছু ক্ষতিপূরণের অংক কিংবা চাকরির প্রতিশ্রুতি নিয়ে। অর্থাৎ আর্থিক ক্ষতিপূরণের মোড়কে এখন নিজের ভাবমূর্তির ক্ষতিপূরণের চেষ্টা করছে শাসক। ফলে এবারও অধরা থেকে যাচ্ছে বিপর্যয় মোকাবিলার পরিকল্পনার প্রশাসনিক খামতি এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর ঘাটটির তথ্য পরিসংখ্যান আর তার বিশ্লেষণ । সন্দেহ নেই এ রাজ্যের পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে উত্তরবঙ্গ অনেকটাই পিছিয়ে দক্ষিণবঙ্গের থেকে। রাজ্যে বাম সরকারের বিদায়ের পর গত পনেরো বছরে উত্তরবঙ্গে বন্যা নিয়ন্ত্রণের পরিকাঠামো হিসাবে নদীবাঁধ, ব্যারেজ, নিকাশি নালা কিংবা খালের সংস্কার কিংবা নতুন সেতু নির্মাণ হয়নি। অথচ এই পনেরো বছরে বিজ্ঞান প্রযুক্তির অগ্রগতির দৌলতে আবহাওয়ার আগাম পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে, নিম্নচাপ থেকে অতিবৃষ্টি কিংবা খরা থেকে বন্যা সবেতেই। ফলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মোকাবিলায় প্রশাসনিক প্রস্তুতির আগাম সময় এখন অনেক বেশি পাওয়া যায় অতীতের তুলনায়। কিন্তু এরপরেও রাজ্য প্রশাসনের সক্রিয়তার অভাব বিপর্যয় মোকাবিলার নিরিখে সরকারি ব্যবস্থার দক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দিল। জলবায়ু বিপর্যয় : অক্ষম প্রশাসন সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় ঘন ঘন হিমালয়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে যে পরিমান বিপর্যয় নেমে আসছে সেই বিপদের প্রেক্ষিতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিমকোর্ট পাহাড়ি জনপদের অস্তিত্বের সংকট নিয়েই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। গ্রাম থেকে শহরের পরিবর্তন এখন সমতল ছাপিয়ে পাহাড়ের গণ্ডিকেও গ্রাস করছে। ফলে পাহাড় ঘেরা নগরায়নের বাজার অর্থনীতির শাখা-প্রশাখা হিসেবে হোটেল – হোম ষ্টে থেকে শুরু করে সড়ক-সেতুর নির্মাণ যজ্ঞ চলছে। পর্যটনকেন্দ্রিক বাজার অর্থনীতির দাপটে পাহাড় ঘেরা রাজ্যের বাস্তুতন্ত্রের নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত। আর তার সাথে নেতিবাচক জলবায়ুর পরিবর্তনের ধাক্কায় ঘটছে মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টি, হড়পা বান, ভূমিধস কিংবা হিমবাহ উপচে পড়া জলের তোড়ে বিপর্যয়। এই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তৈরি হওয়া বিপর্যয়ের হাত থেকে চটজলদি সমাধানের পথ নেই। কিন্তু যখন পরিবেশের উপরে জলবায়ুর এই বিধ্বংসী প্রভাবের আঁচ অনুমান করা যাচ্ছে, কার্য-কারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে প্রযুক্তি নির্ভর উপায়ে, তখনও সতর্ক হতে পারছে না দেশ কিংবা রাজ্যের প্রশাসন ! যার ফলে এদেশের মতো বিপুল জনঘনত্বের দেশে অদূর ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় শরণার্থী মানুষের সংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়তে থাকবে। বেড়ে চলবে এমন জলবায়ুর বিপর্যয়ের ধাক্কায় পাহাড় জীবনে মানুষের মৃত্যুর ঝুঁকি লাফিয়ে লাফিয়ে ! কার্যত এবারের উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং , কালিম্পং , জলপাইগুড়ি কুচবিহার যেভাবে ভূমিধস এবং বানের ধাক্কায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে সেটাও এক অশনি সংকেত। যদিও এমন অশনি সংকেত সাম্প্রতিক অতীতে বারংবার মিলেছে প্রকৃতির থেকেই। কিন্তু সেই সংকেতের তাৎপর্য এখনও বুঝতে প্রশাসন ব্যর্থ বলেই আশংকা এমন আরো ব্যাপক ধ্বংসলীলা অপেক্ষা করছে অদূর ভবিষ্যতে ! চাই পাহাড়ে ঝুঁকির শ্রেণীবিন্যাস অতি বৃষ্টির সময় পাহাড়ের অগভীর নদীখাতগুলি হয়ে ওঠে বিপদের ভরকেন্দ্র। পাহাড়ি নদী সংলগ্ন উপত্যকার পাহাড়ি ঢাল যত খাড়া হয় কিংবা যত নেড়া হয় ততো দ্রুত সেই নদীখাতে বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হয়। ফলে সেই তীব্র বানের সময় নদীখাত ছাপিয়ে জল নদীর পাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে প্লাবিত করে। আর নদীখাতের ধার ঘেঁষে তৈরি হওয়া জনপদে হোটেল- হোমস্টে থেকে দোকান বাজার সবই বন্যার জলে খড়কুটোর মতো উড়ে যায়। এবারের অতি বৃষ্টির দাপটে উত্তরবঙ্গের পাহাড় এবং ডুয়ার্স জুড়ে এমনটাই ঘটেছে । বিশেষত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অল্প সময়ের মধ্যে যখন অতিবৃষ্টির ঘটনা ঘটছে পশ্চিম থেকে পূর্ব হিমালয়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে তখন বিপর্যয়ের নিরিখে এমন অঞ্চলগুলিতে ঝুঁকির মূল্যায়ন ভীষণ জরুরি। জরুরি, ঝুঁকির ভিত্তিতে পাহাড়ের বিভিন্ন অঞ্চলের শ্রেণীবিন্যাস। অথচ সেই কাজটাই উপেক্ষিত হয়ে চলেছে এদেশে কিংবা এ রাজ্যেও। মনে রাখতে হবে গ্রীষ্মকালে হড়পা বানের বিপদের চেয়ে ভরা বর্ষায় কিংবা শেষ বর্ষার অতিবৃষ্টিতে প্লাবনের বিপদ অনেক বেশি। ফলে বিপর্যয় মোকাবিলার স্বার্থেই পাহাড়ে বর্ষাকালে অতিবৃষ্টির সময় নদী সংলগ্ন অঞ্চলগুলির বাসিন্দাদের সবার আগে স্থানান্তরিত করা উচিত নিকটস্থ কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে। উপকূলের জেলাগুলির ক্ষেত্রে যেমন ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় ‘সাইক্লোন শেল্টার’ তৈরি করা হয় ঠিক তেমনি ‘ ফ্লাড শেল্টার’ তৈরি করা উচিত পাহাড়ের এমন ঝুকিবহুল অঞ্চলে। এছাড়াও নদীর জলের প্রবল স্রোতে নদীখাতের পাশের পাহাড়ি ঢালের স্থায়িত্ব বিপন্ন হয় বলেই ঝুঁকির পরিমাণ পাহাড়ি নদীর সন্নিহিত অঞ্চলে অত্যন্ত বেশি। এবারের অতিবৃষ্টিতে নদী সংলগ্ন অঞ্চলগুলির বাসিন্দাদের আগেভাগে নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তরিত করতে পারলে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কমানো যেতো । যেখানে বাঘের ভয় ! সম্প্রতি দেশের পাহাড় সম্বলিত ১৭টি রাজ্যের ১৪৭ টি জেলার উপগ্রহ চিত্র নির্ভর সমীক্ষা অনুযায়ী ভুমিধসের ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী দেশের প্রথম ৩৫ টি জেলার মধ্যে রয়েছে দার্জিলিং। এমন বিপদজনক জেলাগুলিতে আবার জনঘনত্ব এবং বাড়ির ঘনত্ব তুলনায় মত্রা ছাড়া বেশি। ফলে ‘ যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যে হয় ‘ এমন প্রবাদ সত্যি হয়ে উঠছে উত্তরবঙ্গের ভূমিধসের ভয়াবহ বিপদ নিয়ে টিকে থাকা জেলাগুলিতে। যেখানে ধারাবাহিকভাবে পর্যটন কেন্দ্রিক অর্থনীতিতে স্থায়ী এবং অস্থায়ী জনসংখ্যার বৃদ্ধি ঘটে চলেছে। লাগামছাড়া নগরায়নের দাপটে শহরে যেমন জলাজমি বুজিয়ে বাড়ি তৈরি হচ্ছে তেমনি পাহাড়ি উপত্যকা অঞ্চলে নদিখাতের জমি দখল করে হোটেল , হোম-স্টে বানানোর হিড়িক পড়েছে। এরাজ্যে কার্যত শাসক দলের এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদতে চলছে নদীর বুকে , নদির পাশে জমির লুঠ ‘রিয়েল এস্টেট’ গড়ার লক্ষ্যে । আর সেই লুঠের মাশুল হিসাবে প্রতিদিন বিপর্যস্ত হচ্ছে উত্তরবঙ্গের বাস্তুতন্ত্র এবং পরিবেশ। হিমালয় সন্নিহিত জেলাগুলিতে পর্যটন কেন্দ্রিক অর্থনীতি । ফলে সেই সব অঞ্চলে পর্যটনকেন্দ্রিক পরিকাঠামো উন্নতির সাথে সেই অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের সামঞ্জস্য রক্ষার পরিকল্পনা প্রয়োজন। অথচ বাজারকেন্দ্রিক অর্থনীতির দাপটে পাহাড় জুড়ে বাস্তুতন্ত্রের ওপর নেমে আসছে সবচেয়ে বড় আঘাত। পুঁজির দাপটে ত্রাহি রব ছাড়ছে প্রকৃতি । আর রাজ্যের সরকার থেকে স্থানীয় জিটিএ কিংবা পুরসভা পরিবেশ রক্ষার চেয়ে বেশি সক্রিয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থের সুরক্ষায়। ফলে পরিবেশের দফা রফা করে পাহাড়ের হাসি দেখছে সরকার । আর এমন প্রতিটি বিপর্যয়ের পর পাহাড় জুরে উঠছে সজনহারা বাস্তুচ্যুতদের কান্নার রোল । ভূমিধসের পাশাপাশি ওই অঞ্চলগুলি ভূমিকম্পের নিরিখেও প্রবল ঝুঁকি প্রবন। হিমালয়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এদেশে জোন-৪ থেকে জোন-৫ এর অন্তর্গত। এরাজ্যের দার্জিলিং , কালিম্পং , কার্শিয়ং কিংবা পড়শি রাজ্য সিকিম এমন অতি মাত্রার ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে দুর্বল পাথর- মাটির পাহাড়ের ঢাল যত খাড়া হয় ততো সেই পাহাড়ে নির্মাণ ঝুঁকিবহুল হয়ে ওঠে। বিদেশে বহু ক্ষেত্রেই পাহাড়ের ঢাল এবং পাথর মাটির চরিত্র অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করা হয় পাহাড় জুড়ে। কিন্তু এদেশে সেই সরকারি নিয়ন্ত্রন না থাকায় আইনি এবং বেআইনি নির্মাণ রমরমিয়ে চলছে প্রশাসনের নাকের ডগায়। এই প্রেক্ষিতে অতিবৃষ্টি ভূমিধস এবং ভূমিকম্পের মতো সম্মিলিত বিপর্যয় মোকাবিলায় ঝুঁকির নিরিখে পাহাড়ের বিভিন্ন অঞ্চলকে চিহ্নিত করা আশু জরুরী। নগরায়নের দাপটের যুগে , পাহাড়ে কোথায় নির্মাণ নিষিদ্ধ কিংবা আইনসিদ্ধ হবে কি কি শর্ত মেনে সেটিও এখন খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। দার্জিলিং জেলার ভৌগোলিক এলাকার মাত্র ৫৩ শতাংশ এখন সবুজ ঢাকা বাকিটা নগরায়নের গ্রাসে পড়েছে। মিরিক এলাকায় ২০২০ থেকে ২০২৪ এই চার বছরে সবুজ ধ্বংসের পরিমাণ ৭৩ হেক্টর জমি। ফলে খাড়া ঢালের পাহাড়ে এমন বৃক্ষ নিধন চলতে থাকলে প্রবল বৃষ্টিতে ভুমিধস যে কেবল সময়ের অপেক্ষা ছিল , সেটা আবার প্রমাণ হলো মিরিকের ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর। এবারের বন্যায় নিহত মানুষজনের অর্ধেকই হলো মিরিক অঞ্চলের বাসিন্দা। ফলে পাহাড় জুড়ে সরকারি এবং পুর প্রশাসনের ব্যর্থতার কারনেই বিপদজনক অঞ্চলে বাস করেছে মানুষ। আর যার অন্তিম পরিণতি হল এই ভয়াবহ বন্যায় তাঁদের মৃত্যু আর নদীগর্ভে বাস্তুহারা হয়ে। মাফিয়ারাজ : নদী লুঠ মিরিকের সাথে সমতলের সংযোগ রক্ষাকারী অন্যতম ইস্পাতের সেতু দুধনীর কাছে বালাসোন নদীর উপর জলের ধাক্কায় ভেঙে পড়েছে। ভাঙা পড়া সেতুস্তম্ভের চেহারা এবং ইতিহাস প্রমাণ করে যে দুর্গম এলাকার সেতুস্বাস্থ্য সম্পর্কে কতোটা উদাসীন ছিল স্থানীয় প্রশাসন ! বিশেষত সেই অঞ্চলের নদীগর্ভ থেকে যেভাবে বালি কিংবা পাথর মাফিয়ারা নির্মাণের কাঁচামাল হিসেবে পাথর-বালি তুলে নেয় অবৈজ্ঞানিক উপায়ে তাতে নদী খাতের জলপ্রবাহের পরিবর্তন ঘটে যায়। আর নদীখাতের সেই বিপদজনক পরিবর্তন এমন প্রবল বন্যার সময় ভাসিয়ে দেয় নদীর দুপাশের বিস্তীর্ণ জনপদকে। জলখাতের পরিবর্তন অতিবৃষ্টিতে নদীতে জলের গতিকেও প্রভাবিত করে। ফলে নদীর ওপর তৈরি করা সেতু স্তম্ভের পায়ের তলার মাটি দ্রুত ক্ষয় হতে থাকে যার ফলে সেতুস্তম্ভের ভারসাম্যের বিঘ্ন ঘটায় ফাটল ধরে সেতুতে কিংবা ভেঙে পড়তে পারে সেই সেতু। ফলে নদির বুকে বেআইনি খাদান সেই অঞ্চলের সেতু পরিকাঠামো রক্ষার ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি । এবারে বহু এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রনের জন্য তৈরি মাটির নদী বাঁধগুলিও ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে ভারী মালবাহী ট্রাকের চাপে। কারন সেই মালবাহি ট্রাকে পাচার হয় চোরাপথে নদীর বুক থেকে তোলা লুটের পাথর বালি। ফলে এভাবেও বন্যার থেকে রক্ষা পাওয়ার অন্যতম লাইফ লাইন নদীবাঁধ গুলি ধ্বংস হচ্ছে লুটেরা দের হাতে। এর ফলে একদিকে যেমন সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে আর উল্টোদিকে শাসক আশ্রিত নদী মাফিয়ারা নদীর পাথর বালি লুট করার মধ্যে দিয়ে বাস্তুতন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতি সাধন করে চলেছে। প্রবল বৃষ্টিতে এবার ভূমিধস নেমেছে পাহাড়ের জায়গায় জায়গায় বৃষ্টির জলের তোড়ে। পাহাড়ের উপরি পৃষ্ঠের নরম ঝুরো পাথর-মাটি আলগা হয়ে জলের সাথে বয়ে গেছে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। কাদামাটির ওই প্রবল জলস্রোতের মুখে পড়ে ধ্বংস হয়েছে সেই অঞ্চলের দোকান বাজার থেকে ঘরবাড়ি। এবারের বিপর্যয়ের এপিসেন্টার ছিল পাহাড়ে বেশি জনঘনত্বের লোকালয় মিরিক মহকুমা । কার্যত উত্তরবঙ্গের বন্যার চল্লিশ জন মৃতের সিংহভাগ এই অঞ্চলের। বিশেষত ভুমিধসের সময় পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা পাথর কাদার স্তুপ তরল হয়ে নদিখাতে কখনও নেমে আসে আবার কখনও নদিখাত সংলগ্ন নিচু চাষের জমির ওপর দিয়েও বয়ে যায় । বন্যার জল কিছুদিন পর নেমে গেলেও নদীবক্ষে কিংবা পাশের জমিতে থেকে যায় বোল ডার , নুড়ি পাথরের স্তর। নদিবক্ষে জমে যাওয়া এমন স্তরগুলি পরবর্তীকালে নদির জলধারণ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় । ফলে পরবর্তী বৃষ্টিতে ধারন ক্ষমতা কমে যাওয়া নদীতেই বাড়ে প্লাবনের সম্ভাবনা। এমন প্রতিটি বিপর্যয় থেকেই শিক্ষা নিলে পরবর্তী বিপর্যয় নিয়ন্ত্রণে কিছু সুরাহা আশা করা যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে এদেশে নিয়মিত ব্যবধানে ঘটে চলা বিপর্যয় সত্ত্বেও সরকারি প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বিপর্যয় মোকাবিলায় বিপর্যয়ের আগের প্রস্তুতি কিংবা পরিকল্পনার খামতি উত্তরাখন্ড থেকে হিমাচল কিমগ্না জম্মু থেকে উত্তরবঙ্গেও স্পষ্ট ধরা পড়েছে। অতএব পরিশেষে ১৯৭০ থেকে ২০১০ এই চার দশকে হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চল জুড়ে তিরিশটি ‘মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টির’ নথিভুক্ত ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের দাপটে সেই ‘মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টির’ সংখ্যা গত দশকে ঘটেছে আশিটা । ফলে বোঝাই যাচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে (২০১০-২০২০) ভয়াবহ গতিতে ‘মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টির’ সংখ্যা অতীতের তুলনায় আট গুন বেড়েছে । ফলে অতীতের তুলনায় এমন বিপর্যয়ের ঘটনা বহু গুনে বেড়ে চলবে বলেই আশঙ্কা । এই অবস্থায় অতীতের পরিকাঠামো কিংবা পরিকল্পনা নিয়ে বসে থাকলে ভবিষ্যৎ মোকাবিলার পথ অধরা থেকে যাবে। ফলে দেশজুড়ে এই জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সঙ্গতি রেখেই প্রয়োজন পরিবর্তনশীল বাস্তুতন্ত্রের সাথে মানানসই নির্মাণ ভাবনা, নির্মাণ সামগ্রী এবং নির্মাণ পদ্ধতির প্রয়োগ, বিশেষত পাহাড়ি এলাকায়। প্রয়োজন নির্মাণের স্থান কাল পাত্রের উপর নিয়ন্ত্রণ। অন্যথায় উত্তরবঙ্গ থেকে উত্তরাখণ্ডের বিপর্যয়ে প্রান হারাবে আরও মানুষ এই একুশ শতকে। প্রকাশের তারিখ: ১২-অক্টোবর-২০২৫ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|