|
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী - দেশের সার্বভোমত্ব কী বিক্রয়যোগ্য?Samik Lahiri |
শুল্ক হ্রাস, ভারত আগামী ৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে মোট ৫০০ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ৪৫,৩৫,৬২৫ কোটি টাকার পণ্য কিনবে, যা ভারতের এবছরের বাজেটের প্রায় ৮৪.৮২ শতাংশ। এছাড়াও রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ, ডিজিটাল বাণিজ্য ও ট্যাক্স, অশুল্ক বাধা (Non-Tariff Barriers) অপসারণ ইত্যাদি। আসলে কী আছে এই চুক্তিতে? |
| মাত্র ৯ দিনের ব্যবধানে নরেন্দ্র মোদী’র নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার দু’-দুটি বড় মাপের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন সরকারের সাথে। এই দুটি চুক্তির কোনটারই বিস্তারিত প্রকাশিত হয়নি। বিশেষত ভারত-মার্কিন চুক্তি সম্পর্কে শুধু একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে এখনও পর্যন্ত। তবে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তি (Interim Trade Agreement) নিয়ে যৌথ বিবৃতির বাইরেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সরকারি ফ্যাক্টশিট থেকে কিছু সুনির্দিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা গেছে। এই চুক্তির তাৎপর্যপূর্ণ কিছু প্রতিশ্রুতি ও শর্তও সামনে এসেছে। যেমন - শুল্ক হ্রাস, ভারত আগামী ৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে মোট ৫০০ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ৪৫,৩৫,৬২৫ কোটি টাকার পণ্য কিনবে, যা ভারতের এবছরের বাজেটের প্রায় ৮৪.৮২ শতাংশ। এছাড়াও রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ, ডিজিটাল বাণিজ্য ও ট্যাক্স, অশুল্ক বাধা (Non-Tariff Barriers) অপসারণ ইত্যাদি। আসলে কী আছে এই চুক্তিতে? আইনি জালে ভারত ভারত-মার্কিন প্রতিরক্ষা চুক্তির এই নিশ্ছিদ্র গোপনীয়তা কেন? এর পেছনে যে আইনি ও কৌশলগত বেড়াজাল রয়েছে, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে ভারত আসলে এক অত্যন্ত জটিল ও বিপজ্জনক আইনি জালে (Legal Trap) জড়িয়ে পড়ছে। এর প্রধান তিনটি কারণ হলো – ১. আমেরিকার ITAR (International Traffic in Arms Regulations) হলো এমন একটি আইন, যার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে, মার্কিন প্রযুক্তি বিশ্বের যেখানেই যাক না কেন, তার চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ থাকবে ওয়াশিংটনের হাতেই। এন্ড-ইউজার মনিটরিং (EUM) চুক্তির শর্তানুযায়ী, আমেরিকা যে কোনও সময় ভারতে এসে পরীক্ষা করতে পারে, তাদের দেওয়া প্রযুক্তি বা যন্ত্রাংশ কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটা আসলে সরাসরি ভারতের সামরিক গোপনীয়তা ও সার্বভৌমত্বের ওপর 'আইনি নজরদারি'র অনুমতি দেওয়া। ভারত যন্ত্রাংশ জোড়া দেওয়ার অনুমতি পেলেও সেই যন্ত্রাংশের ভেতরের মূল নকশা বা ‘সোর্স কোড’ দেখার অনুমতি পাবে না। ফলে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি হলে বা যুদ্ধকালীন সময়ে সংস্কারের প্রয়োজন পড়লে ভারতকে মার্কিন প্রযুক্তিবিদদের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ২. ভারত ও আমেরিকার মধ্যে সম্পাদিত LEMOA (Logistics Exchange Memorandum of Agreement) এবং BECA (Basic Exchange and Cooperation Agreement)-এর মতো চুক্তিগুলো আপাতদৃষ্টিতে সহায়তামূলক মনে হলেও এর গভীরে রয়েছে অন্য আশঙ্কা। ‘বেকা’-এর মাধ্যমে ভারত আমেরিকার অত্যন্ত উন্নত স্যাটেলাইট ডেটা পায়। কিন্তু বিনিময়ে ভারতকে তাদের নিজস্ব ভূ-স্থানিক (Geospatial) ডেটা শেয়ার করতে হয়। প্রশ্ন হলো, ভারতের প্রতিটি ইঞ্চি জমির মানচিত্র ও কৌশলগত অবস্থানের তথ্য কি তাহলে এবার থেকে পেন্টাগনের সার্ভারে সংরক্ষিত হবে? ‘ডেটা কলোনিয়ালিজম’ নামক উচ্চ-প্রযুক্তির অস্ত্রগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ক্লাউড নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণও থাকবে আমেরিকার হাতে। ফলে ভারতের অজান্তেই আমাদের সামরিক গতিবিধি ওয়াশিংটনের কাছে কাচের মতো স্বচ্ছ হয়ে পড়বে। কেন এসব তথ্য গোপন? ভারত সরকার যদি চুক্তির এই কঠোর শর্তগুলো প্রকাশ্যে আনে, তবে কিছু অস্বস্তিকর সত্য বেরিয়ে পড়বে। এই চুক্তিতে এমন শর্ত থাকতে পারে যে, কোনও নির্দিষ্ট প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে ওয়াশিংটনের মৌখিক বা লিখিত সম্মতির প্রয়োজন হবে। চুক্তিতে এমন ধারাও রয়েছে যা ভারতকে রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাধ্য করবে। ইতিমধ্যেই রাশিয়ার তেল এবং যন্ত্রাংশ কেনার ক্ষেত্রে আমরা তা দেখতে পাচ্ছি। উল্লেখ্য, আমেরিকা যখন পাকিস্তানকে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান দিয়েছিল, তখন চুক্তিতে এমন সব গোপন শর্ত ছিল যে, পাকিস্তান চাইলেই সেই বিমান সব জায়গায় ব্যবহার করতে পারত না। এমনকি নিয়মিত বিরতিতে মার্কিন পরিদর্শকরা সেই বিমানের ‘সিল’ পরীক্ষা করতে আসতেন। ভারত কি আজ সেই একই ‘পরাশ্রয়ী সার্বভৌমত্ব’-এর পথে হাঁটছে না? এই গোপনীয়তা আসলে কোনও কৌশলগত প্রয়োজন নয়, বরং এটি একটি ঢাল। চুক্তির নথিপত্র জনসমক্ষে এলে প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, ভারত ‘অংশীদার’ হিসাবে নয়, বরং শর্তসাপেক্ষ ‘ক্রেতা’ হিসাবে ওয়াশিংটনের কাছে নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ করেছে। 'জুনিয়র পার্টনার' হওয়ার ঝুঁকি ভারত জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম স্থপতি। কিন্তু বর্তমান সরকারের মার্কিন ঘেঁষা নীতি ভারতকে ক্রমশ রাশিয়ার মতো 'পরীক্ষিত বন্ধু' এবং ইরানের মতো কৌশলগত অংশীদারদের থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। আমেরিকার CAATSA (Countering America’s Adversaries Through Sanctions Act) আইনটিও ভারতের ওপর এক অদৃশ্য সেন্সরশিপ হিসাবে কাজ করছে। এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র কেনা বা রাশিয়ার থেকে সস্তায় তেল আমদানির ক্ষেত্রে আমেরিকার 'নিষেধাজ্ঞার হুমকি' সরাসরি ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ ছাড়া আর কিছু নয়। ইতিহাসের অভিজ্ঞতা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের ততক্ষণই গুরুত্ব দেয় যতক্ষণ তাদের স্বার্থসিদ্ধি হয়। আমেরিকা ভারতকে ততক্ষণই বন্ধু মনে করবে, যতক্ষণ ভারত নিজেদের পণ্যের বাজার মার্কিন কর্পোরেট হাঙরদের জন্য উন্মুক্ত করে রাখবে এবং চীনের বিরুদ্ধে মার্কিনীদের পুতুল হিসাবে কাজ করবে। ট্রাম্পের ‘শুল্ক-সন্ত্রাস’ ২০২৬ সালে ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর মার্কিন বিদেশনীতি এখন আর কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি বাণিজ্যিক ব্ল্যাকমেইল। ১০-২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে ভারতকে বাধ্য করা হচ্ছে আমেরিকার শর্ত মেনে চলতে। ভারতীয় পণ্যের ওপর গড় শুল্ক হার ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে ভারতের টেক্সটাইল, চামড়া, রত্ন-অলঙ্কার এবং ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের রপ্তানি হয়তো কিছুটা গতি পাবে। অপরদিকে ভারত আমেরিকার সব ধরনের শিল্পপণ্যের ওপর শুল্ক কমাতে বা পুরোপুরি তুলে নিতে সম্মত হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন সয়াবিন অপরিশোধিত তেলের ওপর প্রায় ১৬.৫% এবং পরিশোধিত তেলের ওপর ৩৫.৭৫% পর্যন্ত বর্তমান শুল্ক শুল্ক সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হয়েছে। একইভাবে ফলমূল, বাদাম, মদ এবং পশুখাদ্যের ওপর শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বা তুলে দেওয়া হবে। ২০২৫ সালে আমেরিকায় কৃষিতে ভরতুকি কয়েকগুণ বেড়ে প্রায় ৪২.৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২৪-এর তুলনায় প্রায় ৩৪৫ শতাংশ বেশি। ২০২৬ সালে সেদেশে কৃষিতে ভরতুকির পরিমাণ আনুমানিক ৪৪.৩ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। অপরদিকে, ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো ২০ শতাংশ পর্যন্ত ভরতুকি দেওয়ার আইনি সুযোগ পেলেও, অর্থাভাবের অজুহাতে ভারতে কৃষক প্রতি ভরতুকির পরিমাণ আমেরিকার তুলনায় নগণ্য। আমেরিকায় একজন কৃষক গড়ে বছরে ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ ডলার পর্যন্ত সরাসরি সরকারি সাহায্য পেতে পারেন, যেখানে ভারতের কৃষকদের জন্য এই পরিমাণ গড়ে ১৫,০০০ হাজার টাকারও কম। আমেরিকার কৃষকরা এই বিশাল ভরতুকি পাওয়ায়, উৎপাদন খরচ অনেক কম। এর ওপর শুল্ক কমে গেলে তারা ভারতের বাজারে যে দামে কৃষিপণ্য বিক্রি করতে পারবে, ভারতের সাধারণ কৃষকদের পক্ষে সেই সস্তা দামের সাথে পাল্লা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাহলে এই চুক্তি কার স্বার্থে? দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী সময়েও ভারত সস্তায় রাশিয়া থেকে তেল আমদানি অব্যাহত রেখেছে। তবে আমেরিকা ভারতের এই স্বাধীন বিদেশনীতিকে চাপের মুখে ফেলার জন্য নানারিকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। ভারত যখন রাশিয়ার থেকে সস্তায় তেল কিনে নিজের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তখনই মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ‘প্রাইস ক্যাপ’-এর চাবুক নিয়ে হাজির হয়। এটি কি সার্বভৌম বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত, নাকি আমারিকার হাতে ভারতের রান্নাঘরের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়ার চেষ্টা? প্রাইস ক্যাপ ও লজিস্টিক বাধা - জি-৭ ভুক্ত রাষ্ট্রসমূহ এবং আমেরিকা রাশিয়ার তেলের ওপর প্রতি ব্যারেল ৬০ ডলারের 'প্রাইস ক্যাপ' বা সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। ভারত যখনই এই সীমার বাইরে গিয়ে তেল কেনার চেষ্টা করেছে, তখনই মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ সেই কার্গো বা জাহাজ কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ডলার যখন অস্ত্র— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক লেনদেনের প্রধান মাধ্যম 'সুইফট' (SWIFT) সিস্টেম থেকে রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। ভারত যখনই বিকল্প উপায়ে, যেমন টাকা-রুবেল বিনিময়ের মাধ্যমে তেলের মূল্য মেটানোর চেষ্টা করেছে, আমেরিকা তখন 'সেকেন্ডারি স্যাংশন' বা পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার ভয় দেখাচ্ছে। কৌশলগত ব্ল্যাকমেইল— ভারতের জ্বালানি আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশ এখন রাশিয়ার দখলে। ট্রাম্প সরকার বারবার দাবি করছে, ভারত এই তেল কিনে রাশিয়ার 'ওয়ার মেশিন' বা যুদ্ধ তহবিলে অর্থ যোগান দিচ্ছে। এই অভিযোগ আসলে ভারতকে অনেক বেশি দামে মার্কিন তেল কিনতে বাধ্য করার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল মাত্র। বিপুল আর্থিক লোকসান— ভারতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই জ্বালানি আমদানির ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল। রাশিয়া বা ইরানের মতো দীর্ঘদিনের অংশীদারদের বদলে আমেরিকার ওপর একক নির্ভরশীলতা ভারতের অর্থনীতিতে এক বিশাল ধাক্কা দেবেই। ভারত বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজার দরের তুলনায় রাশিয়া থেকে আনা তেলে ব্যারেল প্রতি প্রায় ১০-১২ মার্কিন ডলার কম দামে পায়। হিসাব অনুযায়ী, ভারত প্রতিদিন যে পরিমাণ রাশিয়ান তেল আমদানি করে, তা যদি আমেরিকার থেকে বাজার মূল্যে কিনতে হয়, তবে ভারতের বছরে অতিরিক্ত খরচ হবে প্রায় ৬০,০০০ থেকে ৭৫,০০০ কোটি টাকা। এছাড়াও ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে আমেরিকা থেকে তেল আসতে সময় লাগে প্রায় ৪০ দিন, যেখানে মধ্যপ্রাচ্য বা রাশিয়া থেকে লাগে অনেক কম। কিন্তু আমেরিকা-ভারতের দীর্ঘ সমুদ্রপথের কারণে জাহাজের ভাড়া ও বিমা বাবদ বছরে ভারতের অতিরিক্ত ১০,০০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। ডলারের আধিপত্য ও টাকার অবমূল্যায়ন— রাশিয়া বা ইরানের সাথে ভারত অনেক ক্ষেত্রে 'টাকা-রুবেল' বা স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন করতে পারে। কিন্তু আমেরিকার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ মূল্যই মার্কিন ডলারেই দিতে হয়। এর ফলে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার থেকে বছরে অতিরিক্ত ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বেরিয়ে যাবে, যা ভারতীয় টাকাকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও দুর্বল করে তুলবে। এমনিতেই ‘বিশ্বগুরু’র কৃপায় ২০১৪ সালে ১ ডলার কিনতে যেখানে ৬২ টাকার প্রয়োজন হতো, এখন তা ৯১ টাকায় পৌঁছেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে ভারতের পাইকারি মূল্য সূচক (WPI) বৃদ্ধি পাবে। আমেরিকার থেকে দামি তেল কিনলে দেশের বাজারে পেট্রোল-ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ৫-৮ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে, যার ফলে বাড়বে সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। তাহলে রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল আমদানি বন্ধ করার চুক্তি করা হলো কেন? ডিজিটাল নব্য-উপনিবেশবাদ iCET (Initiative on Critical and Emerging Technology) -এর আওতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিং নিয়ে যে যৌথ কাজ হচ্ছে, তার প্রধান উপাদান হলো 'ডেটা'। নজরদারির আশঙ্কা— এডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা, নিজেদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর নেতাদের ওপরও নজরদারি চালায়। ভারতের প্রতিরক্ষা ও নাগরিকদের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট যদি মার্কিন ক্লাউড বা সার্ভারে সংরক্ষিত হয়, তবে তা হবে ডেটা সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। অ্যালগরিদমিক কন্ট্রোলের মাধ্যমে ভারতের সাইবার পরিকাঠামোয় মার্কিন প্রযুক্তির আধিপত্য ভারতের নীতি নির্ধারণের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা আমেরিকার হাতে তুলে দেবে। 'অ্যাসেম্বল ইন ইন্ডিয়া' GE-F414 জেট ইঞ্জিনের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ প্রযুক্তি হস্তান্তরের কথা বলা হলেও বিশেষজ্ঞরা একে 'ব্ল্যাক বক্স' টেকনোলজি হস্তান্তরের সাথে তুলনা করছেন। কোর টেকনোলজি গোপন রাখা - আমেরিকা সাধারণত তাদের ইঞ্জিনের মেটালার্জিক্যাল কম্পোজিশন বা 'সিঙ্গেল ক্রিস্টাল ব্লেড' প্রযুক্তি শেয়ার করে না। ফলে ভারত কেবল উন্নত যন্ত্রাংশ জোড়া দেওয়ার (Assembly) কাজ পাবে। ফলে বিদেশি প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ভারতের নিজস্ব গবেষণা সংস্থা (DRDO বা HAL)-র মৌলিক উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে শেষ করে দেবে অচিরেই, যা কিছুদিনের মধ্যেই ভারতকে একটি 'সার্ভিসিং সেন্টার'-এ পরিণত করবে। 'কিল সুইচ' ও কৌশলগত ব্ল্যাকমেইল মার্কিন প্রতিরক্ষা সামগ্রী কেবল হার্ডওয়্যার নয়, এটি একটি সফটওয়্যার-চালিত শৃঙ্খল। রিমোট কন্ট্রোল - মার্কিন ড্রোন বা যুদ্ধবিমানে প্রায়শই গোপন ‘কিল সুইচ’ বা এন্ড-ইউজার মনিটরিং থাকে। বর্তমান যুদ্ধ কেবল কামানের নয়, কোডেরও। মার্কিন ড্রোন বা যুদ্ধবিমানে থাকা গোপন ‘কিল সুইচ’ ভারতের সমগ্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে যেকোনো মুহূর্তে স্তব্ধ করে দিতে পারে। যদি ভারত এমন কোনো যুদ্ধে জড়ায় যা আমেরিকার স্বার্থবিরোধী, তবে একটি রিমোটের ক্লিকেই হাজার হাজার কোটি টাকায় কেনা এই অস্ত্র ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে যেতে পারে। পাকিস্তানের এফ-১৬ ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা এর বড় উদাহরণ। সিআইএ-র লজিস্টিক হাব ৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ৩১টি MQ-9B ড্রোন কেনার চুক্তি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এই ড্রোনগুলোর পরিচালনার জন্য যে স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন, তাতে মার্কিন প্রযুক্তিবিদদের সরাসরি হস্তক্ষেপ থাকবে। এর ফলে ভারতের মাটি পরোক্ষভাবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি 'লজিস্টিক হাব'-এ পরিণত হবে, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ভারতের সম্পর্ককে আরও জটিল করবে। স্বাস্থ্যে 'বিগ-ফার্মা'র থাবা আমেরিকা দীর্ঘকাল ধরে ভারতের পেটেন্ট আইনের Section 3(d) বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছে। যদি মেধাস্বত্ব আইনে (IPR) ভারত নতি স্বীকার করে, তবে ক্যান্সার বা ইনসুলিনের মতো ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। মনস্যান্টো-বেয়ারের মতো বীজ-রাসায়নিক কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া বাজার তৈরির চেষ্টা ভারতীয় ক্ষুদ্র কৃষকদের আত্মনির্ভরশীলতাকেও ধ্বংস করে দেবে। আধুনিক সামরিক শক্তি অর্জনের ধুয়ো তুলে আসলে মোদী দেশের সার্বভৌমত্বের 'লক্ষ্মণরেখা' অতিক্রম করে ফেলেছেন এই চুক্তিতে। উন্নয়ন ও নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে একটি প্রায় নয়া-উপনিবেশবাদী ব্যবস্থার অংশ হয়ে পড়া, ভারতের জন্য আত্মঘাতী হবেই। ১৯ শতকের লর্ড ওয়েলেসলির ‘অধীনতামূলক মিত্রতা’ (Subsidiary Alliance) ছিল দেশীয় রাজ্যগুলোকে পঙ্গু করার হাতিয়ার। ২১ শতকের এই প্রযুক্তিগত চুক্তি কি তার ‘ডিজিটাল সংস্করণ’? উন্নয়ন ও নিরাপত্তার নাম করে আমরা কি কোনও বড় শক্তির ‘ডিজিটাল কলোনি’ হতে চলেছি? মিত্রতা হয় সমানে-সমানে, প্রভু-ভৃত্যের নয়। সার্বভৌমত্ব কোনও পণ্য নয় যে এটি প্রযুক্তির বিনিময়ে কেনাবেচা করা যায়। ভারতের লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সম্পর্কে স্থাপন। সেটা না করে নরেন্দ্র মোদী মার্কিন সরকারের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতার চুক্তি করে এসেছেন কার স্বার্থে? এই চুক্তি বাতিল করতে হবে, দেশের মানুষের স্বার্থেই। গণশক্তি পত্রিকায় প্রকাশিতপ্রকাশের তারিখ: ১৫-ফেব্রুয়ারি-২০২৬ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|