স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বাংলার সংস্কৃতি (৩য় পর্ব)

Malini Bhattacharya
কিন্তু কেবল সংস্কৃত, ফার্সি বা ইউরোপীয় ভাষাই নয়, উনিশ শতকে বাংলা সাহিত্যের অভ্যুত্থানের ইতিহাসের সঙ্গে কথ্য সংস্কৃতির ওপর অংশত নির্ভরশীল পুরনো বাংলা কাব্য ও গানের উপাদানগুলিও জড়িয়ে আছে। 'অন্নদামঙ্গলে'র মধ্যে 'বিদ্যাসুন্দর' অংশটি সিভিলিয়ান ছাত্রদের পড়াতে রুচিগত কারণে বিদ্যাসাগর সঙ্কুচিত বোধ করতেন, কিন্তু ভারতচন্দ্রের পদ্য তাঁর বিশেষ প্রিয় ছিল 'ঝরঝরে ভাষার' জন্য। তাই 'অন্নদামঙ্গল' তিনি বারবার করে পড়তেন। বঙ্কিমের সাধুভাষার মধ্যে এই কথ্য সংস্কৃতির উপাদানের উপস্থিতিকেই রক্ষণশীল পণ্ডিতরা বিদ্রূপ করেছিলেন 'শবপোড়া মড়াদাহে'র ভাষা বলে।

৩. আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিকাশ

'মাতৃভাষারূপ খনি পূর্ণমণিজালে'

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

দেশের মাটিতে বাংলা হরফে মুদ্রিত প্রথম পূস্তক হ্যালহেডের বাংলা ব্যাকরণ ১৭৭৮ সালে প্রকাশিত হলেও ছাপানো বাংলা বইয়ের প্রবর্তন ও প্রসার ১৮০০ সালে শ্রীরামপুরের ব্যাপিস্ট মিশন প্রেস থেকে শুরু হয়। নিউ টেস্টামেন্টের অনুবাদ দিয়ে শুরু হবার পর কৃত্তিবাসী রামায়ণ, কাশীদাসী মহাভারত, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের 'বত্রিশ সিংহাসন', 'হিতোপদেশ' প্রভৃতি এবং ইংরেজি থেকে অনূদিত বহু পাঠ্যপুস্তক এখান থেকে ছাপা হয়। ১৮১৩ সালের পর থেকে কলকাতা ও তার আশেপাশে আরও অনেক ছাপাখানা গড়ে ওঠে। রাধাকান্ত দেব, রামকমল সেন প্রভৃতির চেষ্টায় ১৮১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কলকাতা স্কুল বুক সোসাইটি। পরবর্তীকালে মুদ্রণ ও প্রকাশনার কাজে বিদ্যাসাগরও আত্ম নিয়োগ করেছিলেন (১৮৪৬-৪৭)। এরই পাশাপাশি বটতলার বইয়ের বাজারও বেশ তেজিভাবেই চলছিল। রং-তামাশা কেচ্ছাকাহিনীর সঙ্গে পুরনো বাংলা সাহিত্যও কিছু কিছু ছাপা হতো। ভারতে-আগত সিবিলিয়ানদের 'অন্নদামঙ্গল' পাঠ্য ছিল। বটতলায় নিকৃষ্টভাবে ছাপা 'অন্নদামঙ্গলের বদলে আরও ভালোভাবে 'অন্নদামঙ্গল' ছাপিয়েই বিদ্যাসাগর তাঁর মুদ্রণ ব্যবসা শুরু করেছিলেন। বটতলা থেকে বাংলা ও ফার্সির সংমিশ্রণে 'দোভাষী' ভাষায় ধর্ম উপদেশমূলক পদ্যকাহিনীও ছাপা হতো।

এছাড়া উনিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলা সংবাদপত্র ও পত্রিকার প্রকাশে জোয়ার এসেছিল। ১৮১৮ থেকে ১৮২৩ সালের মধ্যে প্রকাশিত সংবাদপত্রের কথা আগেই বলা হয়েছে। ১৮২৩ থেকে ১৮৩৫ পর্যন্ত বহাল কণ্ঠরোধের আইন সংবাদপত্র প্রকাশের উৎসাহকে নিভিয়ে দেয়নি। ১৮৩১ সালে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সম্পাদনায় 'সংবাদপ্রভাকর' প্রকাশিত হয়। একই বছরে 'ইয়ং বেঙ্গল' দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের 'জ্ঞানান্বেষণ'। 'তত্ত্ববোধিনী সভা'র মুখপত্র 'তত্ত্ববোধিনী' (১৮৪৩) অক্ষয়কুমার দত্তের সম্পাদনায় বার হয়। বিদ্যাসাগর এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন এবং ধর্মীয় আলোচনায় নিবন্ধ না থেকে গম্ভীর সামাজিক বিষয়ে আলোচনা প্রবন্ধ প্রকাশের জন্য তা পাঠক সমাজে বিশেষ আদৃত হয়। ১৮৫৮ সালে বিদ্যাসাগরেরই উৎসাহে, দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের সম্পাদনায় 'সোমপ্রকাশ'ও বলিষ্ঠ আলোচনার মধ্য দিয়ে নতুন নজির সৃষ্টি করে।

ছাপা বই ও সংবাদপত্রের এই বিস্তারের মধ্য দিয়ে আমরা আভাস পাই এক নতুন পাঠক সমাজের, যাঁরা দেশীয় ভাষায় তর্কবিতর্ক এবং আলোচনায় আগ্রহী, নানাবিধ আনবিজ্ঞানের সঙ্গে এবং সমকালীন বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যাঁরা পরিচিত হতে চান মাতৃভাষার মাধ্যমে। অনুবাদের বিপুল সম্ভারও এই পাঠক সমাজের পিপাসাকেই প্রতিফলিত করে। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত পাঠকের কাছে ইংরেজি ভাষার ভাণ্ডার মুক্ত হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও দেশীয় ভাষার চর্চায় এই আগ্রহ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিকাশের পটভূমিকা। রামমোহনের শিক্ষার গোড়াপত্তন সংস্কৃত এবং তারপর ফার্সিতে। বিদ্যাসাগরেরও শিক্ষার ভিত্তি সংস্কৃত। ইংরেজি তাঁরা দুজনেই শিখেছিলেন পরে। এই সময় পর্যন্তও শিক্ষিত সমাজে এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় এই স্বচ্ছন্দ বিচরণ সম্ভব ছিল। কিন্তু ফার্সি ও সংস্কৃতের প্রভাব তখন অস্তগামী। এই প্রভাব কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাভাষা যেসব উৎস থেকে নতুন উপাদান গ্রহণ করে সমৃদ্ধ হতে পারত, তা কিছুটা সঙ্কুচিত হয়েছিল। মধুসূদন কিন্তু বহু ইউরোপীয় ভাষার সঙ্গে সঙ্গে চেষ্টা করে সংস্কৃতও শিখেছিলেন, বঙ্কিমচন্দ্রও তাঁর ভাষায় সংস্কৃত অলঙ্কারের অনুপ্রেরণাকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে ব্যবহার করেছেন।

কিন্তু কেবল সংস্কৃত, ফার্সি বা ইউরোপীয় ভাষাই নয়, উনিশ শতকে বাংলা সাহিত্যের অভ্যুত্থানের ইতিহাসের সঙ্গে কথ্য সংস্কৃতির ওপর অংশত নির্ভরশীল পুরনো বাংলা কাব্য ও গানের উপাদানগুলিও জড়িয়ে আছে। 'অন্নদামঙ্গলে'র মধ্যে 'বিদ্যাসুন্দর' অংশটি সিভিলিয়ান ছাত্রদের পড়াতে রুচিগত কারণে বিদ্যাসাগর সঙ্কুচিত বোধ করতেন, কিন্তু ভারতচন্দ্রের পদ্য তাঁর বিশেষ প্রিয় ছিল 'ঝরঝরে ভাষার' জন্য। তাই 'অন্নদামঙ্গল' তিনি বারবার করে পড়তেন। বঙ্কিমের সাধুভাষার মধ্যে এই কথ্য সংস্কৃতির উপাদানের উপস্থিতিকেই রক্ষণশীল পণ্ডিতরা বিদ্রূপ করেছিলেন 'শবপোড়া মড়াদাহে'র ভাষা বলে।

এমনকি সাহেবিয়ানায় অভ্যস্ত মধুসুদন দেশীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্বন্ধে অনেক সময়েই যিনি অনেক তাচ্ছিল্যসূচক উক্তি করেছেন তিনিও কিন্তু কৃত্তিবাসী রামায়ণের পয়ারের ছন্দ কানে নিয়েই অমিত্রাক্ষর রচনায় উদ্যোগী হয়েছেন। পয়ারের সঙ্গে বিশেষ পরিচয় ছাড়া তাকে ভেঙে অমিত্রাক্ষর রচনা সম্ভব হতো না। ১৮৪৯ সালে যখন তিনি ইংরেজিতে Captive Ladie লিখছেন, তখনও মাদ্রাজ থেকে আকুলভাবে বন্ধু গৌরদাস বসাককে অনুরোধ করছেন তার জন্য কাশীদাসী মহাভারত ও কৃত্তিবাসী রামায়ণ পাঠাতে। তাঁর 'একেই কি বলে সভ্যতা?'-র মধ্যেও ইংরেজি 'সভ্যতা'র বেড়া ভেঙে নাটকে অন্তঃপুরবাসিনী মেয়েদের কথ্য ভাষার ছন্দকে ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন, 'বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ'তে তিনি এনেছেন গ্রাম্য মানুষের কথোপকথনের ভাষা। দীনবন্ধু মিত্রের 'নীলদর্পণ' নাটকে কথোপকথনের সার্বিক প্রাধান্যের সুযোগ ব্যবহার করে কথ্য বাংলাকে অন্যতম প্রধান ভূমিকা দেওয়া হয়েছে। উপরের এই প্রসঙ্গগুলি খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে ইংরেজি শিক্ষা থেকেই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সৃষ্টিহয়েছে একথা কতো ভুয়ো।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম পর্বে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে টেকচাঁদ ঠাকুর ওরফে প্যারীচাঁদ মিত্রের 'আলালের ঘরের দুলাল' (১৮৫৮) এবং কালীপ্রসন্ন সিংহের 'হুতোম প্যাঁচার নক্শা' (১৮৬২)। কলকাতার সমকালীন বাস্তবজীবন নিয়ে যদিও কুড়ির দশক থেকেই গদ্যে 'নকশা' লেখা হচ্ছে, তবু 'কলিকাতা কমলালয়' (১৮২৩) বা 'নববাবুবিলাস' (১৮২৫) বইগুলির ভাষার সঙ্গে তুলনা করলে 'আলালি' বা 'হুতোমি' ভাষার বৈশিষ্ট্য উজ্জ্বলভাবে বেরিয়ে আসে। কলকাতার বাবুসমাজে ব্যক্তিগত কেচ্ছা বা ছাপাখানার মাধ্যমে অশ্লীল আক্রমণ খুবই চালু ছিল। এই রুচিবিকারের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে ক্ষুরধার সামাজিক ব্যঙ্গের অতি সাবলীল ভাষা যারা টেকচাঁদ পত্তন করেছিলেন হুতোমের মধ্যে আরও তীক্ষ্ণ রূপ পেল। হুতোমের আঁকা সামাজিক ছবিগুলির অসাধারণ সজীবতা 'নকশা-সাহিত্যে'র সর্বোৎকৃষ্ট রূপের উদাহরণ। মনে রাখতে হবে, প্যারীচাঁদ ও কালীপ্রসন্ন দু'জনেই ছিলেন চিন্তার দিক থেকে প্রগতিশীল 'নবজাগরণে'র যুক্তিবাদের দ্বারা প্রভাবিত। বাস্তববাদী রচনার একটি বিশিষ্ট ধারাকে, বিশেষত, কালীপ্রসন্ন বাংলাভাষায় প্রবাহিত করলেন। 'চড়ক', 'বারোইয়ারি', 'হুজুক', 'মিউটিনি', 'বাবু পদ্মলোচন দত্ত ওরফে হঠাৎ অবতার', 'স্নানযাত্রা' প্রভৃতি প্রত্যেক নকশাই কলকাতার সমাজজীবনের বিবর্তন এবং বাবু সমাজের স্ববিরোধের একেকটি জীবন্ত চিত্র। হুতোম-পরবর্তী সময়ে বাংলা উপন্যাসের যে বিবর্তন ঘটেছিল, তা অবশ্য সম্পূর্ণভিন্ন পথে যায়, সেখানে বাস্তবের উপস্থাপন হয়েছে অনেক পরোক্ষভাবে। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধ ব্যঙ্গ রচনার ধারার হুতোমই উদ্বোধন করেছিলেন; সমাজের রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধেই শুধু তিনি কলম ধরেননি, 'মিউটিনি'র ভয়ে ভীত বাঙালীবাবুদের প্রতিক্রিয়া ছাড়াও "শ্রীবৃদ্ধিকারী" সাহেবদের 'সেপাইদের রাগ বাঙালির ওপর ঝাড়া', এবং 'অনারারী মেজেস্টারে'র পদ পেয়ে নীলকর সাহেবদের মিউটিনি উপলক্ষ্য করে 'দাদন, গাদন ও শ্যামচাঁদ খ্যালানো' রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর প্রতিবাদী মনোভাবকে প্রকাশ করে।

নবজাগরণে যে স্বকীয়তার সন্ধান, আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উন্মেষের বীজ তারই মধ্যে লুকিয়ে ছিল। আলোচনা-বিতর্কমূলক গদ্যসাহিত্য বা প্রবন্ধের মাধ্যমে তথ্য পরিবেশনের উদ্যোগ সেই সময়েই শুরু হয়েছে, যখন অনেকে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বাংলা সম্বন্ধে তাচ্ছিল্য ও অবজ্ঞার মনোভাব নিয়ে চিন্তিত। ১৮৩০-৩১ সালে রক্ষণশীলদের মধ্যে হিন্দু কলেজের ছাত্রদের নাস্তিকতা ও স্বধর্মদ্বেষ তুমুল আলোড়ন জাগিয়েছিল, কিন্তু ইংরেজি শিক্ষার প্রাধান্য নিয়ে তাঁরাও বিশেষ মুখ খোলেননি। ১৮৩৫ সালে বেন্টিঙ্ক যখন তাঁর 'মিনিটে' বললেন উচ্চশিক্ষার বাহন হবে ইংরেজি এবং সরকারি অর্থ বরাদ্দ হবে ইংরেজি শিক্ষার প্রসারের জন্যই, তখন কিন্তু 'ইয়ং বেঙ্গলে'র বিদ্রোহী মনোভাবকে উৎসাহ দেবার উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না, তিনি একটি বশংবদ গোষ্ঠী সৃষ্টিকরার কথাই ভেবেছিলেন। কিন্তু চল্লিশের দশকে সেই স্বধর্মদ্বেষী 'ইয়ং বেঙ্গলে'রই অন্যতম মুখপত্র 'বেঙ্গল স্পেক্টেটর' হিন্দু কলেজে বাংলা ভাষাশিক্ষাকে যেভাবে অনাদৃত রাখা হয়েছে, তার নিন্দা করেন এবং প্রশ্ন তোলেন 'এতদ্দেশীয় ভাষার পুস্তক সংগ্রহার্থে যে সাব-কমিটি নিযুক্ত হইয়াছিলেন তাঁহারা এতাবৎকাল পর্যন্ত কি করিলেন'?

রামমোহন যে সাংবাদিকতার ধারা তৈরি করেন, আগেই বলা হয়েছে সেখানে কোম্পানির বহুবিধ কুকীর্তির উল্লেখ করতে তিনি পিছু-পা হননি। 'সম্বাদ-কৌমুদী'তে বাংলাদেশ থেকে শস্য রপ্তানি বন্ধ করার আবেদনও আছে, আছে ইংরেজ ভদ্রলোকদের বগিগাড়ি করে যাবার সময় দু'পাশের মানুষের ওপর নির্মমভাবে চাবুক চালানোর প্রতিবাদ। এই নির্ভীক সাংবাদিকতার ধারাকে অনুসরণ করে পরবর্তীকালে স্বল্পস্থায়ী 'বেঙ্গল স্পেক্টেটর'ও (১৮৪২) কোম্পানির শাসনের দোষত্রুটি, এবং রায়তদের ওপর জমিদারি শোষণের সমালোচনা করে। 'তত্ত্ববোধিনী' (১৮৪৩) পত্রিকাতেও সম্পাদক অক্ষয়কুমার দত্ত- বিদ্যাসাগর যাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন আধ্যাত্মিক প্রচারের চাইতে জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা এবং সামাজিক-রাজনৈতিক প্রসঙ্গ নিয়ে বেশি উৎসাহিত ছিলেন; নীলকর সাহেব ও জমিদারদের প্রজাপীড়নের বিরুদ্ধে এই পত্রিকায় তিনি কলম চালিয়েছিলেন। ১৮৫৩ সালে হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় যখন তাঁর ইংরেজি সাপ্তাহিকপত্র 'হিন্দু পেট্রিয়ট' বার করতে শুরু করেন, তখন এইসব ঐতিহ্য তাঁর পিছনে ছিল। লর্ড ডালহৌসির রাজ্যগ্রাসনীতির তিনি কড়া সমালোচক ছিলেন। ১৮৫৭-৫ মহাবিদ্রোহের সময় বিদ্রোহদমনের নামে ব্রিটিশের রক্তাক্ত অপশাসনের বিরুদ্ধে তীর প্রতিবাদে ঝলসে ওঠে তাঁর লেখনী। যদিও তাঁর মতে এই বিদ্রোহে পরাজয় ছিল অবশ্যম্ভাবী। লর্ড ক্যানিং প্রতিহিংসাপরায়ণতার পক্ষপাতী ছিলেন না, কিন্তু তাঁর কর্মচারীদের নৃশংস অত্যাচার হরিশ্চন্দ্রের মতে ভারতকে এক কসাইখানায় পরিণত করেছিল। সিপাহীদের অত্যাচারের কাহিনী যেভাবে অতিরঞ্জিত করা হচ্ছিল, তাকে বিদ্রূপ করে বলেছিলেন, সাহেবরা 'প্রাচ্যদেশীয় কল্পনাশক্তি'র কথা বলে থাকে, কিন্তু দেখা যাচ্ছে তারা নিজেরা প্রাচ্যদেশীয়দের টেক্কা দিতে পারে, যদি তাদের স্বার্থের প্রশ্ন হয়। নীলকরদের বিরুদ্ধে পত্রিকার মাধ্যমে তাঁর দুঃসাহসী জেহাদ তাঁকে নীলচাষীদের কাছে অতিপ্রিয় করে তুলেছিল, তাঁর অকালমৃত্যুর পর মানুষগান বেধেছিল:

নীল বানরে সোনার বাংলা করলে ছারখার।
অসময়ে হরিশ মোলো লং-এর হলো কারাগার।।

এতে কোনো সন্দেহ নেই, যে হরিশের সাহসিকতা ছিল সত্যিই ব্যতিক্রমী। কিন্তু সংখ্যালঘু হলেও তাঁকে সমর্থন করার মানুষ ছিল, হরিশের মৃত্যুর পর কালীপ্রসন্ন সিংহ বিদ্যাসাগরের অনুরোধে 'হিন্দু পেট্রিয়ট' প্রেস ও সংবাদপত্র কিনে নিয়ে তাঁর নিঃসহায় পরিবারের ভার লাঘব করেন। রাজেন্দ্রলাল মিত্র পরিচালিত 'বিবিধার্থসংগ্রহ' পত্রিকাও 'নীলদপর্ণে'র প্রশংসামূলক সমালোচনা প্রকাশ করে (১৮৬১) সরকারি রোষে বন্ধ হয়ে যায়। অনেক সময়ে বলা হয় তৎকালীন ভদ্রলোক সমাজে ব্রিটিশের সমালোচনায় হরিশ নিতান্ত ব্যতিক্রম। উপরের উদাহরণগুলি এটাই প্রমাণ করে, সাংবাদিকতায় এ ধারা নিতান্ত অনুপস্থিত ছিল না, কিন্তু হরিশ তাকে তুঙ্গে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। অবশ্যই ইংরেজরা তাঁর উদ্দিষ্ট ছিল বলে হরিশ ইংরেজিই ব্যবহার করেন।

হুতোমের বিবরণ থেকে আমরা জানতে পারি ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহকে সে সময়ে 'সিপাই ক্ষ্যাপা' বলে বর্ণনা করা হতো, গোঁড়া হিন্দুরা গুজব ছড়িয়েছিলেন যে বিধবাবিবাহ আইন পাশ হওয়াতে সিপাইরা ক্ষেপেছে, বিধবাবিবাহের প্রথম বর শ্রীশকে কেল্লার ভিতর ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। বিদ্যাসাগরের চাকরি গেছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক আলোড়নের জন্য প্রগতিবাদকেই সবরকমে দোষী ঠাউরেছিলেন তাঁরা। একই সঙ্গে এটাও তাঁদের প্রতিপাদ্য ছিল যে, ব্রিটিশ সরকার যদি দেশীয়দের সামাজিক আচার-আচরণে হস্তক্ষেপ না করে, তাহলে রাজনৈতিক অশান্তিও ঘটবে না। কিন্তু উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে জাতীয়তাবোধের চেতনাবৃদ্ধির একটি ইঙ্গিত ছিল এই যে, কেবল আচারগুলিকে তথৈবচ রাখতে দেবার কথাই বলা হচ্ছে না, এক হিন্দু পুনরুত্থানের স্বপ্নকেও জাগিয়ে তোলা হচ্ছে। 'নবজাগরণে'র যুক্তিভিত্তিক স্বকীয়তার সন্ধানের সঙ্গে এর একটা মৌলিক তফাত আছে। অষ্টাদশ শতকের শেষে বা উনিশ শতকের গোড়ায় উইলিয়াম জোনন্স প্রমুখ প্রাচ্যবাদীরা প্রাচীন ভারতের সভ্যতার (যাকে তাঁরা সাধারণত হিন্দু সভ্যতাই বলতেন) এক গৌরবময় ছবির পুনরুদ্ধার করছিলেন। সাদে, বায়রন, মুর, ক্যাম্পবেল প্রভৃতি যে কবিরা হিন্দু কলেজের ইংরেজি শিক্ষিত ছাত্রদের মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয় ছিলেন, তাঁদের কবিতায় প্রাচ্যবাদীদের প্রভাব ছিল। প্রাচ্যকে, তথা ভারতকে এক বহু প্রাচীন সভ্যতার জন্মভূমি এবং একই সঙ্গে জাঁকজমকপূর্ণ বর্বরতার অন্ধকার ও রহস্যময় দেশ হিসাবে দেখা হতো। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইংরেজি শিক্ষিত যুবকরা সেই কল্পনানির্মিত গৌরবময় ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনের চিন্তাকেই বেশি বেশি করে গ্রহণ করছিলেন। ডিরোজিও-শিষ্য কৃষ্ণদাস পাল ১৮৫৬ সালে এই পরিবর্তনের কথা বলতে গিয়ে বলছেন: স্বজাতির নিন্দা এবং গ্লানিপ্রচারের দিন বিগত: ইংরেজদের সবাই ভালো একথা আর কেউ বলে না, ওয়ালেস-ব্লুস, হ্যাম্পডেন-পেন, ওয়াশিংটন জেফারসনের মতো দেশপ্রেমিক এবং দেশীয় ভাষাচর্চার সমর্থক আজ ইংরেজি শিক্ষিতদের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। কিন্তু রামমোহন, ডিরোজিও বা বিদ্যাসাগরের মধ্যেও স্বকীয়তা ও আত্মসম্মানবোধের পাশাপাশি রক্ষণশীলতার যে তীব্র সমালোচনা পাওয়া যাচ্ছিল, পুনরুত্থানবাদীদের মধ্যে তা বেশ খানিকটা স্তিমিত হয়ে আসে। হিন্দু ভারতের দুর্দশার জন্য মুসলিম শাসনকে দায়ী করার প্রবণতা বেড়ে যায়। এই বিবর্তন বাংলা সাহিত্যের বিকাশে একধরনের টানাপড়েন তৈরি করেছিল।

এ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সাংবাদিকতা এবং পদ্যরচনার মধ্যে পুরনো রক্ষণশীল সমাজের মনোভাবই ফুটে ওঠে। এটা শতকের প্রথমার্ধের মনোভাব। 'ড্রোজু সাহেবি (ডিরোজিও) হেঙ্গামা'র বিবরণ দিতে গিয়ে ত্রিশের দশকের গোড়ায় তিনি ইয়ং বেঙ্গলের দেশাচারবিরোধিতাকে কটাক্ষ করেন, পরে হিন্দু কলেজে অহিন্দু ছাত্রকে প্রবেশাধিকার দেওয়ার প্রশ্নেও (১৮৫৩) 'মুসলমানি' 'খ্রীষ্টানি' ও 'জারজী' 'ত্রিদোষে'র বিপক্ষে কলম ধরেন। বিধবাবিবাহ এবং স্ত্রী-শিক্ষা সম্বন্ধেও তাঁর ঘোর সন্দেহ। অন্যদিকে কিন্তু ১৮৫৭-এর উত্তাল সময়ে তাঁর বিশ্বস্ততা থেকেছে সম্পূর্ণভাবে ব্রিটিশের পক্ষে, এবং 'বিজ্ঞ' হিন্দুদের তুলনায় 'অবোধ যবন'দের সংখ্যাই যে বিদ্রোহীদের মধ্যে বেশি, এটা তিনি পরিষ্কার বলেছেন। রানী লক্ষ্মীবাই সম্বন্ধে তাঁর মন্তব্য: 'হ্যাদে কি শুনি বাণী, ঝাঁসীর রানী/ঠোঁটকাটা কাকী মেয়ে হয়ে সেনা নিয়ে সাজিয়াছে নাকি।।' লক্ষণীয় যে, পরে ঈশ্বরগুপ্তের কবিতার ভূমিকা লিখতে গিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর এই রক্ষণশীলতাকে উল্লেখ্য বিষয় বলে মনে করেননি। তিনি এক 'সেকেলে বাঙালি কবি' এইটুকু বলেই ছেড়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে তিনি ঈশ্বরগুপ্তের সেই সময়ে অনন্য দেশপ্রেমের পরিচয় পেয়েছেন তাঁর 'মাতৃভাষা' বিষয়ক কবিতায় বা 'কতরূপ স্নেহ করি দেশের কুকুর ধরি বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া' এই কবিতার মধ্যে। বঙ্কিমচন্দ্রের বক্তব্য, 'ঈশ্বরগুপ্তের সময়ে কে সাহস করিয়া একথা বলে?' আসলে রক্ষণশীল মনোভাবের কিছু কিছু বিবর্তিতরূপে বঙ্কিমচন্দ্রের প্রজন্মের মধ্যেও ঢুকে গিয়েছিল। 'নবজাগরণে'র যুক্তিবাদীদের সঙ্গে এখানেই তাঁদের তফাত। দেশীয়তার নতুন নির্মাণের যে উদ্যোগ যুক্তিবাদীরা নিয়েছিলেন, শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে তা এক ভিন্নখাতে বইতে থাকে। এই সময়ে রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় টডের 'অ্যানাল্স অব রাজস্থান' অবলম্বন করে 'পদ্মিনী উপাখ্যান, 'কর্মদেবী' প্রভৃতি দেশপ্রেমমূলক গাথাকাব্য লেখেন, যা অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়। রঙ্গলালের লেখায় প্রাচ্যবাদী প্রভাব স্পষ্ট। হিন্দুর অতীত গৌরব স্মরণ করার সঙ্গে মুসলমানদের মূল প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড় করানোর প্রবণতাও লক্ষণীয়। মনে রাখা যেতে পারে যে, ঈশ্বরগুপ্তের 'সংবাদপ্রভাকরে'ই তাঁর সাহিত্যিক হাতেখড়ি হয়েছিল।

মধুসূদন দত্ত এক বেগবান উল্কার মতো এই পরিধির বাইরে চলে গিয়েছিলেন। তিনি বাংলা নাটক ও কবিতার ভাষায় যে বিপ্লব আনলেন তাতে এই উৎক্রমণের চিহ্ন পাওয়া যায়। বঙ্কিম ঈশ্বরগুপ্তের ভাষা সম্বন্ধে বলেছিলেন, তা 'খাঁটি' বাংলা ভাষা: 'তাহাতে সংস্কৃতজনিত কোনো বিকার নাই ইংরেজিনবিশীর বিকার নাই... সরল, সোজা পথে চলিয়া গিয়া পাঠকের প্রাণের ভিতর প্রবেশ করে।' কিন্তু তিনি আবার ১৮৭৩ সালে মধুসূদনের মৃত্যুতে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে জয়দেব গোস্বামীর পর মধুসূদনকেই বাংলার জাতীয় কবি বলে বর্ণনা করেন। অর্থাৎ বঙ্কিম পরোক্ষে স্বীকার করেছেন যে ভাষার বিবর্তনের প্রয়োজন আছে, ঈশ্বরগুপ্তকে দিয়ে আধুনিক বাঙালির সাহিত্য পিপাসা মিটবে না, তিনি নিজে যেমন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে কথা সাহিত্যের ভাষা তৈরি করেছেন, মধুসূদনের মধ্যেও সেই একই প্রয়াসকে তিনি অভিনন্দিত করেছেন। সামাজিক মতামতে রক্ষণশীলতা থাকলেও সাহিত্যিক ভাষাসৃষ্টির ক্ষেত্রে তিনি চুতমার্গকে মানেননি।

মাদ্রাজ বাসকালে ১৮৫৪ সালে প্রদত্ত একটি ইংরেজি বক্তৃতায় মধুসূদন প্রাচ্যবাদী-প্রভাবান্বিত কাব্যিক ভাষায় প্রাচীন ভারতের মহিমাকীর্তন করেছিলেন এবং একই সঙ্গে তার বর্তমান দুর্দশা নিয়ে বিলাপ করেছিলেন, মুসলিম আক্রমণে ধ্বংসপ্রাপ্ত অধঃপতিত হিন্দুস্থানের রত্নখচিত কণ্ঠের ওপর পা তুলে যে অ্যাংলো-স্যাক সন জাতি বসে আছে, তাদের বর্তমান শ্রেষ্ঠত্বও অবশ্য একই সঙ্গে মেনে নিয়েছিলেন এবং সিদ্ধান্ত করেছিলেন, যে খ্রীষ্টীয় সভ্যতাকে গ্রহণের মধ্য দিয়েই হিন্দুস্থানের মুক্তি ঘটবে। দু'বছর বাদে কিন্তু এই মধুসূদনই কলকাতায় ফিরে বাংলা নাটক ও কবিতার রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। ১৮৬২ সাল পর্যন্ত এক অসাধারণ সৃষ্টিশীল পর্বের মধ্য দিয়ে যান। এ-জন্য দেশীয় সমাজে অভূতপূর্ব আদর ও সম্মান তিনি পেয়েছিলেন। বিদ্যোৎসাহিনী সভা তাঁকে 'বাংলা ভাষার আদি কবি' বলে সম্মানিত করেন। কিন্তু তবু এক বাঙালি কবির লভ্য অর্থ ও সামাজিক মর্যাদা মধুসূদনের কাছে যথেষ্ট ছিল না, ব্যারিস্টার হবার জন্য তিনি বিলেতে যান, ব্যারিস্টার হয়েও আসেন এবং বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও কোর্টে ডাক পান। কবি হিসাবে তাঁর শ্রেষ্ঠ সময় তখন অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, স্ববিরোধের আগুনে জ্বলে উল্কার মতোই তাঁর অবসান। এ স্ববিরোধ তাঁর যুগের স্ববিরোধও বটে।

মধুসূদনের ইউরোপপ্রীতি কিন্তু তাঁর সাহিত্যসৃষ্টিকে সীমাবদ্ধ রাখতে পারেনি। হোমার বা মিল্টনের নকল নয়, তাঁর সৃষ্ট অমিত্রাক্ষর বাংলাভাষার মধ্যেকার সম্ভাবনাগুলি থেকেই সম্পূর্ণনতুন সঙ্গীত ও ছন্দ সৃষ্টি করে। মধুসূদননিজে লিখেছেন, রাস্তায় যেতে যেতে এক দোকানীকে তিনি 'মেঘনাদবধ কাব্য' পড়তে দেখেন অতি শুদ্ধভাবে, মধুসূদনের প্রশ্নের জবাবে সেই পাঠক বলেছিলেন, অমিত্রাক্ষর বাংলাভাষায় অবশ্যই চলবে, তা বাংলার সবচেয়ে মহিমান্বিত ছন্দ ('noblest measure')। মধুসূদন সম্বন্ধে বঙ্কিম বা বিদ্যোৎসাহিনী সভা যেমন বলেছিল, তার সঙ্গে যেন তাল রেখেই মধুসূদন নিজেও এইসময়ে তাঁর চিঠিপত্রে 'জাতীয়' কাব্য বা 'জাতীয়' নাট্যশালার সম্ভাবনার কথা বলেন। অবশ্যই কৃষ্ণদাস পাল যেমন 'হিন্দু দেশপ্রেমিক'কে ব্রুস-ওয়ালেস, ওয়াশিংটন-জেফারসনের আদলেই ভেবেছিলেন, এই সময়ে জাতীয় কবি বা নাট্যকারের ধারণাতেও নিশ্চয়ই পাশ্চাত্য জাতীয়তার একটা প্রভাব ছিল, হিন্দু  জাতীয়তার একটা প্রাচ্যবাদী রূপরেখাও ছিল। কিন্তু রঙ্গলালের কাব্যে এটা যেমন খুব মোটা দাগে প্রতিফলিত, মধুসুদনেআদৌ তেমন নয়। মধুসূদননিজের লেখায় পাশ্চাত্য প্রভাবের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। 'শর্মিষ্ঠা'র প্রসঙ্গে বলেছেন, এ লেখা তাদেরই জন্য যারা পাশ্চাত্য চিন্তাধারাকে আগেই আত্মস্থ করেছে, বলেছেন, সংস্কৃতের দাসত্বের বন্ধন মোচনই তাঁর উদ্দেশ্য। 'মেঘনাদবধে' রামের বদলে রাবণকে নায়ক। হিসাবে দেখা এই উদ্দেশ্যের সঙ্গে মিলে যায়। এটা হিন্দু রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে তাঁর জেহাদ। অন্যদিকে রাম ও তার বানরসেনার লংকা আক্রমণ, দেশরক্ষার জন্য মেঘনাদের সংগ্রাম এবং পুত্রহারা রাবণের হাহাকার এক পরাজিত, ভাগ্যনিগৃহীত জাতির বিষাদকে ভাষা দেয়।

নাট্যরচনাতেও মধুসুদন ইউরোপীয় আদর্শ নিয়েই শুরু করেছিলেন। যেমন মহাকাব্য রচনার ক্ষেত্রে তেমনি নাট্যসৃষ্টিতেও কিন্তু ইউরোপীয় প্রভাবকে স্বেচ্ছায় বরণ করার পিছনে ছিল সাবেকি সাহিত্যরীতি থেকে মুক্তির প্রয়াস। 'শর্মিষ্ঠা' বা 'পদ্মাবতী'তে অবশ্য সংস্কৃত নাটকের প্রভাবই সমধিক। কিন্তু এই সময়ে বাংলা থিয়েটারের যে দ্রুত বিকাশ দেখা যায়, তার মধ্যে কেবলমাত্র বাবুসমাজের নিজস্ব বিনোদন সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষাই আছে তা নয়, আছে সমকালীন আবেগ, অভীপ্সা ও যাস্তব ধ্যানধারণাকে ভাষা দেবার চেষ্টা। সাহেবদের থিয়েটারে উচ্চস্তরের দু'একজন বাবুর হয়তো প্রবেশ পাওয়া অসম্ভব ছিল না, অন্যদিকে দেশী যাত্রা, কবিগান, হাফ-আখড়াই প্রথাগত বিনোদন জোগানোর জন্য ছিল। কিন্তু শিক্ষিত সমাজের মধ্যে এক অন্যতর সাংস্কৃতিক পিপাসা ছিল, পাশ্চাত্যের নাটক এবং নাট্যশালার আদর্শ তাদের মাথায় ছিল, আবার একইরকমভাবে তাদের কাছে প্রয়োজন ছিল নাটকে বাংলাভাষার ব্যবহার। লেবেডেফের 'বাঙালি থিয়েটারে' (১৭৯৫) বা নবীন বসুর বাড়িতে 'বিদ্যাসুন্দর' পালার অভিনয়ে (১৮৩৫) দেশী ও বিদেশী মঞ্চরীতির কিছু মিশ্রণ দেখা যায়। দু'জায়গাতেই স্ত্রী-ভূমিকায় মেয়েরা অভিনয় করেছিলেন। কিন্তু লেবেডেফের সময়ে বাঙালি দর্শক-সমাজ ছিল খুবই সীমিত। ১৮৩৫ সালে তা অনেক বিস্তার লাভ করেছিল। স্কুল-কলেজে ইংরেজি নাটকের অভিনয় এবং ধনী ব্যক্তিদের বাড়িতে শৌখিন নাট্যাভিনয়-এর মধ্য দিয়ে এই দর্শকসমাজ গড়ে ওঠে। 'নাটুকে রামনারায়ণে'র 'রত্নাবলী' নাটকের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন বেলগাছিয়ার বিত্তশালী সিংহপরিবার। এই সময় থেকেই সংস্কৃত থেকে অনুবাদ বা পৌরাণিক নাটকের পাশাপাশি 'কুলীনকুল-সর্বস্ব', 'নবনাটক' বা উমেশচন্দ্র মিত্রের 'বিধবাবিবাহ' নাটকের মতো সামাজিক বাস্তবের রূপায়ণের প্রয়াস দেখা যায়।

মধুসুদন দুটি সামাজিক নাটক লিখেছিলেন। 'একেই কি বলে সভ্যতা' এবং 'বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ' (১৮৬১)। কিন্তু ঠিক যেমন বেলগাছিয়া, পাথুরিয়াঘাটা বা জোড়াসাঁকো কোথাও 'কুলীনকুলসর্বস্ব' মঞ্চস্থ হতে পারেনি, তেমনি বেলগাছিয়ার সিংহরা মধুসূদনের সামাজিক নাটককেও তাঁদের মঞ্চে ঠাঁই দিতে সাহস পাননি। 'একেই কি বলে সভ্যতা।' ইয়ং বেঙ্গলের অনাচারের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ হিসাবে শোভাবাজারে মঞ্চস্থ হলেও 'বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ'-তে হিন্দু জমিদারের লাম্পট্য ও ভণ্ডামির চিত্র ধনী পৃষ্ঠপোষকদের পছন্দ হয়নি। প্রকাশের সাতবছর পরে অবশেষে তা মঞ্চস্থ হয় 'আরপুলি নাট্যাভিনয় সমাজে'র মঞ্চে। কিন্তু মধুসূদনের অন্যান্যনাটকগুলিতেও সংস্কৃত নাটকের 'রোমান্টিক' (মধুসুদনের ব্যবহৃত বিশেষণ) ও কাব্যপ্রধান চরিত্র থেকে সরে এসে ঘটনা এবং চরিত্রের রূপায়ণে জোর দেবার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রাচীন সংস্কৃত নাটককেই শুধু নয়, ভারতচন্দ্রের 'বিদ্যাসুন্দরে'র প্রথাবদ্ধতাকেও মধুসুদন নাটকের গতির পক্ষে বাধাস্বরূপ মনে করেছেন। টড় থেকে নেওয়া কৃষ্ণকুমারীর উপাখ্যানকে আশ্রয় করে তাঁর বিয়োগান্তক নাটক, সংস্কৃত নাটক এবং বিদ্যাসুন্দরের ঐতিহ্য থেকে অনেকখানি সরে এসেছিল বলেই তা শৌখিন নাট্যশালার পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি। নিছক বিনোদনের থেকে ভাবগভীরতা বা বাস্তবতার দিকে যাবার প্রয়াস ছিল খুবই কঠিন। যে 'জাতীয় নাট্যশালা'র কথা মধুসূদন ভেবেছিলেন, তা তখন স্বপ্ন মাত্র। ধনীদের শৌখিন নাট্যশালার বাইরে যখন বাংলা নাটকের যাত্রা শুরু হয় এবং নাট্যপ্রেমিক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ যখন নিজেদের নাট্যশালা গড়ে তোলার জন্য চেষ্টিত হন, তখন সামাজিক এবং রাজনৈতিক নাটক প্রয়োজনার কিছু কিছু ঝুঁকি তাঁরা নেন। দীনবন্ধু মিত্রের অধিকাংশ নাটকই সামাজিক এবং সরাসরি বাস্তবভিত্তিক। কিন্তু ১৮৬০ থেকে নাটক লেখা শুরু করলেও তাঁর নাটকের অভিনয়ের জন্য তাঁকে ১৮৬৮ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ঐ বছর গিরিশচন্দ্র ঘোষের 'বাগবাজার অ্যামেচার থিয়েটারে'র মঞ্চে তাঁর 'সধবার একাদশী' অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর প্রথম নাটক 'নীলদর্পণে'র অভিনয় হয় প্রকাশের বারো বছর পরে, ১৮৭২ সালে। গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারের উদ্বোধনে এই নাটক মঞ্চস্থ হয়। মূল চরিত্ররা সমাজের উচ্চস্তরের হলেও কৃষক-চরিত্র এই নাটকে যে প্রাধান্য পেয়েছে এবং রাজনৈতিক বিষয়কে যেভাবে নাটকে আনা হয়েছে, তা এক নতুন যুগের ইঙ্গিত বহন করে আনে।


প্রকাশের তারিখ: ০৬-আগস্ট-২০২৬

© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট
মুজফ্ফ‌র আহমদ ভবন
কলকাতা - ৭০০০১৬

ফোন: ০৩৩ - ২২১৭৬৬৩৩, ২২১৭৬৬৩৪
www.cpimwestbengal.org