|
ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশনSamanway Raha |
ইজরায়েলি বাহিনী এখনও অব্দি দু বার আক্রমণ চালিয়েছে এই নৌ সংহতি আন্দোলনের উপর। আক্রমণ করতে ব্যবহার করা হয়েছে ড্রোন। ফ্লোটিলায় উপস্থিত আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন তাঁরা ভীত নন, তাঁরা এগিয়ে যাবেন। একবিংশ শতাব্দীর নিকৃষ্টতম ঘটনা প্যালেস্তাইনের গণহত্যার বিরুদ্ধে এগোচ্ছে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ নৌ সংহতি আন্দোলনের জাহাজ, নৌক গুলো। এক ঐতিহাসিক লড়াই লড়ছে প্যালেস্তাইনের যোদ্ধারা। একই সাথে, আপসহীন ভাবে আরও জোরদার হচ্ছে এই সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন বিরোধী সংহতি আন্দোলন। |
ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন হল একটি সংহতি আন্দোলন, যা আনুষ্ঠানিক ভাবে ২০১০ সালে তৈরি হয়। তবে এই ধরনের নৌ পথে সংহতি আন্দোলনের সূত্রপাত ২০০৮, ২০০৯ সালে, যখন ছোট ছোট জাহাজ / নৌকা গাজার জন্য ত্রাণ নিয়ে রওনা হত। যাদের নাম ছিল Free Gaza Movement, ২০১০ সালে ইজরায়েলি বাহিনী মারমারা জাহাজে হামলা চালায়। এই হামলায় ১০ জন তুর্কি সংহতি আন্দোলনের কর্মী নিহত হন। এই ঘটনার পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠী, সমাজকর্মী সংগঠন গুলি একজোট হয়। মূলত তুর্কি, নরওয়ে, সুইডেন, দঃ আফ্রিকা, কানাডা, স্পেন, ইংল্যান্ড, মালেশিয়া এবং আমেরিকার গাজা সংহতি গোষ্ঠীগুলি একসাথে আসে। এই তৎপরতা মূলত ইতালি, গ্রিস, তুরষ্কের বন্দর শহর গুলো থেকে পরিচালিত হয়। বিভিন্ন দেশের বামপন্থী নের্তৃত্ব, মানবাধিকার কর্মী, ডক্তার-নার্স, সাংবাদিক এবং পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীরা এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন। এই গোষ্ঠীর কোনো নির্দিষ্ট সদর দপ্তর নেই। যখন ইজরায়েলি প্রশাসন তার আগ্রাসন বাড়িয়েছে, দীর্ঘদিনের অবরোধ করেছে গাজা উপকুলে যার ফলে তীব্র অনাহার তৈরি হয়েছে এই ভূখন্ডে, তখনই আমরা এই বৃহৎ আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে গাজার জন্য সক্রিয়তা দেখেছি। ২০২৩ এর অক্টোবর থেকে যে আগ্রাসন এবং অবরোধ চলছে প্যালেস্তাইন ভূখন্ডে, তার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করছে ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন। এযাবৎকালে তাঁদের নেওয়া কর্মসূচী গুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত কর্মসূচী হল গাজা ফ্রিডম ফ্লোটিলা নৌ মিশনগুলো।
মাদলিন মিশন ( জুন, ২০২৫):-
এক অভূতপূর্ব কাহিনী লুকিয়ে আছে এই মিশনের নামকরণে। এক লড়াই এর গল্প। ৩০ বছরের মাদলিন একজন মহিলা মৎসজীবী। ২০২৩ এর অক্টোবরে আগ্রাসন শুরুর আগে গাজার সমুদ্রে যতদূর পর্যন্ত ইজরায়েলের বে-আইনী অনুমতি পাওয়া যেত, ততদূর মাছ ধরতে যেতেন মাদলিন। সেই মাছ বিক্রির পয়সায় পরিবার চলত মাদলিনের। ২০২৩ এর নভেম্বরে ইজরায়েলি আক্রমনে তার ঘরের কাছেই প্রাণ হারান মাদলিনের বাবা। এই মর্মান্তিক ঘটনার পরে মাদলিন তাঁর পরিবার সহ প্রথমে পালিয়ে যান খান ইউনিসে, তারপর দেইর আল বালাহ অঞ্চলে কিছু দিন ঠাঁই নেন। সবশেষে নুসেইরাতে আশ্রয় নেন মাদলিন। ঘরছাড়া হওয়ার সময়ে মাদলিন ছিলেন নয় মাসের গর্ভবতী। জানুয়ারি মাসে আবার তিনি ফিরে আসেন নিজের ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘরের কাছে। এখন মাদলিনের চার সন্তান। ঘরের মেঝেতেই চার সন্তান সহ স্বামী কে নিয়ে কোনো রকমে জীবন কাটাচ্ছেন মাদলিন। সমুদ্রে নিয়মিত মাছ ধরার সময় অনেক বিদেশী বন্ধুর সাথে একসময়ে পরিচয় হয়েছিল তাঁর। তাদের সাথে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে একদিন এক আইরিশ সংহতি আন্দোলনকারীর কাছ থেকে মাদলিন জানতে পারেন তাঁর নামে একটি জাহাজ ত্রাণ নিয়ে রওনা দেবে গাজার উদ্দেশ্যে। আল জাজিরা কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের আবেগের কথা ভাগ করে নেন। কৃতজ্ঞতা জানান মাদলিন জাহাজে রওনা দেওয়া পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী গ্রেটা থুনবার্গ, ইওরোপীয় সংসদের ফরাসী বামপন্থী আন্দোলনের নেত্রী এবং সদস্য রীমা হাসান সহ বাদবাকি সাহসী আন্দোলনকারীদের। মাদলিন জাহাজের ছবি এবং তার উপড়ে উড়তে থাকা প্যালেস্তাইনের পতাকা দেখে তাঁর স্বগতোক্তি, “ এটাই মানবতার সর্বোচ্চ রূপ, আত্মত্যাগের প্রতীক। ”
১৫ বছর বয়স থেকে মাদলিন তাঁর বাবার সাথে সমুদ্রে গিয়ে মাছ ধরতেন। গাজায় প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত সার্ডিন মাছ। সেই মাছ দিয়ে তৈরি খাবার ছিল খুব জনপ্রিয়। বর্তমানে তাঁরা সব হারিয়েছেন, হারিয়েছেন সারা জীবনের সঞ্চয়। এই ঘটনা শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং তার সাথে প্যালেস্তিনিয়দের আত্মপরিচয়ের উপর আঘাত। আল জাজিরা কে তিনি জানান, যখন নবজাতক সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, তখন শিবিরের পরিবেশ ছিল অস্বাস্থ্যকর। কোনো রকম ব্যথা কমানোর ওষুধ পর্যন্ত তিনি পাননি। ছিলনা বিছানা, নবজাতকদের কোলে নিয়েই মেঝেতে ঘুমাতে হত তাঁকে। এই আগ্রাসন যেন মাদলিনের দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা বোঝার ধারনাও পালটে দিয়েছে।
মাদলিনের আহ্বান, “এটা বিশ্বজুড়ে নিরবতা ভাঙার প্রয়াস। যা গাজার ঘটনা গোটা বিশ্বের চোখের সামনে আনবে।” মাদলিন জাহাজ রওনা দিয়েছিল গাজার উদ্দেশ্যে। গাজার খানিক দূরে এসে ইজরায়েলি বাহিনী আটক করে জাহাজটিকে। গ্রেপ্তার করা হয় আন্দোলনকারী দের। গ্রেটা থুনবার্গ ফিরে এলেও, সহজে ফেরেননি রীমা হাসান সহ বাকি আন্দোলনকারীরা। অনশন শুরু করেন তাঁরা। উত্তাল হয় বিশ্ব। ইওরোপের বন্দর শহর গুলো ফেটে পরে বিক্ষোভে। মাদলিনের প্রেরণায় ভর করে নিরবতা ভাঙে বিশ্বের। আরও বড়ো লড়াই এর প্রস্তুতি শুরু হয়।
মিশন হান্দালা (জুলাই, ২০২৫) :-
মাদলিন কে আটক করার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশনের পরবর্তী মিশন ঠিক হয়-“হান্দালা”। খাবার, ওষুধ সহ বিপুল পরিমাণ ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে হান্দালা নামক জাহাজটি ইতালি থেকে রওনা হয় ১৩ই জুন, ২০২৫। ১৮ জন সংহতি আন্দোলনের কর্মী ছিলেন এই জাহাজে। যাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ক্রিশ্চিয়ান স্মলস। যিনি নিজে আমাজন লেবার ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা। ছিলেন এমা, যিনি একজন ইওরোপীয় ইউনিয়নের সাংসদ। ফ্রিডম ফ্লোটিলার পক্ষ থেকে স্পষ্ট ভাবেই জানানো হয়, তাদের এই প্রয়াস দীর্ঘমেয়াদী লড়াই এর অংশ। একই সাথে তাদের লক্ষ্য গাজায় অনাহারে থাকা এবং দীর্ঘদিন অপুষ্টির শিকার শিশুরা। জাহাজটির নাম হান্দালা রাখা হয়েছিল, যে একটি কার্টুন চরিত্র। প্যালেস্তাইনের লড়াই এর অন্যতম বিখ্যাত কার্টুনিস্ট এবং বুদ্ধিজীবী নাজি আল আলি সৃষ্ট এই চরিত্র। তিনি যখন খুব ছোটো তখন প্যালেস্তাইনে নাকবা (বিপর্যয়) নেমে আসে, যার ফলে বহু মানুষ ঘরছাড়া হন। যাদের আশ্রয় হয়ে ওঠে লেবানন, জর্ডন, মিশরের শিবির গুলি। এরকমই এক শিবিরে ছেলেবেলা কেটেছে নাজির। তাঁর বড়ো হয়ে ওঠা এবং বড়ো হওয়ার সাথে সাথেই তাঁর ছেলেবেলার স্মৃতি কে মনে রেখে একটি দশ বছরের কার্টুন চরিত্র তৈরি করেন। প্রাথমিক ভাবে সেই চরিত্র দর্শক দের দিকে মুখ ঘোরানোই ছিল, কিন্তু পরবর্তী সময়ে নাজি আল্ আলি হান্দালার মুখ ঘুরিয়ে দেন। যেন এক দশ বছরের বাচ্চা, যে নিজের মার্তৃভূমির বিপর্যয়ের জন্য পৃথিবীর থেকে রাগে ক্ষোভে মুখ ঘুরিয়ে আছে। যতদিন না স্বাধীন হবে প্যালেস্তাইন, ততদিন হান্দালা মুখ ঘুরিয়ে থাকবে। ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন এরকম এক কার্টুন চরিত্রের নামে নিজেদের মিশনের নাম দেন।
মিশন ঘোষনার সময় ফ্রিডম ফ্লোটিলা লিখেছিল, “গাজার শিশুরা, যারা জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশী, তাদের পুরো জীবনই কাটছে নির্মম অবরোধ ও ঘেরাটোপের মধ্যে। ২০২৩ এর অক্টোবর থেকে এখনও অব্দি ৫০,০০০ এর বেশী শিশু নিহত বা আহত বা অনাথ হয়েছে। ঘরছাড়া হয়েছে প্রায় ১০ লাখ শিশু। এখন তারা সবাই অনাহার, রোগ এবং একধরনের মানসিক আঘাতের মুখোমুখি হয়েছে, যা আমরা কল্পনাও করতে পারিনা। এই মিশন তাদের জন্য।”
ফ্রিডম ফ্লোটিলার মুখপাত্র বোর্জিয়া বলেন, “বহু বছর ধরে প্যালেস্তিনিয়দের মাছ ধরা বা চাষাবাদ করার ক্ষেত্র কে ধ্বংস করেছে ইজরায়েল। ফলে গাজার মানুষ সম্পুর্ন রূপে সাহায্যের উপর নর্ভরশীল হয়ে পড়েছে। যা তাদের আত্মসম্মান ও আত্মনির্ভরতার চেতনা কে সম্পুর্ন রূপে ধ্বংস করেছে।” এই মিশন গুলো একাধারে যেমন মানবিক কর্মসূচী, তার সাথে গোটা বিশ্বের কাছে এক সাহসী রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। ইতালির প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ব্যবসা করা লিওনার্দোর মতন কোম্পানি এই গণহত্যার জন্য ইজরায়েলকে অস্ত্র রপ্তানি করছে। বোর্জিয়া এই ঘটনার সমালোচনার সাথে সাথেই প্রশ্ন তোলেন ইতালি সরকারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের ব্যার্থতা নিয়েও। জাহাজে উপস্থিত ট্রেড ইউনিয়ন নেতা ক্রিশ্চিয়ান স্মলস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইজরায়েলের প্রতি শর্তহীন সমর্থনের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “এটা শুধু সরকারের ব্যাপার না। আমাদের নিজস্ব শ্রমিক ইউনিয়নগুলি, যাদের ন্যায়ের জন্য লড়াই করার কথা, তারাও এই গণহত্যায় জড়িত। নিরীহ মানুষ হত্যা শ্রমিক ইউনিয়নের বক্তব্যের বাইরে হতে পারেনা।” সামাজিক মাধ্যমে তিনি আহ্বান জানান, “আমি শ্রমিক ইউনিয়ন গুলোকে আহ্বান জানাচ্ছি ইজরায়েলে সমস্ত অস্ত্র চালান বন্ধ করুন। অবিলম্বে যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব গ্রহণ করুন এবং ইতিহাসের সঠিক পক্ষে দাঁড়ান। আমরা ভীত হবনা। আমরা নিরব থাকবোনা।” ইওরোপ জুড়ে শ্রমিক সংগঠন গুলি ক্রমশ বেড়ে ওঠা শ্রমিক দের চাপে পড়ে প্যালেস্তাইনপন্থী প্রস্তাব গ্রহন করতে বাধ্য হচ্ছে। মাদলিনের পরে হান্দালা, লক্ষ্য গাজা কে মুক্ত করা। আবার অবরুদ্ধ হয় এই মিশন, উপস্থিত বামপন্থী নের্তৃত্বরা এবং মানবাধিকার কর্মীরা তীব্র প্রতিবাদ জানান, এ যেনো নাছোরবান্দা মনোভাব। যা বুঝিয়ে দেয় প্যালেস্তাইনের শিশু নারীরা একা নয়, গোটা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষ একজোট হয়ে একবিংশ শতাব্দীর নয়া উপনিবেশবাদ কে রুখবে।
সুমুদ ফ্লোটিলা (সেপ্টেম্বর, ২০২৫) :-
ইতিহাস এতোবড়ো নৌ সংহতি আন্দোলন এর আগে দেখেনি। ৬ টি মহাদেশের ৪৪ টা দেশের ৫০ টা জাহাজ/নৌকার সম্মিলিত সংহতি আন্দোলন সংগঠিত হচ্ছে এখন। ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং ইওরোপের একাধিক দেশের মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মী, পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীরা, শ্রমিক বামপন্থী আন্দোলনের কর্মীরা একজোট হয়ে এগোচ্ছেন গাজা উপকুলের দিকে। ভাঙতে হবে ইজরায়েলের দীর্ঘদিনের গাজা অবরোধ। এবারের মিশনের নাম “সুমুদ”। আরবি শব্দ সুমুদের অর্থ হল লক্ষ্যে অবিচল থাকা। এই সংহতি আন্দোলন যেনো সেই নামের প্রতি সুবিচার করছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে শুরু করে ইজরায়েলি উগ্র জায়নবাদী মন্ত্রী দের হুমকি এখনও থামাতে পারেনি সুমুদ ফ্লোটিলা কে। ইজরায়েলি মন্ত্রী বেন গাভির ঘোষণা করেছেন এই সংহতি আন্দোলন নাকি সন্ত্রাসবাদী কাজকর্ম কে উৎসাহ জোগাতে তৈরি হয়েছে। যা সম্পূর্ন ভিত্তিহীন এবং মিথ্যা অভিযোগ। এই সর্ববৃহৎ সংহতি আন্দোলনে একাধিক গোষ্ঠী যুক্ত হয়েছে যেমন, গ্লোবাল মুভমেন্ট টু গাজা যারা আগে গ্লোবাল মার্চ টু গাজা নামে পরিচিত ছিল। যারা দীর্ঘদিন ধরে আন্তজার্তিক স্তরে গাজা সংহতি এবং দীর্ঘদিনের অবরোধ ভাঙার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে।
আফ্রিকার উত্তর প্রান্তে প্যালেস্তিনিয় মানুষদের মধ্যে দীর্ঘদিন কাজ করা মাঘরেব সুমুদ ফ্লোটিলা। মালেশিয়া সহ আরও আটটি দেশকে জড়িয়ে গড়ে ওঠা সুমুদ নুসানতারা গোষ্ঠী রয়েছে, যারা মালেশিয়া থাইল্যান্ড সহ বিভিন্ন দেশে প্যালেস্তাইন সংহতি আন্দোলনের সাথে দীর্ঘদিন যুক্ত। এবং সবচেয়ে বড়ো গোষ্ঠী হিসেবে রয়েছে ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন। সুতরাং নিশ্চিত ভাবে বোঝা যাচ্ছে গোটা প্রক্রিয়াই প্রথম থেকেই একটি আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া। DW মিডিয়া জানাচ্ছে, প্রায় ৩০০ টন প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে রওনা দিয়েছে সুমুদ। যার মধ্যে পানীয় জল, ওষুধ এবং মহিলাদের ব্যবহারের সামগ্রী রয়েছে। জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক নাথান ব্রাউন জানাচ্ছেন, “গাজার অনাহারে থাকা বিধ্বস্ত মানুষদের যে পরিমাণ সামগ্রীর প্রয়োজন, তা পূরণ করতে পারবেনা সুমুদ। কিন্তু গাজার বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি কাড়তে পারবে।” এবং অবশ্যই প্যালিস্তিনিয় মানুষেরা যে উপেক্ষিত নয়, এই বার্তাও পৌঁছাবে তাদের কাছে।
ফ্লোটিলা তাদের মিশনের শুরুতে ৪ সেপ্টেম্বর বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছিল, “গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা ঐক্যবদ্ধ ভাবে মানবিক মিশন চালাচ্ছে, যার লক্ষ্য হল প্যালেস্তাইনের মানুষের কাছে খাবার, জল, ওষুধ এবং চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া। যারা ইজরায়েলি অবরোধের কারণে ভয়াবহ গণহত্যা, দুর্ভিক্ষ এবং ভয়ঙ্কর স্বাস্থ্য সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। আমাদের এই জোট যেখানে ৪৪ টি দেশের ডাক্তার, নার্স, নির্বাচিত প্রতিনিধি, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা যুক্ত।”
এই মিশনের শুরুতে তারা আন্তর্জাতিক মহলের কাছে দাবি জানায়…
১। সকল রাষ্ট্র ও প্রাসঙ্গিক কর্তৃপক্ষের কাছে আহ্বান, যেনো তারা গাজায় একটি মানবিক এবং ধারাবাহিক করিডোরের মাধ্যমে বেসামরিক মানুষদের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়। এটি একটি নৈতিক এবং আইনগত বাধ্যবাধকতা। প্যালেস্তাইনের সাধারণ মানুষদের জন্য যেনো বাধাহীন ভাবে জীবনরক্ষাকারী সহায়তার প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়।
২। শান্তিপূর্ণ মানবিক অহিংস উদ্যোগের সাথে যুক্ত হওয়ার অধিকার সাধারণ সিভিল সোস্যাইটির মানুষের আছে। গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা, যারা মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর। সেই কাজ কে সুরক্ষিত রাখতে হবে। তারা আন্তর্জাতিক মহলের এবং প্রতিষ্ঠান গুলোর কাছে আবেদন জানায়, তারা যেনো ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে গাজা উপকুলে পৌঁছাতে পারে, তার জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা।
৩। ক্ষুধাকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার যে নিকৃষ্টতম চেষ্টা, তা বন্ধ করতে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এই ঘটনা জেনেভা কনভেনশনের সিদ্ধান্ত বিরোধী কাজ। একই সাথে প্যালেস্তাইনের মানুষদের নিজস্ব ভূমিতে শান্তিতে স্বাধীন ভাবে বসবাস করার অধিকারকে সম্মান জানাতে হবে।
৪। যে কোনো ধরনের দখলমূলক মানসিকতা আন্তর্জাতিক আইন বিরোধী কাজ। এই কথাকে স্মরণে রেখে দখলমূলক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আর্জি জানায় ফ্রিডম ফ্লোটিলা।
ইজরায়েলি বাহিনী এখনও অব্দি দু বার আক্রমণ চালিয়েছে এই নৌ সংহতি আন্দোলনের উপর। আক্রমণ করতে ব্যবহার করা হয়েছে ড্রোন। ফ্লোটিলায় উপস্থিত আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন তাঁরা ভীত নন, তাঁরা এগিয়ে যাবেন। একবিংশ শতাব্দীর নিকৃষ্টতম ঘটনা প্যালেস্তাইনের গণহত্যার বিরুদ্ধে এগোচ্ছে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ নৌ সংহতি আন্দোলনের জাহাজ, নৌক গুলো। এক ঐতিহাসিক লড়াই লড়ছে প্যালেস্তাইনের যোদ্ধারা। একই সাথে, আপসহীন ভাবে আরও জোরদার হচ্ছে এই সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন বিরোধী সংহতি আন্দোলন। দুঃখের বিষয় এটাই যে, এই সংহতির ক্ষেত্রে ভারত রাষ্ট্রের কোনো রূপ ভূমিকা নেই। কোনো প্রতিনিধি নেই ভারত রাষ্ট্রের। ভারত রাষ্ট্র ব্যস্ত ইজরায়েলের সাথে বাণিজ্যিক চুক্তি করতে। যেখানে ইওরোপ, লাতিন আমেরিকার একাধিক রাষ্ট্র নেতানিয়াহু সহ একাধিক উগ্র জায়নবাদী নেতার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে, সেখানে ইজরায়েলের মন্ত্রী স্মোত্রিচ ভারতে বসে বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষর করছে। রাষ্ট্র যখন এই ন্যক্কারজনক ভূমিকা পালন করছে, তখন দেশের লক্ষ লক্ষ খেটে খাওয়া মানুষ প্যালেস্তাইনের জন্য রাস্তায় নেমেছেন।
স্লোগান উঠেছে…
Death to IDF (Israeli Defence Force)
Death to US Imperialism
প্রকাশের তারিখ: ১২-সেপ্টেম্বর-২০২৫ |
© কপিরাইট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) - পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
|